বিনা খরচে মালয়েশিয়ায় ১০ হাজার কর্মী পাঠাবে বাংলাদেশ

মোহাম্মদ জামিল খান
মোহাম্মদ জামিল খান

মালয়েশিয়ায় ১০ হাজার কর্মী পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ। অভিবাসন ব্যয় শূন্য রেখে দক্ষ ও অভিজ্ঞ কর্মীদের সেদেশে পাঠানোর পাশাপাশি নিয়োগকর্তাদের চাহিদা অনুযায়ী কর্মী বাছাই করা হবে। দুই দেশই এখন পুনরায় শ্রমবাজার চালুর লক্ষ্যে এ পথে এগিয়ে যাচ্ছে।

মালয়েশিয়ার নিয়োগকর্তারা কর্মী নেওয়ার জন্য ডিমান্ড লেটার (চাহিদাপত্র) পাঠাতে শুরু করেছেন। কর্মীদের ধরন, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার বিষয়ে আলোচনার জন্য আগামী সপ্তাহে মালয়েশিয়ার একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফরে আসবে।

শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, মালয়েশিয়া প্রাথমিকভাবে ১০ হাজার কর্মী নিতে রাজি হয়েছে এবং এই কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ অভিবাসন ব্যয়মুক্ত হবে।

আরিফুল একইসঙ্গে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়েরও দায়িত্বে আছেন।

গতকাল শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, কর্মীদের নির্বাচনের আগেই নিয়োগকর্তাদের চাহিদা অনুযায়ী প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এরপর বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল) এবং অন্যান্য রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে তাদের পাঠানো হবে।

আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, দুই দেশের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমেই মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় খুলেছে। তবে সরকার চায়, অতীতে সিন্ডিকেট-ভিত্তিক কর্মী নিয়োগের কারণে শ্রমিকরা যে ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিলেন, তার পুনরাবৃত্তি যেন না হয়।

তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বিদেশগামী কর্মীরা বিভিন্ন সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নানা ধরনের হয়রানির শিকার হয়েছেন।

তিনি আরও যোগ করেন, শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়ে আলোচনার সময় সরকার সুনির্দিষ্ট কিছু শর্ত জুড়ে দিয়েছে।

প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা এবং রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকদের তথ্যমতে, মালয়েশিয়ার নিয়োগকর্তারা চাহিদাপত্র (ডিমান্ড লেটার) ইস্যু করা শুরু করেছেন এবং লেভি (শুল্ক) পরিশোধের মাধ্যমে 'ফরেন ওয়ার্কার্স সেন্ট্রালাইজড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম' (এফডব্লিউসিএমএস)-এ কর্মীদের তালিকাভুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু করেছেন।

কুয়ালালামপুরে বাংলাদেশ হাইকমিশন মালয়েশিয়ার নিয়োগকর্তাদের পাঠানো চাহিদাপত্রগুলো যাচাই-বাছাই করে অনুমোদন (সত্যায়ন) দেওয়া শুরু করেছে।

গত সপ্তাহে হাইকমিশন গুডনেস সার্ভিসেস লিমিটেডের মাধ্যমে মালয়েশিয়ার সুপারমার্কেট চেইন এনএসকে ট্রেড সিটির জন্য ২৮ বাংলাদেশি কর্মীর একটি চাহিদাপত্র সত্যায়ন করেছে।

কর্মকর্তারা জানান, শূন্য অভিবাসন ব্যয়ে বোয়েসেলের মাধ্যমে এই ১০ হাজার কর্মী পাঠানোর ওপর সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

বোয়েসেলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ রাশেদুল হক গতকাল দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, যে ১০ হাজার কর্মী নেওয়া হবে, তাদের মধ্য থেকে প্রয়োজনীয় দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও শারীরিক সক্ষমতা যাচাই করে তবেই চূড়ান্ত করা হবে।

তিনি আরও বলেন, কর্মী নির্বাচনের মানদণ্ড সম্পূর্ণ নিয়োগকর্তার ওপর ছেড়ে দিতে চাই। তারা কাদের নিতে চান, কী ধরনের কর্মী প্রয়োজন এবং তাদের কী কী যোগ্যতা থাকতে হবে—সেটি তারাই নির্ধারণ করবেন।

রাশেদুল জানান, কর্মী নিয়োগের শর্তাবলী নিয়ে আলোচনার জন্য আগামী সপ্তাহে মালয়েশিয়ার একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফরে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।

তিনি জানান, মালয়েশিয়ার প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফর করলে এবং নিয়োগকর্তাদের চাহিদার বিষয়টি পরিষ্কার হলে, কর্মী পাঠানোর একটি সুনির্দিষ্ট সময়সীমা জানা যাবে।

তবে নতুন কর্মী পাঠানোর আগে বোয়েসেল পুরোনো একটি প্রক্রিয়া শেষ করতে চায়।  ২০২৪ সালের ৩১ মে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় যে কর্মীদের ভিসা ও প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও যাওয়া আটকে গিয়েছিল, আগে তাদের পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে।

আশা করা হচ্ছে, আগামী ১৬ অক্টোবরের মধ্যে এই কর্মীদের পাঠানোর কাজ শেষ হবে।

বোয়েসেলের একজন কর্মকর্তা জানান, আগের আটকে পড়া কর্মীদের মধ্যে এখনো প্রায় ১২০ থেকে ১৫০ জন যাওয়ার অপেক্ষায় আছেন। তাদের নিয়োগকর্তাদের কাছে চিঠি লিখে এই প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করার অনুরোধ জানানো হবে।

এদিকে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর দাবি, চাহিদাপত্র পাওয়ার পর কর্মী নির্বাচন, স্বাস্থ্য পরীক্ষা, প্রশিক্ষণ এবং অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা কবে ও কীভাবে শুরু হবে, সে বিষয়ে তারা এখনো সুনির্দিষ্ট কোনো নির্দেশনা পায়নি।

এ বিষয়ে আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, স্বাস্থ্য পরীক্ষার বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। সব নিয়মকানুন ঠিক হয়ে গেলে সরকার এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানিয়ে দেবে।

বর্তমানে বাংলাদেশি কর্মীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য ১৭টি অনুমোদিত মেডিকেল সেন্টার রয়েছে।

গত ১ অক্টোবর, পল্টনের বক্স কালভার্ট রোডে অবস্থিত হিউম্যান ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড মেডিকেল সেন্টার নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে সিলগালা করে দেওয়া হয়। কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই মালয়েশিয়াগামী কর্মীদের মেডিকেল পরীক্ষা ও রিপোর্ট দেওয়ার অপরাধে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

গতকাল ব্রিফিংয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন  বলেন, দেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে সরকার মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় খোলার জন্য কাজ করছে।

তবে তিনি বিস্তারিত কিছু না জানিয়ে বলেন, এই প্রক্রিয়াটি কিছু শর্ত সাপেক্ষে চলছে। আগের সরকারের আমলে করা সমঝোতা স্মারক এবং সেই সময়কার নিয়োগ কাঠামোর কারণে এখনো কিছু জটিলতা রয়ে গেছে।

মাহদী আমিন আরও বলেন, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় এসব বিষয় নিয়ে কাজ করছে এবং এ বিষয়ে কোনো কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা গণমাধ্যমকে জানানো হবে।