দেশের কোথায় বাল্যবিয়ে বেশি, কোথায় কম

সর্বোচ্চ হার রাজশাহীতে, নারীশিক্ষা ও কর্মসংস্থানে পিছিয়ে থেকেও সিলেটে সর্বনিম্ন
আব্দুল্লাহ হেল বুবুন

জিম্বাবুয়ের মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবী ন্যারাদজাই গুমবোনজভান্দা একবার বলেছিলেন, ‘আমি বাল্যবিয়েকে শিশু ধর্ষণ বলি।’ বাস্তব পরিস্থিতি তার এই কথার মতোই নির্মম। বাংলাদেশে এখনো অনেক মেয়ের শৈশব সংকুচিত হয়ে আসে দারিদ্র্য, সহিংসতা, পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার ব্যয়, বয়ঃসন্ধির সঙ্গে জুড়ে দেওয়া সামাজিক প্রত্যাশা এবং শেষ পর্যন্ত প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগেই বিয়ের চাপে। 

এই প্রতিবেদনে আমরা তুলে ধরেছি, কোন বিষয়গুলো মেয়েদের বাল্যবিয়ের দিকে ঠেলে দেয়, কী কারণে তারা পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে না, সহিংসতা থেকে সুরক্ষা দেওয়ার দায়িত্বে থাকা ব্যবস্থাগুলো কেন ব্যর্থ হয় এবং পুরুষতান্ত্রিক সমাজে বেড়ে ওঠার অর্থ কেন প্রায়ই কম স্বাধীনতা নিয়ে বড় হওয়া। বাল্যবিয়ে বন্ধ করার অর্থ শৈশবকেই সুরক্ষিত করা। লক্ষ্যটি স্পষ্ট—মেয়েদের নিরাপদ রাখা, পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা, নিজেদের ভবিষ্যৎ বেছে নেওয়ার অধিকার রক্ষা করা এবং সর্বত্র, প্রতিটি মেয়ের বাল্যবিয়ে বন্ধ করা।

গত ২৫ বছরে বাংলাদেশে মাতৃ ও নবজাতকের মৃত্যু উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বেড়েছে এবং দারিদ্র্য হ্রাস পেয়েছে। কিন্তু বাল্যবিয়ের ক্ষেত্রে অগ্রগতির চিত্র এখনো হতাশাজনক।

শিল্পায়ন, নগরায়ণ ও মানুষের সম্পদ বাড়লেও বাল্যবিয়ে কমানোর অগ্রগতি ধীর।

বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপের (বিডিএইচএস) ১৯৯৩-৯৪ সালের তথ্যে দেখা যায়, ২০-২৪ বছর বয়সী নারীদের ৭৩ শতাংশের বিয়ে হয়েছিল ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে। ২০২২ সালে এই হার কমে দাঁড়ায় ৫১ শতাংশে। অর্থাৎ প্রায় তিন দশকে কমেছে মাত্র ২২ শতাংশ, যা বছরে গড়ে প্রায় শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ। ভারত, পাকিস্তান, নেপাল ও মালদ্বীপের তুলনায় বাংলাদেশের এই অগ্রগতি অনেক ধীর।

বিশ্বজুড়ে বাল্যবিয়ের হার কমানোর গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক হিসেবে বিবেচিত শিক্ষা ও সম্পদ বাংলাদেশে তুলনামূলকভাবে কম কার্যকর হয়েছে। ২০২৫ সালের মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভের (এমআইসিএস) তথ্য অনুযায়ী, উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করা ২০-২৪ বছর বয়সী নারীদেরও ২৫ শতাংশের বিয়ে হয়েছিল ১৮ বছর হওয়ার আগে।

এমনকি সবচেয়ে ধনী পরিবারের ক্ষেত্রেও প্রায় প্রতি তিনজন নারীর একজনের (৩১ দশমিক ৫ শতাংশ) বিয়ে হয়েছে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে। শহর ও গ্রামের মধ্যেও ব্যবধান খুব বেশি নয়। শহরে এই হার ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ, গ্রামে ৪৯ দশমিক ৪ শতাংশ।

বসবাসের স্থান নির্ধারণ করে বিয়ের বয়স

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৪ সালের ক্ষুদ্র এলাকার হিসাব অনুযায়ী, দেশের ৫৪১টি উপজেলায় ২০-২৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে বাল্যবিয়ের হার ৩৮ দশমিক ৩ থেকে ৬৫ দশমিক ৭ শতাংশের মধ্যে।

খুলনা ও রাজশাহী বিভাগে বাল্যবিয়ের হার সবচেয়ে বেশি। খুলনা বিভাগের ৬৪টি উপজেলার প্রতিটিতে এই হার ৬০ শতাংশের বেশি (৬০ দশমিক ১ থেকে ৬৪ শতাংশ)। রাজশাহীর ৭০টি উপজেলার মধ্যে শুধু মতিহার ছাড়া বাকি ৬৯টিতেও এই হার ৬০ শতাংশের বেশি।

দেশে সবচেয়ে বেশি বাল্যবিয়ের হার চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলায়—৬৫ দশমিক ৭ শতাংশ। বাল্যবিয়ের হার বেশি এমন অন্য এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে বগুড়া, জয়পুরহাট ও সিরাজগঞ্জ।

বরিশাল, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, রংপুর ও ঢাকা বিভাগের অধিকাংশ এলাকায় বাল্যবিয়ের হার ৪৮ থেকে ৫৩ শতাংশ। ঢাকা বিভাগের মধ্যে শাহবাগে এই হার সবচেয়ে কম, ৩৯ শতাংশ। আর মিরপুরে সবচেয়ে বেশি, ৬০ শতাংশ।

অন্যদিকে, সিলেট বিভাগের প্রতিটি উপজেলায় বাল্যবিয়ের হার ৪৩ শতাংশের নিচে (৩৮ দশমিক ৩ থেকে ৪২ দশমিক ৮ শতাংশ)। জেলাভিত্তিক হিসাবে সুনামগঞ্জে এই হার সবচেয়ে কম। আর দেশের সব উপজেলার মধ্যে সর্বনিম্ন হার সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে (৩৮ দশমিক ৩ শতাংশ)।

কম বয়সে বিয়ে, পরে আফসোস

বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপ-২০২২ অনুযায়ী, দেশের অন্য যেকোনো অঞ্চলের তুলনায় খুলনা, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের নারীদের বিয়ে হয় কম বয়সে। একইসঙ্গে এই তিন বিভাগের নারীদের মধ্যেই পরে বিয়ে করার ইচ্ছা ছিল বলে জানানোর প্রবণতা সবচেয়ে বেশি।

এই তিন বিভাগে ২০-৪৯ বছর বয়সী নারীদের প্রথম বিয়ের গড় বয়স ১৬ বছর। অর্থাৎ, এই তিন বিভাগের অর্ধেক নারী ১৬ বছর বয়স বা তার আগেই বিয়ে করেছেন।

এই বিভাগগুলোতেই এমন বিবাহিত নারীর হার বেশি, যারা জানিয়েছেন, তারা আরও পরে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন। রাজশাহীতে এই হার ৪৭ শতাংশ, খুলনায় ৪২ শতাংশ এবং রংপুরে ৩৭ দশমিক ৮ শতাংশ।

এর বিপরীত চিত্র সিলেটে। বাংলাদেশে একমাত্র এই বিভাগেই নারীদের বিয়ের গড় বয়স ১৮ বছরের বেশি (১৮ বছর ৮ মাস)।

সিলেটের মাত্র ১৬ দশমিক ৬ শতাংশ নারী জানিয়েছেন, তারা আরও পরে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন। রাজশাহী ও খুলনার নারীদের ক্ষেত্রে এই হার প্রায় তিন গুণ।

জরিপটিতে এসব পার্থক্যের কারণ অনুসন্ধান করা হয়নি। তবে বাল্যবিয়ের প্রভাব নিয়ে বিভিন্ন গবেষণা থেকে বোঝা যায়, বিভাগভেদে নারীদের মনোভাবের পার্থক্যের পেছনে কী ধরনের বিষয় কাজ করতে পারে।

গবেষণায় বাল্যবিয়ের সঙ্গে কম শিক্ষাগত যোগ্যতা, স্বামীর পরিবারের মধ্যে নারীর মর্যাদা হ্রাস, প্রজননসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা কমে যাওয়া এবং মাতৃমৃত্যুর ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশসহ ৩৪টি দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করে করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগে বিয়ে করা নারীদের ক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্ক বয়সে বিয়ে করা নারীদের তুলনায় শারীরিক বা যৌন সহিংসতায় শিকার হওয়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

সিলেটের ধাঁধা

প্রচলিত আর্থসামাজিক সূচক বিবেচনায় নিলে সিলেটে বাল্যবিয়ের হার বেশি হওয়ার কথা।

বিডিএইচএস-২০২২ অনুযায়ী, ১৫-৪৯ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে মাধ্যমিক বা তার পরেও পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া নারীর অনুপাত সিলেটে সবচেয়ে কম। নিরক্ষর নারীর হার সেখানে সবচেয়ে বেশি। নারী কর্মসংস্থানের হারও সবচেয়ে কম—জাতীয়ভাবে ৩২ শতাংশের বিপরীতে মাত্র ১৮ দশমিক ৮ শতাংশ।

দারিদ্র্যের হার দিয়েও এ পার্থক্য ব্যাখ্যা করা কঠিন। নোয়াখালী ও ঢাকায় দারিদ্র্যের হার দেশের সর্বনিম্নগুলোর মধ্যে—যথাক্রমে ৬ দশমিক ১ ও ৬ দশমিক ৮ শতাংশ। অথচ এই দুই জেলার উপজেলাগুলোতে বাল্যবিয়ের গড় হার প্রায় ৫২ শতাংশ।

দারিদ্র্যের হার সবচেয়ে কম এমন ১০টি জেলার তালিকায় থাকা মেহেরপুর, খুলনা, সিরাজগঞ্জ ও বগুড়ায়ও ১০ জনের মধ্যে ছয়জনেরও বেশি নারীর বিয়ে হয়েছে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে।

২০২০ সালে আইরিস গ্রুপের একটি প্রতিবেদনেও দেখা যায়, আর্থসামাজিক ও স্বাস্থ্য সূচকে পিছিয়ে থাকা সত্ত্বেও বাল্যবিয়ের হার সবচেয়ে কম সিলেটে।

আইরিস গ্রুপ নারীদের নেতৃত্বে পরিচালিত একটি আন্তর্জাতিক উন্নয়নবিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান।

বিষয়টি অনুসন্ধান করতে দ্য ডেইলি স্টার সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলা ঘুরে শিক্ষক, সরকারি কর্মকর্তা, শিক্ষার্থী, রাজনীতিবিদ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলেছে।

জগন্নাথপুরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইসলাম উদ্দিনের মতে, পুরুষদের বিদেশে গিয়ে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা বিয়ের বয়স বাড়ার একটি কারণ।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় সিলেটের তরুণেরা বেশি বয়সে বিয়ে করেন। এ অঞ্চলে প্রবাসীর সংখ্যাও বেশি। অধিকাংশ তরুণের লক্ষ্য বিদেশে যাওয়া। বিদেশে গিয়ে প্রতিষ্ঠিত হতে সময় লাগে।’

২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, সিলেটে অবিবাহিত মানুষের হার ৩৭ দশমিক ৭৭ শতাংশ, যেখানে জাতীয় হার ২৮ দশমিক ৬৫ শতাংশ। জগন্নাথপুরে অবিবাহিত পুরুষের হার ৪৯ দশমিক ৯৬ শতাংশ এবং নারীর হার ৩৬ দশমিক ২৮ শতাংশ।

জনশুমারির জেলা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, জগন্নাথপুরের প্রায় প্রতি চারটি পরিবারের একটি প্রবাসী আয় পায়। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, অধিকাংশ প্রবাসী যুক্তরাজ্যে থাকেন।

পাশের শান্তিগঞ্জ উপজেলার সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান শীতাংশু শেখর ধর ইউরোপের প্রভাবের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘এখানকার মানুষ যুক্তরাজ্য বা ইউরোপে বসবাসকারীদের অনুসরণীয় মনে করেন।’

তবে সুনামগঞ্জের যেসব উপজেলায় যুক্তরাজ্য বা ইউরোপে বসবাসকারী প্রবাসীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম, সেখানেও বাল্যবিয়ের হার দেশের প্রায় সব এলাকার তুলনায় কম।

সরকারি জুবিলী স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক এ কে এম আজাদ মিয়া মনে করেন, এর পেছনে ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক কারণ থাকতে পারে। নিজের মায়ের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, আমার মা ১৯৬৫ সালে ২৪ বছর বয়সে বিয়ে করেছিলেন।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরেই বাল্যবিয়ের হার সর্বোচ্চ

চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার বাইরে নয়াগোলা গ্রামে ছেলের সঙ্গে চায়ের দোকান চালান আশরাফুল আলম। মেয়েদের ১৮ বছর হওয়ার আগেই বিয়ে দিয়ে তিনি নিজের ওপর থেকে ‘বোঝা নামিয়েছেন’ বলে মনে করেন।

এক মেয়ের ১৮ বছর পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করার ইচ্ছা ছিল তার। কিন্তু যৌতুক ছাড়া বিয়ের প্রস্তাব পেয়ে রাজি হয়ে যান। তার আশঙ্কা ছিল, অপেক্ষা করলে পরে যৌতুকের দাবি উঠতে পারে এবং মেয়ের নিরাপত্তাও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

আশরাফুল বলেন, ‘এটি শরিয়াহসম্মতও।’ তার ভাষ্য, নারীদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর এবং পুরুষদের ২১ বছর নির্ধারণের আইন মানসিক ও শারীরিক পরিপক্বতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

বিবিএসের ২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলায় ১৮-৪৯ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে বাল্যবিয়ের হার দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ—৬৫ দশমিক ৭ শতাংশ।

কিন্তু বাল্যবিয়ে বন্ধে আইন প্রয়োগের পরিসংখ্যানে সমস্যাটির ব্যাপকতার প্রতিফলন খুব সামান্য। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে পুরো জেলায় মাত্র ১৮টি বাল্যবিয়ে বন্ধ করা হয়েছে। আর ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বন্ধ করা হয়েছে আরও ৪১টি।

সরকারি কর্মকর্তা, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, রাজনীতিবিদ, শিক্ষার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দারা বাল্যবিয়ের পেছনে নারীদের কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগ, ধর্মীয় রক্ষণশীলতা, দারিদ্র্য, নিরাপত্তাহীনতা, আইনের দুর্বল প্রয়োগ এবং রাজনৈতিক অমনোযোগকে দায়ী করেছেন।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক শাহিদা আখতার নারীদের কর্মসংস্থানের অভাবকে বাল্যবিয়ের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

তিনি বলেন, ‘কাজের জন্য নারীরা খুব কমই জেলার বাইরে যান। আর এখানে তাদের জন্য কাজের সুযোগও নেই।’

২০২২ সালের জনশুমারির জেলা প্রতিবেদন অনুযায়ী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরে ১৫-২৪ বছর বয়সী নারীদের ৫৮ দশমিক ৬৭ শতাংশ শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা প্রশিক্ষণের বাইরে রয়েছেন। ১৫-১৯ বছর বয়সী মেয়েদের প্রায় অর্ধেকই পড়াশোনা করেন না, কাজও করেন না।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মেডিকেল কর্মকর্তা ডা. সুলতানা পাপিয়া বলেন, এর আগে তিনি যেসব এলাকায় বসবাস করেছেন বা কাজ করেছেন, কোথাও বাল্যবিয়ের এমন ব্যাপকতা দেখেননি।

উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের এই জেলায় ১৮ লাখের বেশি মানুষের বসবাস।

‘১২-১৩ বছর বয়সেই মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়। প্রতিটি শিশুকেই এমনভাবে অভ্যস্ত করা হয় যে তারা মনে করে, অল্প বয়সে বিয়ে করাই স্বাভাবিক। তাদের কাছে বিয়েটা পুতুল খেলার মতো’, বলেন ডা. সুলতানা পাপিয়া।

দারিদ্র্য ও ‘ধর্মীয় গোঁড়ামি’কে দায়ী করে তিনি বলেন, কয়েকটি মাদ্রাসায় মেয়েদের জরায়ুমুখের ক্যানসার প্রতিরোধী টিকা দিতে স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি।

‘আমরা ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের পাঠিয়েছি, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদেরও কাছে গিয়েছি। কিন্তু এরপরেও তারা টিকা দিতে রাজি হননি। এ ধরনের কুসংস্কার এই জেলায় বিশেষভাবে প্রকট।’

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. জয়নাল আবেদিন ধর্মীয় রক্ষণশীলতাকে বাল্যবিয়ের ‘প্রধান চালিকাশক্তি’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তার অভিযোগ, নারীদের ওপর ঘটা যৌন সহিংসতার জন্য তাদেরকেই দোষারোপ করেন কোনো কোনো ধর্মীয় নেতা।

এক্সিম ব্যাংক কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আতিকুল ইসলাম মেয়েদের ব্যাপক যৌন হয়রানির কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘মেয়ের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন অভিভাবকেরা ১৬-১৭ বছর বয়সেই তাদের বিয়ে দিয়ে দেন।’

স্থানীয় বাসিন্দা ও সরকারি কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বিয়ের নিবন্ধক বা কাজিরাও বাল্যবিয়ে সম্পন্ন করতে সহায়তা করেন।

জেলা শিক্ষা কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘বাল্যবিয়ে সম্পন্ন করতে তারা স্বাভাবিক ফির চেয়ে তিন গুণেরও বেশি টাকা নেন।’

সব মিলিয়ে এসব বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, দেশের অন্যান্য ক্ষেত্রে অগ্রগতি সত্ত্বেও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সামাজিক চাপ ও আইনের দুর্বল প্রয়োগের কারণেই এখনো টিকে আছে বাল্যবিয়ে।