বিমসটেক: কী, কেন, কীভাবে
পৃথিবীর কয়েকশ দেশের মধ্যে নানা ধরনের সম্পর্কের রসায়ন আর স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কারণে গড়ে উঠেছে নানা ধরনের জোট, সংগঠন। কোনো জোট সামরিক, কোনো জোট ব্যবসায়িক, আবার হয়তো কোনো জোট গড়ে উঠেছে নিজেদের মধ্যে তথ্য-প্রযুক্তি আদান-প্রদানের মাধ্যমে কৌশলগত সুবিধা নিশ্চিতের জন্য।
তেমনি একটি জোট বিমসটেক। ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে ১২ অক্টোবর থেকে শুরু হয়েছে বিমসটেক সম্মেলন। জোটটি প্রতিষ্ঠার প্রায় তিন দশক পর এই প্রথম সদস্য রাষ্ট্রগুলোর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরা একসঙ্গে বসতে যাচ্ছেন কোনো সম্মেলনে।
১২ ও ১৩ অক্টোবর এই সম্মেলনে প্রথম দিন সদস্য দেশগুলোর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা এবং দ্বিতীয় দিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরা বৈঠকে বসবেন। প্রথম দিনের বৈঠককে ভারতের স্বরাষ্ট্রসচিব গোবিন্দ মোহন এবং দ্বিতীয় দিনের বৈঠকে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সভাপতিত্ব করবেন।
নয়াদিল্লিতে এবারের বৈঠকে বিমসটেক রাষ্ট্রগুলোতে সন্ত্রাসবাদ ও আন্তসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব পাবে। মানব ও অর্থ পাচার, মাদক চোরাকারবার, সন্ত্রাস ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধের পাশাপাশি সদস্য দেশগুলোর আইন প্রয়োগকারী ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনাও রয়েছে এজেন্ডায়।
বিমসটেক কী
বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের সাতটি দেশের একটি আঞ্চলিক জোট বিমসটেক (বিআইএমএসটিইসি)। এর পূর্ণ অর্থ হলো, ‘বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টি-সেক্টোরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কোঅপারেশন’।
শুরুর দিকে অবশ্য এর নামকরণ করা হয়েছিল সদস্য দেশগুলোর নামের আদ্যাক্ষর থেকে। প্রতিষ্ঠাকালে এর সদস্য ছিল বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা ও থাইল্যান্ড। আদ্যাক্ষর বি, আই, এস ও টি-এর সঙ্গে ‘ইকোনমিক কোঅপারেশন’-এর আদ্যাক্ষর ই ও সি মিলে জোটের নাম ‘বিআইএসটি-ইসি’।
তাদের সঙ্গে এরপর যোগ দেয় মিয়ানমার। তখন এম যুক্ত হয়ে জোটের নাম ‘বিআইএমএসটি-ইসি’ হয়ে যায়।
এরপর এই জোটে যোগ দিয়েছে আরও দুটি দেশ—নেপাল ও ভুটান। সে হিসাবে জোটের নাম বদলে ‘বিবিআইএমএনএসটি-ইসি’ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু, সেটা আর হয়নি। ২০০৪ সালে ব্যাংকক সামিটে বরং বিমসটেক নামটাকেই সিলগালা করে দেওয়া হয় এবং এর অক্ষরগুলোর প্রতীকী অর্থ দেশের নামের আদ্যাক্ষরের পরিবর্তে জোটের সার্বিক লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে করা হয়।
বিমসটেকের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই সাত দেশের মধ্যে বাণিজ্য, যোগাযোগ, জ্বালানি, নিরাপত্তা, কৃষি, পর্যটন ও প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোই এই জোটের লক্ষ্য।
১৯৯৭ সালের ৬ জুন প্রতিষ্ঠিত এই জোটটি কোনো সামরিক জোট নয়। বরং সদস্যদেশগুলো নিজ নিজ সার্বভৌমত্ব বজায় রেখে একে অপরকে সহযোগিতা করবে, সেটাই উদ্দেশ্য।
কেন গঠন হলো বিমসটেক
এই সাত দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি দেশগুলোর নিরাপত্তা ও জনগণের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নও একটি অন্যতম লক্ষ্য বিমসটেকের।
সদস্যদেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য বৃদ্ধি, বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও সামুদ্রিক অর্থনীতি বিকাশ; প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সড়ক, রেল, নৌ ও সমুদ্রপথে যাতায়াত বাড়ানো এর অন্যতম উদ্দেশ্য। একইসঙ্গে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি এবং প্রযুক্তি ও দক্ষতা বিনিময়ের মাধ্যমে স্বাস্থ্য ও মানবসম্পদ উন্নয়নে সহযোগিতার প্রচেষ্টাও রয়েছে এই জোটের।
সামরিক জোট না হলেও দেশগুলোর নিরাপত্তা জোরদারে সন্ত্রাসবাদ, আন্তদেশীয় অপরাধ ও দুর্যোগ মোকাবিলায় সমন্বয় করার লক্ষ্য রয়েছে বিমসটেকের। পাশাপাশি দেশগুলোর জনগণের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য পর্যটন, সংস্কৃতি, শিক্ষা ও মানুষের যাতায়াত সহজ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে এর গঠনের সময়।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা, পরিবেশ সংরক্ষণ ও পাহাড়ি অর্থনীতির উন্নয়নে কাজ করে বিমসটেক। কৃষি উৎপাদন, মৎস্য, গবাদিপশু, কৃষি প্রযুক্তি ও খাদ্য সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়ন এবং দারিদ্র্য কমাতে পরস্পরকে সহযোগিতা এই জোটের অন্যতম এজেন্ডা।
কীভাবে শুরু
১৯৯৭ সালে ব্যাংকক ঘোষণার মাধ্যমে বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা ও থাইল্যান্ডের অংশগ্রহণে এই জোটের শুরু হয়। একই বছর মিয়ানমার এবং ২০০৪ সালে নেপাল ও ভুটান এতে যোগ দেয়।
২০১৪ সালে মিয়ানমারের নেপিদোতে আয়োজিত তৃতীয় শীর্ষ সম্মেলনে সিদ্ধান্ত হয়, এই জোটের স্থায়ী সচিবালয় হবে ঢাকায়। পরবর্তীতে একই বছর ১৩ সেপ্টেম্বর ঢাকার গুলশান-২-এ সেই সচিবালয় উদ্বোধন করা হয়। এই সচিবালয় জোটের প্রশাসনিক ও সমন্বয় কাজ পরিচালনা করে। এর নেতৃত্বে থাকেন মহাসচিব। বর্তমানে এই দায়িত্বে রয়েছেন ভারতীয় কূটনীতিবিদ ইন্দ্র মনি পান্ডে। সদস্যদেশগুলোর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতি দেখা, সভা আয়োজন করা এবং বিভিন্ন কার্যক্রম সমন্বয়ে সহযোগিতাও সচিবালয়ের দায়িত্ব।
২০২৪ সালের ২০ মে বিমসটেক সনদ কার্যকর হওয়ার পর এই জোটের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি আরও সুসংহত হয়।
বিমসটেকের সম্মেলন ও সভা
বিমসটেকের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে যোগাযোগ ও সভা নানাভাবে হতে থাকে। সব সভায় একই পর্যায়ের প্রতিনিধি অংশ নেন না। কোথাও সরকারপ্রধান, কোথাও মন্ত্রী, আবার কোথাও সচিবরা বসেন। সভার ধরন ও আলোচ্যসূচি অনুযায়ী বদলে যায় অংশগ্রহণকারীও।
শীর্ষ সম্মেলন: সদস্য রাষ্ট্রগুলোর রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধানদের নিয়ে সাধারণত ২ বছর পর পর আয়োজন করা হয় শীর্ষ সম্মেলনের। দেশগুলোর শাসনব্যবস্থা অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী বা সমপর্যায়ের সরকারপ্রধান এ ধরনের সভায় অংশ নেন। সাধারণত বড় নীতিগত সিদ্ধান্ত, ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা ও গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক উদ্যোগ নির্ধারণ বিষয়ক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এ সম্মেলনে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক: সদস্য দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী বা পররাষ্ট্রবিষয়ক দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা এ ধরনের সভায় অংশ নিয়ে সামগ্রিক সহযোগিতা সমন্বয়, শীর্ষ সম্মেলনের প্রস্তুতি এবং আগের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনা করেন। সাধারণত প্রতি বছর এ বৈঠক হয়।
জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বৈঠক: পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা এ ধরনের বৈঠকে অংশ নিয়ে মন্ত্রীদের বৈঠকের প্রস্তুতি, প্রস্তাব যাচাই, বিভিন্ন সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন সমন্বয় ও অগ্রগতি পর্যালোচনা করেন।
স্থায়ী কার্যকরী কমিটির বৈঠক: সদস্য দেশগুলোর জাতীয় ফোকাল পয়েন্টের প্রতিনিধিরা এতে অংশ নেন। সাধারণত যুগ্ম সচিব, মহাপরিচালক বা সমপর্যায়ের কর্মকর্তা এখানে থাকেন। তারা প্রশাসনিক ও বাজেটসংক্রান্ত বিষয়, কর্মসূচির সময়সূচি এবং অগ্রাধিকার নির্ধারণে সহায়তা বিষয়ক আলোচনা করেন।
এ ছাড়া, বিমসটেকের কাঠামোর আওতায় জাতীয় নিরাপত্তাপ্রধানদের বৈঠক, খাতভিত্তিক মন্ত্রী ও বিশেষজ্ঞদের বৈঠকসহ বিশেষায়িত সভাও হয়। এসব বৈঠক ও সভায় নিজ নিজ দেশের তরফে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নেন।
কোথায় দেখা হয় সবার
বিমসটেকের সব সভা বা বৈঠক নির্দিষ্ট কোনো জায়গায় হয় না। সভার ধরন, সভাপতির নির্দেশনা এবং সদস্য দেশগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতেই জায়গা নির্ধারণ করা হয়।
যেমন: শীর্ষ সম্মেলন ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক সাধারণত সভাপতিত্বকারী দেশ আয়োজন করে। এ ছাড়া, জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও কার্যকরী কমিটির সভা স্থায়ী কার্যালয়সহ সদস্য দেশগুলোর বিভিন্ন শহরেও হতে পারে। খাতভিত্তিক সভা ও বিশেষ সভাও দেশগুলোর আলোচনায় নির্ধারিত জায়গায় হতে পারে।
বিমসটেকের প্রথম শীর্ষ সম্মেলন হয়েছিল ২০০৪ সালে থাইল্যান্ডের ব্যাংককে। এরপর ২০০৮ সালে ভারতের নয়াদিল্লিতে দ্বিতীয়, ২০১৪ সালে মিয়ানমারের নেপিদোতে তৃতীয়, ২০১৮ সালের নেপালের কাঠমান্ডুতে চতুর্থ, ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কার কলম্বোয় পঞ্চম এবং সর্বশেষ ২০২৫ সালে থাইল্যান্ডের ব্যাংককে ষষ্ঠ শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বিমসটেকের নেতা কে
বিমসটেকের নেতা নির্বাচিত হয় পালাক্রমে। দেশগুলোর ইংরেজি নামের বর্ণানুক্রম অনুযায়ী ঘুরে ঘুরে একেকটি দেশ সভাপতির দায়িত্ব পায়। সাধারণত শীর্ষ সম্মেলনে একটি দেশ পরবর্তী দেশকে দায়িত্ব হস্তান্তর করে।
বর্তমানে বিমসটেকের সভাপতি বাংলাদেশ। ২০২৫ সালের ৪ এপ্রিল অনুষ্ঠিত সর্বশেষ শীর্ষ সম্মেলনে এই দায়িত্ব হস্তান্তর হয়। বাংলাদেশ এই দায়িত্ব নিয়েছে থাইল্যান্ডের কাছ থেকে। দুই বছরের মেয়াদ শেষ হলে পরবর্তীতে ভুটানের সভাপতি হওয়ার কথা রয়েছে।
এ পর্যন্ত বাংলাদেশ ৩ বার; ভারত, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা ও থাইল্যান্ড ২ বার করে এবং নেপাল একবার বিমসটেক সভাপতি হয়েছে।
তবে এই জোটের সব সিদ্ধান্তই সভাপতির আদেশে হয়, বিষয়টি এমন নয়। সদস্য দেশগুলোর সমান অংশগ্রহণ ও ঐকমত্যের ভিত্তিতেই বিমসটেকের কার্যক্রম পরিচালিত হয়।