নির্যাতন–অবহেলায় কমছে নারী কর্মীদের অভিবাসন
নানা সমস্যার কারণে গত চার বছর ধরে নারী কর্মীদের অভিবাসন ধীরে ধীরে কমছে। পেছনে অনেক কারণের মধ্যে অন্যতম— নতুন শ্রমবাজার অন্বেষণের অভাব, কাজের অনিরাপদ পরিবেশ ও নির্যাতন।
এই নারীদের বেশিরভাগই সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, জর্দান ও লেবাননে যান। সেখানে তারা মূলত গৃহকর্মী বা পোশাক শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য বলছে, এই বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪০ হাজার ৮৮ নারী বিদেশে গিয়েছেন। গত বছর ৬১ হাজার ১৫৮ নারী বিদেশে গিয়েছিলেন। ২০২৩ ও ২০২২ সালে এই সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ৭৬ হাজার ১০৮ এবং এক লাখ পাঁচ হাজার ৪৬৬।
বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, কোভিড-১৯ মহামারির আগে প্রতি বছর এক লাখের বেশি নারী বিদেশে যেতেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদেশে কাজ করতে যেতে নারীরা নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। নির্যাতন, চিকিৎসার অভাব, জোরপূর্বক পতিতাবৃত্তি, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, অপর্যাপ্ত খাবার এবং যৌন হয়রানির কারণে অনেকেরই উন্নত জীবনের স্বপ্ন চোখের সামনে ভেঙে যাচ্ছে।
খুলনার বাসিন্দা তুলি আক্তার (ছদ্মনাম) গৃহপরিচারিকা হিসেবে ভালো আয়ের আশায় নিজের সঞ্চিত দেড় লাখ টাকা খরচ করে সংযুক্ত আরব আমিরাতে যান। তবে, তার স্বপ্ন দ্রুতই দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়।
আবুধাবিতে পৌঁছানোর পর তাকে আজমানের হাওয়ার্ড জনসন হোটেলে নিয়ে যান বাংলাদেশি সায়েম ও পায়েল (যিনি রানু নামেও পরিচিত)।
পায়েলের মায়ের সহায়তায় তুলিকে জোরপূর্বক যৌনকর্মে বাধ্য করা হয়। সম্প্রতি একটি এনজিওর সাহায্যে তিনি বাংলাদেশে ফিরে এসেছেন।
তুলি একা নন, অনেক নারী একই ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন এবং নির্যাতন এবং অনিরাপদ পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে ফিরে আসতে বাধ্য হন।
প্রতি বছর দেশে ফিরে অনেক নারী কর্মী বিএমইটিতে অভিযোগ করেন।
অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রামের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে ফেরা ৯৪ শতাংশ নারী নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন। ৪৭ শতাংশ নারী যৌন হয়রানির কথা জানান। আর ৯৭ শতাংশ নারী চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হন।
৮০ শতাংশ নারী পর্যাপ্ত খাবার পাননি, এবং ৮২ শতাংশ নারী ভোর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত কাজ করেন। ১৫ শতাংশকে খাবার বা পানি ছাড়াই ঘরে আটকে রাখা হয় এবং ৯৭ শতাংশকে সাপ্তাহিক ছুটি দেওয়া হয়নি।
অধিকাংশ নারী শ্রমিক বাংলাদেশ ছাড়ার আগে কোনো চাকরির চুক্তিপত্র পান না।
ব্র্যাক গত ছয় বছরে দেশে ফেরা শতাধিক কর্মীকে সহায়তা করার কথা জানিয়েছে, যাদের বেশিরভাগই নারী। এই কর্মীরা শারীরিক, মানসিক বা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং অনেকেই অতিরিক্ত কাজ এবং কম বেতনের কারণে গুরুতর মানসিক আঘাত পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন।
ওয়েজ আর্নার্স ওয়েলফেয়ার বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সাল থেকে গত পাঁচ বছরে ৪১২ নারী অভিবাসী শ্রমিকের মরদেহ ফেরত পাঠানো হয়েছে, যাদের মধ্যে ৮৪ জন আত্মহত্যা করেছেন।
২০১৭ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ৬৯ শতাংশ নারী শ্রমিকের মৃত্যুর কারণকে প্রতিবেদনে স্বাভাবিক বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্ট রিসার্চ ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী, ৪৮ শতাংশ পরিবার এসব প্রতিবেদনে বিশ্বাস করে না।
অভিবাসন ও শরণার্থী বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনির বলেন, নারীরা বিদেশে কর্মক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা করার জন্য যথাযথভাবে প্রস্তুত নন, তাই তাদের বেশিরভাগই গৃহকর্মী বা পোশাক শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন।
'সমাজ এখনো নারী অভিবাসীদের নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখে। বেশিরভাগ অভিবাসী নারীই দক্ষ থাকেন না, যা তাদের কাজের সুযোগ সীমিত করে। সরকার পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেনি বা নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান করেনি। ফলে বিদেশে যাওয়া নারীর সংখ্যা ক্রমাগত কমছে,' তিনি আরও বলেন।
ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম এবং ব্র্যাক ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বলেন, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে সংকটে থাকা নারীরা মূলত সৌদি আরবে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতে যান।
তাদের অবস্থার উন্নতির পরিবর্তে নির্যাতন ও নির্যাতনের কারণে তাদের সংকট আরও বাড়ে। ফলস্বরূপ অনেক নারী আত্মহত্যার পথ বেছে নেন, আরও বলেন তিনি।
ইন্দোনেশিয়াসহ অন্যান্য দেশ তাদের নারী অভিবাসী কর্মীদের নিরাপত্তার বিষয়টিতে জোর দিচ্ছে।
'তারা নারীদের পরিচর্যা ও নার্সিংয়ের কাজের প্রশিক্ষণ দিয়ে অদক্ষ গৃহকর্ম থেকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করে। বাংলাদেশ এখনো এমন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি,' তিনি বলেন, সরকারকে নারীদের দক্ষতা উন্নয়নের ওপর জোর দিতে হবে।
'শুধুমাত্র দক্ষ নারীরাই নিরাপদে প্রবাসে যেতে পারেন এবং সেখানে সুযোগ পেয়ে তাদের ভাগ্য উন্নয়ন করতে পারেন।'