সরকারের সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ প্রত্যাখ্যান ১১ দলীয় ঐক্যের
বিশেষ কমিটির মাধ্যমে সরকারের সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ প্রত্যাখ্যান করেছে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য।
আজ রোববার দুপুরে রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানান জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।
তিনি বলেন, গণভোটে অনুমোদিত প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে সংসদীয় বিশেষ কমিটির মাধ্যমে সাংবিধানিক সংস্কার বাস্তবায়নের বর্তমান উদ্যোগ ১১ দলীয় ঐক্য প্রত্যাখ্যান করেছে।
বিএনপি গণভোটের গণরায় উপেক্ষা করে সংস্কারের পরিবর্তে সংসদে গঠিত সংবিধান সংশোধন বিশেষ কমিটির কার্যক্রম চালানোর উদ্যোগ নিয়েছে—এ অবস্থানে ১১ দলীয় ঐক্যের বক্তব্য তুলে ধরতেই এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ১১ দলীয় ঐক্য মনে করে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা, জুলাই জাতীয় সনদ এবং গণভোটে প্রকাশিত জনগণের রায়ের প্রতি সম্মান দেখানোই বর্তমান সাংবিধানিক মতপার্থক্য নিরসনের গণতান্ত্রিক পথ।
তিনি বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের (এমপি) দুটি শপথ নেওয়ার কথা—একটি এমপি হিসেবে, অন্যটি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে। কিন্তু নির্বাচনের পর বিরোধী দলের এমপিরা দুটি শপথ নিলেও বিএনপির এমপিরা শুধু সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন। এখানেই বর্তমান সাংবিধানিক সংকটের মূল প্রশ্ন।
সংসদ সদস্য হিসেবে প্রাপ্ত ক্ষমতা এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে জনগণের গণভোটে অর্পিত গাঠনিক ক্ষমতা এক নয় উল্লেখ করে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, একই ব্যক্তি দুটি প্রতিষ্ঠানের সদস্য হতে পারেন, কিন্তু প্রতিষ্ঠান দুটির ক্ষমতার উৎস, আইনগত পরিচয় ও দায়িত্ব এক নয়। জাতীয় সংসদ একটি সংবিধান কর্তৃক সৃষ্ট প্রতিষ্ঠান। অন্যদিকে, সংবিধানের মৌলিক পুনর্বিন্যাসের প্রশ্নে জনগণই চূড়ান্ত সার্বভৌম ক্ষমতার উৎস।
গণভোটে জনগণ যে রায় দিয়েছে, সেই রায়ের প্রতি সম্মান দেখানো এবং অনুমোদিত প্রক্রিয়ায় তা বাস্তবায়ন করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব বলে উল্লেখ করেন মিয়া গোলাম পরওয়ার।
তিনি বলেন, সেটি না করে গণরায়ের আলোকে সংবিধান সংস্কার প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেওয়ার পরিবর্তে সংসদীয় বিশেষ কমিটির মাধ্যমে বিষয়টিকে সীমিত পরিসরের সাধারণ সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ায় নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গণভোটে জনগণ যে প্রক্রিয়া অনুমোদন করেছেন, তাকে পাশ কাটিয়ে কোনো বিকল্প প্রক্রিয়াকে জনগণের ম্যান্ডেটের সমতুল্য হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।
সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ জাতীয় সংসদকে সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা দিলেও সেটি সীমাহীন নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, সর্বোচ্চ আদালতের বিভিন্ন রায় অনুযায়ী সংবিধানের মৌলিক কাঠামো সাধারণ সংশোধনী ক্ষমতার মাধ্যমে পরিবর্তন করা যায় না। সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন করা গেলেও জনগণের গাঠনিক ক্ষমতা ছাড়া সংবিধানের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তনের এখতিয়ার নেই।
এ ক্ষেত্রে পঞ্চম, সপ্তম, অষ্টম, ত্রয়োদশ ও ষোড়শ সংশোধনীসহ বিভিন্ন সংশোধনী সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে বাতিল হওয়ার নজির তুলে ধরেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়ে সংশোধনী আনা হয়েছে কি না, সেটি মৌলিক প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন হলো, যে ক্ষমতা প্রয়োগ করা হচ্ছে, সেই ক্ষমতার উৎস কী এবং জনগণ কোন প্রক্রিয়ায় সেই ম্যান্ডেট দিয়েছে।
এ সময় ১১ দলীয় ঐক্যের পক্ষ থেকে তিনটি দাবি জানান তিনি। এগুলো হলো—গণভোটের রায় যথাযথভাবে বাস্তবায়ন, জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটে অনুমোদিত সাংবিধানিক সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে নির্ধারিত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে পরিষদ কার্যকর করা।
এর পাশাপাশি সরকারকে একতরফাভাবে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো সংশ্লিষ্ট পরিবর্তন আনার উদ্যোগ থেকে বিরত থাকার এবং রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক সংস্কারকে জনগণের প্রত্যাশা, গণভোটের রায় ও রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব জালালুদ্দিন আহমদ, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বিল্লাল হোসেন মিয়াজি, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান (ইরান), জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মুসা বিন ইযহার, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব ফখরুল ইসলাম এবং এবি পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল মামুন প্রমুখ।
বিশেষ সংসদীয় কমিটি গত শুক্রবার জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষরকারী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংবিধান সংশোধন নিয়ে আলোচনার আমন্ত্রণ জানায়। আজ কমিটির দ্বিতীয় বৈঠকে এ বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণের কথা রয়েছে। দলগুলোর পাশাপাশি বিচার বিভাগ, আইনজীবী, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, বুদ্ধিজীবী ও সংবাদপত্রের সম্পাদকদের সঙ্গেও আলোচনার পরিকল্পনা রয়েছে।
গত ২৯ এপ্রিল সরকার সংবিধান সংশোধনের জন্য ১৭ সদস্যের একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেয়। এতে ক্ষমতাসীন জোটের ১২ জন এবং বিরোধী দলের জন্য পাঁচটি আসন রাখার কথা ছিল। তবে জামায়াত নেতৃত্বাধীন বিরোধী পক্ষ সদস্যদের নাম না দেওয়ায় সরকার ১৩ জুলাই ১২ সদস্যের কমিটি গঠন করে। কমিটি ৪ আগস্ট প্রথম বৈঠক করে।