করোনা পরীক্ষায় ফি: বাড়তে পারে সংক্রমণ

ওয়াসিম বিন হাবিব ও মওদুদ আহম্মেদ সুজন

মাস দুয়েক আগে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রধান কোভিড-১৯ পরীক্ষা সম্পর্কে বাংলাদেশ সরকারের অবস্থান বর্ণনা করে একটি ভারতীয় ম্যাগাজিনে সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন। সেখানে তিনি বলেছিলেন, ধনী-গরীব নির্বিশেষে সকলের করোনা পরীক্ষা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকার বিনামূল্যে পরীক্ষা করাচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ এপ্রিলের শেষের দিকে দ্য কারাভান ম্যাগাজিনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমাদের সরকারের নীতি হলো, ধনী বা গরীব যে কেউ কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হলে সে একজন সরকারি রোগী। আমরা বিনাখরচে তাদের দায়িত্ব নেব। সবার পরীক্ষা নিশ্চিত করাই আমাদের অগ্রাধিকার।’

তিনি আরও বলেন, ‘এটা নিশ্চিত করতে আমরা বেসরকারি পরীক্ষাগারগুলোতে বিনামূল্যে পিসিআর পরীক্ষা করতে দিয়েছি এই শর্তে যে তারা রোগীদের কাছ থেকে কোনো ফি নেবে না।’

বিনামূল্যে করোনা পরীক্ষার অবস্থান থেকে সড়ে এসেছে সরকার। পরীক্ষার জন্য ফি নির্ধারিত হয়েছে ২০০ টাকা এবং ৫০০ টাকা। ফি নির্ধারণের কারণ হিসেবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, ‘অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা এড়াতে এবং উন্নত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে’ এই ফি নির্ধারণ করা হয়েছে।

করোনা পরীক্ষায় ফি নেওয়ার ঘোষণা এমন সময় এলো যখন দেশে ক্রমাগত বাড়ছে কোভিড-১৯ এ মৃত্যু ও সংক্রমণে সংখ্যা। গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ সংখ্যক ৬৪ জন রোগীর মৃত্যু হয়েছে এবং নতুন শনাক্ত হয়েছে তিন হাজার ৬৮২ জন।

ফি নেওয়ার বিষয়ে জানতে জানতে চাইলে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, দক্ষিণ এশিয়ার কোনো দেশই তাদের সরকারি স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্রে করোনা পরীক্ষার জন্য কোনো ফি নেয় না। সরকারী পরিচালনাধীন পরীক্ষায় এ জাতীয় ফি আরোপ করা সারা বিশ্বেই বিরল।

তারা আরও বলেন, ফি নির্ধারণের কারণে ভাইরাস সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রচেষ্টায় একটি বাধা হিসেবে সামনে দাঁড়াবে। বিশেষ করে সমাজের দরিদ্র মানুষের যদি লক্ষণ দেখাও দেয় তাহলেও তারা সরকারি হাসপাতাল ও বুথগুলোতে পরীক্ষা করাতে পারবেন না। তারাই ভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলবে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, দেশ এখনও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং ভাইরোলজিস্টদের পরামর্শ অনুসারে অধিক পরিমাণে পরীক্ষার ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছে।

দুমাসের ছুটির কারণে দরিদ্র মানুষদের জীবন এরই মধ্যে কঠিন হয়ে উঠেছে। তার ওপর এই ফি তাদের জন্য অতিরিক্ত বোঝা হয়ে উঠবে বলে তারা যোগ করেছেন।

গত রোববার প্রকাশিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তি অনুসারে, বাড়ি থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হলে কোভিড-১৯ পরীক্ষার জন্য জন প্রতি ৫০০ টাকা এবং নির্ধারিত নমুনা সংগ্রহ বুথ বা সরকারি হাসপাতালে নমুনা দেওয়া হলে ২০০ টাকা ফি দিতে হবে।

বেসরকারি হাসপাতালগুলো কোভিড-১৯ পরীক্ষার জন্য জন প্রতি তিন হাজার ৫০০ টাকা করে নিয়ে থাকে। যদি কারো নমুনা বাড়ি থেকে সংগ্রহ করা হয় তবে এই ফি চার হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বিনামূল্যে হওয়ায় উপসর্গহীন অনেকেও পরীক্ষার জন্য নমুনা দিচ্ছেন। এতে আরও বলা হয়েছে যে পরীক্ষা থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব সরকারি কোষাগারে জমা করতে হয়।

তবে বিশেষজ্ঞরা ‘অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা’ সম্পর্কিত সরকারের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে বলেন, লক্ষণ দেখা দিলে বা ভয়ের কারণেই কেবল মানুষ হাসপাতালে এবং পরীক্ষার বুথকে ভিড় করছে।

কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় কারিগরি উপদেষ্টা কমিটির সদস্য অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, ‘এই প্রাদুর্ভাব রোধ করার মূল চাবিকাঠি পরীক্ষা, পরীক্ষা এবং পরীক্ষা। তবে সরকার একটি বিপরীতমুখী সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’

দ্য ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, ‘এই সিদ্ধান্তের কারণে আমরা শুধু ধনীদের মধ্যে সংক্রমণের হার জানতে পারব। কারণ দরিদ্ররা পরীক্ষার জন্য ফি ব্যয় না করে সেই টাকা দিয়ে দুই কেজি আটা কিনে নেবে।’

শিগগির আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় কারিগরি উপদেষ্টা কমিটিকে তার মতামত জানাবেন বলে যোগ করেন তিনি।

রোগতত্ত্ব , রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরামর্শক ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘কোভিড-১৯ পরীক্ষার জন্য নাগরিকদের কাছ থেকে কোনো দেশের সরকার অর্থ নেয় বলে আমাদের জানা নেই। তবে এটাই আসল ব্যাপার না, বাস্তবতা হচ্ছে এই সিদ্ধান্ত প্রান্তিক মানুষদের পরীক্ষা করানো থেকে নিরুৎসাহিত করবে।’

আর এর ফলস্বরূপ ভাইরাসের সংক্রমণ আরও বাড়বে বলে তিনি যোগ করেন।

তিনি আরও বলেন, ‘যদি উপসর্গ দেখে আইসোলেশনে নেওয়ার ব্যবস্থা থাকত তাহলে এর কোনো প্রভাব পড়তো না। তবে পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া ছাড়া আইসোলেশন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। ফলে, পরীক্ষা কমলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।’

জানুয়ারির শেষ দিকে পরীক্ষা শুরু করে দেশে এখন পর্যন্ত সাত লাখ ৬৬ হাজার ৪৬০টি নমুনা পরীক্ষা করেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দেশে পরীক্ষার সুবিধা বাড়ানো হচ্ছে। বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে মোট ৬৮টি ল্যাবে আরটি-পিসিআর মেশিনে করোনা পরীক্ষা হচ্ছে।

এর মধ্যে ৩৪টি ল্যাব সরকারি এবং সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ হাসপাতাল ও অন্যান্য স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার অধীনে পরিচালিত।

তবে কিটের অভাব, বায়ো-সেফটি ল্যাব এবং দক্ষ জনবলের অভাবে কিছু ল্যাবে পরীক্ষা ব্যাহত হচ্ছে।

গতকাল দুপুর আড়াইটায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২৪ ঘণ্টায় মোট ১৮ হাজার ৪২৬টি পরীক্ষা করা হয়েছে। যা অন্যান্য দেশের তুলনায় এখনও কম।

কোভিড-১৯ পরীক্ষার হিসাবে সংযুক্ত আরব আমিরাত তালিকার শীর্ষে রয়েছে। স্ট্যাটিস্টা ডটকমের তথ্য অনুসারে, দেশটিতে প্রতি ১০ লাখ মানুষের মধ্যে তিন লাখ ১৭ হাজার ১০৯ জনের পরীক্ষা করানো হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এই সংখ্যা ৯৮ হাজার ৪৬৯ জন।

বাংলাদেশ প্রতি ১০ লাখ মানুষের মধ্যে চার হাজার ৪৫২ জনের পরীক্ষা করিয়ে তালিকায় ২৮তম স্থানে আছে। ভারত ও পাকিস্তান যথাক্রমে ছয় হাজার ৮৬ এবং পাঁচ হাজার ৭১৫ জনের পরীক্ষা করিয়ে ২৬ এবং ২৭তম অবস্থানে রয়েছে।

কোন দেশ কত ফি নিচ্ছে?

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পরীক্ষার জন্য কোনো ফি নেওয়া হয় না। তবে চিকিত্সার জন্য ৩০ হাজার ডলার বা তারও বেশি খরচ হতে পারে।

যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস সন্দেহভাজন রোগীদের বিনাখরচে পরীক্ষা করছে। তবে বেসরকারি ল্যাবে পরীক্ষা করাতে ৩৭৫ পাউন্ড পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে।

ভারতে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে বিনামূল্যে পরীক্ষা করা যায়। তবে কিছু বেসরকারি ল্যাব পরীক্ষার জন্য জনপ্রতি ৪ হাজার ৫০০ ভারতীয় রুপি ফি নিয়েছিল। পরে সরকারি নির্দেশনায় বেসরকারি ল্যাবে পরীক্ষার এই ফি কমানো হয়।

পাকিস্তানে সরকারিভাবে সারা দেশে বিনামূল্যে কোভিড-১৯ পরীক্ষা করা হচ্ছে। তবে কিছু বেসরকারি ল্যাব নির্দিষ্ট ফি নিয়ে পরীক্ষা করছে।

যুদ্ধ বিধ্বস্ত আফগানিস্তান সরকারও পরীক্ষার খরচ বহন করছে। যদি কেউ বেসরকারি পরীক্ষা কেন্দ্রে পরীক্ষা করে তাহলে তাদের একটি নির্দিষ্ট ফি দিতে হচ্ছে।

নেপালে সরকারিভাবে পরীক্ষার ব্যয় বহন করা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, দেশটি ঘোষণা করেছে যে বেসরকারি হাসপাতালে প্রতিটি পরীক্ষার জন্য সরকার তাদের পাঁচ হাজার ৫০০ টাকা পরিশোধ করবে।