বিশ্লেষণ

২ ‘নৌকায়’ পা দিয়েই চলতে চায় তাইওয়ান?

স্টার অনলাইন ডেস্ক

বিশ্ব রাজনীতিতে ঘটতে চলেছে এমন এক ঘটনা, যা বিগত প্রায় এক দশকে ঘটেনি। যিনি সেই যুগান্তকারী ঘটনা ঘটিয়েছিলেন তিনিই আবারও এক ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী হতে যাচ্ছেন। বলা হচ্ছে— বেইজিংয়ে ট্রাম্প-জিনপিংয়ের আসন্ন বৈঠকের কথা। তবে এই লেখার বিষয় মূলত তাইওয়ান।

বিশ্লেষকদের অনেকে বলছেন—আসলে তাইওয়ান ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি বিবদমান চীনের সঙ্গেও সুসম্পর্ক রেখে চলতে চায়। অর্থাৎ, ২ নৌকায় পা দিয়েই চলতে পছন্দ স্বশাসিত দ্বীপটির।

গত ১০ মে সিএনএন-এর এক প্রতিবেদনের শিরোনামে বলা হয়—‘যুক্তরাষ্ট্র-চীনের শীর্ষ সম্মেলনের আগে, তাইওয়ানের বিরোধী নেতা ২ পরাশক্তিকে আপন করে নেওয়ার কথা বলছেন।’

এতে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র যখন তাইওয়ানকে চাপ দিচ্ছে চীনের আগ্রাসন ঠেকাতে দ্বীপটির প্রতিরক্ষা খরচ আরও বাড়ানোর জন্য, তখন সেই দ্বীপের বহুল আলোচিত ও অন্যতম স্পষ্টবাদী নেতা চেং লি-উন তুলে ধরছেন ভিন্ন ভাবনা। দিচ্ছেন, ‘চীনের সঙ্গে বৈরিতা কমিয়ে বন্ধুত্ব বাড়ানোর’ পরামর্শ।

তাইওয়ানের বিরোধী কুয়োমিনতাং বা কেএমটি দলের প্রধান চেং লি-উন সতর্ক করে বলছেন, ‘তাইওয়ান পরবর্তী ইউক্রেন হতে চায় না।’

গতকাল ১৩ মে চীনে পা রাখেন মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প। সে দেশে ৩ দিনের সফরে অংশ হিসেবে আজ ১৪ মে বেইজিংয়ে চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তার শীর্ষ বৈঠক।

চীনে ট্রাম্পের সফরের মাস খানেক আগে অর্থাৎ গত ১০ এপ্রিল বেইজিংয়ে জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন তাইওয়ান বিরোধী দলনেতা চেং লি-উন। তিনি সংবাদমাধ্যম সিএনএন-কে বলেন, ‘শুধুমাত্র অস্ত্র দিয়ে তাইওয়ানকে নিরাপদ রাখা যাবে না।’

২০১৭ সালের নভেম্বরে সর্বশেষ মার্কিন রাষ্ট্রপতি ট্রাম্প চীন সফরে গিয়েছিলেন। এবারও তিনিই চীনে গেলেন।

গত ১১ মে ট্রাম্পের চীন সফর নিয়ে নিউইয়র্ক টাইমস-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, বেইজিংয়ে ট্রাম্প-জিনপিংয়ের নির্ধারিত বৈঠকে দুই বিশ্বশক্তির দ্বৈরথের নতুন রূপ পাওয়া যাবে।

অর্থাৎ, এই দুই দেশের শক্রতা কত দূর পৌঁছায়, এর একটি ধারণা সেই বৈঠক থেকে জানতে পারবে বিশ্ববাসী।

প্রতিবেদনটি থেকে জানা যায়—আশা করা হচ্ছে, বেইজিং সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের শীর্ষ নেতারা চলমান ইরান যুদ্ধ, ডিসি-বেইজিং বাণিজ্য, তাইওয়ান ও অন্যান্য বিতর্কিত বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে পারেন।

অর্থাৎ, তাইওয়ানও থাকছে সিনো-মার্কিন শীর্ষ সম্মেলনের আলোচনার তালিকায়।

তাইওয়ান নিয়ে বিতর্ক কেন?

তাইওয়ানের সরকারি নাম ‘রিপাবলিক অব চায়না’ বা চীন প্রজাতন্ত্র। আয়তন প্রায় ৩৬ হাজার ১৯৭ বর্গকিলোমিটার। জনসংখ্যা ২ কোটি ৩০ লাখের বেশি।

চীনের মতো তাইওয়ানেরও সরকারি ভাষা ম্যান্ডারিন চাইনিজ। এ ছাড়াও, তাইওয়ানের অন্যান্য আঞ্চলিক ভাষাও সরকারিভাবে ব্যবহার করা হয়।

বিপরীতে, চীন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি, সামরিক ও জনশক্তির দেশ। এর আয়তন ৯৫ লাখ ৯৬ হাজার ৯৬১ বর্গকিলোমিটার। অর্থাৎ, চীন ভৌগোলিক দিক থেকে তাইওয়ানের তুলনায় প্রায় ২৬৭ গুণ বড়।

তাইওয়ানের উন্নয়নের মূল শক্তি হিসেবে ধরা হয় এর সেমিকন্ডাক্টর খাতকে।

বিশ্বের অধিকাংশ দেশ তাইওয়ানকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। যদিও, এই স্বশাসিত দ্বীপটির নিজস্ব পতাকা, সরকার ও সেনাবাহিনী আছে।

চীনের দাবি, তাইওয়ান তাদের অংশ। তাইওয়ানের দাবি, তারা চীনের অংশ নয়; তারা স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ।

তাইওয়ানকে প্রয়োজনে চীন সামরিক অভিযানের মাধ্যমে দখলের ঘোষণা দেওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রসহ শিল্পোন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলো এই দ্বীপটির পাশে থাকার বার্তা দিয়ে রেখেছে।

কমিউনিজমকে হুমকি হিসেবে গণ্য করায় চীনের কমিউনিস্ট শাসকদেরকে যুক্তরাষ্ট্র ‘শত্রু’ হিসেবে দেখে। তাই তারা চীনের কমিউনিস্টবিরোধী জাতীয়তাবাদী শক্তিকে সমর্থন দিয়ে আসছে।

মার্কিন প্রশাসন তাইওয়ানে আশ্রয় নেওয়া কমিউনিস্টবিরোধী চীনের জাতীয়তাবাদী নেতা-কর্মী-সমর্থকদের আজও সহায়তা দেওয়ায় এ নিয়ে পুরো বিশ্ব পরিষ্কার দুইভাবে বিভক্ত।

একদল মনে করে তাইওয়ান চীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ; অন্যদল মনে করে তাইওয়ান স্বাধীন দেশ।

স্বাধীন দেশ হিসেবে তাইওয়ানকে স্বীকৃতি না দিলেও অনেক দেশ এই দ্বীপটির সঙ্গে বাণিজ্য করছে।

দ্বীপটি দখলের ঘোষণা দেওয়া বেইজিংয়ের সঙ্গেও তাইপের শক্তিশালী অর্থনৈতিক সম্পর্ক আছে।

তাইওয়ান সরকারের হিসাবে—২০২৪ সালে তাইপে-বেইজিং বাণিজ্য ছিল ১৭৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি।

বিভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষণ থেকে জানা যায়, চীন বিবদমান তাইওয়ানের সঙ্গে বাণিজ্য করলেও অন্যান্য দেশকে তাইওয়ানের সঙ্গে বাণিজ্য করতে নিরুৎসাহ করে।

এমনকি, তাইওয়ানের সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে চাওয়া দেশগুলোকে পরাশক্তি চীন হুমকি দিয়ে থাকে।

আর এ কারণেই বিশ্বমঞ্চে তাইওয়ান নিয়ে এত বিতর্ক।

‘এক চীন নীতি’

তাইওয়ানের সরকারি তথ্য বলছে—১৯১২ সালে যখন চীন প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তখন তাইওয়ান ছিল প্রতিবেশী জাপানের উপনিবেশ। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের পরাজয়ের পর তাইওয়ান ও এর সংলগ্ন পেংগু দ্বীপ বিজয়ী শক্তি চীনের জাতীয়তাবাদী সরকারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

১৯৪৯ সালে চীনে কমিউনিস্টদের সঙ্গে জাতীয়তাবাদীদের গৃহযুদ্ধ বাঁধলে চীন প্রজাতন্ত্র সরকার তাইওয়ান থেকে পরিচালিত হয়। মাও সেতুংয়ের নেতৃত্বে কমিউনিস্টরা বিজয়ী হয়ে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন গঠন করে।

তখন পরাজিত জাতীয়তাবাদীরা বা চীন প্রজাতন্ত্রের সমর্থকরা আশ্রয় নেয় তাইওয়ানে। ফলে চীন চলে যায় কমিউনিস্ট সরকারের অধীনে এবং তাইওয়ান থেকে যায় জাতীয়তাবাদীদের দখলে।

চীন সরকারিভাবে নাম নেয় ‘গণপ্রজাতন্ত্রী চীন’ এবং তাইওয়ান সরকারিভাবে নাম নেয় ‘চীন প্রজাতন্ত্র’।

তাইওয়ান পুরো চীনের ওপর নিজের কর্তৃত্ব দাবি করলেও পরে তা ত্যাগ করে। বিপরীতে, চীন বরাবর তাইওয়ানের ওপর নিজের কর্তৃত্ব দাবি করে আসছে।

চীন থেকে মাত্র ২ কিলোমিটার দূরত্বেও তাইওয়ানের দ্বীপ আছে। বেইজিং তা দখলে নেয়নি। চীনের কমিউনিস্ট সরকারের দাবি পুরো তাইওয়ান চীনের অংশ।

গত ১১ মে বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে বলা হয়—তাইওয়ান দ্বীপ নিয়ে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বহু বছর ধরে দ্বন্দ্ব চলছে। কিন্তু, যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের কাছে অস্ত্র বিক্রি করলেও চীনের হামলা থেকে দ্বীপটিকে রক্ষা করতে কতটা এগিয়ে আসবে তা নিয়ে এখনো প্রশ্ন আছে।

তাইওয়ানের পরিস্থিতি ‘জটিল’ ও অন্যদের থেকে ‘আলাদা’ বলেও প্রতিবেদনটিতে মন্তব্য করা হয়।

ইউরেশিয়া গ্রুপের চীনবিষয়ক পরিচালক অ্যামান্ডা সিয়াও সংবাদমাধ্যমটিকে বলেন, ‘আমাদের কাছে কার্যত ২টি চীন ছিল। বেইজিং ও তাইপের সরকারগুলো নিজেদের চীনের আইনসংগত প্রতিনিধিত্ব দাবি করতো।’

গত ৭৭ বছর ধরে চলছে চীন ও তাইওয়ানের টানাপোড়েন। যুক্তরাষ্ট্র সেই দ্বন্দ্বে জড়িয়েছিল মূলত কমিউনিস্টদের বিস্তার রোধ করার বাসনা নিয়ে। তবে জড়িয়ে পড়ার পর যুক্তরাষ্ট্র আজো সেই সংকট থেকে বের হতে পারেনি।

‘শত্রু’ থেকে ‘বন্ধু’

১৯৫০ সালে চীন ও তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের সহায়তায় উত্তর কোরিয়ার কমিউনিস্ট শাসক প্রতিবেশী দক্ষিণ কোরিয়ায় হামলা চালায়। সেসময় মার্কিন রাষ্ট্রপতি হ্যাারি ট্রুম্যান ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘আমরা কমিউনিস্ট দাসত্বের বিরোধিতা করতে একতাবদ্ধ।’

বিবিসি বাংলার সেই প্রতিবেদন অনুসারে—দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্র কমিউনিজমের প্রসারকে বড় হুমকি হিসেবে বিবেচনা করেছিল। সে কারণে কমিউনিস্টবিরোধী তাইওয়ান তাদের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হয়।

এতে আরও বলা হয়, হঠাৎ সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে চীনের দ্বন্দ্ব শুরু হলে সেই সুযোগে বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র।

১৯৭১ সালে চীনের আমন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্রের টেবিল টেনিস দলের বেইজিং সফর বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে ‘পিংপং কূটনীতি’ হিসেবে সুপরিচিত। পরের বছর অর্থাৎ, ১৯৭২ সালে মার্কিন রাষ্ট্রপতি রিচার্ড নিক্সন আচমকা চীন সফরে গেলে হোয়াইট হাউসের বন্ধু হয়ে উঠে গ্রেট হল।

এরপর জিমি কার্টারের শাসনামলে চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক আরও মজবুত হয়।

বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্ক স্বাভাবিক হয় ১৯৭৯ সালে। এরপর তাইওয়ানের সঙ্গে ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্রের দূরত্ব বাড়তে থাকে। দ্বীপ থেকে মার্কিন সৈন্য সরিয়ে নেওয়া হয়।

ওয়াশিংটন থেকে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রে তাইওয়ানের সঙ্গে অ-আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক রাখবে।

বিশ্লেষকদের অনেকের মতে—যদিও যুক্তরাষ্ট্র ‘এক চীন’ নীতি অনুসরণ করে চলে এবং তাইওয়ানকে স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না, তবুও যুক্তরাষ্ট্রকে ‘কমিউনিস্ট দমনের’ অংশ হিসেবে কমিউনিস্টবিরোধী তাইওয়ানকে ক্রমাগত সহায়তা দিতে হচ্ছে।

২০২৫ সালে মার্কিন কংগ্রেস তাইওয়ানের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে একটি আইন পাস করে। সেই আইনে তাইওয়ানের জনগণের সম্মতি ছাড়া তাদের দ্বীপের রাজনৈতিক পরিচয় নির্ধারণের বিপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান নেওয়ার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করা হয়।

তাইওয়ানের ওপর চীন নিজের সার্বভৌমত্ব দাবি করলেও দ্বীপটি ১৯৪৯ সাল থেকেই কার্যত স্বাধীনভাবে পরিচালিত হচ্ছে। বিবিসির দেশ পরিচিতি পর্বে তাইওয়ান সম্পর্কে বলা হয়—চীন চায় কোনো দেশ একই সঙ্গে চীন ও তাইওয়ানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক না রাখুক।

এ কারণে তাইওয়ানের সঙ্গে খুব কম সংখ্যক দেশের আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক আছে। যুক্তরাষ্ট্র হচ্ছে তাইওয়ানের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র। এক সময় তাইওয়ানের নাম ছিল ফরমোজা।

‘দ্বিচারিতা’ যখন রাষ্ট্রনীতি

জাতিসংঘে চীনের প্রতিনিধি কে হবে, গণপ্রজাতন্ত্রী চীন সরকার নাকি চীন প্রজাতন্ত্র বা তাইওয়ান সরকার?—এ নিয়ে দ্বন্দ্ব ছিল দীর্ঘদিন। ১৯৭১ সালে সেই দ্বন্দ্বের অবসান হয়।

সেই সময় জাতিসংঘের সদস্য ছিল ১২৮ দেশ। সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে জাতিসংঘের সাধারণ ও নিরাপত্তা পরিষদে বেইজিংয়ের গণপ্রজাতন্ত্রী সরকার বিশ্বমঞ্চে পুরো চীনের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পায়। তখন পুরো চীনের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ হারায় তাইপের প্রজাতন্ত্রী সরকার।

তাইওয়ানের সরকারি তথ্য বলছে—১৯৪৯ সালে তাইওয়ানে প্রবর্তিত সামরিক শাসন ১৯৮৭ সালে তুলে নেওয়া হলে দ্বীপটিতে নতুন নতুন রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠিত হতে শুরু করে। তাইওয়ান প্রণালীর দুই পারের মানুষের মধ্যে অর্থাৎ, মূল ভূখণ্ড চীন ও তাইওয়ান দ্বীপের বাসিন্দাদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়তে থাকে।

ট্রাম্পের আসন্ন চীন সফর ও রাষ্ট্রপতি জিনপিংয়ের শীর্ষ সম্মেলনকে ইঙ্গিত করে গত ৯ মে দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনের শিরোনাম করা হয়—‘বিশ্বের ২ সর্বোচ্চ ক্ষমতাবান নেতা আবারও বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন।’

এতে বলা হয়, চীন গুরুত্ব দেবে ‘থ্রি টি’-এর ওপর। অর্থাৎ—ট্যারিফ, টেকনোলজি ও তাইওয়ান।

আরও বলা হয়, গত ফেব্রুয়ারিতে রাষ্ট্রপতি ট্রাম্পকে টেলিফোনে চীনের জিনপিং বলেছিলেন, ‘বেইজিং কখনোই চীন থেকে তাইওয়ানের আলাদা হওয়া মেনে নেবে না।’

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো তাইওয়ান প্রণালীকে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌ-বাণিজ্যপথ হিসেবে উল্লেখ করছে। গত মার্চ ১৮ এ সম্পর্কে সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বের মোট নৌ-বাণিজ্যের ২০ শতাংশ তাইওয়ান প্রণালী দিয়ে পরিচালিত হয়।

বিশ্বের মোট কন্টেইনারের প্রায় অর্ধেক এই প্রণালী দিয়ে বহনের পাশাপাশি পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেমিকন্ডাক্টর এই প্রণালী দিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।

তাইওয়ান প্রণালী হচ্ছে দক্ষিণ ও পূর্ব চীন সাগরের সংযোগস্থল। চীনের মূল ভূখণ্ড ও তাইওয়ান দ্বীপের মধ্যে সর্বনিম্ন দূরত্ব প্রায় ১৩০ কিলোমিটার।

চীন ও তাইওয়ানের মধ্যে উত্তেজনার কারণে এই প্রণালীর দুই পাশে ঘন ঘন নৌ মহড়া হয়ে থাকে, যা বিশ্ব বাণিজ্যকে হুমকির মধ্যে রেখেছে।

বিবিসি বাংলার সেই প্রতিবেদন অনুসারে, তাইওয়ানে চীন হামলা চালালে যুক্তরাষ্ট্র ঠিক কী ভূমিকা নেবে, তা ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে কখনোই পরিষ্কার করা হয়নি। এ ক্ষেত্রে তারা কৌশলগত ‘দ্বিচারিতা’ বজায় রেখেছে।

‘১৯৭৯ সাল থেকে তাইওয়ানের বাস্তবতার পরিবর্তন হলেও আমেরিকার এই দ্বিচারিতার পরিবর্তন হয়নি’ বলেও প্রতিবেদনটিতে মন্তব্য করা হয়।

প্রতিবেদনটি থেকে আরও জানা যায়, ১৯৯০ এর দশকে তাইওয়ান গণতান্ত্রিক দেশ হয় এবং চীনকে প্রতিনিধিত্ব করা বন্ধ করে। কিন্তু চীন সব সময়ই তাইওয়ানকে নিজেদের অংশ মনে করে এসেছে।

তাইওয়ানের মানুষও চায়, এখনকার মতো সম্পর্ক বজায় থাকুক। এটাকেই তারা নিরাপদ মনে করছেন।

তাইওয়ানের অধিকাংশ বাসিন্দা একদিকে যেমন চীনের সঙ্গে একত্রীকরণ চায় না; অন্যদিকে, পূর্ণ স্বাধীনতাও চায় না। তারাও এক ধরনের ‘দ্বিচারিতা’ বা ‘দ্বিমুখী’ বাস্তবতা নিয়ে চলছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে নতুন উত্তেজনা তৈরি হলে সেই ধাক্কা এসে লাগে তাইওয়ানের উপকূলেও।

ফিরে আসা যাক বেইজিংয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঐতিহাসিক সফরের সংবাদে।

গত ১০ মে নিউজার্সি-ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি-এর প্রতিবেদনের শিরোনামে বলা হয়—সিঙ্গাপুর থেকে ব্রাসেলস পর্যন্ত সব বিশ্বনেতা দূর থেকে তাকিয়ে আছেন ট্রাম্প ও জিনপিংয়ের শীর্ষ সম্মেলনের দিকে।

এখন দেখার বিষয় আর সব ইস্যুর মতো তাইওয়ান নিয়ে ২ বিশ্বনেতা কী বক্তব্য দেন।

তবে তাইওয়ানের বিরোধী দলনেতা চেং লি-উন মনে করেন, বেইজিং ও ওয়াশিংটনের মধ্যে কোনো একটিকে বেছে নেওয়ার জন্য তাইপের ওপর চাপ দেওয়া উচিত হবে না।

তার ভাষ্য: ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্ব হলেই যে চীনের সঙ্গে বৈরিতা হবে এমন কোনো কথা নেই।’

অর্থাৎ, ২ পরাশক্তির সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখেই চলতে চায় তাইওয়ান। পা রাখতে চায় ‘২ নৌকাতেই’।