বিশ্লেষণ

‘ফাইভ বি’ বনাম ‘থ্রি টি’, ট্রাম্পের চীন সফরে উত্তেজনা বাড়বে না কমবে?

স্টার অনলাইন ডেস্ক

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করতে আগামী ১৪ ও ১৫ মে বেইজিং সফরে যাচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত ৯ বছরের মধ্যে এটিই হতে যাচ্ছে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রথম চীন সফর।

বিশ্ব রাজনীতির সবচেয়ে ক্ষমতাধর এই দুই নেতার বৈঠকটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন সারা বিশ্বে নানা রকম উত্তেজনা বিরাজ করছে।

ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক ফোরামের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত অক্টোবরে দক্ষিণ কোরিয়ার বুসানে দুই নেতার শেষ দেখা হয়েছিল। সেখানে তারা বাণিজ্য যুদ্ধের উত্তেজনা কিছুটা কমিয়েছিলেন এবং শুল্ক ৫৭ শতাংশ থেকে ৪৭ শতাংশে নামিয়ে এনেছিলেন।

কিন্তু, বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের যুদ্ধ, বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট এবং প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার কারণে পরিস্থিতি আরও অনেক বেশি জটিল হয়ে উঠেছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দক্ষিণ কোরিয়ার বুসানে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে করমর্দন করছেন। ৩০ অক্টোবর ২০২৫। ফাইল ছবি: রয়টার্স

গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর স্ট্রাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প মূলত বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই দুই দেশের সম্পর্ক কিছুটা স্থিতিশীল করার লক্ষ্যেই বেইজিং যাচ্ছেন। এই সফরের আলোচনার প্রধান বিষয়গুলো বেশ বড় এবং বিস্তৃত।

নিউইয়র্ক টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র এই সফরে ‘ফাইভ বি’ বা পাঁচটি ‘বি’ নিয়ে আলোচনা করতে চায়। এগুলো হলো—বোয়িং বিমান, বিফ বা গরুর মাংস, বিনস বা সয়াবিন, বোর্ড অব ট্রেড এবং বোর্ড অব ইনভেস্টমেন্ট।

অন্যদিকে, চীন আলোচনা করতে চায় ‘থ্রি টি’ নিয়ে। এগুলো হলো—ট্যারিফ (শুল্ক), টেকনোলজি (প্রযুক্তি) ও তাইওয়ান। এর বাইরেও এই দুই নেতা মধ্যপ্রাচ্যের ইরান যুদ্ধ, ইউক্রেন পরিস্থিতি, উত্তর কোরিয়া, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং যুক্তরাষ্ট্রে ফেন্টানাইল নামক মাদকের প্রবেশ বন্ধ করার মতো বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করবেন।

বার্তাসংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্প্রতি ২০ বছরের কারাদণ্ড পাওয়া হংকংয়ের গণতন্ত্রকামী কর্মী জিমি লাইয়ের বিষয়টিও আলোচনায় তুলবেন ট্রাম্প।

প্রত্যাশা ও সম্ভাবনা

প্রতিবেদনে বলা হয়, এই সফর থেকে দুই দেশই নিজেদের জন্য কিছু নির্দিষ্ট সুবিধা আদায় করতে চায়। যুক্তরাষ্ট্র আশা করছে, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে ট্রাম্পের এই আলোচনার ফলে আমেরিকার অর্থনীতি এবং নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সরাসরি কিছু লাভ হবে।

যুক্তরাষ্ট্র চায় চীন যেন তাদের প্রভাব খাটিয়ে ইরানকে চাপ দেয় এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করে। বাণিজ্যের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র চায় চীন তাদের কাছ থেকে বছরে ২৫ মিলিয়ন মেট্রিকটন সয়াবিন কিনুক এবং বোয়িং কোম্পানির ৫০০টি ৭৩৭ ম্যাক্স বিমান কেনার বিশাল একটি চুক্তি চূড়ান্ত করুক।

এই বিষয়গুলো সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য যুক্তরাষ্ট্র একটি স্থায়ী ‘বোর্ড অব ট্রেড’ গঠনের প্রস্তাব দেবে, যা দুই দেশের মধ্যে অন্তত ৩০ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য সমানভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে।

অন্যদিকে, চীনের প্রত্যাশা হলো শান্তি এবং স্থিতিশীলতা। তারা চায় যুক্তরাষ্ট্র যেন তাদের পণ্যের ওপর থেকে অতিরিক্ত শুল্ক বা ট্যারিফ নিয়ে একটি নির্দিষ্ট নিয়ম তৈরি করে। চীনের আরেকটা বড় চাওয়া হলো প্রযুক্তি। তারা চায় যুক্তরাষ্ট্র যেন তাদের উন্নত মাইক্রোচিপ তৈরির যন্ত্রপাতি কেনার ওপর থেকে সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়।

বাণিজ্যের ক্ষেত্রে তারা ‘বোর্ড অব ট্রেড’-এর পাশাপাশি একটি ‘বোর্ড অব ইনভেস্টমেন্টও’ গঠন করতে চায়।

রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চাওয়া হলো তাইওয়ান ইস্যু। চীন চায় যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ান বিষয়ে তাদের দীর্ঘদিনের কথার ধরন পরিবর্তন করুক। যুক্তরাষ্ট্র সাধারণত তাইওয়ানের স্বাধীনতা ‘সমর্থন করে না’। কিন্তু শি জিনপিং চান যুক্তরাষ্ট্র এখন এই ‘বিরোধিতার’ কথা পরিষ্কার করে বলুক।

সিএসআইএসের দাবি, বিশ্ব রাজনীতিতে এই সফরের প্রভাব অনেক ইতিবাচক হতে পারে। তারা একটি চুক্তিতে পৌঁছালে বিশ্বজুড়ে চলা অনেক উত্তেজনা কমে আসবে। হরমুজ প্রণালি খুলে গেলে বিশ্বে তেলের দাম কমবে এবং জ্বালানি সংকট দূর হবে, যা সারা বিশ্বের জন্যই স্বস্তির খবর।

ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের দেশগুলো আশা করছে এই দুই দেশের সম্পর্ক একটি মাঝামাঝি বা ‘গোল্ডিলকস’ অবস্থায় থাকবে। এটি খুব খারাপ বা ভালো হওয়ারও প্রয়োজন নেই। ফলে তাদের কোনো এক পক্ষ বেছে নিতে হবে না।

তাইওয়ানের স্বাধীনতা ইস্যুতে অস্বস্তিতে রয়েছে চীনা সরকার। ইলাস্ট্রেশন: রয়টার্স

সুবিধা ও অসুবিধা

এই সফরের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য যেমন বড় সুযোগ তৈরি হতে পারে, তেমনি কিছু ঝুঁকিও রয়েছে। একইভাবে চীনের জন্যও এই সফরে লাভ-ক্ষতি দুটোই আছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সুযোগ ও ঝুঁকি

আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন রয়েছে। এর আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চীনের কাছে কৃষি পণ্য এবং বোয়িং বিমান বিক্রির বড় চুক্তি করতে পারলে তার দেশের অর্থনীতি ও রাজনীতিতে বিশাল ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

এছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রের গাড়ি ও বিমান তৈরির কারখানার জন্য চীন থেকে ‘রেয়ার আর্থ’ বা বিরল খনিজ পদার্থ পাওয়া অনেক সহজ হবে।

গবেষণা সংস্থা কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের ভাষ্য, চীনের কাছ থেকে ইরানের বিষয়ে সাহায্য বা বাণিজ্য চুক্তি পাওয়ার জন্য তাইওয়ান বা অন্য কোনো মিত্র দেশের নিরাপত্তা বিষয়ে ছাড় দিয়ে দিতে পাড়েন ট্রাম্প। ফলে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ান অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে পড়তে পারে।

এছাড়া, চীন সরকার তাদের ইলেকট্রিক গাড়ি, সোলার প্যানেল ও ব্যাটারি তৈরিতে অনেক ভর্তুকি দিচ্ছে। এর ফলে সস্তা চীনা পণ্যে বাজার ভরে যাচ্ছে, যা যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশের ব্যবসাকে হুমকির মুখে ফেলছে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বড় অসুবিধা।

ইরান যুদ্ধ নিয়ে বৈঠক করেন চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। ৬ মে ২০২৬। ছবি: রয়টার্স

চীনের সুযোগ ও ঝুঁকি

সিএসআইএস বলছে, চীনের জন্য সবচেয়ে বড় সুযোগ হলো আন্তর্জাতিক বিশ্বে নিজেদের সম্মান বাড়ানো। ট্রাম্প নিজে বেইজিংয়ে যাচ্ছেন, এই বিষয়টিকে চীন তাদের বৈশ্বিক ক্ষমতা এবং মর্যাদার স্বীকৃতি হিসেবে দেখাবে।

ট্রাম্পের এই সফরের মাধ্যমে চুক্তি হলে চীন তাদের অর্থনীতিকে একটি সম্ভাব্য মন্দার হাত থেকে বাঁচাতে পারে এবং রপ্তানি বাজার ঠিক রাখতে পারে।

চীনের জন্য একটি বড় অসুবিধা হলো ইরান যুদ্ধ। নিউইয়র্ক টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের কারণে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় চীনের অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদে অনেক ক্ষতির মুখে পড়ছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে চীনের একটি তেলের শোধনাগারের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। চীনা ব্যাংকগুলোর ওপর আরও নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার হুমকি দিয়েছে, যা চীনের অর্থনীতির জন্য বড় একটি ঝুঁকি।

বৈঠক ব্যর্থ হলে

যদি এই সফর থেকে কোনো ভালো সমঝোতা না আসে বা আলোচনা ব্যর্থ হয়, তবে বিশ্ব অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর এর ফলাফল হবে অত্যন্ত ভয়াবহ।

প্রথমত, দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য যুদ্ধ আবার তীব্র আকার ধারণ করতে পারে। ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক ফোরামের তথ্য অনুযায়ী, এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন চীনের পণ্যের ওপর ৩৪ শতাংশ থেকে ১২৫ শতাংশ পর্যন্ত বিপুল শুল্ক বসিয়েছিল, যার ফলে ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে চীনের রপ্তানি প্রায় ২০ শতাংশ কমে যায়।

আলোচনা ব্যর্থ হলে এই অর্থনৈতিক সংকট আবার ফিরে আসবে। গাড়ি ও উন্নত প্রযুক্তিপণ্য তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় রেয়ার আর্থ বা বিরল খনিজ পদার্থের সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে।

রেয়ার আর্থ বা বিরল খনিজ। ছবি: রয়টার্স

দ্বিতীয়ত, বৈশ্বিক অর্থনীতি বড় ধাক্কা খাবে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকলে তেলের দাম বাড়তেই থাকবে, যা সারা বিশ্বের জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে দেবে এবং বিশ্বজুড়ে মন্দা দেখা দিতে পারে।

তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এর চরম নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তাইওয়ান নিয়ে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা অনেক বেড়ে যেতে পারে, যা এই অঞ্চলে বড় ধরনের যুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি করবে।

এছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং পারমাণবিক অস্ত্রের মতো ভয়ংকর বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণের জন্য কোনো নিয়ম বা চুক্তি তৈরি হবে না। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস জানায়, ইতোমধ্যে চীন ২০৩৫ সালের মধ্যে তাদের পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যা ১ হাজার ৫০০-তে উন্নীত করার পরিকল্পনা করেছে। সমঝোতা না হলে ইরান ও ইউক্রেন যুদ্ধ থামানোর উদ্যোগও অনেক পিছিয়ে যাবে এবং বিশ্বজুড়ে অস্থিরতা আরও দীর্ঘস্থায়ী হবে।

চীনের কাছে থাকা পারমাণবিক অস্ত্র। ফাইল ছবি: রয়টার্স

সব মিলিয়ে বলা যায়, ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং শি জিনপিংয়ের এই আসন্ন বেইজিং বৈঠক থেকে রাতারাতি বিশ্বের সব বড় সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে, এমনটা কেউই আশা করছেন না।

তাদের এই সম্পর্কের মূলে অনেক কাঠামোগত জটিলতা রয়েছে, যা সহজেই মিটে যাওয়ার নয়। তবে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের মূল নীতি হলো—'যুদ্ধ না করা'। দুই পক্ষই আসলে দর কষাকষির মাধ্যমে কিছুটা সময় নিতে চাইছে, যাতে তারা নিজেদের অর্থনীতি ও সামরিক শক্তিকে আরও মজবুত করতে পারে।

বড় কোনো ঐতিহাসিক চুক্তি না হলেও, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী এই দুই নেতার একসঙ্গে বসে কথা বলাই এই মুহূর্তে বিশ্বের জন্য একটি বড় স্বস্তির খবর। ছোট ছোট কিছু বাণিজ্য চুক্তি, শুল্ক কমানোর সিদ্ধান্ত কিংবা অন্তত একে অপরের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা না দেওয়ার প্রতিশ্রুতিগুলোও বিশ্বের অর্থনীতি এবং রাজনীতিতে অনেকখানি স্থিতিশীলতা আনবে।