ট্রাম্পের পর কে, ভ্যান্স নাকি রুবিও?
ডোনাল্ড ট্রাম্পের পর রিপাবলিকান পার্টির নেতৃত্ব কে দেবেন, তা নিয়ে বর্তমানে ওয়াশিংটনের রাজনীতিতে জোর চর্চা চলছে। বার্তাসংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে ট্রাম্প নিজেও তার মিত্র ও উপদেষ্টাদের একান্ত আলাপে প্রশ্ন করছেন—‘জেডি নাকি মার্কো?’।
বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও—উভয়েই ট্রাম্পের সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। তাদের এই লড়াই শুধু ক্ষমতার নয়, বরং এটি ট্রাম্প পরবর্তী রিপাবলিকান পার্টির আদর্শিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এক পদক্ষেপ হতে যাচ্ছে।
মাগা পপুলিজম বনাম রক্ষণশীলতা
জেডি ভ্যান্স এবং মার্কো রুবিও—এই দুই নেতার রাজনৈতিক যাত্রার কেন্দ্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি আনুগত্য থাকলেও তাদের আদর্শিক অবস্থান একেবারেই ভিন্ন।
জেডি ভ্যান্স নিজেকে একজন কট্টর ‘মাগা পপুলিস্ট’ এবং ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ জাতীয়তাবাদী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য আটলান্টিকের প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি মূলত বিদেশি যুদ্ধে জড়ানোর ঘোর বিরোধী এবং দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপ নিয়ে সন্দিহান।
অন্যদিকে, মার্কো রুবিও ঐতিহ্যবাহী ‘রক্ষণশীল প্রাতিষ্ঠানিকতা’ বা এস্টাবলিশমেন্টের একজন প্রতিনিধি ছিলেন। তিনি একসময় ন্যাটোর কট্টর সমর্থক ও আন্তর্জাতিকতাবাদী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তবে বর্তমানে উভয়ের মধ্যেই একটি বড় মিল হলো, তারা দুজনেই নিজেদের অতীত অবস্থান পরিবর্তন করে ট্রাম্পের কট্টর নীতির সঙ্গে আপস করেছেন।
অনেক ভোটারের কাছে রুবিও এখন একজন ‘স্থিতিশীল’ ও ‘প্রাপ্তবয়স্ক’ নেতা হিসেবে পরিচিত। সেখানে ভ্যান্সের ঘনঘন অবস্থান পরিবর্তন এবং অতিরঞ্জিত নাটকীয়তার সমস্যা রয়েছে। আর এই কারণে অনেকেই রুবিওকে ‘নিজের সত্তা বিকিয়ে দেওয়া’ একজন পরিণত রাজনীতিবিদ হিসেবে দেখছেন। ট্রাম্প নিজেও রুবিওর এই আদর্শিক পরিবর্তনকে দারুণভাবে পছন্দ করেন। কারণ তিনি ধর্মান্তরিতদের উৎসাহ নিয়ে বিশেষভাবে আগ্রহী।
হোয়াইট হাউস বনাম স্টেট ডিপার্টমেন্ট
প্রশাসনিক দায়িত্ব এই দুই নেতার ২০২৮ সালের সম্ভাব্য প্রার্থিতাকে ভিন্নভাবে প্রভাবিত করছে। ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে জেডি ভ্যান্স দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদে আছেন। তবে তিনি বেশ কিছু রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন বলে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম পলিটিকো। বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে শান্তি আলোচনার দায়িত্ব পেয়েও তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। আবার প্রশাসনের নিম্নমুখী জনপ্রিয়তার কারণে তার নিজের অবস্থানও নড়বড়ে হয়ে পড়েছে।
অপরদিকে, মার্কো রুবিও একইসঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে পালন করছেন। হোয়াইট হাউসের ওয়েস্ট উইংয়ে বসে তিনি ট্রাম্পের অত্যন্ত কাছাকাছি থেকে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছেন। আর এই সুযোগই তাকে কৌশলগতভাবে অনেক এগিয়ে রাখছে। ভেনেজুয়েলার নিকোলাস মাদুরোকে উৎখাত করার মতো জটিল বৈদেশিক মিশনে তার সাফল্য এবং বিভিন্ন কেলেঙ্কারি সযত্নে এড়িয়ে চলার কারণে তিনি প্রশাসনে একজন অত্যন্ত দক্ষ ও কার্যকর অপারেটর হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছেন।
ট্রাম্পের প্রভাব
ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে তার উত্তরসূরি নির্বাচন করেননি এবং তার সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলবে। ট্রাম্পের মূল ভোটারদের মধ্যে ভ্যান্সের শক্ত অবস্থান থাকলেও তা ক্রমেই কমছে। উদাহরণস্বরূপ, সিপিএসির সমীক্ষায় ভ্যান্সের সমর্থন গত বছরের ৬১ শতাংশ থেকে কমে ৫৩ শতাংশ হয়েছে। মার্কিন ইউগভ সমীক্ষা অনুযায়ী, দলের ভেতরেও তার রেটিং ৬৫ থেকে কমে ৬৩ শতাংশে নেমেছে।
বিপরীতে, রুবিওর সমর্থন অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে বাড়ছে। সিপিএসি সমীক্ষায় তার সমর্থন ৩ শতাংশ থেকে লাফিয়ে ৩৫ শতাংশ এবং ইউগভ পোলে ৩৩ থেকে বেড়ে ৪২ শতাংশে পৌঁছেছে। ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে রুবিও চমৎকার মুনশিয়ানা দেখাচ্ছেন। তিনি তার যেকোনো বৈদেশিক সিদ্ধান্তকে অত্যন্ত সুচারুভাবে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’-এর মোড়কে উপস্থাপন করতে পারেন। এটি সাধারণ ভোটারদের রাগ ক্ষোভ কমাতে সাহায্য করে। তবে, ভ্যান্সের পেছনে এখনো ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র এবং ইলন মাস্কের মতো ধনকুবেরদের শক্তিশালী সমর্থন রয়েছে বলে জানায় রয়টার্স।
কার পাল্লা ভারী?
রিপাবলিকান পার্টির বৈচিত্র্যময় ভোটারদের মধ্যে এই দুই নেতার আবেদন ভিন্ন। জেডি ভ্যান্সের ‘হিলবিলি এলিজি’ পটভূমির কারণে কর্মজীবী শ্বেতাঙ্গ ও গ্রামীণ ভোটারদের কাছে তার একটি সহজাত আবেদন রয়েছে। বইটিতে লেখা তার শৈশবের দারিদ্র্য ও পারিবারিক সংগ্রামের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ভোটারদের কাছে তাকে কেবল একজন রাজনীতিবিদ নয়, বরং তাদেরই ‘স্বজন’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তবে তার বর্তমান অস্থিতিশীল অবস্থানের কারণে সেই আবেদন ম্লান হতে শুরু করেছে।
অন্যদিকে, মার্কো রুবিও তার কিউবান-আমেরিকান বংশপরিচয় এবং পশ্চিম গোলার্ধে (যেমন: ভেনেজুয়েলা ও কিউবা) তার আগ্রাসী নীতির কারণে হিস্পানিক (লাতিন আমেরিকান, ক্যারিবীয়, ইউরোপীয়) ভোটারদের কাছে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছেন। এছাড়া ইহুদি ভোটার এবং সাধারণ রক্ষণশীলদের কাছে তিনি একজন ‘প্রকৃত রাষ্ট্রনায়ক’ ও স্বাভাবিক রাজনীতির প্রতীক হিসেবে দারুণভাবে সমাদৃত হচ্ছেন বলে জানায় দ্য আটলান্টিক। ট্রাম্পের বর্তমান জোটের অনেক ভোটারই মনে করেন রুবিও একজন অত্যন্ত যোগ্য নেতা, যিনি আন্তর্জাতিক পরিসরেও ভালো কাজ করছেন।
চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা
২০২৮ সালের নির্বাচনী দৌড়ে দুজনের জন্যই বড় রাজনৈতিক বাধা রয়েছে। জেডি ভ্যান্সের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো তার দ্রুত পতনশীল জনপ্রিয়তা। সিএনএনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, একজন ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে মেয়াদের এই পর্যায়ে তার রেটিং মাইনাস ১৮-তে নেমে গেছে, যা আধুনিক ইতিহাসে সবচেয়ে কম। এছাড়া পোপের সঙ্গে বিবাদ এবং মিত্রদের নিয়ে কিছু রাজনৈতিক ভুল পদক্ষেপ তার ইমেজকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
অন্যদিকে রুবিওর প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো কট্টর ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ পপুলিস্ট গোষ্ঠী (যেমন: টাকার কার্লসন ও নিক ফুয়েন্তেসের অনুসারীরা)। তারা রুবিওকে অতিরিক্ত যুদ্ধবাজ ও এস্টাবলিশমেন্টের দালাল মনে করে এবং ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের জন্য তাকে আংশিক দায়ী করে। ২০২৬ সালের মিডটার্ম নির্বাচন এই দুজনের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে।
জেডি ভ্যান্স ইতোমধ্যে জানিয়েছেন, তিনি ২০২৬ সালের মিডটার্মের পরেই ২০২৮ সালের নির্বাচনের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন। একইভাবে, ট্রাম্পও সম্ভবত মিডটার্মের ফলাফল দেখেই তার উত্তরসূরি চূড়ান্ত করবেন।
চূড়ান্ত মূল্যায়ন
ট্রাম্প পরবর্তী যুগে রিপাবলিকান পার্টির আদর্শিক রূপরেখা কেমন হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করছে ভ্যান্স এবং রুবিওর মধ্যকার এই দ্বৈরথের ফলাফলের ওপর।
ইরান যুদ্ধের ফলাফল এই লড়াইয়ের নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করবে। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে ভ্যান্সের যুদ্ধবিরোধী অবস্থান গুরুত্ব পাবে, আর দ্রুত সমাধান হলে রুবিওর রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে। তবে রুবিওর উত্থান মানে পুরোনো উদারপন্থী রিপাবলিকান রাজনীতিতে ফেরা নয়, বরং ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিকে আরও সুশৃঙ্খল ও যৌক্তিক মোড়কে উপস্থাপন করা। চূড়ান্ত বিচারে, ভ্যান্স দলটিকে আরও আপসহীন পপুলিজমের দিকে নিয়ে যেতে চান, যেখানে রুবিও চেষ্টা করছেন ট্রাম্পের আগ্রাসী নীতির সঙ্গে প্রশাসনিক দক্ষতার এক সফল মিশ্রণ ঘটিয়ে দলটিকে দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে।
ভ্যান্সের চূড়ান্ত বিজয় প্রমাণ করবে, রিপাবলিকান পার্টি সম্পূর্ণভাবে একটি কট্টর, পপুলিস্ট এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্নতাবাদী দলে পরিণত হয়েছে। বিপরীতে, মার্কো রুবিওর উত্থানের অর্থ এই নয়—দলটি পুরোনো, মধ্যপন্থী এস্টাবলিশমেন্ট যুগে ফিরে যাচ্ছে। বরং এটি প্রমাণ করে, রুবিও নিজেই দলের বর্তমান কট্টর নীতির সঙ্গে আপস করে নিজেকে ট্রাম্পের ছাঁচে সফলভাবে ঢেলে সাজিয়েছেন। তবে তিনি ভ্যান্সের চেয়ে অনেক বেশি দক্ষ, স্থিতিশীল এবং আন্তর্জাতিকমুখী ভাবমূর্তি বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছেন। শেষ পর্যন্ত, যদি রুবিও দলের হাল ধরেন, তবে তিনি ট্রাম্পিজমের বৈশিষ্ট্যগুলো ধরে রাখলেও তা প্রয়োগের ক্ষেত্রে অনেক বেশি সুশৃঙ্খল, প্রাতিষ্ঠানিক এবং কার্যকরী রূপ পেতে পারে।