ভারতের রাজ্যসভা, লোকসভা, বিধান পরিষদ ও বিধানসভা নির্বাচন কী
বাংলাদেশে একজন নাগরিক ভোট দেন ২ বার। অর্থাৎ, জাতীয় ও স্থানীয় সরকার পর্যায়ে। তারা জাতীয় পর্যায়ে ভোট দিয়ে সংসদ সদস্য বা এমপি ও স্থানীয় পর্যায়ে ভোট দিয়ে মেয়র বা চেয়ারম্যানের পাশাপাশি কাউন্সিলর নির্বাচিত করেন।
প্রতিবেশী ভারতে একজন নাগরিক ভোট দেন ৩ বার—জাতীয় পর্যায়ে লোকসভায়, নিজ রাজ্য বিধানসভায় ও স্থানীয় সরকার পর্যায়ে।
তবে ভারতে আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে ভোট হয়—জাতীয় পর্যায়ের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভায় ও রাজ্য পর্যায়ের উচ্চকক্ষ বিধান পরিষদে। সেসব নির্বাচনে ভোট দেন নাগরিকদের ভোটে নির্বাচিত বিধানসভার প্রতিনিধিরা।
অর্থাৎ, সাধারণ নাগরিকরা জাতীয় আইন পরিষদের উচ্চকক্ষ ‘রাজ্যসভা’ ও রাজ্যের আইন পরিষদের উচ্চকক্ষ ‘বিধান পরিষদ’ নির্বাচনে ভোট দেন না।
বাংলাদেশে যেহেতু এককেন্দ্রিক শাসন ব্যবস্থা বা এখানে কোনো রাজ্য বা প্রদেশ নেই, তাই রাজ্য পর্যায়ের নির্বাচন হয় না। এছাড়াও, এখানে এখন পর্যন্ত জাতীয় সংসদে উচ্চকক্ষ গঠন করা হয়নি।
প্রায় ১৫০ কোটি জনসংখ্যার দেশ ভারত বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচিত। দেশটির একজন নাগরিক ১৮ বছর বয়সে ভোটাধিকার পান।
২০২৪ সালে দেশটির সর্বশেষ লোকসভা নির্বাচন হয়। নিয়ম অনুসারে, আগামী নির্বাচন হবে ২০২৯ সালে।
চলতি এপ্রিলে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও আসামসহ ৪ রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর পুদুচেরিতে বিধানসভার নির্বাচন হতে যাচ্ছে।
এ দেশের পাঠকদের কাছে প্রতিবেশী ভারতের ৫টি প্রধান নির্বাচন—লোকসভা, বিধানসভা, রাজ্যসভা, বিধান পরিষদ ও পঞ্চায়েত নির্বাচনের পার্থক্য তুলে ধরা হলো।
লোকসভা
ভারতের পার্লামেন্ট বা আইন পরিষদ দুই কক্ষবিশিষ্ট। আগেই বলা হয়েছে—উচ্চকক্ষের নাম ‘রাজ্যসভা’ ও নিম্নকক্ষের নাম ‘লোকসভা’। রাজ্যসভার সর্বোচ্চ সদস্য সংখ্যা ২৫০। লোকসভার বর্তমান সদস্য ৫৪৩ জন।
ব্রিটানিকার তথ্য বলছে—১৯৫৪ সালের ১৪ মে ‘লোকসভা’ শব্দটি জাতীয় পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষের নাম হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়। এর আগে ভারতের জাতীয় পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষের নাম ছিল ‘হাউস অব দ্য পিপল’। এই নামটি এখনো ভারতের সংবিধানে লেখা আছে।
সংবিধান অনুসারে, ভারতের লোকসভার সদস্যের সর্বোচ্চ সংখ্যা ৫৫০ হবে। তাদের মধ্যে ৫৩০ জন নির্বাচিত হন দেশটির ২৮ রাজ্য থেকে। বাকি ২০ জনকে নেওয়া হয় ৮ কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল থেকে।
ব্রিটানিকা থেকে আরও জানা যায়—ভারতের সংবিধানের ৮১ অনুচ্ছেদে লোকসভার আসন সংখ্যা ৫০০-তে সীমিত রাখার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু, দেশটিতে প্রশাসনিক সুবিধা ও জাতিগত দাবির কারণে বড় বড় রাজ্য ভেঙে নতুন নতুন রাজ্য গড়ে তোলায় লোকসভার সদস্য সংখ্যা ৫০০ থেকে বাড়িয়ে ৫৪৩ করা হয়।
আগামী লোকসভা নির্বাচনে আসন সংখ্যা আরও বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে।
লোকসভার সদস্যরা প্রতি ৫ বছর পরপর জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হন। বেশি ভোট পাওয়া প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। রাজ্যের জনসংখ্যার ওপর ভিত্তি করে ওই রাজ্যে লোকসভার আসন সংখ্যা দেওয়া হয়।
বিশেষ পরিস্থিতিতে মেয়াদপূর্তির আগেই লোকসভা ভেঙে দিয়ে নতুন নির্বাচন দেওয়ার ঘটনা ঘটে।
লোকসভার নির্বাচিত সদস্যরা দেশটির প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করেন। তিনি মন্ত্রিসভা গঠন করেন এবং সংসদ নেতা হিসেবে বিবেচিত হন।
বিধানসভা
ভারতের জাতীয় পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষের নাম যেমন ‘লোকসভা’; তেমনি, একটি রাজ্যের আইন পরিষদের নিম্নকক্ষের নাম ‘বিধানসভা’। বিধানসভার সদস্যদের ‘বিধায়ক’ বলা হয়। তারা ৫ বছরের জন্য নির্বাচিত হন।
একেকটি রাজ্যের বিধানসভার সদস্য কত হবে, তা নির্ভর করে সেই রাজ্যের জনসংখ্যার ওপর।
স্বাভাবিকভাবেই ভারতের সবচেয়ে জনবহুল রাজ্য উত্তরপ্রদেশের বিধানসভা সদস্য সংখ্যার দিক থেকে দেশটির সবচেয়ে বড়। সেই রাজ্যের বিধানসভার মোট সদস্য ৪০৩ জন।
সদস্য সংখ্যার দিক থেকে সিকিম রাজ্যের বিধানসভা সবচেয়ে ছোট। এর সদস্য সংখ্যা ৩২ জন। পাশাপাশি, কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হিসেবে সবচেয়ে ছোট পুদুচেরি। এর সদস্য সংখ্যা ৩০ জন।
বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার সদস্য ২৯৪ জন। অপর সীমান্তবর্তী রাজ্য আসামে বিধানসভার সদস্য ১২৬ ও ত্রিপুরার বিধানসভার সদস্য সংখ্যা ৬০।
সংবিধান মেনে একটি বিধানসভায় বেশি ভোট পাওয়া দল বা জোট সেই রাজ্যে সরকার গঠন করে।
রাজ্যসভা
ভারতের সর্বোচ্চ আইন পরিষদের উচ্চকক্ষ ‘রাজ্যসভা’কে স্থায়ী কক্ষ বলা হয়। যেহেতু রাজ্যসভার সদস্যরা জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন না, তাই তাদের নিয়ে আলোচনা কম। তবে যেকোনো আইন প্রণয়নে রাজ্যসভার গুরুত্ব লোকসভার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।
সংবিধান অনুসারে, রাজ্যসভা কখনই ভেঙে দেওয়া যায় না। অর্থাৎ, বিশেষ পরিস্থিতিতে দেশটির আইন পরিষদের নিম্নকক্ষ ‘লোকসভা’ ভেঙে নতুন নির্বাচনের আয়োজন করা যেতে পারে; কিন্তু, উচ্চকক্ষ বা ‘রাজ্যসভা’ পুরোপুরি ভেঙে নতুন নির্বাচনের মাধ্যমে গঠন করা যায় না।
সংবিধান অনুসারে, প্রতি ২ বছর পরপর রাজ্যসভার মোট সদস্যের এক তৃতীয়াংশের মেয়াদ পূর্ণ হয়।
জনসংখ্যার ভিত্তিতে রাজ্যসভার আসন নির্ধারণ করা হয়। তবে একটি ছোট রাজ্য বা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল থেকে অন্তত একজনকে রাজ্যসভার সদস্য করা হয়। রাজ্যসভার সদস্যের মধ্যে ১২ জনকে রাষ্ট্রপতি মনোনয়ন দেন।
গত ২৬ ফেব্রুয়ারি ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দুর এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়—রাজ্যসভার সদস্যদের সংখ্যা সর্বোচ্চ ২৫০ হতে হবে। সবাই ৬ বছরের জন্য নির্বাচিত হন। রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলোর আইনসভার নিম্নকক্ষ ‘বিধানসভা’র সদস্যরা দেশটির পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ তথা ‘রাজ্যসভা’র সদস্যদের নির্বাচিত করেন।
বিধানসভা নির্বাচনে বিজয় একটি রাজনৈতিক দলের জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, বিধানসভায় নির্বাচিত রাজনৈতিক দল আনুপাতিক হারে রাজ্যসভায় সদস্য পদ পায়।
লোকসভায় একটি দল সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও তারা রাজ্যসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠ নাও হতে পারে। কেননা, রাজ্যসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে রাজগুলোর বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে হয়।
গত ১৬ মার্চ রাজ্যসভার ২৫০ আসনের মধ্যে মেয়াদ শেষ হওয়া ৩৭ সদস্যদের আসনে ১০ রাজ্যে নির্বাচন হয়।
চলতি এপ্রিলে রাজ্যসভার আরও ৩৭টি আসন খালি হবে। সেসব আসন পূরণে ১০ রাজ্যের বিধানসভায় ভিন্ন ভিন্ন সময়ে নির্বাচন হবে।
সংবিধান বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য: রাজ্যসভাকে গড়ে তোলা হয়েছে লোকসভার ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করা জন্য। রাজ্যসভা মূলত রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলোর স্বার্থকে রক্ষা করে চলে।
রাজ্যসভার সদস্য হতে একজন প্রার্থীকে বিধানসভার সদস্যদের ‘পছন্দের’ তালিকায় থাকতে হয়। যে কয়টি আসন খালি হয়, সে কয়টি আসনের জন্য প্রার্থী ঠিক করে নেওয়া হয়। তারপর বিধানসভার সদস্যরা ভোটের মাধ্যমে রাজ্যসভার সদস্যদের অনুমোদন দেন।
দ্য হিন্দুর প্রতিবেদন অনুসারে—চলতি এপ্রিলে রাজ্যসভার যে ৩৭টি আসন খালি হবে সেগুলো পূরণ করতে পশ্চিমবঙ্গ ও বিহার থেকে ৫ জন করে, তামিলনাড়ু থেকে ৬ জন ও মহারাষ্ট্র থেকে ৭ জনকে নেওয়া হবে। বাকিরা আসবেন অন্য রাজ্য থেকে।
বিধান পরিষদ
ভারতের যেসব রাজ্যের আইন পরিষদ দুই কক্ষবিশিষ্ট সেসব রাজ্যের আইন পরিষদের উচ্চকক্ষকে ‘বিধান পরিষদ’ বলা হয়। অর্থাৎ, ভারতের পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষের নাম যেমন ‘রাজ্যসভা’; তেমনি, একটি রাজ্যের পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষের নাম ‘বিধান পরিষদ’।
একটি রাজ্যের উচ্চকক্ষ বিধান পরিষদের সদস্য সংখ্যা নিম্নকক্ষ বিধানসভার এক তৃতীয়াংশের বেশি হয় না। বিধান পরিষদের সদস্যদের একটি অংশ নির্বাচিত, অন্য একটি অংশকে রাজ্যের গভর্নর মনোনয়ন দেন।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম থেকে জানা যায়—বর্তমানে ভারতের ২৮ রাজ্য ও ৮ কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মধ্যে ৬ রাজ্যের আইন পরিষদ দুই কক্ষবিশিষ্ট। সেই হিসেবে সেসব রাজ্যে উচ্চকক্ষ বা ‘বিধান পরিষদ’ আছে। রাজ্যগুলো হলো: উত্তরপ্রদেশ, তেলেঙ্গানা, মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক, অন্ধ্রপ্রদেশ ও বিহার।
এ ছাড়াও, ভারতে স্থানীয় সরকার বা পঞ্চায়েত নির্বাচন মাঝেমধ্যে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে গুরুত্ব পায়। কেননা, পঞ্চায়েত নির্বাচনে একটি দলের ভালো ফল বিধানসভায় প্রভাব ফেলতে পারে। ভারতের নাগরিকরা যে তিন ক্ষেত্রে নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, এই স্থানীয় সরকার নির্বাচন এমনি একটি ক্ষেত্র।






