বিজয়ের যেভাবে তামিলনাড়ু জয়
দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ু বিধানসভা নির্বাচনে অভিনেতা থেকে রাজনীতিবিদ বনে যাওয়া সি জোসেফ বিজয়ের (থালাপতি বিজয়) দল তামিলাগা ভেট্টি কাজাগাম (টিভিকে) একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
এ রাজ্যের পুরোনো ডিএমকে এবং এআইএডিএমকে দল দুটিকে পরাজিত করে বিজয়ের দল ১০৮টি আসনে জয়লাভ করেছে। তবে সরকার গঠনের জন্য ১১৮টি আসনের চেয়ে দলটি ১০ আসন পিছিয়ে আছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকার গঠনের জন্য বিজয়কে এখন ডিএমকে নেতৃত্বাধীন সেক্যুলার প্রগ্রেসিভ অ্যালায়েন্স (এসপিএ) অথবা এআইএডিএমকে নেতৃত্বাধীন এনডিএর সমর্থন নিতে হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক বিজয়ানন্দ জানান, সাধারণত রাজ্যপাল একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দলকে সরকার গঠনের আহ্বান জানান। এ ক্ষেত্রে ১০৮ আসন পাওয়ায় ছোট দলগুলোর সমর্থন টিভিকের নিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, সরকার গঠনের আমন্ত্রণ পাওয়ার পর ৭ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে বিধানসভায় আস্থা ভোটে জয়ী হতে হবে। যদি টিভিকে ব্যর্থ হয়, তবে রাজ্যপাল দ্বিতীয় বৃহত্তম জোটকে ডাকতে পারেন।
তবে টিভিকে জানিয়েছে, আগামীকালই শপথ নেবেন বিজয়।
দ্য হিন্দুর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তামিলনাড়ুর জনপ্রিয় চলচ্চিত্র তারকা বিজয় রাজনীতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রবেশের আগেই একটি শক্তিশালী সামাজিক ও সংগঠনিক ভিত্তি তৈরি করেছিলেন। এই ভিত্তিই পরে তার রাজনৈতিক দল টিভিকের জন্য মাঠের কাজ করে দেয়।
চলচ্চিত্র থেকে ধীরে ধীরে সংগঠনের দিকে যাত্রা
বিজয় দীর্ঘদিন ধরে তামিল চলচ্চিত্রে একজন সুপারস্টার হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তার বিশাল ফ্যানবেস কেবল সিনেমা দেখা বা উদযাপনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ফ্যান ক্লাবগুলো ধীরে ধীরে সামাজিক সংগঠনে রূপ নেয়।
ফ্যান ক্লাবগুলোর মাধ্যমে তারা নিয়মিতভাবে রক্তদান কর্মসূচি, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ত্রাণ বিতরণ, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের সহায়তা এবং স্থানীয় সামাজিক কার্যক্রম চালাতে শুরু করে। এই কাজগুলো আনুষ্ঠানিক রাজনীতির বাইরে থেকেও একটি সংগঠিত নেটওয়ার্ক তৈরি করে।
তৃণমূল পর্যায়ে নেটওয়ার্ক গঠন
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আনুষ্ঠানিক দল গঠনের আগেই বিজয়ের সমর্থকেরা গ্রাম ও জেলা পর্যায়ে সংগঠিত হতে শুরু করে। এই নেটওয়ার্ক ধীরে ধীরে এমন একটি কাঠামো তৈরি করে, যা রাজনৈতিক সংগঠনের মতোই কার্যকর ছিল।
এই সময়েই বিভিন্ন এলাকায় সমন্বিত কমিটি গড়ে ওঠে, যারা স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক কাজের পাশাপাশি নেতৃত্ব গঠনের প্রক্রিয়াও শুরু করে। ফলে দল ঘোষণার আগেই একটি ‘গ্রাসরুট অর্গানাইজেশনাল স্ট্রাকচার’ তৈরি হয়ে যায়।
নির্বাচনে অংশগ্রহণের আগেই রাজনৈতিক শক্তির পরীক্ষা
২০২১ সালের স্থানীয় নির্বাচনে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো রাজনৈতিক দল না থাকলেও বিজয়ের সমর্থকেরা স্বতন্ত্রভাবে অংশ নেয়। সেখানে তারা উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করে, যা তার সংগঠনের বাস্তব প্রভাব প্রথমবারের মতো স্পষ্ট করে।
এই ফলাফলকে বিশ্লেষকরা তার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক শক্তির ‘টেস্ট রান’ হিসেবে দেখেছেন। এতে বোঝা যায়, তার জনপ্রিয়তা কেবল চলচ্চিত্রে সীমাবদ্ধ নয়, বরং সেটি ভোটে রূপান্তরিত হওয়ার সক্ষমতাও রাখে।
টিভিকে গঠনের পেছনের প্রস্তুতি
টিভিকে যখন আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়, এর কাঠামো আগেই তৈরি ছিল। দীর্ঘদিনের ফ্যান ক্লাব, সামাজিক কার্যক্রম এবং জেলা পর্যায়ের সংগঠনগুলো এই নতুন রাজনৈতিক দলের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই প্রস্তুতির কারণে দল গঠনের পরপরই তারা দ্রুত জনসংযোগ ও সংগঠন বিস্তার করতে সক্ষম হয়।
রাজনৈতিক কৌশল: জনপ্রিয়তা থেকে সংগঠিত শক্তি
বিজয়ের রাজনৈতিক উত্থানকে শুধুমাত্র একজন তারকার জনপ্রিয়তা হিসেবে দেখা হচ্ছে না। বরং এটি একটি ধীর, পরিকল্পিত রূপান্তর—যেখানে ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তাকে সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করা হয়েছে।
তার কৌশল ছিল তিনটি ধাপে: ফ্যানবেস তৈরি, সামাজিক কাজের মাধ্যমে আস্থা অর্জন এবং সেই নেটওয়ার্ককে রাজনৈতিক কাঠামোয় রূপদান।
কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের টানাপোড়েন
বিজয়ের রাজনৈতিক অবস্থান হঠাৎ করে গড়ে ওঠেনি; বরং এটি ধীরে ধীরে তৈরি হওয়া একটি বিবর্তন, যেখানে ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, তামিল পরিচয়ের রাজনীতি এবং কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে মতপার্থক্য একসঙ্গে কাজ করেছে। নরেন্দ্র মোদি সরকারের প্রতি তার সমালোচনামূলক অবস্থান মূলত এই প্রেক্ষাপটেই তৈরি হয়েছে।
প্রথমত, বিজয়ের রাজনৈতিক যাত্রার ভিত্তি তামিলনাড়ুর আঞ্চলিক রাজনীতির দীর্ঘ ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত। তামিলনাড়ুতে কেন্দ্র বনাম রাজ্য ক্ষমতার টানাপোড়েন নতুন কিছু নয়। ভাষা, রাজস্ব বণ্টন এবং ফেডারেল অধিকারের প্রশ্নে রাজ্যের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি সন্দেহ বা সমালোচনা প্রায়ই দেখা যায়। এই পরিবেশে বিজয়ের রাজনৈতিক ভাষ্যও ধীরে ধীরে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দিকে ঝুঁকেছে।
বিজয় বারবার জোর দিয়েছেন যে তামিলনাড়ুর শিক্ষা, ভাষা ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে রাজ্যের স্বায়ত্তশাসন থাকা উচিত।
দ্বিতীয়ত, বিজয়ের ফ্যানবেস থেকে গড়ে ওঠা সংগঠন টিভিকের রাজনৈতিক অবস্থান শুরু থেকেই ‘রাজ্যকেন্দ্রিক জনস্বার্থকে’ গুরুত্ব দিয়েছে। এই কাঠামোর ভেতরে কেন্দ্রীয় সরকারের কিছু নীতিকে, বিশেষ করে অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলোকে, তামিল জনগণের স্বার্থবিরোধী হিসেবে উপস্থাপন করার প্রবণতা দেখা যায়।
টিভিকে গঠনের সময় তার বক্তব্য ছিল—তামিলনাড়ুতে একটি ‘নতুন রাজনৈতিক বিকল্প’ দরকার, যা প্রচলিত জাতীয় রাজনীতির বাইরে কাজ করবে।
বিজয়ের জয় উদযাপনের অংশ হিসেবে একটি বড় ব্যানারে দুধ ঢালছেন তার সমর্থকেরা। ছবি: সংগৃহীত
তৃতীয়ত, কেন্দ্রীয় সরকারের কিছু নীতি—যেমন ভাষা নীতি, শিক্ষানীতি এবং কেন্দ্র-রাজ্য অর্থনৈতিক বণ্টন—তামিল রাজনৈতিক পরিসরে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্কের বিষয়। এই বিষয়গুলো নিয়েই বিজয়ের অবস্থান ধীরে ধীরে আরও স্পষ্টভাবে সমালোচনামুখী হয়েছে, যা অনেক পর্যবেক্ষকের মতে তাকে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব, বিশেষ করে মোদি সরকারের প্রতি সমালোচক অবস্থানে নিয়ে গেছে।
নতুন জাতীয় শিক্ষানীতি এবং ভাষা প্রয়োগ নিয়ে দক্ষিণ ভারতের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ আছে।
বিজয়ের অবস্থান ছিল তামিল ভাষা ও স্থানীয় সংস্কৃতিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কেন্দ্রীয় চাপের মাধ্যমে ভাষা বা নীতি চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়।
বিজয় একাধিকবার বলেছেন যে রাজনীতির কেন্দ্র হওয়া উচিত সাধারণ মানুষ, ক্ষমতা বা কেন্দ্রীয় প্রশাসন নয়।
চতুর্থত, রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিজয়ের অবস্থান শুধুমাত্র আদর্শিক নয়, বরং কৌশলগতও। তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে শক্তিশালী আঞ্চলিক পরিচয়ভিত্তিক ভোটব্যাংক রয়েছে, যেখানে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান অনেক সময় রাজনৈতিকভাবে কার্যকর ভূমিকা রাখে। ফলে তার বক্তব্যগুলো আংশিকভাবে এই ভোট-বাস্তবতার সঙ্গেও যুক্ত।
সব মিলিয়ে বলা যায় বিজয়ের মোদিবিরোধী সমালোচনামূলক অবস্থান একক কোনো ঘটনার ফল নয়। এটি তামিলনাড়ুর আঞ্চলিক রাজনীতি, কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠার কৌশলের সম্মিলিত ফল।



