হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে যা যা ঘটছে
হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা চরম রূপ নিয়েছে। যুদ্ধবিরতি চললেও উভয় পক্ষই একে অপরের জাহাজে হামলা চালানোর দাবি করেছে। এর জেরে উপসাগরীয় অঞ্চলেও নতুন করে বেড়েছে উত্তেজনা।
এ অবস্থায় মঙ্গলবার হরমুজ প্রণালি সংক্রান্ত একটি খসড়া প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা শুরু করতে যাচ্ছে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ।
বার্তাসংস্থা এপি, রয়টার্স ও সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে চলমান পরিস্থিতির সর্বশেষ তথ্য।
পেন্টাগনের ব্রিফিংয়ে যা জানা গেল
আজ মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন এক সংবাদ সম্মেলনে হরমুজ প্রণালির বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরেন।
তিনি জানান, বর্তমানে পারস্য উপসাগরে এক হাজার ৫৫০টিরও বেশি জাহাজ আটকা পড়ে আছে। এসব জাহাজে অন্তত ২২ হাজার ৫০০ নাবিক রয়েছেন।
হরমুজকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের তৎপরতা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘১০০টিরও বেশি মার্কিন সামরিক বিমান ২৪ ঘণ্টা আকাশপথে হরমুজ প্রণালি টহল দিচ্ছে।’
সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, ‘উত্তেজনা থাকলেও যুদ্ধবিরতি এখনো শেষ হয়ে যায়নি।’
তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ওই নৌপথে একটি নিরাপদ পথ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে এবং শত শত বাণিজ্যিক জাহাজ পার হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।
‘নেক্সট জেনারেশন ট্যাকটিক্যাল নেটওয়ার্ক’ ব্যবহার করে হরমুজে সব সামরিক কার্যক্রম পরিচালনা ও সমন্বয় করা হচ্ছে বলেও জানানো হয় সংবাদ সম্মেলনে।
ট্রাম্পের ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ ও ইরানের হুঁশিয়ারি
গতকাল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজে আটকে পড়া বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে পথ দেখিয়ে বের করে আনার জন্য ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ নামে একটি অভিযানের ঘোষণা দেন।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের তথ্য অনুযায়ী, এই অভিযানে প্রায় ১৫ হাজার মার্কিন সেনা সরাসরি অংশগ্রহণ করছে। জাহাজগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিতে মোতায়েন করা হয়েছে শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র-বিধ্বংসী ডেস্ট্রয়ার এবং শতাধিক অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান।
তবে এ অভিযানের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। তারা বলছে, ইরানের বিপ্লবী রক্ষী বাহিনীর (আইআরজিসি) অনুমতি ছাড়া কেউ এই প্রণালি ব্যবহারের চেষ্টা করলে তাদের লক্ষ্য করে গুলি চালানো হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফও সতর্ক করে বলেছেন, তার দেশ ‘এখনও শুরুই করেনি’।
হরমুজে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকাণ্ড নৌ-চলাচলকে ঝুঁকিতে ফেলেছে বলে দাবি করেন তিনি।
পাল্টাপাল্টি হামলার দাবি
ইরানের ফার্স নিউজ এজেন্সির বরাতে আল জাজিরা জানিয়েছে, হরমুজে একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজকে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলেও তা অমান্য করায় দুটি ইরানি ড্রোন দিয়ে হামলা চালানো হয়েছে।
তবে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড হামলার খবর অস্বীকার করেছে। উল্টো তারা দাবি করেছে যে, তাদের বাহিনী আইআরজিসির ৬টি নৌযান ডুবিয়ে দিয়েছে।
উভয় ঘটনার সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি সংবাদমাধ্যমগুলো।
এ বিষয়ে অস্ট্রেলিয়ার ডিকিন ইউনিভার্সিটির মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশীয় রাজনীতি বিষয়ক অধ্যাপক শাহরাম আকবরজাদেহ আল জাজিরাকে বলেন, ‘ইরানের নেতৃত্ব মনে করে যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের উত্তেজনা বৃদ্ধির জবাবে তাদেরও উত্তেজনা বাড়ানো প্রয়োজন। মার্কিন অবরোধের কারণে ইরানিরা যদি রপ্তানি করতে না পারে, তবে তারা যুক্তরাষ্ট্র এবং তার আঞ্চলিক মিত্রদের ওপর একই অর্থনৈতিক যন্ত্রণা চাপিয়ে দিতে চায়।’
হরমুজ নিয়ে ইরানের নতুন ম্যাপ
হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে একটি নতুন মানচিত্র প্রকাশ করেছে ইরানের বিপ্লবী রক্ষী বাহিনী।
আল জাজিরা জানায়, ওই ম্যাপে আইআরজিসি তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকার সীমানা আরও পূর্বে সরিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের জলসীমাকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। এতে নতুন করে আঞ্চলিক সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
জাতিসংঘে খসড়া প্রস্তাব
যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলোর পৃষ্ঠপোষকতায় তৈরি একটি খসড়া প্রস্তাব নিয়ে মঙ্গলবার জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে আলোচনা হবে।
বার্তাসংস্থা এপি জানায়, প্রস্তাব অনুযায়ী ইরান যদি হরমুজে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা বন্ধ ও কোথায় মাইন পাতা রয়েছে তা প্রকাশ না করে, তাবে দেশটির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে। প্রয়োজনে সামরিক শক্তি ব্যবহারেরও অনুমতি দেওয়া হতে পারে।
এর আগেও হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার জন্য একটি প্রস্তাব উত্থাপিত হয় নিরাপত্তা পরিষদে। রাশিয়া ও চীনের ভেটোর কারণে তা বাতিল হয়।
বিশ্লেষকদের মত
বৈশ্বিক ঝুঁকি বিশ্লেষণকারী সংস্থা ভেরিস্ক ম্যাপলক্রফটের প্রধান মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষক টরবিওর সল্টভেড বার্তাসংস্থা এপিকে বলেন, ‘হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি অত্যন্ত অনিশ্চিত। এর কারণ হলো ইরান এখনও স্পষ্টভাবে সেইসব জাহাজকে আক্রমণ করার পরিকল্পনা করছে, যেগুলো ইরানের অনুমোদিত পথে যাচ্ছে না।’
প্রতিবেদনে বলা হয়, হরমুজের উত্তর দিকের পথটি ব্যবহার করতে হলে আইআরজিসির অনুমোদন ও টোল দিতে হচ্ছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’-এর পথটি দক্ষিণে ওমানের জলসীমার মধ্য দিয়ে যায়।
সল্টভেডের মতে, কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতা চুক্তি হলেই হরমুজে চলাচল স্বাভাবিক হওয়া সম্ভব। অন্যথায় ইরানের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর ব্যবস্থা করতে হবে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা শুরু করলে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যায়। এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ করা হয়।
পথটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে তেল ও সারের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে, যা বিশ্বব্যাপী মন্দা এবং খাদ্য সংকটের আশঙ্কা তৈরি করেছে। এর প্রতিক্রিয়ায় গত ১৩ এপ্রিল থেকে ইরানি বন্দরগুলোতে নৌ-অবরোধ জারি করেছে যুক্তরাষ্ট্র।




