মালির বিদ্রোহীরা কী চায়—রাষ্ট্রক্ষমতা না বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদের দখল?
আফ্রিকার দেশ মালি মহাদেশের তৃতীয় বৃহত্তম সোনা মজুদের অধিকারী। পাশাপাশি দেশটিতে বিপুল পরিমাণ লিথিয়াম ও ইউরেনিয়ামের মতো গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ রয়েছে।
পশ্চিম আফ্রিকার সাহেল অঞ্চলের দেশটি আজ এক দ্বৈত বাস্তবতার মুখোমুখি—একদিকে বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদের ভাণ্ডার, অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান সহিংসতা ও রাষ্ট্রীয় অস্থিতিশীলতা।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর সর্বশেষ তথ্য বলছে, আল-কায়েদা ঘনিষ্ঠ জিহাদি জোট জামাআত নুসরাত আল-ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন এবং তুয়ারেগ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সমন্বিত হামলা মালির নিরাপত্তা কাঠামোকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে, যেখানে রাজধানী বামাকো পর্যন্ত হুমকির মুখে।
এই প্রেক্ষাপটে মালির চলমান সংকটকে শুধু একটি রাজনৈতিক সংঘাত হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। বরং এটি এমন এক জটিল বাস্তবতা, যেখানে সরকারবিরোধী লড়াই, আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা এবং সম্পদসমৃদ্ধ ভূখণ্ডের কৌশলগত গুরুত্ব একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে।
ফলে প্রশ্নটি ক্রমেই স্পষ্ট উঠছে—মালির বিদ্রোহীরা কি কেবল রাষ্ট্রক্ষমতা দুর্বল করতে চায়, নাকি এর আড়ালে রয়েছে দেশের বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার বৃহত্তর হিসাব?
বিপুল সম্পদের ওপর বসে আছে মালি
নিরাপত্তা ও ক্ষমতার লড়াইয়ের মধ্যেও মালির প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ মানুষ বিপুল সম্পদের ওপর বসবাস করছে।
দেশটির প্রমাণিত সোনা মজুদ প্রায় ৮০০ টন, যা আফ্রিকায় তৃতীয় বৃহত্তম—দক্ষিণ আফ্রিকা (৫ হাজার টন) এবং ঘানার (১ হাজার টন) পরেই। মালির সরকারের মতে, ভূতাত্ত্বিক সম্ভাবনা অনুযায়ী এই মজুদ ২ হাজার টন পর্যন্ত হতে পারে।
প্রায় ২০ লাখেরও বেশি মানুষ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে খনি খাতের ওপর নির্ভরশীল। অধিকাংশ সোনার খনি অবস্থিত দক্ষিণের সিকাসো ও কৌলিকোরো অঞ্চল এবং পশ্চিমের কায়েস অঞ্চলে, যা বিরিমিয়ান আগ্নেয়গিরি বেল্ট বরাবর বিস্তৃত।
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে মালি প্রায় ১০০ টন সোনা উৎপাদন করেছে, যার মধ্যে ক্ষুদ্র খনির উৎপাদনও অন্তর্ভুক্ত।
এতে করে মালি আফ্রিকার দ্বিতীয় বৃহত্তম সোনা উৎপাদক—ঘানার (১৪০ দশমিক ৬ টন) পরেই এবং দক্ষিণ আফ্রিকার (৯৮ দশমিক ৯ টন) সামান্য উপরে।
তবে মালির সরকারি বার্ষিক উৎপাদন হিসাব প্রায় ৫৭ টন। এই বড় ব্যবধানের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয় ব্যাপক চোরাচালান এবং ক্ষুদ্র খনি খাতের উৎপাদন সঠিকভাবে গণনা না হওয়া।
সোনা মালির সবচেয়ে বড় রপ্তানি পণ্য, যা দেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৮০ শতাংশ।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগ এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে সোনা থেকে মালির আয় হয়েছে প্রায় ৪ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার।
ওবজারভেটরি অব ইকোনমিক কমপ্লেক্সিটি (ওসিই) অনুযায়ী, সোনার পর মালির প্রধান রপ্তানি পণ্য হলো কাঁচা তুলা, পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম, তেলবীজ এবং লৌহ আকরিক।
বিদেশি কোম্পানির প্রাধান্য
মালির খনি শিল্প দীর্ঘদিন ধরে বিদেশি বহুজাতিক কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, বিশেষ করে কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলো। সাম্প্রতিক সময়ে চীনা কোম্পানির উপস্থিতিও দ্রুত বাড়ছে।
২০২০ সালের আগস্টে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা সামরিক সরকার ২০২৩ সালে একটি নতুন খনি আইন প্রণয়ন করে। এই আইনের মাধ্যমে সরকার খনি প্রকল্পে সর্বোচ্চ ৩৫ শতাংশ শেয়ার নিতে পারে এবং কঠোর কর নীতির মাধ্যমে বিদেশি কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে বেশি রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করে।
কানাডার ব্যারিক গোল্ড মালির অন্যতম বৃহৎ খনি পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান, যারা ২০০৫ সাল থেকে দেশের পশ্চিমাঞ্চলের লুলো–গুনকোটো কমপ্লেক্সে সোনা উত্তোলন করছে।
অন্যান্য প্রধান খনির মধ্যে রয়েছে ফেকোলা, সিয়ামা, সাদিওলা হিল, কালানা এবং তাবাকোটো। মোরিলা খনি বর্তমানে বন্ধ হওয়ার পথে, আর ইন্তাহাকা এলাকা ক্ষুদ্র খনি কার্যক্রম ও বিরোধপূর্ণ অবস্থার মধ্যে রয়েছে।
লিথিয়াম খাতের উত্থান
মালির বৃহত্তম লিথিয়াম প্রকল্প গৌলামিনা, যা ২০২৪ সালে চালু হয়েছে। এটি চীনের গ্যানফেং লিথিয়ামের মালিকানাধীন, যেখানে অস্ট্রেলিয়ার লিও লিথিয়ামেরও বড় অংশীদারিত্ব রয়েছে এবং মালির রাষ্ট্রীয় অংশীদারিত্ব তুলনামূলক কম।
এই প্রকল্পে কোটি টনের বেশি লিথিয়ামসমৃদ্ধ আকরিক রয়েছে। এ ছাড়া, বুগুনি লিথিয়াম প্রকল্প ২০২৫ সালে চালু হয়েছে এবং কায়েস অঞ্চলে লিথিয়াম অনুসন্ধান চলছে।
অপার সম্ভাবনা
সোনা ছাড়াও মালিতে রয়েছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ: লিথিয়াম, ইউরেনিয়াম, ফসফেট, লৌহ আকরিক, ম্যাঙ্গানিজ ও হীরা।
দক্ষিণ মালির গৌলামিনা প্রকল্পে ২০০ মিলিয়নেরও বেশি টন লিথিয়ামসম্পদ থাকার অনুমান করা হয়, যা আফ্রিকার অন্যতম বৃহৎ।
ইউরেনিয়াম অনুসন্ধান কিদাল ও ফালেয়া অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত, আর নাইজার নদী অববাহিকায় হীরার অস্তিত্ব শনাক্ত হয়েছে।
মালির খনিজ সম্পদের বড় অংশ এখনো পুরোপুরি অনুসন্ধান বা উত্তোলন করা হয়নি, বিশেষ করে দেশের উত্তরাঞ্চলে নিরাপত্তা সংকটের কারণে উন্নয়ন ধীরগতির।
মালির ন্যাশনাল ডিরেক্টরেট ফর জিওলজি অ্যান্ড মাইনসের ২০২২ সালের হিসাব অনুযায়ী দেশটিতে রয়েছে: ২ হাজার টন সোনা, ৪ কোটি টন চুনাপাথর, ১০ বিলিয়ন টন শেল, ২ বিলিয়ন টন লৌহ আকরিক, ১১ হাজার টন ইউরেনিয়াম, ১ কোটি টন ম্যাঙ্গানিজ, ৫ দশমিক ৮ বিলিয়ন টন লিথিয়াম, ১ দশমিক ২ বিলিয়ন টন বক্সাইট, ২৪ লাখ ক্যারেট হীরা, ৫ দশমিক ৩ কোটি টন লবণ ও ৬ কোটি টন মার্বেল।
আল-কায়েদা ঘনিষ্ঠ গোষ্ঠী রাজধানীর কাছে চেকপোস্ট বসানোর পাশাপাশি উত্তর মালির একটি শহর দখল করেছে। ছবি: রয়টার্স
বিদ্রোহীরা কী চায়?
রাজধানী বামাকো ঘিরে বিদ্রোহীদের অবরোধের প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—মালির বিদ্রোহীরা আসলে কী চায়? তারা কি পুরো রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করতে চায়, নাকি দেশের বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায়?
প্রথমত, বিশ্লেষকরা মনে করেন যে, বিদ্রোহীদের প্রধান লক্ষ্য সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকার দখল করা নয়। বরং তারা রাষ্ট্রকে দুর্বল করে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে চায়।
দ্য গার্ডিয়ানের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বিদ্রোহীরা রাজধানী দখলের চেয়ে উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের কৌশলগত এলাকা নিয়ন্ত্রণে বেশি আগ্রহী, যাতে তারা রাজনৈতিকভাবে সরকারকে চাপ দিতে পারে।
একইভাবে দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট উল্লেখ করেছে, এই ধরনের সমন্বিত হামলা মূলত ‘রাষ্ট্রের দুর্বলতা প্রদর্শন’ এবং জনগণের আস্থা নষ্ট করার কৌশল।
দ্বিতীয়ত, তুয়ারেগ বিদ্রোহীদের লক্ষ্য ঐতিহাসিকভাবে আলাদা। তারা দীর্ঘদিন ধরে উত্তর মালিতে ‘আজাওয়াদ’ নামে একটি স্বাধীন বা স্বায়ত্তশাসিত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে আসছে। এই আন্দোলনের শিকড় রয়েছে উপনিবেশ-পরবর্তী রাজনৈতিক বঞ্চনা এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের মধ্যে। ফলে তাদের কাছে এই সংঘাত মূলত পরিচয়, ভূখণ্ড এবং স্বশাসনের প্রশ্ন।
অন্যদিকে জিহাদি গোষ্ঠীগুলোর লক্ষ্য আরও আদর্শিক। আল-কায়েদা সংযুক্ত সংগঠনগুলো মালিতে শরিয়াভিত্তিক শাসন প্রতিষ্ঠা এবং তাদের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে।
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্সের তথ্য অনুযায়ী, এসব গোষ্ঠী গ্রামীণ এলাকায় বিকল্প প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করে রাষ্ট্রের শূন্যতা পূরণের চেষ্টা করছে।
তবে প্রশ্ন থেকে যায়—এই সংঘাতে প্রাকৃতিক সম্পদের ভূমিকা কতটা? মালিতে রয়েছে আফ্রিকার তৃতীয় বৃহত্তম সোনা মজুদ, পাশাপাশি বিপুল লিথিয়াম, ইউরেনিয়াম ও অন্যান্য খনিজ সম্পদ। এই সম্পদের বড় অংশই এমন অঞ্চলে অবস্থিত, যেখানে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ দুর্বল এবং বিদ্রোহীদের প্রভাব বেশি।
যদিও বিদ্রোহীরা সরাসরি সম্পদ দখলের কথা খুব কমই প্রকাশ্যে বলে, তবুও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে খনিজসমৃদ্ধ অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ তাদের জন্য একটি বড় কৌশলগত সুবিধা। এসব এলাকা নিয়ন্ত্রণ মানে অর্থনৈতিক উৎস, অস্ত্র কেনার সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বজায় রাখা।
এ ছাড়া, মালির অভ্যন্তরীণ সংকট আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। ২০২০ সালের অভ্যুত্থানের পর মালির সামরিক সরকার ফ্রান্সের পরিবর্তে রাশিয়ার সহায়তা নেয়। কিন্তু সাম্প্রতিক হামলাগুলো দেখিয়েছে যে, এই নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব সত্ত্বেও দেশটির স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হয়নি। ফলে বিদ্রোহীরা এই ক্ষমতার শূন্যতাকে কাজে লাগাচ্ছে।
সব দিক বিবেচনা করলে বলা যায়, মালির বর্তমান সংঘাত একমাত্রিক নয়। এটি কেবল সরকার পতনের লড়াই নয়, আবার শুধুমাত্র সম্পদ দখলের যুদ্ধও নয়। বরং এটি একাধিক উদ্দেশ্যের সমন্বয়—তুয়ারেগদের জন্য স্বায়ত্তশাসন, জিহাদি গোষ্ঠীর জন্য আদর্শিক শাসন এবং উভয়ের জন্যই কৌশলগত অঞ্চল ও সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা।
বিশ্লেষকদের মতে, মালির বিদ্রোহীরা সরাসরি পুরো রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের চেয়ে ‘দুর্বল রাষ্ট্রের ভেতরে শক্তিশালী প্রভাব’ গড়ে তুলতে বেশি আগ্রহী। এই প্রক্রিয়ায় প্রাকৃতিক সম্পদ একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু পরোক্ষ ভূমিকা পালন করছে।
