কেমন আছে আমাদের সেই ফেলে আসা ‘ভাড়া বাসাটি’?

নাদিয়া রহমান
নাদিয়া রহমান

দুটো শব্দ, ‘ভাড়া’ আর ‘বাসা’। শব্দ দুটো বলতেই আমাদের অনেকেরই অনেক রকমের স্মৃতি কিংবা বিষয় মনে আসে। কারো কাছে ভাড়া বাসা মানেই বিরক্তি, বাড়িওয়ালার অহেতুক নিয়মকানুন, আবার কারও কাছে নস্টালজিয়া। তবে যেরকমই হোক না কেন, আমরা যে বাসাটাতেই থাকি, সেটা আমাদের আপন নীড় হিসেবে গড়ে তুলি। ঘরটা গোছানোর সময় আমাদের মনে হয়, এটা আমাদেরই নিজস্ব ঠিকানা।

প্রতিদিন এই নগরীতে কত হাজার মানুষ পাড়ি জমায়। নিজ গণ্ডি, নিজের পরিচিত জায়গা ছেড়ে অনেকেরই ঠাঁই হয় এই ভাড়া বাসায়। মেস বা ছাত্র-ছাত্রী নিবাস না হয় কিছুটা ভিন্ন। কিন্তু চার কোণার এই ঘরটাকে পরিপাটি করে তোলার সময়ে এই স্থানটুকু আমাদের প্রত্যেকের কাছেই ‘আমাদেরই’ হয়ে ওঠে।

ভাবছিলাম, নিজের জীবনের ভাড়া বাসাগুলো নিয়ে। শুধু চার দেয়াল আর ছাদ নয়, বরং অস্থায়ী জীবনের স্থায়ী কিছু গল্পের নাম। নিজের বেড়ে ওঠার স্মৃতি, শহরের ভিড়ে, অচেনা রাস্তায়, অচেনা মানুষের ভিড়ে, এই ভাড়া বাসাগুলোই হয়ে ওঠে আমাদের ছোট ছোট পৃথিবী। এখানে আমরা বাস করি, আবার ছেড়েও যাই। কিন্তু রেখে যাই আমাদের গল্পগুলো, আমাদের সংগ্রাম, আনন্দ-বেদনার দিনলিপি।

ভাড়া বাসার একটা আলাদা গন্ধ থাকে, বিশেষ করে আমরা যারা পুরোনো সময়ের সেই দুই-তিনতলা বাড়িগুলোতে থেকে এসেছি। পুরোনো কাঠের আলমারি, কিছুটা স্যাঁতসেঁতে দেয়াল, লিফটের বদলে সিঁড়ি, রান্নাঘরের মশলার মিশ্রণ—সব মিলিয়ে এক ধরনের পরিচিত অচেনা অনুভূতি। এক বাসা থেকে আরেক বাসায় গেলে সেই বারান্দাটা বদলে যায়। সঙ্গে বদলায় মায়ের পছন্দের রান্নাঘরটা, দেয়ালে সেঁটে রাখা কত স্কেচ কিংবা পুরোনো কোনো বই। এত সব কি গাঁটটি বেঁধে ভ্যানে নেওয়া সম্ভব? তাও আবার সেই ভ্যান সারাক্ষণ পাহারা দিয়ে রাখো! মায়ের, বাবাদের যে কী হাল হতো! আর আমাদের, বাড়ির ছোটদের হতো মন খারাপ। পাড়ায় জুটিয়ে ফেলা বন্ধুমহল ছেড়ে যাচ্ছি, স্কুলটা হয়তো এবার একটু বেশিই দূরে, তাই ঘুম থেকে উঠতে হবে আরেকটু ভোরে।

আর এই ভাড়া বাসার জীবনটাও তো সহজ নয়। মাসের শেষে ভাড়ার চাপ, বাড়িওয়ালার হঠাৎ নোটিশ, পানির সমস্যা কিংবা বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা। যে বছর বাড়িওয়ালা ভাড়া বাড়ায় না, সে বছর ঘরে ঈদের আনন্দ শুরু হয়। এই আনন্দও তো কম নয়! এসবই এই জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। অনেক সময় মনে হয়, আমরা যেন নিজেদের ঘরে থেকেও পুরোপুরি ‘নিজের’ নই। দেয়ালে পেরেক মারার আগে ভাবতে হয়, রঙ বদলাতে চাইলে অনুমতি লাগে, এই সীমাবদ্ধতাগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এই বাসা আমাদের নয়, আমরা কেবল সাময়িক অতিথি।

কিন্তু কয়েক মাস যেতেই নতুন ভাড়া বাসাটিও হয়ে যায় আবার আমাদের নিজেদের। আসলে প্রতিটি বাসাই গল্প বহন করে। নানান মানুষের নানান গল্প। যে বা যারা ছেড়ে যায়, তাদের নিত্যদিনের গল্প। আবার আমাদের, নতুন ভাড়াটের নতুন গল্প। সব গল্প ধীরে ধীরে মিশে যায় এই শহরের যান্ত্রিকতার পেটে। কে মনে রাখে কার এত কথা! দিন শেষে সবাই তো নিজেদের জীবনস্রোতে ব্যস্ত। বাবারা ব্যস্ত জীবিকায়, মায়েরা সংসারে। আর আমরা ছোটরা ব্যস্ত স্কুলের পরীক্ষার রুটিনে। আজ এই পরীক্ষা তো কাল অই মাস্টারের বকা! দেখতে দেখতে এক সময় আমরাও তো বড় হই। এবার সময় আসে নিজেদের ডর্ম কিংবা নিজেদের বাসা গোছাবার! মা-বাবারা এবার স্বস্তি চান, নিজেদের সঞ্চয় করে রাখা অর্থ দিয়ে কেনা একটা আধুনিক অ্যাপার্টমেন্টে। আবার আরেকটি গল্পের অধ্যায়ের শুরু...

একবার বাসা বদলানোর দিন, দেখি পুরোনো ঘরটা একেবারে খালি। দেয়ালে কোনো ছবি নেই, বুকশেলফ নেই, শুধু ফাঁকা জায়গা আর প্রতিধ্বনি। তখন হঠাৎ করে বুঝতে পারলাম, এই ঘরটা আসলে কতটা ভরে ছিল আমাদের উপস্থিতিতে। আমরা চলে যাওয়ার পর ঘরটাও যেন কিছুটা বিমর্ষ হয়ে পড়লো!

এভাবে এ বাসা ও বাসা ঘুরতে ঘুরতে, শেষ পর্যন্ত হয়তো আমরা কোনোদিন ‘নিজের’ একটা ঠিকানা পাই। মায়েদের-বাবাদের আর বাক্স, গাঁটটি বাঁধতে হয় না। নতুন বাসাটায় যেয়ে ঘষে-মেজে পরিষ্কার করার কষ্টটাও করতে হবে না। আর এখন তো শহরে হয়েছে আধুনিক ফ্ল্যাট। যেখানে আবার নতুন নতুন সুবিধা—লিফট, জেনারেটর, টাইলস করা মেঝে ইত্যাদি। নিচের রাস্তার সঙ্গেও তেমন যোগাযোগ নেই।

সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটা বুঝি তখনই, যখন দেখি আর কোনো তরকারিওয়ালা বা ফেরিওয়ালা ভেতরে ঢুকতে পারে না। সিকিউরিটির গার্ডে সবকিছু আটকে যায়। ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে লাগলো দরজার সামনে সেই চেনা ডাক, ‘তরকারি লাগবে?’ কিংবা ‘পুরোনো লোহা, বোতল!’ ফেরিওয়ালাদের কণ্ঠস্বর যেন পাড়ার এক অবিচ্ছেদ্য সুর ছিল। তারা শুধু বিক্রেতা ছিল না, বরং আমাদের প্রতিদিনের জীবনের অংশ ছিল। অনেক সময় দরজার সামনে দাঁড়িয়ে মা গল্প করতেন, দরদাম হতো, আর আমরা পাশে দাঁড়িয়ে সব দেখতাম। এখন তো শহরে মাথায় টুকরি নিয়ে ডাক দিয়ে বেড়ানো তরকারিওয়ালা দেখা যায় না। এখন আছে ভ্যানগাড়িতে সাজানো সবজির পসরা।

নব্বই দশকের সঙ্গে একালের তুলনা চলবে না। এখনকার ফ্ল্যাট-বাড়ির ভাড়াটেরা আমাদের চেয়ে তুলনামূলক সচ্ছল, কিছুটা স্বাধীনও। আমরা শৈশব, কৈশোর ভাড়া বাসার বেশ কিছু নিয়ম কানুনে বেড়ে উঠলেও সেই বাসাগুলো ছিল আমাদের এক রকম আপন। বাড়িওয়ালা ঝামেলার হতে পারে, কিন্তু ঘরগুলোয় তো আমরাই থেকেছি। পরিষ্কার করার সময়েও কখনো কারো মনে হয়নি অন্যের ঘর পরিষ্কার করছি। দেয়ালে মোমরঙ, তুলি দিয়ে আকা একটা ছবি সেঁটে দেওয়ার সময় বাবার যে বকুনি খেতাম দেয়ালের রঙ নষ্ট হবে বলে, তখন তো মনে হয়নি, এই দেয়াল আমার ক্ষণস্থায়ী ঠিকানা!

তাই আমাদের মতোন সেলুলয়েডের পর্দার যুগের মানুষের কাছে ভাড়া বাসার গল্প মানেই এক টুকরো সময়, যা ধীরে ধীরে বদলে গেছে শহরের সঙ্গে। আমাদের সেই বাসায় হয়তো খুব ছোট একটা বারান্দা ছিল। তবু বিকেলের আলোটা এসে পড়ত ঠিকঠাক। পড়াশোনা শেষ করে আমরা প্রায়ই বারান্দায় দাঁড়াতাম, নিচে রাস্তায় তাকিয়ে থাকতাম। পাড়ার ছোটছোট ছেলে-মেয়েরা খেলছে, কেউ হাঁটছে, কেউ গল্প করছে—এই সাধারণ দৃশ্যগুলোই তখন দিনের সবচেয়ে প্রিয় অংশ ছিল।

এখন মনে হয়, আমরা শুধু একটা বাসা ছেড়ে আসিনি, বরং একটা সময়, একটা জীবনযাপন পেছনে ফেলে এসেছি। তাই প্রায়ই সেই পুরোনো গলিটার সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় মনে হয়, কেমন আছে বাসাটা? সেই বাসার দেয়ালে কি এখনো কেউ মোমরঙ, তুলি দিয়ে আঁকা ছবি টানিয়ে রাখে? সেই কিশোরটির মনও কি কিছুটা আমার কৈশোরকালীন সময়ের মতোই? সেই ঘরের বাবাও কি দিনশেষে রাতের খবর দেখতে সেই লিভিং রুমটায় বসেন? তাই আজ বাড়িওয়ালার ওপর সকল ক্ষোভ মুছে শুধু বাসাটার উদ্দেশেই বলি, ‘ভালো থাকুক সেই দেয়াল, বারান্দা আর লিভিং রুমটা, যেখানে পরিবারের সবাই একসঙ্গে বসে আমরা খাবার খেতাম’।