এক্সপ্লেইনার

ইরানের পাল্টা প্রস্তাবে কী আছে, কেন আটকে আছে শান্তি উদ্যোগ?

স্টার অনলাইন ডেস্ক

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ প্রস্তাবের জবাব দিয়েছে ইরান। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, বিদেশে জব্দ থাকা ইরানি সম্পদ মুক্ত করা এবং যুদ্ধ অবিলম্বে বন্ধের নিশ্চয়তা।

বার্তাসংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের মূল প্রস্তাবের বিস্তারিত এখনো সীমিত।

তবে বিভিন্ন গণমাধ্যম জানিয়েছে, এতে যুদ্ধ বন্ধ এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার কাঠামো নির্ধারণে এক পাতার একটি সমঝোতা স্মারক রয়েছে।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সরাসরি ইরানের জবাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বন্ধের উদ্যোগ এখন অচলাবস্থায় পড়েছে।

পারমাণবিক ইস্যু

সোমবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, তাদের জবাবে লেবাননসহ পুরো অঞ্চলে চলমান যুদ্ধ অবিলম্বে বন্ধের আহ্বান জানানো হয়েছে। একইসঙ্গে ইরানি বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের দাবিও জানানো হয়েছে।

মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, দীর্ঘদিনের মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় বিদেশে জব্দ থাকা ইরানি সম্পদ মুক্ত করার দাবি তুলেছে তেহরান।

দ্য ওয়ালস্ট্রিট জার্নালে উদ্ধৃত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ইরান আগামী ৩০ দিনের মধ্যে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনায় বসার প্রস্তাব দিয়েছে।

পত্রিকাটি জানিয়েছে, ইরান তাদের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের একটি অংশ হালকা করতে চায়। বাকি অংশ তৃতীয় কোনো দেশে স্থানান্তরের প্রস্তাবও দিয়েছে তারা।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম স্থগিত করতে রাজি হলেও সেটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত ২০ বছরের চেয়ে কম সময়ের জন্য। তবে তেহরান তাদের পারমাণবিক স্থাপনা ভেঙে ফেলার প্রস্তাব নাকচ করেছে।

গত জুনে ১২ দিনের যুদ্ধে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। ট্রাম্প দাবি করেছেন, ওই হামলায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ হয়ে গেছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দাবি, ইরানের কাছে এখনো এমন সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে যা বোমা তৈরিতে ব্যবহার করা যেতে পারে। তাই সেগুলো ইরান থেকে সরিয়ে নিতে হবে।

জার্নাল বলেছে, পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ এবং উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দাবিগুলো পূরণ করতে পারেনি ইরানের জবাব।

রোববার ট্রাম্প ইরানের জবাবকে ‘পুরোপুরি অগ্রহণযোগ্য’ বলে মন্তব্য করেন।

এদিকে ইরানের তাসনিম নিউজ এজেন্সি নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, বিশেষ করে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বিষয়ে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন ‘বাস্তবতার প্রতিফলন নয়’।

হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যত

জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর হরমুজ প্রণালিতে সামুদ্রিক চলাচল বন্ধ করার পর এখন বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য ধীরে ধীরে প্রণালিটি পুনরায় খুলে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে ইরান।

এর বিনিময়ে ১৩ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া ইরানি বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ ধাপে ধাপে শিথিল করার প্রস্তাবও দিয়েছে তেহরান।

শান্তিকালীন সময়ে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়।

ইরান এই প্রণালি অতিক্রমকারী জাহাজ থেকে টোল আদায়ের জন্য একটি অর্থপ্রদানের ব্যবস্থাও চালু করছে বলে এএফপির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই বিধিনিষেধের কারণে গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের দাম বেড়েছে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।

গত মাসে ওয়াশিংটন পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ইরানি জাহাজ চলাচলের ওপর নিজস্ব অবরোধ আরোপ করে। এর লক্ষ্য ছিল দেশটির তেল রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়া।

তাসনিম জানিয়েছে, ইরানের জবাবে ৩০ দিনের মধ্যে ইরানি তেল বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং বিদেশে জব্দ থাকা ইরানি সম্পদ মুক্ত করার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

তবে এর বিনিময়ে ইরান কী দেবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানায়নি সংস্থাটি। শুধু বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ তেহরানই চালিয়ে যাবে।

‘হ্যাঁ বা না’ নয়, অবস্থানের ব্যাখ্যা

আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আব্বাস আসলানি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবে ইরানের প্রতিক্রিয়া ‘হ্যাঁ বা না’ ধরনের কোনো জবাব নয়। বরং এটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত খসড়া নিয়ে তেহরানের অবস্থানের ব্যাখ্যা ও স্পষ্টীকরণ।

সেন্টার ফর মিডল ইস্ট স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের এই জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো বলেন, ‘দুই পক্ষের মধ্যে পারমাণবিক ইস্যুই সবচেয়ে জটিল বিষয় হয়ে রয়েছে, যদিও এ ক্ষেত্রে ইরান তুলনামূলকভাবে নমনীয় অবস্থান দেখিয়েছে।’

তার ভাষ্য, তেহরান স্বচ্ছতা ও আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) পরিদর্শনের বিষয়ে উন্মুক্ত মনোভাব দেখিয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘প্রাথমিক পর্যায়ে যদি তারা কোনো ধরনের শান্তিচুক্তিতে পৌঁছাতে পারে, তাহলে তা ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করতে পারে এবং একধরনের আস্থা তৈরির পদক্ষেপ হিসেবেও কাজ করতে পারে।’

তবে তার সতর্কতা, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানকে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রপ্তানির শর্ত দেয় বা দীর্ঘ সময়ের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম স্থগিত রাখতে বলে, তাহলে কোনো চুক্তিতে পৌঁছানো অসম্ভব হয়ে পড়তে পারে।