চীনের পথে ট্রাম্প, শির সঙ্গে বৈঠক ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের উদ্বেগ কেন?
ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের কোনো দফারফা না করেই তিন দিনের চীন সফরে যাচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মঙ্গলবার এয়ার ফোর্স ওয়ানে করে বেইজিংয়ের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন তিনি। প্রায় এক দশকের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রেসিডেন্টের এটাই প্রথম চীন সফর বলে জানিয়েছে এএফপি।
বিশ্ব অর্থনীতিতে অস্থিরতার মধ্যেই বেইজিংয়ে মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন দুই প্রভাবশালী নেতা ডোনাল্ড ট্রাম্প ও শি জিনপিং। বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার তারা বৈঠক করবেন, যেখানে মূলত বাণিজ্য ইস্যু নিয়েই আলোচনা হবে। এর পাশাপাশি তাইওয়ান ও ইরান নিয়ে সম্ভাব্য উত্তেজনার বিষয়গুলোও আলোচনায় আসতে পারে।
বেইজিংয়ের উদ্দেশে রওনা দেওয়ার আগে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ শেষ করতে চীনের সাহায্যের প্রয়োজন নেই। তবে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে আমি এ বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনা করব।
ইরানের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক অংশীদার চীন, যারা দেশটির তেলের বড় অংশ কিনে থাকে এবং একইসঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সমর্থক হিসেবেও ভূমিকা রাখে।
তবে ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেছেন, প্রায় আড়াই মাস আগে শুরু হওয়া এই সংঘাতের সমাধান খুঁজতে শি জিনপিংয়ের সাহায্যের প্রয়োজন আছে বলে তিনি মনে করেন না।
তিনি বলেন, ‘আমাদের অনেক বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে। তবে সত্যি বলতে, ইরান তাদের মধ্যে একটি নয়, কারণ আমরা ইরানকে খুবই নিয়ন্ত্রণে রেখেছি।’
ট্রাম্প আরও বলেন, ‘আমরা হয় একটি চুক্তি করব, নয়তো তারা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাবে।’
এদিকে চীন ইরানকে অস্ত্র সহায়তা দিচ্ছে এবং নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা তেল কিনছে—এমন প্রতিবেদন সত্ত্বেও ট্রাম্প বলেন, শি জিনপিং ‘তুলনামূলকভাবে ভালো আচরণ করেছেন।’
তিনি বলেন, ‘ওই অঞ্চল থেকেই তারা অনেক তেল পায়। আমাদের কোনো সমস্যা হয়নি। আর তিনি আমার বন্ধু, আমরা ভালোভাবে চলি।’
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর উদ্বেগ কেন?
অনেক বিশ্লেষক এই বৈঠককে ‘ট্রানজেকশনাল’ বা লেনদেনের বৈঠক হিসেবে দেখলেও একে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা বাড়ছে। দুই পরাশক্তির মধ্যে চুক্তির বলি হতে হয় কিনা এ নিয়ে অনেকে চিন্তিত। সিএনএন, সিএনবিসি ও ওয়াশিংটন টাইমসের বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনেও এর কিছুটা উঠে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসি’র চীনবিষয়ক কর্মসূচির জ্যেষ্ঠ পরিচালক ক্রেইগ সিঙ্গেলটন বলেন, ‘ইরান যুদ্ধ এমন এক অস্থির বহিরাগত চাপ তৈরি করেছে, যা এই বৈঠককে আরও জটিল করে তুলেছে।’
হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার কারণে পারস্য উপসাগরে আটকে আছে বহু দেশের অসংখ্য জাহাজ। দুই মাস ধরে চলা এ অচলাবস্থা স্বাভাবিক করার উপায় খুঁজছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো।
হরমুজ প্রণালি খোলা রাখা ছাড়া উপসাগরীয় দেশগুলোর সামনে কার্যত কোনো কার্যকর বিকল্প নেই। কারণ সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার ও ইরাকের বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস রপ্তানি এই প্রণালির ওপর নির্ভরশীল।
অপরদিকে, ইরানের তেলের প্রায় ৮০ শতাংশের ক্রেতা চীন। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো চীনের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদারদের মধ্যে রয়েছে। ফলে এ অঞ্চলে যেকোনো অস্থিরতা সরাসরি চীনের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলছে।
ট্রাম্পও হরমুজ প্রণালি খোলার জন্য বৈশ্বিক চাপের মুখে রয়েছেন। তাই ইরান যুদ্ধ বন্ধ ও হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার দিকে দুই শীর্ষ নেতারই মনোযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে বিশ্লেষক ক্রেইগ সিঙ্গেলটন ওয়াশিংটন টাইমসকে বলেন, ‘স্বল্পমেয়াদী ধাক্কা সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে বেইজিং হয়তো অনেক দেশের তুলনায় ভালো অবস্থানে আছে। তবুও চীন চায় হরমুজ প্রণালি আবার খুলে যাক এবং জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হোক। কারণ চীনের রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতি নির্ভর করে স্থিতিশীল জ্বালানি, পরিবহন ও বীমা ব্যবস্থার ওপর। সংঘাত যত দীর্ঘ হবে, চীনের বাণিজ্য কাঠামোয় অনিশ্চয়তার খরচ তত বাড়বে।’
বেইজিং এমন একটি শক্তি, যার ইরানের ওপর বাস্তব প্রভাব রয়েছে। আঞ্চলিক শক্তিগুলো মনে করছে, চীন এখন নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারে।
ইরান হরমুজ প্রণালিতে যৌথ নৌ টহলের প্রস্তাব দিয়েছে, যেখানে চীনা মুদ্রা ইউয়ান ব্যবহারের কথাও উঠেছে। এটি যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর ব্যবস্থার বিকল্প কাঠামোর ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
যেসব বিষয় নিয়ে উদ্বেগ
সংবাদমাধ্যম সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য হলো চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং যেন ইরানের ওপর তার প্রভাব ব্যবহার করে তেহরানকে যুদ্ধ বন্ধ করতে বা অন্তত হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে চাপ দেন।
তবে মধ্যপ্রাচ্যের অনেকেই সন্দিহান, চীন সত্যিই ইরানের ওপর চাপ প্রয়োগ করবে কিনা। কারণ এর আগে হরমুজ চালুর প্রচেষ্টায় যুক্তরাষ্ট্রের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছে বেইজিং।
এ ছাড়া, সম্প্রতি হরমুজ প্রণালিতে চীনা মালিকানাধীন একটি তেলবাহী জাহাজে আগুন দেয় ইরান। এ ঘটনায় দুই দেশের সম্পর্কে কিছু টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে বলেও মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
তবে ট্রাম্পের চীন সফরের আগেই গত সপ্তাহে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিকে আমন্ত্রণ জানায় বেইজিং। বিশ্লেষকদের মতে, এর মাধ্যমে চীন নিজেকে সংঘাত নিরসনের প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে।
মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের চায়না পাওয়ার প্রজেক্টের পরিচালক বনি লিন বলেন, ‘ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের আগে চীন যে ইরানের সঙ্গে বৈঠক করছে, সেটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ।’
তিনি আরও বলেন, ‘এটি একদিকে দেখায় যে ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনার আগে চীন ইরানকে সমর্থন দিচ্ছে। অন্যদিকে এটি চীনকে শক্তিশালী অবস্থানে রাখছে, কারণ এতে তারা বুঝতে পারছে ইরান কী চায় এবং কী করতে রাজি নয়।’
যুদ্ধের চাপ সামলাতে ও টিকে থাকার কৌশল হিসেবে ইরানও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করতে চাইছে বলে মনে করেন তিনি।
চীনের অতিরিক্ত ঝুঁকি না নেওয়ার নীতি
সংঘাতে সরাসরি জড়িয়ে পড়তে চায় না চীন। ‘অতিরিক্ত ঝুঁকি না নেওয়ার’ নীতি অনুসরণ করছে দেশটি।
বিশ্লেষকদের মতে, চীন এমন অবস্থান নিয়েছে যেখানে তারা যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি সমস্যার সমাধানে সরাসরি ঝাঁপিয়ে পড়তে আগ্রহী নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রে বেইজিং হয়তো চাইছে, ইরান সংকটে যুক্তরাষ্ট্র আরও দীর্ঘ সময় জড়িয়ে থাকুক।
আর এতেই উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তা প্রশ্নে নতুন আতঙ্কে রয়েছে। তারা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র আগের মতো সক্রিয় থাকবে কিনা। কারণ সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন নৌবাহিনী প্রণালিটি সচল রাখতে নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্প হয়তো চীনের কাছ থেকে অর্থনৈতিক সুবিধা আদায়ের বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি সামরিক পরিকল্পনা বদলে দিতে পারেন—এমন আশঙ্কাও রয়েছে।
সব মিলিয়ে ট্রাম্প-শির বৈঠককে একটি সম্ভাব্য মোড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো। হয় ইরান যুদ্ধের কূটনৈতিক সমাধানের পথ তৈরি হবে, নয়তো এটা স্পষ্ট হবে যে চীন এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রকে দীর্ঘ সংকটে আটকে থাকতেই স্বচ্ছন্দ বোধ করছে।
বিশ্লেষক বনি লিনের মতে, চীন সফরে ট্রাম্পের অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার আছে, ইরান ইস্যুও আছে, আবার তাইওয়ান প্রসঙ্গও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই তিনটি বিষয় একটি অন্যটির বিনিময়ে সহজে আদান-প্রদানযোগ্য নয়।



