এক্সপ্লেইনার

শি জিনপিংয়ের বক্তব্যে ‘থুসিডাইডিস ট্র্যাপ’ প্রসঙ্গ, এর মানে কী

রকিবুল হক
রকিবুল হক

চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে গ্রেট হল অব দ্য পিপলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের শুরুতে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং তার বক্তব্যে ‘থুসিডাইডিস ট্র্যাপ’ বা থুসিডাইডিস ফাঁদের কথা উল্লেখ করেন।

শি জিনপিং বলেন, সারা বিশ্ব আমাদের এই বৈঠকের দিকে তাকিয়ে আছে। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে এমন এক পরিবর্তন ত্বরান্বিত হচ্ছে, যা গত এক শতাব্দীতে দেখা যায়নি এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি এখন অত্যন্ত পরিবর্তনশীল ও উত্তাল।

তিনি বলেন, বিশ্ব আজ এক নতুন সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে। চীন ও যুক্তরাষ্ট্র কি থুসিডাইডিস ট্র্যাপ কাটিয়ে সম্পর্কের এক নতুন কাঠামো তৈরি করতে পারবে? আমরা কি সম্মিলিতভাবে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করে বিশ্বে আরও স্থিতিশীলতা আনতে পারব?

তিনি আরও বলেন, এই প্রশ্নগুলো ইতিহাস, বিশ্ব এবং সাধারণ মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো আমাদের সময়ের এমন কিছু প্রশ্ন, যার উত্তর বড় দেশগুলোর নেতা হিসেবে আপনার এবং আমার দেওয়া প্রয়োজন।

আলোচনায় শি জিনপিং ও ডোনাল্ড ট্রাম্প

শি বলেন, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র—উভয় দেশই সহযোগিতা থেকে লাভবান হয় এবং সংঘাতের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী না হয়ে বরং অংশীদার হওয়া উচিত। আমাদের উচিত একে অপরের সাফল্য ও সমৃদ্ধিতে সহায়তা করা এবং এই নতুন যুগে বড় দেশগুলোর একে অপরের সঙ্গে মিলেমিশে চলার সঠিক পথ খুঁজে বের করা।

‘থুসিডাইডিস ট্র্যাপ’ আসলে কী?

চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনায় এখন ‘থুসিডাইডিস ট্র্যাপ’ বা ‘থুসিডাইডিস ফাঁদ’ কথাটি খুব বেশি শোনা যাচ্ছে, বিশেষ করে শি জিনপিং ক্ষমতার শীর্ষে ওঠার পর থেকে।

সহজ কথায় বলতে গেলে ‘থুসিডাইডিস ট্র্যাপ’ হলো একটি ভয়ের পরিস্থিতি। যখন পুরনো কোনো শক্তিশালী দেশ দেখে যে নতুন আরেকটি দেশ দ্রুত উন্নতি করে সক্ষমতায় বা শক্তিতে তাদের সমান হয়ে যাচ্ছে, তখন পুরনো দেশটি ভয় পেয়ে যায়। এই ভয় থেকে দুই দেশের মধ্যে সংঘাত বা যুদ্ধ লেগে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গ্রাহাম অ্যালিসন এই শব্দবন্ধটি জনপ্রিয় করেছেন। তিনি চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনা বোঝাতে এটি ব্যবহার করেন। অ্যালিসন এই ধারণাটি নেন দুই হাজার বছর আগের গ্রিক ইতিহাসবিদ থুসিডাইডিসের কাছ থেকে, যিনি এথেন্স ও স্পার্টার মধ্যে হওয়া যুদ্ধের কাহিনী লিখেছিলেন।

ওই যুদ্ধের অনেক কারণ থাকলেও থুসিডাইডিস মূল বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তিনি মূলত দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্যের পরিবর্তনের ফলে তৈরি হওয়া চাপের কথা বলেছিলেন। 

থুসিডাইডিস এখানে দুটি প্রধান বিষয় চিহ্নিত করেন—একদিকে উদীয়মান শক্তির ক্রমবর্ধমান অধিকারবোধ ও গুরুত্ব পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা, আর অন্যদিকে প্রতিষ্ঠিত শক্তির মনে জন্ম নেওয়া ভয়, নিরাপত্তাহীনতা এবং বর্তমান অবস্থা টিকিয়ে রাখার জেদ।

খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে এথেন্স প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে দর্শন, ইতিহাস, নাটক, স্থাপত্য, গণতন্ত্র ও নৌ-শক্তিতে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছিল। এতে আগে থেকেই শক্তিশালী নগররাজ্য স্পার্টা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল। 

 অস্ট্রিয়ান পার্লামেন্ট বিল্ডিংয়ের সামনে থুসিডাইডিসের ভাস্কর্য
অস্ট্রিয়ান পার্লামেন্ট বিল্ডিংয়ের সামনে থুসিডাইডিসের ভাস্কর্য। ছবি: সংগৃহীত

থুসিডাইডিসের মতে, এথেন্সের অবস্থান ছিল যুক্তিসঙ্গত। ক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তাদের আত্মবিশ্বাস এবং অতীতে তাদের সঙ্গে ঘটা অন্যায়ের বিরুদ্ধে সচেতনতাও বেড়েছিল। তারা চেয়েছিল পুরোনো নিয়ম বদলে নতুন ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি হোক। অন্যদিকে স্পার্টার কাছে এথেন্সের এই উত্থান ছিল ভয়ের। স্পার্টার শাসকরা মনে করেছিল, এথেন্স তাদের তৈরি করা ব্যবস্থাকেই ধ্বংস করতে চাইছে—যে ব্যবস্থার সুযোগ নিয়েই এথেন্স বড় হয়েছে।

ক্ষমতার ভারসাম্য ধরে রাখতে এথেন্স ও স্পার্টা তখন অন্যান্য নগররাষ্ট্রের সঙ্গে জোটবদ্ধ হতে শুরু করে। কিন্তু এই জোটই পরে তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। 

যখন দুই ছোট নগররাষ্ট্র করিন্থ ও করসিরার মধ্যে বিরোধ দেখা দিল, তখন স্পার্টা করিন্থের পক্ষে দাঁড়াতে বাধ্য হলো এবং এথেন্সও তার মিত্রকে বাঁচাতে এগিয়ে এলো। এর ফলে শুরু হলো পেলোপনেশিয়ান যুদ্ধ। এই যুদ্ধ চলে ৩০ বছর ধরে।

যখন যুদ্ধ শেষ হলো, স্পার্টা নামে মাত্র জিতলেও উভয় রাষ্ট্রই ততদিনে প্রায় ধ্বংস হয়ে যায়। এই যুদ্ধের ফলে পুরো গ্রিস অঞ্চল পারস্যের তুলনায় দুর্বল হয়ে পড়ে।

এখনকার দিনে গবেষকরা ‘থুসিডাইডিস ট্র্যাপ’-এর উদাহরণটি ব্যবহার করেন এটা বোঝাতে যে, দীর্ঘদিন ধরে শক্তিশালী অবস্থানে থাকা আমেরিকার সামনে চীন যেভাবে মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে, তাতেও একই রকম পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

ইতিহাসবিদ অ্যালিসন উল্লেখ করেন, ১৫ থেকে ২০ শতক পর্যন্ত ইউরোপীয় শক্তিগুলোর মধ্যে আধিপত্য নিয়ে লড়াইয়ের সময় এই ‘থুসিডাইডিস ট্র্যাপ’ বা ফাঁদটি বারবার কার্যকর হয়েছে। সে সময় উদীয়মান শক্তি এবং পুরোনো শক্তিগুলোর মধ্যে বহুবার যুদ্ধ বেধেছিল।

গত ৫০০ বছরের ১৬টি ঘটনার মধ্যে ১২টিতেই উদীয়মান শক্তির উত্থান ও প্রতিষ্ঠিত শক্তির ভয়ের কারণে যুদ্ধ বেধেছিল। ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এশিয়া ও ইউরোপের আধিপত্যের লড়াইগুলো আসলে একই গল্পের ভিন্ন ভিন্ন সংস্করণ মাত্র।

‘থুসিডাইডিস ট্র্যাপ’— তত্ত্বের প্রতি শি জিনপিংয়ের আগ্রহ প্রথম নজরে আসে ২০১৫ সালে। সে বছর যুক্তরাষ্ট্র সফরে গিয়ে এক ভাষণে তিনি এই প্রসঙ্গটি উল্লেখ করেছিলেন। কারণ অনেক কৌশলগত বিশ্লেষক মনে করেন, এথেন্স ও স্পার্টার ক্ষেত্রে যা সত্য ছিল, বর্তমানের চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও আজ তা-ই ঘটছে।

শি জিনপিং ও ডোনাল্ড ট্রাম্প
অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। ছবি: এএফপি

শি জিনপিংয়ের মন্তব্যের তাৎপর্য

শি জিনপিং এমন এক সময়ে ‘থুসিডাইডিস ট্র্যাপ’— এর কথা নতুন করে বললেন, যখন তাইওয়ান ইস্যু, বাণিজ্য শুল্ক, সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা, ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক প্রতিযোগিতা এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক করার মতো একাধিক বিষয়ে বেইজিং ও ওয়াশিংটনের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে।

বিশ্লেষকরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন যে, আমেরিকা ও চীনের এই সম্পর্ক দিন দিন ‘থুসিডাইডিস ট্র্যাপ’ বা দুই শক্তির লড়াইয়ের মতোই হয়ে উঠছে। বিশ্বজুড়ে এখন এই আশঙ্কা বাড়ছে যে, দুই দেশের মধ্যে যেকোনো ভুল পদক্ষেপ বিশ্ব অর্থনীতি এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে ওলটপালট করে দিতে পারে। 
ট্রাম্পের এবারের বেইজিং সফরের প্রতীকী গুরুত্বও অনেক। ২০১৭ সালে তার প্রথম মেয়াদে যখন তিনি চীন সফর করেছিলেন, তখন জাঁকজমকপূর্ণ রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান আর ব্যক্তিগত সুসম্পর্কের ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরে বাণিজ্যযুদ্ধ এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসের কারণে দুই দেশের সম্পর্কের দ্রুত অবনতি ঘটে। 

আজ যখন শি জিনপিং ট্রাম্পকে থুসিডাইডিস ট্র্যাপ এড়ানোর আহ্বান জানালেন, তিনি মূলত মার্কিন প্রেসিডেন্টকে বোঝাতে চেয়েছেন যেন তিনি চীনের উত্থান নিয়ে শঙ্কিত না হন।

শি জিনপিং এই শব্দবন্ধের মাধ্যমে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে এই বলে সতর্ক করলেন যেন ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি না হয়। অর্থাৎ, এথেন্স ও স্পার্টার মতো ধ্বংস না হয়ে যেন চীন ও যুক্তরাষ্ট্র সহাবস্থান করতে পারে।

এর মধ্যেই আবার তাইওয়ান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রকে কড়া বার্তা দিয়েছেন শি জিনপিং। ডোনাল্ড ট্রাম্পকে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, তাইওয়ান ইস্যু ‘ভুলভাবে মোকাবিলা’ করা হলে তা দুই পরাশক্তিকে সরাসরি সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি বলেন, ‘তাইওয়ান প্রশ্নই চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।’

শি আরও বলেন, ‘এটি ভুলভাবে পরিচালিত হলে দুই দেশ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়তে পারে, এমনকি সরাসরি যুদ্ধ লেগে যেতে পারে। এতে দুই দেশই বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে পড়ে যাবে।’