জাপান-বাংলাদেশ যৌথ উদ্যোগে ১০০০ শয্যার ক্যানসার হাসপাতাল

জাগরণ চাকমা

বাংলাদেশের আইচি মেডিকেল গ্রুপের অংশীদারিত্বে জাপানি সংস্থা শিপ হেলথ কেয়ার হোল্ডিংস দুই হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে এক হাজার শয্যা বিশিষ্ট ডেডিকেটেড ক্যানসার হাসপাতাল ও গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন করবে ঢাকায়।

হাসপাতালের জন্য ঢাকার পূর্বাচলে দুই শ কোটি টাকা মূল্যের ছয় বিঘা জমি দেবে আইচি এবং বাকি বিনিয়োগ আসবে ওসাকা ভিত্তিক শিপ হেলথ কেয়ার থেকে।

জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা জাইকা এই প্রকল্পের একটি অংশ। জাপান ক্যানসার হাসপাতাল ও গবেষণা ইনস্টিটিউট নামের এই হাসপাতালে বিশ্বমানের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করবে প্রতিষ্ঠানটি।

আইচি মেডিকেল গ্রুপের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যে অবকাঠামো নির্মাণের জন্য রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নকশার অনুমোদন পেয়েছি।’

এটি হতে যাচ্ছে বাংলাদেশে যৌথ উদ্যোগে নির্মিত দ্বিতীয় হাসপাতাল।

শিপ হেলথ কেয়ার হোল্ডিংস এবং আইচি মেডিকেল গ্রুপ এর আগে জাইকার সহযোগিতায় আরও একটি হাসপাতাল তৈরি করেছে। যৌথ উদ্যোগে আশুলিয়ার জাপান ইস্ট-ওয়েস্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালটি তৈরি করতে খরচ হয়েছিল ৫৬০ কোটি টাকা।

এটিই ছিল জাপানের বাইরে শিপ হেলথ কেয়ারের প্রথম হাসপাতাল। ছয় শ শয্যা বিশিষ্ট মাল্টি-স্পেশালিটি হাসপাতালটির উদ্বোধন করোনাভাইরাস মহামারির কারণে পিছিয়ে যায়। আশা করা হচ্ছে আগামী বছরের জানুয়ারিতে হাসপাতালটির পুরোপুরি কার্যক্রম শুরু হবে।

গত জুনে এই হাসপাতালে দুই শ শয্যার করোনা ইউনিট চালু করা হয়েছে।

এই হাসপাতালটি যৌথ উদ্যোগে চালু করার জন্য চুক্তি সই করা হয়েছি ২০১৬ সালে।

ক্যানসার হাসপাতালের বিষয়ে অধ্যাপক মো. মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ‘আমরা এই বছরের জুলাইয়ে নতুন হাসপাতালের নির্মাণকাজ শুরু করতে পারতাম। তবে, করোনাভাইরাসের কারণে জাপানি বিশেষজ্ঞরা তাদের দেশে ফিরে যাওয়ায় দেরি হয়েছে।’

পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে থাকায় তারা বাংলাদেশে আসতে শুরু করেছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা জানুয়ারিতে নির্মাণকাজ শুরু করতে পারব বলে আশা করছি। আগামী ৩৬ মাসের মধ্যে একটি ল্যাব, চিকিৎসা-বর্জ্য পরিচ্ছন্ন করার প্ল্যান্ট এবং নিবিড় পরিচর্যা ইউনিটসহ সব নির্মাণ সম্পন্ন হবে বলে আশা করছি। আমরা ২০২৪ সালের শুরুতেই হাসপাতালের সকল কার্যক্রম শুরু করতে পারব বলে আশা করছি।’

তিনি জানান, শিপ আইচি মেডিকেল সার্ভিসেসের যৌথ উদ্যোগে নির্মিত এই হাসপাতালটি ৪০ তলার অনুমতি পেলেও ৩০ তলা পর্যন্ত নির্মিত হবে।

এই হাসপাতালে অন্তত দুই হাজার ৫০০ জনের কর্মসংস্থান হবে। তাদের মধ্যে অ্যানকোলজিস্ট এবং নার্সসহ ২০০ জন জাপানি বিশেষায়িত চিকিৎসা পেশাদার থাকবেন।

তিনি বলেন, ‘হাসপাতালের ১০ শতাংশ শয্যা দরিদ্রদের জন্য থাকবে। তারা বিনামূল্যে চিকিৎসা পাবেন।’

এই যৌথ উদ্যোগে জাপানি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও নার্সদের কাজের অনুমতি সহজ করার জন্য সরকারকে অনুরোধ জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

হাসপাতালটিতে ডায়াগনস্টিক কাজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। এটি রোগীদের প্রোটন থেরাপি দেবে, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল।

অধ্যাপক মোয়াজ্জেম বলেন, ‘এই থেরাপির মাধ্যমে ক্যানসার কোষ পুরোপুরি নিঃশেষ করা সম্ভব। দক্ষিণ এশিয়ায় এটি এর আগে কখনো ব্যবহৃত হয়নি।’

ক্যানসারের চিকিৎসায় প্রতি বছর প্রায় চার থেকে পাঁচ লাখ রোগী বিদেশে যান। এই রোগীদের জন্য ঝামেলামুক্ত সহজ চিকিৎসাসেবা এই হাসপাতালেই করা সম্ভব হবে বলে যোগ করেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশেই জাপানি মানের ক্যানসারের চিকিৎসার সুবিধা দিতে চাই।’

১৯৯৫ সালে যাত্রা শুরু করে আইচি মেডিকেল গ্রুপ। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি মেডিকেল খাতে গবেষণা ও উন্নয়ন নিয়ে কাজ করার পাশাপাশি চিকিৎসা, ডেন্টাল ও নার্সিং শিক্ষার সঙ্গেও জড়িত।

জাপানে শিপ হেলথ কেয়ারের তিন শ হাসপাতাল রয়েছে এবং এই গোষ্ঠীর বিশ্বব্যাপী খ্যাতিমান হাসপাতালগুলোর সঙ্গে ভালো যোগাযোগ রয়েছে।

শিপ আইচি মেডিকেল তাদের সেবার মান উন্নয়নের জন্য থাইল্যান্ডের মাহিডল বিশ্ববিদ্যালয়, জাপানের নাগোয়া বিশ্ববিদ্যালয়, ক্যানসার ও হার্টের সমস্যার জন্য জাপানের ওসাকা আন্তর্জাতিক হাসপাতাল এবং ব্যাংককের ব্যাংপাকক মেডিকেল গ্রুপের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে চুক্তি করেছে।

অধ্যাপক মোয়াজ্জেম বলেন, ‘জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবসা করার জন্য নয়, মানসম্পন্ন চিকিৎসা দিতে এসেছে। কারণ বাংলাদেশের ক্যানসার রোগীরা ডেডিকেটেড ক্যানসার হাসপাতালের অভাবে মানসম্পন্ন চিকিৎসাসেবা পান না।’

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, প্রতি বছর বাংলাদেশে প্রায় দেড় লাখ মানুষ ক্যানসারে আক্রান্ত হন।

অধ্যাপক মোয়াজ্জেম জানান, দেশে ক্যানসার আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দিনকে দিন বাড়ছে।

বেসরকারি সংস্থা ক্যানসার অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ জানিয়েছে, দেশে ২২টি বেসরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি সরকারি ১৫টি হাসপাতাল ও ক্যানসার ইউনিট রয়েছে।