বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা পুনর্গঠন: অস্ট্রেলিয়ার মডেল থেকে কী শেখা যায়?

সুমন রেজা
সুমন রেজা

শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। অথচ বাংলাদেশে এখনো শিক্ষা এমন একটি খাত, যেখানে বারবার মুখরোচক নানা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবে সবচেয়ে কম রূপান্তর ঘটেছে। প্রতি বছর বাজেট এলেই আশা, সংস্কার ও বিনিয়োগের সেই চেনা বুলি শোনা যায়। কিন্তু, বাস্তবে এর ফল যা আসে, তা একটি তরুণ, উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও জনবহুল দেশের চাহিদার তুলনায় নিতান্তই অপ্রতুল।

বাংলাদেশ যদি কেবল টিকে থাকার মানসিকতা থেকে বের হয়ে টেকসই সমৃদ্ধির দিকে এগোতে চায়, তাহলে শিক্ষাকে আর দশটা সাধারণ খরচের খাত হিসেবে না দেখে জাতীয় উন্নয়নের অগ্রাধিকার হিসেবে দেখতে হবে। যদিও বর্তমান বিএনপি সরকার শিক্ষার ওপর জোর দিচ্ছে, তবুও এতে আরও সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজন রয়েছে।

আসলে মূল সমস্যাটি কেবল বাজেটের স্বল্পতা নয়, বরং ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, বাংলাদেশ স্কুলে ভর্তি বৃদ্ধি, লিঙ্গ সমতা ও শিক্ষার সুযোগ প্রসারে দারুণ অগ্রগতি অর্জন করেছে। কিন্তু, শিক্ষার গুণগত মান, সমতা ও প্রাসঙ্গিকতা এখনো বড় উদ্বেগের বিষয়। বহু শিক্ষার্থী বছরের পর বছর পড়াশোনা শেষ করার পরও পর্যাপ্ত পঠন, লিখন, গাণিতিক, ডিজিটাল বা সমস্যা সমাধানের কিংবা প্রায়োগিক দক্ষতা অর্জন করতে পারছেন না। এর অর্থ হলো, এই ব্যবস্থা যোগ্যতার চেয়ে সনদ তৈরিতে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে।

বাজেট কেন অপ্রতুল থেকে যায়

২০২৬–২৭ অর্থবছরে শিক্ষার প্রস্তাবিত বরাদ্দ একলাফে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকায়, যা জিডিপির প্রায় ২ শতাংশ। অথচ, ২০২৫–২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে তা ছিল জিডিপির ১ দশমিক ৩৯ শতাংশ।

শিক্ষায় বাজেট বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে, ভালো কথা। এই সংখ্যা বাড়ানোর জন্য নীতি-নির্ধারকরা প্রশংসার দাবিদার। কিন্তু আন্তর্জাতিক বিচারে একটি দেশে প্রতিযোগিতামূলক জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তুলতে, গবেষণার মান উন্নত করতে এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল শ্রমবাজারের জন্য লাখো তরুণকে প্রস্তুত করতে শিক্ষায় জিডিপির ২ শতাংশ বরাদ্দ অতি সামান্য।

আরও গভীর সমস্যা হলো, অর্থ বরাদ্দ হলেও তা প্রায়শই বাস্তবে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে না। বরাদ্দের একটি বড় অংশ চলে যায় বেতন, প্রশাসনিক ব্যয়, বিচ্ছিন্ন নানা প্রকল্প এবং গতানুগতিক পদ্ধতির রক্ষণাবেক্ষণে। ফলে, শিক্ষকদের উন্নয়ন, গবেষণা, ডিজিটাল শিক্ষা, ল্যাবরেটরি, লাইব্রেরি ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসনের জন্য খুব কমই অবশিষ্ট থাকে। অন্য কথায়, সমস্যাটি কেবল কতটা খরচ করা হচ্ছে তা নয়, বরং কতটুকু বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে খরচ করা হচ্ছে সেটাই আসল বিষয়। সুশাসন ও ক্রয় প্রক্রিয়ায় সংস্কার না আনলে অতিরিক্ত অর্থ কেবল একই অদক্ষ কাঠামোর পেটেই যাবে।

আদতে বাংলাদেশ একটি বৃহত্তর উন্নয়নগত সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি। যদিও সীমিত অভ্যন্তরীণ রাজস্ব, সরকারি অর্থায়নের চাপ এবং অবকাঠামো, ভর্তুকি ও সামাজিক সুরক্ষার মতো খাতের সঙ্গে শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া সরকারের জন্য কঠিন। তবুও এটিই একমাত্র খাত, যা দেশের উৎপাদনশীলতা ও কর্মসংস্থান বাড়াতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ঘটাতে পারে। আর সেজন্যই বাজেটের ব্যবস্থাপনা পদ্ধতিতে পরিবর্তন না আনলে কেবল বরাদ্দ বাড়িয়ে কোনো দেশ বিশ্বমানের শিক্ষা অর্জন করতে পারে না।

কিউএস র‍্যাংকিংয়ে পারফরম্যান্স দুর্বল থাকে কেন?

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কিউএস র‍্যাংকিংয়ে স্থান পেলেও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারেনি। সম্প্রতি প্রকাশিত ‘কিউএস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র‍্যাংকিং ২০২৬’-এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ৫৮৪ নম্বরে থেকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বে শীর্ষে ছিল। বুয়েট ছিল ৭৬১–৭৭০ এর মধ্যে এবং দেশের অন্যান্য শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো তালিকার আরও নিচের দিকে ছিল। এটি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একক ব্যর্থতা নয়, বরং উচ্চশিক্ষার সামগ্রিক ব্যবস্থারই প্রতিফলন। আমরা এখনো কেবল যেখানে সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দিকেই গুরুত্ব দিচ্ছি, অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের কিংবা শিক্ষার মান নিয়ে তেমন মাথাব্যথাই যেন কারো নেই।

কিউএস তাদের র‍্যাংকিং মূলত একাডেমিক সুনাম, নিয়োগের স্বচ্ছতা মূল্যায়ন, গবেষণার পরিধি ও শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতার মতো বিষয়গুলোকে বিবেচনা করে। আর এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হয়। গবেষণার তহবিল সীমিত, গবেষণাগারে পর্যাপ্ত রিসোর্স নেই, শিক্ষকদের উন্নয়ন অসম, প্রকাশনায় প্রণোদনা দুর্বল এবং অনেক বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণামুখী না হয়ে এখনো মূলত শিক্ষাদানকেন্দ্রিক রয়ে গেছে।

একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে যদি তৃতীয় বিশ্বের সুযোগ-সুবিধা এবং অনিয়মিত প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা দিয়ে বিশ্বমানের ফল দিতে বলা হয়, তাহলে তারা বিশ্ব র‍্যাংকিংয়ে ভালো করতে পারে না—এটাই স্বাভাবিক।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো সুশাসন। ছাত্র ও শিক্ষকদের নোংরা রাজনীতির পাশাপাশি বাংলাদেশের অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, নিয়োগে বিলম্ব, ধীরগতির সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও প্রশাসনিক অদক্ষতায় জর্জরিত। অন্যদিকে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কিছু ক্ষেত্রে বেশ ভালো অবস্থানে থাকলেও পরিধি, গবেষণার সংস্কৃতি এবং বৈশ্বিক মানের দিক দিয়ে এখনো পিছিয়ে রয়েছে। যদিও নর্থ-সাউথ, ব্র্যাক, ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির মতো কিছু বিশ্ববিদ্যালয় ভালো করছে, তবুও সামগ্রিকভাবে উভয়ক্ষেত্রেই সুস্থ ব্যবস্থার অনেক সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে।

অস্ট্রেলিয়ার শিক্ষা ব্যবস্থার কেন উন্নত?

অস্ট্রেলিয়া শিক্ষা ক্ষেত্রে বাংলাদেশের চেয়ে একটি উপযোগী বৈপরীত্য তুলে ধরে। কারণ, তারা এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে যা আন্তর্জাতিকভাবে বিশ্বস্ত, সুনিয়ন্ত্রিত ও রপ্তানিমুখী। অস্ট্রেলিয়ার সরকার তাদের ব্যবস্থাকে এমন একটি মান নিয়ন্ত্রণ ও অ্যাক্রেডিটেশন হিসেবে পরিচালনা করে, যা শিক্ষার্থীদের চমৎকার অভিজ্ঞতা ও সাফল্য সুনিশ্চিত করার জন্য উপযোগী। অস্ট্রেলিয়ার শিক্ষা শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক শিখন, সমস্যা সমাধান ও উচ্চতর চিন্তন দক্ষতার জন্যও ব্যাপকভাবে স্বীকৃত এবং সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দীর্ঘকাল ধরে বিশ্বের সেরাগুলোর তালিকায় রয়েছে।

আসলে পার্থক্যটি কেবল অর্থের নয়, যদিও অর্থায়ন গুরুত্বপূর্ণ। অস্ট্রেলিয়া অর্থায়নের পাশাপাশি সুশাসন, দায়বদ্ধতা, স্বায়ত্তশাসন ও মানের নিশ্চয়তাকে সমন্বিত করে। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কাছ থেকে আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিযোগিতা করা, গবেষণার মেধা আকর্ষণ করা, মান বজায় রাখা এবং শিল্প, তথা বাজারের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করার মতো বিষয়গুলো নিশ্চিত করে নেওয়া হয়।

ব্যবস্থাটি শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত, যাতে গ্র্যাজুয়েটরা প্রয়োজনীয় দক্ষতা নিয়ে বের হতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশিক্ষণ ও অর্থনৈতিক চাহিদার মধ্যকার এই সমন্বয়ই অস্ট্রেলিয়াকে বিশ্বজুড়ে একটি বিশ্বমানের শিক্ষা প্রদানকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার অন্যতম কারণ।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কেবল ডিগ্রি দেওয়ার কারখানা না ভেবে জ্ঞানের প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখার যে সংস্কৃতি, অস্ট্রেলিয়া তার সুফলও পায়। এখানে গবেষণা আরও পদ্ধতিগতভাবে অর্থায়ন পায়, একাডেমিক পেশা অনেক বেশি আকর্ষণীয় এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি প্রতিযোগিতা ও গুণগত মানকে আরও সমৃদ্ধ করে। তাই বাংলাদেশের জন্য শিক্ষাটি স্পষ্ট—সম্মান কেবল স্লোগান থেকে আসে না, এটি আসে নিরবচ্ছিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা থেকে।

বাংলাদেশ ও অস্ট্রেলিয়ার শিক্ষা: তুলনামূলক চিত্র

অর্থায়নের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, বাংলাদেশে শিক্ষাখাতে ব্যয় ধীরে ধীরে বাড়লেও ২০২৬–২৭ অর্থবছরে তা জিডিপির প্রায় ২ শতাংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অন্যদিকে, অস্ট্রেলিয়ায় শিক্ষাখাতকে শক্তিশালী মাননিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, স্বীকৃতি (অ্যাক্রেডিটেশন) এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার মাধ্যমে সুসংহতভাবে সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া হয়।

দুটি দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের মান ও অবস্থানের ক্ষেত্রেও পার্থক্য স্পষ্ট। শিক্ষাদানের সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও পার্থক্য বিদ্যমান। যেখানে বাংলাদেশে শিক্ষা ব্যবস্থা এখনো মূলত পরীক্ষাকেন্দ্রিক ও ডিগ্রিমুখী; সেখানে অস্ট্রেলিয়ায় শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক শিক্ষা পদ্ধতিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি, অর্জিত একাডেমিক জ্ঞান কর্মক্ষেত্রে প্রয়োগের পদ্ধতি এবং স্বাধীনভাবে শেখার সক্ষমতা গড়ে তোলার ওপর অধিক জোর দেয় অস্ট্রেলিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো।

গবেষণা পরিবেশের দিক থেকে বাংলাদেশ এখনো সীমিত অর্থায়ন ও দুর্বল গবেষণা সক্ষমতার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। অন্যদিকে, অস্ট্রেলিয়ায় উন্নত গবেষণা অবকাঠামো, পর্যাপ্ত সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অধিক দৃশ্যমান ও প্রভাবশালী গবেষণা কার্যক্রম বিদ্যমান।

সবশেষে, সুশাসনের প্রশ্নে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক হস্তক্ষেপের প্রতি নির্ভরশীল এবং অনেক বেশি সংবেদনশীল। পক্ষান্তরে, অস্ট্রেলিয়ার শিক্ষাব্যবস্থা অধিকতর কাঠামোবদ্ধ নিয়ন্ত্রণ, কার্যকর মাননিশ্চিতকরণ ও সুসংগঠিত নীতিমালার মাধ্যমে পরিচালিত হয়।

তবে এই তুলনার উদ্দেশ্য বাংলাদেশ সম্পর্কে কোনো হীনমন্যতা সৃষ্টি করা নয়, বরং জরুরি সংস্কারের প্রয়োজনীয়তাকে সামনে আনা। আয়তন, জনসংখ্যা ও জনসেবার ওপর চাপ—সবদিক থেকেই অস্ট্রেলিয়ার তুলনায় অনেক বড় ও জটিল দেশ বাংলাদেশ। আর ঠিক এই কারণেই শিক্ষা সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা অনেক জরুরি। কয়েক কোটি তরুণ-তরুণীর দেশে এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা বহন করার সামর্থ্য রাখে না, যা পর্যাপ্ত উদ্ভাবন সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হয় এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সক্ষম পর্যাপ্ত সংখ্যক দক্ষ গ্র্যাজুয়েট গড়ে তুলতে পারে না। তাই শিক্ষা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদী পরিকাঠামো তথা পরিকল্পনা গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।

পরিবর্তন কোথায়, কীভাবে হওয়া উচিত?

প্রথমত, বাংলাদেশকে শিক্ষার ব্যয় ক্রমান্বয়ে বাড়াতে হবে এবং এটিকে অসংখ্য কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে অপচয় হওয়া থেকে রক্ষা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে লক্ষ্যটি কেবল একটি প্রতীকী সংখ্যা হওয়া উচিত নয়; এটি হওয়া উচিত স্বাক্ষরতা, গাণিতিক দক্ষতা, গ্র্যাজুয়েশনের মান, শিক্ষকদের উন্নয়ন ও গবেষণার ফলাফলের মতো পরিমাপযোগ্য লক্ষ্যের সঙ্গে যুক্ত বহু বছরের একটি অঙ্গীকার। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাজেটে কেবল ভবন ও কাগজপত্রের চেয়ে শ্রেণীকক্ষ, শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।

দ্বিতীয়ত, শিক্ষকের গুণগত মানকে সংস্কারের কেন্দ্রে রাখতে হবে। স্বচ্ছ নিয়োগ, নিয়মিত প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল দক্ষতা ও পারফরম্যান্সভিত্তিক পেশাগত অগ্রগতির মাধ্যমে শিক্ষকদের পেছনে বিনিয়োগ না করলে কোনো শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতি হয় না। একজন দক্ষ শিক্ষক একটি দুর্বল স্কুলকে টেনে তুলতে পারেন; আর একজন দুর্বল শিক্ষক একটি প্রজন্মকে ধ্বংস করে দিতে পারেন। বাংলাদেশের উচিত শিক্ষকতাকে একটি মর্যাদাপূর্ণ পেশা হিসেবে গড়ে তোলা, চাকরি না পেয়ে কোনো শেষ ভরসা নয়।

তৃতীয়ত, উচ্চশিক্ষায় জবাবদিহিতার সঙ্গে প্রকৃত স্বায়ত্তশাসন প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উদ্ভাবন, কোর্স ডিজাইন ও গবেষণা অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার স্বাধীনতা থাকা উচিত। তবে স্বচ্ছ সূচকের ভিত্তিতে তাদের মূল্যায়নও করতে হবে। এর অর্থ হলো আরও প্রতিযোগিতামূলক গবেষণা অনুদান, শক্তিশালী প্রকাশনা প্রণোদনা, শিল্পখাতের সঙ্গে উন্নত সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক বিনিময় কর্মসূচি। দেশে ডজন ডজন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজন নেই, যারা একই কাজ খারাপভাবে করবে। বরং অল্প কিছু বিশ্ববিদ্যালয় প্রয়োজন, যারা প্রয়োজনীয় কাজগুলো অসাধারণভাবে করবে।

চতুর্থত, পাঠ্যক্রমকে মুখস্থবিদ্যা থেকে সরিয়ে দক্ষতার দিকে নিয়ে যেতে হবে। বাংলাদেশকে ২১ শতকের অর্থনীতির বাস্তবতার সঙ্গে শিক্ষাকে মেলাতে হবে। ডিজিটাল স্বাক্ষরতা, ইংরেজি যোগাযোগ, ডেটা স্কিল, কারিগরি প্রশিক্ষণ, উদ্যোক্তা হওয়া ও সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা শিক্ষার্থীদের মধ্যে গড়ে তুলতে হবে। নতুন অর্থনীতি কেবল মুখস্থবিদ্যাকে পুরস্কৃত করবে না, এটি পুরস্কৃত করবে সৃজনশীলতা, অভিযোজনযোগ্যতা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতাকে।

শিক্ষা সংস্কারের কিছু চূড়ান্ত দিকনির্দেশনা

বাংলাদেশের শিক্ষার চ্যালেঞ্জ উচ্চাকাঙ্ক্ষার অভাব নয়, এটি কাঠামোগত বাস্তবায়নের অভাব। বাজেট বাড়ছে, কিন্তু ধীরে। বিশ্ববিদ্যালয়ের র‍্যাংকিং আছে, কিন্তু তা মাঝারি থেকে নিচের সারিতে। এই ব্যবস্থা বিপুল সংখ্যক গ্র্যাজুয়েট তৈরি করছে, কিন্তু পর্যাপ্ত আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক চিন্তাবিদ, গবেষক ও পেশাজীবী তৈরি করতে পারছে না। এ কারণেই শিক্ষা সংস্কারকে একটি বার্ষিক বাজেটের খাত হিসেবে না দেখে দেশ গড়ার প্রকল্প হিসেবে দেখতে হবে।

গুণগত মান সুনিশ্চিতকরণ, প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা, শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক শিখন এবং গবেষণা সংস্কৃতিকে গুরুত্ব দিলে কী পাওয়া সম্ভব, অস্ট্রেলিয়া তার বড় প্রমাণ। অস্ট্রেলিয়াকে অন্ধভাবে অনুকরণ করা নয়, বরং বাংলাদেশের উচিত তাদের সাফল্যের পেছনের নীতিগুলো থেকে শেখা। বাংলাদেশ যদি উন্নত বিশ্ববিদ্যালয়, ভালো চাকরি ও শক্তিশালী বৈশ্বিক সুনাম চায়, তাহলে গোড়া থেকেই শিক্ষাকে নতুন করে গড়ে তুলতে হবে।

সুতরাং সামনের পথটি পরিষ্কার—বেশি খরচ করুন, বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে খরচ করুন, শিক্ষকের মান রক্ষা করুন, গবেষণাকে শক্তিশালী করুন, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমান এবং এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলুন, যেখানে দক্ষতার মূল্যায়ন হবে। বাংলাদেশ যদি তা করতে পারে, তাহলে শিক্ষাখাত আর নিত্যদিনের অভিযোগের বিষয় থাকবে না, বরং জাতীয় শক্তিতে পরিণত হবে এবং সে শুরুটা শুরুর সময় এখনই।

সুমন রেজা: কবি ও কলামিস্ট; অস্ট্রেলিয়ার উলংগং বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত