মহাসড়ক নির্মাণের খেসারত কায়পুত্ররা দেবে কেন?

Philip Gain
ফিলিপ গাইন

সাতক্ষীরা সদর উপজেলার দক্ষিণ আলিপুর ইউনিয়নের একটি মর্মন্তুদ ঘটনা এখনো অনেক মানুষের কাছেই অজানা। কোনো প্রত্যন্ত চর বা গভীর অরণ্য নয়, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কের পাশেই ঘটছে ঘটনাটি।

সাতক্ষীরা-শ্যামনগর মহাসড়কের পার ঘেঁষে ৪৬টি কায়পুত্র পরিবার কয়েক দশক ধরে বসবাস করে আসছে। প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) দক্ষিণ আলিপুরের ভেতর দিয়ে মহাসড়ক সম্প্রসারণের কাজ শুরু করলে সড়কের পাশেই থাকা কায়পুত্রদের পাঁচটি পরিবারের ঘড়বাড়ি ভেঙে পড়ে। হতভাগ্য পরিবারের সদস্যরা এখন খোলা আকাশের নিচে পলিথিনের ছাউনিতে রাত পার করছেন। বাকিরাও একই ভাগ্য বরণের হুমকিতে রয়েছেন।

উচ্ছেদের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে লিখিত কোনো নোটিশ দেওয়া হয়েছে বলে জানা যায়নি। তবে স্থানীয় বাসিন্দা, কায়পুত্র সম্প্রদায়ের লোকজন ও স্থানীয় সাংবাদিক মারফতে জানা যায়, সওজ তাদের অধিকৃত জমিতে যারা বসবাস করছেন তাদের আগামী ২৪ ও ২৫ জুনের মধ্যে চলে যেতে মাইকিং করছে। অন্যথায়, তাদের ঘড়বাড়ি ভাঙা পড়বে। এটা যদি সত্যি হয়, তবে তা কেবলমাত্র একটি উচ্ছেদের ঘটনাই হবে না; বরং বাংলাদেশ কতটা মানবিক সেই প্রশ্ন সামনে আসবে। কারণ এসব ভূমিহীন পরিবারের যাওয়ার মতো আর কোনো আশ্রয় বা বিকল্প বাসস্থান নেই।

কায়পুত্ররা ঐতিহ্যগতভাবে খোলা মাঠে শূকর চড়ানো গোষ্ঠী। এই গোষ্ঠী বাংলাদেশের একটি প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, যারা পেশাগত পরিচয়ের কারণে নানাবিধ সামাজিক বঞ্চনা, বৈষম্য ও অস্পৃশ্যতার শিকার। সাতক্ষীরা, খুলনা ও যশোর জেলার প্রায় ৭৫টি গ্রামে তাদের বসবাস। তাদের মোট জনসংখ্যা আনুমানিক ১২ হাজার। সাধারণ মানুষ এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় সরকারি নথিপত্রে এখনো এই সম্প্রদায়কে ‘কাওড়া’ নামে সম্বোধন করে, যা একটি অবমাননাকর ও নেতিবাচক অর্থবহনকারী শব্দ। বর্তমানে এই সম্প্রদায়ের মানুষ নিজেদেরকে ‘কায়পুত্র’ নামেই পরিচিত হতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। কারণ এই নামের মধ্য দিয়ে তারা দীর্ঘদিনের অপমান ও হেয় প্রতিপন্নতার বোঝা থেকে মুক্ত হওয়ার পথ খুঁজছেন। তবে শুধু নাম পরিবর্তন করলেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তৈরি হওয়া গভীর সামাজিক কুসংস্কার ও বৈষম্য মুছে ফেলা যায় না।

Kayputra
২০২৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ভেঙে ফেলা কায়পুত্র পরিবারের বসতঘর। ছবি: প্রসাদ সরকার

সামাজিক অবস্থানের দিক থেকে কায়পুত্ররা এক অস্বস্তিকর ও প্রান্তিক অবস্থানে রয়েছে। মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশে, যেখানে শূকরকে অপবিত্র মনে করা হয় এবং ইসলামে এর মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ, সেখানে পেশাগত পরিচয়ের কারণে কায়পুত্ররা প্রায়শই সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর অবজ্ঞা ও ঘৃণার শিকার হন। একইসঙ্গে, হিন্দু সমাজের কিছু অংশেও ঐতিহাসিকভাবে তাদের ‘অস্পৃশ্য’ হিসেবে দেখা হয়। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে সম্ভবত এমন আর কোনো জনগোষ্ঠী খুঁজে পাওয়া যাবে না, যারা এত গভীরভাবে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, একঘরে করে রাখা ও বঞ্চনার শিকার। দক্ষিণ আলিপুরের কায়পুত্র জনগোষ্ঠী প্রতিদিন এই সামাজিক বোঝা বহন করে চলেছে।

সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণাধীন খতিয়ান নম্বর ২-এর আওতাভুক্ত সরকারি খাসজমির ওপর তারা দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছেন। তাদের মধ্যে প্রবীণ অনেক বাসিন্দার দাবি, বাংলাদেশ স্বাধীনের আগ থেকেই তারা এ এলাকায় আছেন। অনেকের এখানেই জন্ম এবং বড় হওয়া। কেউ কেউ আইয়ুব খানের আমলের কথাও স্মরণ করতে পারেন। এত দীর্ঘ সময় ধরে এখানে বসবাস করলেও তাদের দারিদ্র্য এখনো চরম পর্যায়ে রয়ে গেছে।

এখানকার কায়পুত্রদের ঘরবাড়ি মূলত অস্থায়ী ঝুপড়ির মতো, যা গোলপাতা, মরিচা পড়া টিন ও পলিথিন দিয়ে তৈরি। সেখানে কোনো যথাযথ পয়ঃনিষ্কাষণ ব্যবস্থা নেই। ৪৬টি পরিবারের অনেকেই এখনো খোলা স্থানে মলত্যাগ করে। কারণ তাদের শৌচাগারের কোনো ব্যবস্থা নেই। অনেক নারী, প্রবীণ ও বিধবা ভিক্ষাবৃত্তির মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করেন। এমনকি প্রতিবন্ধীদের অনেকে সরকারি ভাতা পাওয়ার যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও কোনো ভাতা পান না। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, তাদের এই দারিদ্র্য এমন এক সামাজিক বিচ্ছিন্নতার ফল, যা এখন প্রায় প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে।

সরেজমিনে গিয়ে কথা হয় কায়পুত্র নারী শেফালি মণ্ডলের সঙ্গে। তিনি জানান, এখন আর আগের মতো দিনমজুরের কাজের জন্য ডাক পান না। কারণ, তারা ‘নিম্নবর্ণের’ মানুষ হিসেবে বিবেচিত। অনেক নারীই খোলাখুলিভাবে সামাজিক অপমান ও বৈষম্যের অভিজ্ঞতার কথা বলেন। তাদের অভিযোগ, বাজারে বা চায়ের দোকানে তাদেরকে অবজ্ঞার চোখে দেখা হয়, শুধুমাত্র তাদের পরিবারের পুরুষরা শূকর চড়ানোর কাজে যুক্ত আছেন বলে। অথচ দেশে শূকরের মাংসের একটি উল্লেখযোগ্য বাজার রয়েছে, যা অর্থনীতিরও একটি অংশ। কায়পুত্রদের কায়িক শ্রমে উৎপাদিত শূকরের মাংস অমুসলিম সম্প্রদায়ের অনেক মানুষের খাবার। এই মাংস ঢাকাসহ বেশ কিছু বড় শহরের হোটেলে সরবরাহ করা হয়। কিন্তু এই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে টিকিয়ে রাখতে যারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে, সেই মানুষগুলো সমাজের চোখে প্রায় অদৃশ্য এবং অনেক ক্ষেত্রেই অবাঞ্ছিত রয়ে গেছে।

Kayputra
গোপালগঞ্জের উন্মুক্ত মাঠে শূকর চরাচ্ছে কায়পুত্র রাখালরা। ছবি: ফিলিপ গাইন

কায়পুত্রদের জীবিকা ক্রমশ হুমকির মুখে পড়েছে। কারণ ঐতিহ্যবাহী শূকর পালন পেশা দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। চারণভূমির বড় একটি অংশ মাছের ঘেরে পরিণত হওয়ায় শূকর পালনের জন্য প্রয়োজনীয় খোলা জমি এখন আর পাওয়া যাচ্ছে না। সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হওয়ার ভয়ে ও বৈষম্য থেকে মুক্তি পেতে অনেক কায়পুত্র ইতোমধ্যে তাদের বংশানুক্রমিক পেশা ত্যাগ করে মাছ ধরা পেশার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। গবেষকদের মতে, বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী এক প্রজন্মের মধ্যেই ঐতিহ্যবাহী শূকর পালন প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। এমন প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ আলিপুরে উচ্ছেদের এই ঘটনা তাদের শেষ অবলম্বনগুলোর একটিকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে।

একথা সত্য যে বাংলাদেশের সড়ক নির্মাণ প্রয়োজন। উন্নত অবকাঠামো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, আঞ্চলিক যোগাযোগ এবং জনকল্যাণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু উন্নয়নের অর্থ এটা হতে পারে না যে সমাজের সবচেয়ে দরিদ্র মানুষগুলোকে ভিটেহারা করে দেওয়া।

সড়ক ও জনপথ বিভাগ দাবি করছে, জমিটি আইনগতভাবে তাদের মালিকানাধীন এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের দায়িত্ব তাদের নয়, বরং জেলা প্রশাসনের। আইনগত দৃষ্টিকোণ থেকে এই অবস্থান সঠিক হতে পারে। জানা যায়, জমিটি সড়ক ও জনপথ বিভাগ ১৯৬২ থেকে ১৯৬৪ সালের মধ্যে অধিগ্রহণ করে এবং বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী বিদ্যমান ১৮ ফুট প্রশস্ত সড়ককে সম্প্রসারণ করে ৩৪ ফুট প্রশস্ত দুই লেনের মহাসড়কে রূপান্তর করা হবে।

কিন্তু এখানে আইনগত বিষয়টি প্রধান নয়। যখন রাষ্ট্রের একটি প্রতিষ্ঠান মানুষের বসতবাড়ি উচ্ছেদ করে এবং অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের ওপর তাদের পুনর্বাসনের দায়িত্ব ন্যস্ত করে, তখন এসব পক্ষের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল অংশ অর্থাৎ যারা উচ্ছেদের শিকার, তারা আমলাতান্ত্রিক জটিলতার ফাঁদে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।

কায়পুত্ররা উন্নয়নের বিরোধিতা করছেন না। বরং তারা একটি বাস্তবসম্মত সমাধানের প্রস্তাব দিয়েছেন। বর্তমানে তাদের যে বসতি রয়েছে, তার পেছনে আরও কিছু খাসজমি রয়েছে, সেখানে তাদের পুনর্বাসন করা এবং সরকারের পুনর্বাসন কর্মসূচির আওতায় স্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন তারা। তারা ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি, আর্থিক ক্ষতিপূরণ বা অন্য কোনো বিশেষ সুবিধা দাবি করছেন না—শুধু বসবাসের জন্য একটি নিরাপদ জায়গা চাইছেন। তাদের এই দাবি অত্যন্ত সংযত ও ন্যায্য; রাষ্ট্রের উচিত তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা।

Kayputra
গোপালগঞ্জের উন্মুক্ত মাঠে শূকরের সঙ্গে কায়পুত্র রাখালরা। ছবি: ফিলিপ গাইন

সড়ক ও জনপথ বিভাগের এই পদক্ষেপের পেছনে আরও একটি বৃহত্তর নীতিগত প্রেক্ষাপট রয়েছে। শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে সাতক্ষীরা জেলাকে ভূমিহীন ও গৃহহীনমুক্ত ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু দক্ষিণ আলিপুরের বাস্তবতা সেই দাবিকে স্পষ্টভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে। যদি এই কায়পুত্র পরিবারগুলোকে রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে সাতক্ষীরা সদর উপজেলাকে গৃহহীনমুক্ত বলা যায় না। এই সংকটের অবিলম্বে নীতিগত সংশোধনের দাবি জানান তারা।

পুনর্বাসনের নিশ্চয়তা না দেওয়া পর্যন্ত সব ধরনের উচ্ছেদ কার্যক্রম স্থগিত রাখতে হবে; ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য জেলা প্রশাসনকে নিকটবর্তী খাসজমি বরাদ্দ দিতে হবে; সব পরিবারকে সরকারি পুনর্বাসন কর্মসূচির আওতায় আনতে হবে এবং উপযুক্ত বাসিন্দাদের ফ্যামিলি কার্ড, বিধবা ভাতা, বয়স্ক ভাতা ও প্রতিবন্ধী ভাতাসহ বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

এটি মূলত আমরা কেমন দেশ গড়ে তুলতে চাই, সেই নৈতিক প্রশ্নের সঙ্গে সম্পর্কিত—আমরা কি এমন একটি দেশ চাই, যা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ নাগরিকদের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রেখে সড়ক সম্প্রসারণ করে; নাকি এমন একটি দেশ, যেখানে প্রজন্মের পর প্রজন্ম অদৃশ্য থেকে যাওয়া মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর দিয়েই মহাসড়ক নির্মিত হয়। দক্ষিণ আলিপুরের মানুষ কোনো অবৈধ দখলদার নয়; তারা এমন নাগরিক, যাদের জন্য সমাজ কখনোই প্রকৃত অর্থে কোনো জায়গা তৈরি করেনি। ফলে তাদের কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। নৈতিকভাবে এই দায় আমাদের সমগ্র সমাজের ওপর বর্তায়। কায়পুত্ররা প্রজন্মের পর প্রজন্ম সমাজের প্রান্তে বসবাস করে এসেছে। রাষ্ট্র যেন তাদের সেই প্রান্ত থেকেও সম্পূর্ণভাবে ফেলে না দেয়।

সাতক্ষীরার দক্ষিণ আলিপুর থেকে তথ্য সংগ্রহে লেখককে সহায়তা করেছেন সোসাইটি ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্টের (সেড) গবেষণা দলের সদস্য রবিউল্লাহ, ফাহমিদা রহমান ও ফাহমিদা আফরোজ নাদিয়া।

ফিলিপ গাইন: গবেষক এবং সোসাইটি ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্টের (সেড) পরিচালক।