জামায়াত আমিরের ‘গৃহযুদ্ধ’ মন্তব্যের নেপথ্যে কী?

তানিম আহমেদ
তানিম আহমেদ

রাজনীতিতে বিরোধী দল সরকারের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালাবে, সরকার বিরোধীদের বিরুদ্ধে—এটা দস্তুর। বিরোধী দল সরকারের বিরুদ্ধে কড়া প্রচারণা চালালেও অবাক হওয়ার কিছু নেই। শেষ পর্যন্ত যেকোনো রাজনৈতিক দলের লক্ষ্য তো পরের নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় আসা। তাই বিরোধীদলীয় নেতা জনসভায় সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র বক্তব্য রাখবেন—এটা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু যখন বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘গৃহযুদ্ধ’ ঠেকাতে তিনি জাতীয় নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিয়েছেন, তখন বিষয়টি স্বাভাবিক রাজনৈতিক বাগাড়ম্বরের সীমা ছাড়িয়ে যায়।

তখন স্বভাবতই মনে হয় বিরোধী দলীয় নেতা এবং জামায়াতে ইসলামীর প্রধান নিছক রাজনৈতিক প্রচারণার বাইরে গিয়ে আরও বিপজ্জনক কিছুর ইঙ্গিত দিচ্ছেন। সেই বিপদের আলোচনায় ঢোকার আগে একবার তার বক্তব্যের অন্য দিকটি নিয়েও আলোচনা করা প্রয়োজন।

গত ২০ জুন শফিকুর রহমান খুলনার জনসভায় বলেছেন, ‘দেশকে আমরা ভালোবাসি। শত যন্ত্রণা বুকে নিয়ে নির্বাচনের ফলাফল আমরা মেনে নিয়েছি। এ কথা মনে করবেন না কেউ, নির্বাচনের ফলাফল দেশে একটা গৃহযুদ্ধ শুরু না হোক, সেই জন্য আমরা মেনে নিয়েছিলাম। কারও বাপ–দাদার চোখ রাঙানিকে আমরা পরোয়া করব না। অন্যায়ের কাছে আমরা মাথা নত করব না। আমাদের নেতৃবৃন্দ হারতে হারতে ফাঁসির তক্তায় দাঁড়িয়ে মুচকি হাসি দিয়ে আমাদের শিখিয়ে দিয়েছেন, প্রয়োজনে জাতির জন্য আমাদের তৈরি থাকতে হবে।’

জামায়াত নেতা অভিযোগ করেছেন, সবশেষ নির্বাচনটি কার্যত পুরোপুরি সাজানো ছিল। অন্ততপক্ষে ব্যাপক অনিয়ম অভিযোগের ইঙ্গিত দিচ্ছেন। জাতীয় নির্বাচনের চার মাসেরও বেশি সময় পরে এ ধরনের মন্তব্য বেশ বিস্ময়কর—বিশেষ করে যে নির্বাচন সাধারণভাবে শান্তিপূর্ণ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে। এটা অবশ্য ঠিক যে ৩২টি আসনে ভোট পুনর্গণনার দাবি জানিয়েছিল জামায়াত। তাদের দাবি অনুযায়ী, সেখানে সামান্য ব্যবধানে পরাজয় গণনার ত্রুটির কারণে হয়েছিল।

তবে এই অভিযোগ আসে গেজেট প্রকাশের পরে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, যেসব ভোটকেন্দ্রে যে সময়ে আপত্তি জানানোর নিয়ম ছিল, সেখানে দলটি কোনো অভিযোগ করেনি। ওই ৩২ আসনের ফলাফলও আর পরিবর্তন হয়নি।

কিন্তু এই আসনগুলো নিয়ে জামায়াতের অভিযোগ, অভিযোগের ধরন ও আচরণ—সব মিলিয়ে শুরু থেকেই পরিষ্কার ছিল যে পুরো বিষয়টা আমলে নেওয়ার মতো নয়। বিরোধী দলের কিছু একটা বলার দরকার, দলের কর্মী ও সমর্থকদের সান্ত্বনা দেওয়ারও একটা ব্যাপার থাকে, এই ৩২ আসনের অভিযোগ সম্ভবত সেগুলোকে মাথায় রেখে ছিল।

যদি সত্যিই তারা পুনর্গণনার বিষয়ে আন্তরিক হতো, তাহলে দলের প্রতিনিধিরা ভোটকেন্দ্রেই প্রতিবাদ করতেন এবং তাদের ন্যায্য অধিকার হিসেবে পুনর্গণনা চাইতেন। সেটা না করে তারা গেজেট বিজ্ঞপ্তির জন্য অপেক্ষা করেছে। এছাড়াও, নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালেও এ নিয়ে অভিযোগ নেওয়া হয়নি। সেখানেও অভিযোগ যথাযথভাবে নিষ্পত্তি হতে পারত। তার ওপর নির্বাচনের পর থেকে এ পর্যন্ত জামায়াতের যত জনসভা হয়েছে, একটিতেও বিষয়টি জোরালোভাবে উঠে আসেনি।

কিন্তু এখন জামায়াত প্রধান আবারও সেই ৩২টি আসনের প্রসঙ্গ তুলছেন কড়া ভাষায়। বুঝিয়ে দিচ্ছেন যে আসনগুলো আসলে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে দলটি তাদের প্রাপ্য আদায়ে কঠোর লড়াইয়ে নামত। সেটা এমনই লড়াই যে দেশকে গৃহযুদ্ধের দিকে নিয়ে যেতে পারত।

জামায়াত নেতার এমন মন্তব্যে উদ্বেগজনকভাবে সহিংসতার ঝোঁক প্রকাশ পায়। পাশাপাশি গভীরতর কিছুর ইঙ্গিতও পাওয়া যায়। প্রথমত মন্তব্যে বোঝা যায় দেশের স্বার্থে, একটা প্রাণবন্ত সংসদের জন্যে যেমন সরব বিরোধী দল দরকার, জামায়াত আদতে সেই বিরোধী দল নয়। দল এবং দলটির নেতারা দলীয় স্বার্থকে পুরো জাতির স্বার্থের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলছে। না হয় ৩২টি আসনের জন্য গৃহযুদ্ধের প্রশ্ন আসবে কেন?

এই মন্তব্যে আরও একটি ব্যাপার উঠে আসে। জামায়াত প্রধানের আত্মবিশ্বাস তার নিয়ন্ত্রণে এমন শক্তি বা ক্ষমতা আছে, যে ইচ্ছা করলেই তা দিয়ে গৃহযুদ্ধ বাধানো যায়। কিন্তু তিনি সংযত থেকেছেন। পরেরবার নাও থাকতে পারেন।

প্রশ্ন জাগে, একটি রাজনৈতিক দলের কেন, কোন কারণে এমন শক্তির বা লোকবলের দরকার হয়, যা দিয়ে তারা গৃহযুদ্ধ পর্যন্ত বাধিয়ে দিতে পারে?

বিরোধীদলীয় নেতার এই বক্তব্য কেবল মেঠো রাজনৈতিক বক্তৃতা বলে উড়িয়ে দেওয়ার কোনো অবকাশ নেই। আর তিনি যেটা বলছেন তার মানে হলো, ২০২৪ সালের রক্তাক্ত রাজনৈতিক অভ্যুত্থানের দেড় বছরের মাথায় তার দল আরেকটি রক্তাক্ত সংঘাতের জন্যে তৈরি ছিল, আর নেতারাও সেরকম একটি কর্মসূচির কথা চিন্তা করেছিলেন। রাজনৈতিক মিত্ররা সদয় হয়ে এমন মনোভাবকে হয়তো দায়িত্বজ্ঞানের অভাব বলবেন। তবে সমালোচকরা একে বিধ্বংসী মনোভাব হিসেবেই দেখবেন।

শফিকুর রহমান তার বক্তৃতায় পূর্বসূরিদের কথাও টেনে আনেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের নেতৃবৃন্দ হারতে হারতে ফাঁসির তক্তায় দাঁড়িয়ে মুচকি হাসি দিয়ে আমাদের শিখিয়ে দিয়েছেন, প্রয়োজনে জাতির জন্য আমাদের তৈরি থাকতে হবে।’

কিন্তু তিনি যে পূর্বসূরিদের কথা বললেন, মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর দোসর হিসেবে যুদ্ধাপরাধের দায়ে তাদের ফাঁসি হয়েছিল। হত্যা, অগ্নিসংযোগ ও ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের জন্য তাদের মৃত্যুদণ্ড হয়েছিল। জামায়াত ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীর বিরুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অবস্থান নিয়েছিল এবং দলটির নেতারা সেই অপকর্মের জন্য ফাঁসিতে ঝুলেছিলেন।

তারা যুদ্ধাপরাধ বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। কিন্তু এই রায়গুলো কোনো আদালতে এখনো চ্যালেঞ্জ করা হয়নি, বাতিলও হয়নি। কিন্তু বর্তমান জামায়াত নেতা যখন গৃহযুদ্ধের হুমকি দিতে গিয়ে সেই নেতাদের স্মরণ করেন—যারা একসময় বাংলাদেশের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন—তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, তবে কি বর্তমান জামায়াত নেতা তার পূর্বসূরিদের সেই আদর্শই ধারণ করেন?

জামায়াত ও তার ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির বারবার প্রমাণ করেছে যে তারা তাদের কলুষিত অতীত এবং সেই নেতাদের আঁকড়ে রাখতে চায়। টিএসসির ছবি প্রদর্শনীতে তাদের শহীদ আখ্যা দিয়ে কিংবা সংসদে শোকপ্রস্তাব তুলে তারা সেটাই জানান দেয় বারবার। তাই যখন শফিকুর রহমান ১৯৪৭ সাল থেকে দলের সদস্যদের ‘ভুলের’ জন্য ক্ষমা চান, কিন্তু ১৯৭১ সালের পাপ স্পষ্টভাবে স্বীকার করেন না, তখন আর মনে হয় না তিনি সেটা সরল মনে চাইছেন। বরং মনে হয় এটা আশেপাশের বৈরী আবেগকে সাময়িকভাবে প্রশমিত করার কৌশল। জামায়াত এভাবেই বহু বছর পার করেছে। কিন্তু যতদিন ইতিহাসের মুখোমুখি না হবে, ততদিন এই বোঝা তাদের ঘাড় থেকে নামবে না।

তবে, জামায়াত এখন সংসদে প্রধান বিরোধী দল। এটা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। দলটির কট্টর সমালোচকরাও চাইবেন যে সংসদে বিরোধী দল হিসেবে জামায়াত সফল হোক। তারা যেন সরকারি দলকে কড়া নজরদারির মধ্যে রাখেন, পান থেকে চুন খসলে তাদের জবাবদিহি করে। এটা দলটির জন্য দেশসেবার একটি বিরল সুযোগও বটে। কিন্তু দলের প্রধানের এরকম বক্তব্য সেই সম্ভাবনা নষ্ট করে দেবে। এমন বক্তব্য প্রধান বিরোধী দলের মর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আর এটা দলটির জন্যেও ভালো কিছু বয়ে আনবে না।

তানিম আহমেদ: ডিজিটাল এডিটর, দ্য ডেইলি স্টার