এলএনজি সংকটে দীর্ঘায়িত হতে পারে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ভোগান্তি
বঙ্গোপসাগরে বৈরী আবহাওয়ার কারণে এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট আবারও ঘনীভূত হয়েছে। গত তিন সপ্তাহের মধ্যে গ্যাস সরবরাহ সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসায় গ্রামাঞ্চলে দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যুৎ বিভ্রাট হচ্ছে, যা বিদ্যমান সংকটকে আরও শোচনীয় করে তুলছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, গতকাল দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ কমে দৈনিক প্রায় ২ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুটে (এমএমসিএফডি) দাঁড়িয়েছে, যেখানে দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ এমএমসিএফডি।
এর মধ্যে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে প্রায় ১ হাজার ৬৩০ এমএমসিএফডি গ্যাস পাওয়া গেছে এবং দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল মিলে ৪১০ এমএমসিএফডি পর্যন্ত সরবরাহ করেছে।
গত ২১ জুলাই মার্কিন মালিকানাধীন এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত টার্মিনালটি দুর্ঘটনার কবলে পড়ে সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ার পর থেকে এটিই সর্বনিম্ন মোট গ্যাস সরবরাহ।
যদিও টার্মিনালটি ৫ আগস্ট থেকে আংশিকভাবে কার্যক্রম শুরু করে এবং সামগ্রিক এলএনজি সরবরাহ কিছুটা বাড়ে, তবে সামিট পরিচালিত টার্মিনালটি গত ১০ আগস্ট থেকে সরবরাহ কমিয়ে দিতে শুরু করে কারণ তারা ট্যাঙ্কার থেকে এলএনজি খালাস করতে পারছিল না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পেট্রোবাংলার একজন কর্মকর্তা বলেন, 'আমরা সামিট পরিচালিত টার্মিনালে থাকা বর্তমান মজুত শেষ করতে চাই না, আর এ কারণেই এটি সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে।'
তিনি আরও বলেন, 'জাহাজগুলো এলএনজি খালাসের জন্য প্রস্তুত থাকলেও সমুদ্রের বৈরী আবহাওয়ার কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। সামিট যদি আজকের মধ্যে এলএনজি নিতে না পারে তবে পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে।'
এলএনজি সরবরাহের এই ঘাটতির প্রভাব এখন বিদ্যুৎ খাতে অনুভূত হচ্ছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে না পারার অন্যতম প্রধান কারণ হলো গ্যাসের অপর্যাপ্ত সরবরাহ।
তিনি বলেন, এক্সিলারেট টার্মিনালটি এখনো পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারছে না। তিনি আরও যোগ করেন, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন রাতারাতি বাড়ানো সম্ভব নয়।
একদিন আগে অমিত জানান যে, এক্সিলারেট পরিচালিত টার্মিনালের একটি বয়লার মেরামত করা হচ্ছে এবং অন্যটি অকেজো অবস্থায় আছে। তিনি বলেন, দ্বিতীয় বয়লারটি পুনরায় চালু করতে হলে বর্তমানে চালু থাকা বয়লারটি অন্তত ৭২ ঘণ্টার জন্য বন্ধ রাখতে হবে, আর এতে করে গ্যাস সরবরাহে আবারও সাময়িক বিঘ্ন ঘটবে।
গতকাল পেট্রোবাংলার একজন কর্মকর্তা দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'চলতি সপ্তাহে বয়লারটি পুনরায় চালু হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। তিনি বলেন, 'বরং, সামিটের টার্মিনালটি যখন পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হবে, তখন আমরা এটি চালুর চেষ্টা করব।'
অমিতের মতে, সরকার গতকাল সন্ধ্যা থেকে একটি নতুন কৌশল নিয়েছে, তাই বিদ্যুৎ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতির আশা করা হচ্ছে।
এদিন এক নির্দেশনায় বিদ্যুৎ বিভাগ জানায়, শপিং মল, মার্কেট ও দোকানপাট পূর্বের নির্ধারিত রাত ৯টার পরিবর্তে বেলা ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা রাখা যাবে।
আলোকিত বিলবোর্ডগুলো অবশ্যই সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে বন্ধ করতে হবে এবং সব ধরনের আলোকসজ্জা বা শৌখিন বাতি বন্ধ থাকবে।
মেলা, বাণিজ্য মেলা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলোও রাত ৮টার মধ্যে শেষ করতে হবে। তবে রেস্তোরাঁ, হাসপাতাল এবং ফার্মেসি এই নির্দেশনার আওতামুক্ত থাকবে।
গতকাল রাত ৮টা পর্যন্ত দেশে প্রতি ঘণ্টায় গড়ে ২ হাজার ৭৪৫ মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল, যার অর্থ হলো বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোকে দীর্ঘ সময় ধরে লোডশেডিং করতে হয়েছে।
চলতি মাসের শুরুতে পরিস্থিতির কিছুটা সাময়িক উন্নতি হলেও সবশেষ তা আবার অবনতির দিকে গেছে। গত ৬ আগস্ট গড়ে প্রতি ঘণ্টায় লোডশেডিং কমে ৩৩৫ মেগাওয়াটে এবং ৭ আগস্ট ৭৪০ মেগাওয়াটে নেমে এসেছিল, তবে পরবর্তী দিনগুলোতে তা বেড়ে ২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হয়েছে।
নতুন করে শুরু হওয়া বিদ্যুৎ বিভ্রাট বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে প্রকট আকার ধারণ করেছে, যেখানে বিতরণ কোম্পানিগুলো চাহিদার তুলনায় অনেক কম বিদ্যুৎ পাচ্ছে।
দীর্ঘস্থায়ী লোডশেডিং নিয়ে ক্রমবর্ধমান জনরোষের মধ্যে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি (বিপিবিএ) গতকাল পুলিশ মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) কাছে একটি চিঠি পাঠিয়ে তাদের গ্রিড, সাবস্টেশন এবং অফিসগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অনুরোধ জানিয়েছে।
চিঠির তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েকদিন ধরে ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মোট গড় চাহিদা ছিল ৮ হাজার থেকে ৯ হাজার মেগাওয়াট, যার বিপরীতে বরাদ্দ পাওয়া গেছে মাত্র ৫ হাজার থেকে ৬ হাজার মেগাওয়াট। এ থেকে বোঝা যায়, লোডশেডিং মূলত শহরের বাইরেই হচ্ছে।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ গ্রাহক বা প্রায় ৪ কোটি গ্রাহককে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে থাকে।
সমিতি জানিয়েছে, কোনো কোনো এলাকায় দিনে ৮, ১০ বা এমনকি ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে।
কিছু সাবস্টেশন ও অফিসে হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়েছে, যার ফলে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। সমিতি আইজিপিকে স্থানীয় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিরাপত্তা জোরদার করার নির্দেশ দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানিয়েছে।
নেত্রকোনায় স্থানীয় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি গত সোমবার জেলা প্রশাসনের কাছে নিরাপত্তা চেয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, কর্মকর্তারা বিভিন্ন হুমকিমূলক ফোন কল পাচ্ছেন এবং তাদের অফিস ঘেরাও ও ভাঙচুর করার হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
সমিতি আরও জানিয়েছে যে, বকেয়া বিদ্যুৎ বিল আদায়ের অভিযান চালানোর সময় তাদের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা হামলা ও লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন। তাদের দেওয়া তথ্যমতে, ১২০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল মাত্র ৫০-৬০ মেগাওয়াট।
বেশ কয়েকটি উপজেলার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, তারা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মাত্র ৫ থেকে ৭ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাচ্ছেন। তবে এই সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন নয়।
গোপালগঞ্জে সম্ভাব্য হামলা ও নাশকতার আশঙ্কার কথা উল্লেখ করে ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি তাদের অফিস এবং ৩৩/১১ কেভি সাবস্টেশনগুলোর আশেপাশে পুলিশি টহল চেয়েছে।
গোপালগঞ্জ বিদ্যুৎ সরবরাহ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মঈন উদ্দিন আহমেদ জানান, গতকাল সকালে সেখানে ১৫ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ৯ মেগাওয়াট। দুপুরে চাহিদা বেড়ে ১৭ মেগাওয়াটে দাঁড়ালেও সরবরাহ ৯ মেগাওয়াটেই স্থির ছিল।
তিনি বলেন, গত সপ্তাহে বিভাগে গড়ে দৈনিক প্রায় ৮ ঘণ্টা করে লোডশেডিং হয়েছে এবং গত দুই দিনে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে।
গাইবান্ধায় স্থানীয় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি জানিয়েছে, সাতটি উপজেলায় বিদ্যুতের চাহিদা ৬৫-৭৫ মেগাওয়াট। তবে চাহিদার তুলনায় ২৫-৩০ শতাংশ কম বিদ্যুৎ পাওয়ায় দিন ও রাত মিলিয়ে ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্য অনুযায়ী, সিলেটে ১০ আগস্ট রাত ৮টায় লোডশেডিং ৬৮ মেগাওয়াটে পৌঁছে, যা ৫ থেকে ১১ আগস্ট সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ। বারবার বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, বিশেষ করে রেফ্রিজারেশন এবং প্রিন্টিং সেবার ওপর নির্ভরশীল দোকানগুলো চরম বিপাকে পড়েছে।
বাংলাদেশ সিএনজি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, গ্যাসের চাপ অত্যন্ত কম থাকায় নারায়ণগঞ্জ জেলার ৩৩টি সিএনজি ফিলিং স্টেশনের মধ্যে ৩০টিই বন্ধ হয়ে গেছে।
সস্তাপুরের ‘মাস সিএনজি ওয়ার্কার্স’-এর প্রকৌশলী কাজী রকিবুল ইসলাম জানান, তাদের মেশিনগুলো চালানোর জন্য প্রতি বর্গ ইঞ্চিতে অন্তত ১৫ পাউন্ড (পিএসআই) চাপের প্রয়োজন, কিন্তু তারা পাচ্ছিলেন ১ পিএসআইয়েরও কম।
তিনি আরও জানান, আগের রাতে অন্তত পাঁচ ঘণ্টা গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ ছিল। সকালে চাপ কিছুটা বাড়লেও দুপুরের দিকে তা আবার কমে যায়।