স্বাধীনতার ২৫০ বছর: আমেরিকানরা কি তাদের প্রতিষ্ঠাকালীন নীতিমালা সম্পর্কে জানেন?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় আমি ক্যাম্পাস এবং ঢাকার বিভিন্ন স্থানে ভিয়েতনাম যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতাম। যুক্তরাষ্ট্রে এই বিক্ষোভ আরও ব্যাপক ছিল। বিক্ষোভ প্রদর্শন একটি সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছিল এবং ষাটের দশকের শেষের দিকে ও সত্তরের দশকের শুরুতে সেই বিক্ষোভে কখনো কখনো মার্কিন পতাকা পোড়ানোর ঘটনাও ঘটত। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে এবং ১৯৭১ সালে আমাদের সদ্য জেতা স্বাধীনতা যুদ্ধের অভিজ্ঞতায় পতাকার বিষয়টি আমার কাছে অত্যন্ত আবেগঘন ছিল। তাই কোনো দেশের পতাকা পোড়ানো আমার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়েছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্রে এটি যেভাবে সহ্য করা হয়েছিল, তা আমাকে অত্যন্ত মুগ্ধ করেছিল।
বহু বছর পরে ১৯৮৯ সালে আমি তখন ইউনেস্কোতে কর্মরত, বাংলাদেশে ফিরে একটি ইংরেজি পত্রিকা চালু করার পরিকল্পনা করছিলাম, সেসময়ে মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের একটি ঐতিহাসিক রায়—টেক্সাস বনাম জনসন—সম্পর্কে পড়ি। সেখানে বলা হয়েছিল, রাজনৈতিক প্রতিবাদ হিসেবে জাতীয় পতাকা পোড়ানো যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর অধীনে ‘মতপ্রকাশের স্বাধীনতা’ হিসেবে সুরক্ষিত। আমি সঙ্গে সঙ্গে এই সংশোধনীটি বিস্তারিতভাবে পড়ি এবং এর বিষয়বস্তু দেখে বিস্মিত হই, যেখানে ধর্মীয় স্বাধীনতা, বাকস্বাধীনতা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, সমাবেশের স্বাধীনতাসহ আরও বহু বিষয়ে স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে।
পতাকা পোড়ানোর প্রতিক্রিয়ায় কংগ্রেস ‘ফ্ল্যাগ প্রটেকশন অ্যাক্ট ১৯৮৯’ পাস করলেও যুক্তরাষ্ট্র বনাম আইখম্যান মামলায় মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট তা বাতিল করে দেয়।
এসব রায়ের পর আমি মার্কিন সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর প্রবল অনুরাগী হয়ে উঠি, যা একটি হবু প্রকাশকের জন্য স্বপ্নের মতো ছিল। টমাস জেফারসনের সেই বিখ্যাত মন্তব্যটিও আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। তিনি বলেছিলেন—‘গণআকাঙ্ক্ষাই যেহেতু আমাদের সরকারের ভিত্তি, তাই প্রথম কাজ হওয়া উচিত সেই অধিকার সংরক্ষণ করা; আর যদি আমাকে দুটির মধ্যে বেছে নিতে বলা হয়, সংবাদপত্রবিহীন সরকার নাকি সরকারবিহীন সংবাদপত্র, তবে আমি দেশের জন্যে নিমিষেই পরেরটি নেব’। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার পক্ষে এত শক্তিশালী ও সর্বব্যাপী বক্তব্য বিরল।
যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে আমার যত সমালোচনাই থাকুক না কেন, তাদের সংবিধানের প্রথম সংশোধনী ও জেফারসনের মন্তব্যটি আমার মনে দৃঢ়ভাবে স্থান পেয়েছিল এবং আজও তা একইভাবে আছে। দুঃখজনকভাবে, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রেই সেই মূল্যবোধের অবক্ষয় হচ্ছে। সাংবাদিকদের ‘সবচেয়ে খারাপ’ মানুষ বলা হচ্ছে এবং কোনো প্রমাণ ছাড়াই অনেককে দুর্নীতিগ্রস্ত বলা হচ্ছে। যে দেশটি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার বিকাশে এত বড় অবদান রেখেছে, সেই দেশেই এমন দৃশ্য দেখার জন্য বিশ্ব প্রস্তুত ছিল না।
আমেরিকার সবচেয়ে শক্তিশালী আকর্ষণ—চিন্তার স্বাধীনতা—আজ চাপের মুখে। বিশ্বের সবচেয়ে সম্মানিত মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো, যেগুলো দেশের ভাবমূর্তি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং বিশ্বের সেরা মেধাবীদের আকৃষ্ট করে, সেগুলো এখন অপমানিত হচ্ছে এবং দুর্নীতিগ্রস্ত ও ইহুদিবিদ্বেষী হিসেবে আখ্যা পাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পার্লামেন্ট ক্যাপিটলে সহিংস হামলা এবং পরবর্তীতে সহিংস অপরাধে দণ্ডিতদের মুক্তি দেওয়া, যাদের মধ্যে পুলিশ হত্যাকারীও ছিল, সেটা আইনের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সম্মানকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। নাগরিকদের বিরুদ্ধে আইস (ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট) ব্যবহার করা হচ্ছে। সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে তাদের হাতে অন্তত আটজনের মৃত্যু হয়েছে। এই কাজের মাধ্যমে সংবিধানে বর্ণিত ‘জীবনের অধিকার’-এর ওপর জনআস্থা ভেঙে পড়ছে।
বিশ্বের নানা প্রান্তের অভিবাসীদের সমন্বয়ে শুরু থেকেই গড়ে ওঠা বহুসাংস্কৃতিক সমাজ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের মৌলিক পরিচয় এখন অনেক সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিতে রূপান্তরিত হচ্ছে, যা সেই দেশেই ক্রমবর্ধমান বর্ণবাদের বিষয়ে উদ্বেগজনক প্রশ্ন তুলছে। অথচ এই দেশকেই একসময় বিশ্বের ‘মেল্টিং পট’ হিসেবে প্রশংসা করা হতো। ক্ষমতার কেন্দ্রগুলোর মধ্যে ‘চেক অ্যান্ড ব্যালান্স’-এর ধীরে ধীরে ক্ষয় এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসনের অবক্ষয়—সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব কর্মকাণ্ডেই তার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৫০ বছরে এসে উদযাপনের তেমন কিছু নেই বলেই মনে হয়। কারণ আমেরিকানরাই যেন ভুলে গেছেন কেন একসময় বিশ্ব তাদের এত শ্রদ্ধা করত। সব আমেরিকান তো দূরের কথা, প্রতিটি কংগ্রেসম্যান, সিনেটর, নেতা ও প্রশাসনিক কর্মকর্তারা ১৭৭৬ সালের স্বাধীনতার ঘোষণা এবং ১৭৮৯ সালে পাস হওয়া মার্কিন সংবিধানের নীতিমালাগুলো পুরোপুরি জানেন কি না আমার সন্দেহ আছে। এই সংবিধান প্রণয়নে জেমস ম্যাডিসন, বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিন, আলেকজান্ডার হ্যামিলটন ও জর্জ ওয়াশিংটনের মতো বরেণ্য ব্যক্তিরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। এটি এমন অগ্রণী দলিলগুলোর একটি, যা সরকারের তিনটি স্বতন্ত্র শাখা—আইন, নির্বাহী ও বিচার বিভাগ—প্রতিষ্ঠা করে এবং ক্ষমতার সব কেন্দ্রের মধ্যে ভারসাম্য ও নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করে। ১৭৯১ সালে অনুমোদিত প্রথম ১০টি সংশোধনী, যা ‘বিল অব রাইটস’ নামে পরিচিত, আজও যেকোনো সংবিধানে গৃহীত সবচেয়ে অনুপ্রেরণামূলক ও মূল্যবান দলিলগুলোর মধ্যে অন্যতম।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাকালীন নীতিমালাগুলোকে এত তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে সেই সময়ের বাস্তবতা। সেগুলো উদ্ভূত হয়েছিল এমন সময়, যখন বিশ্ব ছিল রাজতন্ত্র, সাম্রাজ্যবাদ ও বংশানুক্রমিক শাসনের দখলে। সেটি ছিল একইসঙ্গে ঔপনিবেশিকতার যুগ। ১৭৯১ সালের মধ্যে কুইবেক প্রদেশসহ উত্তর আমেরিকার অন্যান্য অঞ্চল এবং ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জের কিছু অংশ শাসন করছিল ব্রিটেন। পাশাপাশি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মাধ্যমে ভারতে দ্রুত তাদের শাসন বিস্তার করেছিল। লাতিন আমেরিকার অধিকাংশ, মেক্সিকো, ফ্লোরিডা ও ফিলিপাইন শাসন করত স্পেন। ব্রাজিল নিয়ন্ত্রণ করত পর্তুগাল। একইসঙ্গে আফ্রিকা ও এশিয়ায় বাণিজ্যকেন্দ্র ছিল পর্তুগালের। ক্যারিবীয় অঞ্চলে ফ্রান্সেরও উপনিবেশ ছিল। ডাচ প্রজাতন্ত্র ও সুইস কনফেডারেশন ছাড়া কোথাও প্রতিনিধিত্বশীল সরকারের সামান্যতম অস্তিত্বও ছিল না।
সেই সময়ের তুলনায় আমেরিকার স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার নেতা ও মার্কিন সংবিধানের প্রণেতারা ছিলেন বিস্ময়করভাবে গণতান্ত্রিক, অসাধারণ দূরদর্শী এবং অত্যন্ত জনমুখী। তাদের এই উদ্যোগ বিশ্বজুড়ে প্রতিনিধিত্বশীল ও জবাবদিহিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠার সূচনা করে। এসব দলিলে অন্তর্ভুক্ত ধারণাগুলো ফরাসি বিপ্লব, লাতিন আমেরিকার স্বাধীনতা আন্দোলন এবং বিশ্বব্যাপী উপনিবেশবিরোধী আন্দোলনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। এমনকি আমাদের ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার ঘোষণাও অনেকাংশে যুক্তরাষ্ট্রের সেই অভিজ্ঞতা ও নীতিমালা থেকে অনুপ্রাণিত ছিল।
তবে এসব মূল্যবোধ ও নীতির মধ্যে একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব বিদ্যমান ছিল। সার্বজনীন সমতার ধারণার পাশাপাশি দাসপ্রথাও টিকে ছিল। আদিবাসী জনগোষ্ঠী ও নারীদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা এবং নেটিভ আমেরিকানদের ভূমি থেকে উৎখাত করা—এসব মিলিয়ে এক লজ্জাজনক দ্বৈত মানদণ্ডের উদাহরণ তৈরি হয়।
এই বৈপরীত্যের সবচেয়ে বড় উদাহরণ স্বাধীনতার প্রায় এক শতাব্দী পর, মার্কিন গৃহযুদ্ধ (১৮৬১-১৮৬৫) পর্যন্ত দাসপ্রথা অব্যাহত থাকা। প্রতিষ্ঠাকালীন নীতির এই বিশ্বাসঘাতকতা সবচেয়ে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে আদিবাসী জনগোষ্ঠী—নেটিভ আমেরিকানদের প্রতি আচরণে। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রেই তাদের ‘নির্মম ইন্ডিয়ান বর্বর’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল, যা তৎকালীন বর্ণবাদী ও ঔপনিবেশিক মানসিকতার প্রতিফলন। নিয়মিত মারধর, ভূমি থেকে উচ্ছেদ, বসতভিটা ধ্বংস—সব মিলিয়ে একটি জনগোষ্ঠীকে প্রায় নিশ্চিহ্ন করে ফেলার প্রক্রিয়া চলেছে। ১৮৬৫ সালে ১৩তম সংশোধনী গৃহীত হওয়ার মাধ্যমে দাসপ্রথা বিলুপ্ত হয়। নেটিভ আমেরিকানরা নাগরিকত্ব পায় ১৯২৪ সালে। বর্ণভিত্তিক বিভাজন তো বন্ধ হলো এই সেদিন মাত্র।
মার্কিন নারীরা ভোটাধিকার পেয়েছে ১৯২০ সালে ১৯তম সংশোধনীর মাধ্যমে—প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ারও দুই বছর পর এবং দীর্ঘদিন ভোটাধিকার আন্দোলনের পরে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্ব দ্রুত এগিয়ে গেলে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ও শক্তিশালী পরিবর্তন-স্রষ্টা হিসেবে আবির্ভূত হয়। ফ্যাসিবাদের ধ্বংস এবং নাৎসি সামরিক শক্তির সম্পূর্ণ পরাজয় (এবং ইহুদিদের ভয়াবহ গণহত্যা) যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে গণতন্ত্র ও বৈশ্বিক সমৃদ্ধি গড়ে তোলার এক অনন্য সুযোগ সৃষ্টি করেছিল।
কিন্তু শীতল যুদ্ধের আবির্ভাব সবকিছু বদলে দেয়। পুঁজিবাদী ও সমাজতান্ত্রিক ব্লকের আদর্শিক প্রতিযোগিতা শীতল যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রকে স্বৈরাচারী, নির্মম ও দুর্নীতিগ্রস্ত শাসনব্যবস্থাকে সমর্থন করতে প্রণোদিত করে—কেবল তারা কমিউনিজমবিরোধী হওয়ায়। ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানে জেনারেল আইয়ুবের অভ্যুত্থানকে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন দেয়, ফলে পাকিস্তানে গণতন্ত্রের সম্ভাবনা নষ্ট হয়—কারণ তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কমিউনিজমবিরোধী কৌশলের অংশ হতে রাজি হয়েছিলেন। ভিয়েতনাম, আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া ও সিরিয়ায় যুদ্ধগুলো প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ারের ভাষায় তথাকথিত ‘সামরিক-শিল্প জটিলতা’-কে আরও শক্তিশালী করে।
ধারণা করা হয়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ৫০টিরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক হস্তক্ষেপ চালিয়েছে—যার মধ্যে কয়েক দিনের স্বল্পমেয়াদি অভিযান থেকে শুরু করে কয়েক দশকব্যাপী দীর্ঘ যুদ্ধও রয়েছে। কংগ্রেশনাল রিসার্চ সার্ভিসের তথ্যমতে, ১৭৯৮ সাল থেকে বিদেশে মার্কিন সশস্ত্র বাহিনী ব্যবহারের ৪৬৯টি ঘটনার কথা জানা যায়। যেমন: মেক্সিকান-আমেরিকান যুদ্ধ, স্প্যানিশ-আমেরিকান যুদ্ধ, ফিলিপাইন-আমেরিকান যুদ্ধ এবং গ্রানাডা ও পানামা আক্রমণ। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে চলা ভিয়েতনাম যুদ্ধ ও আফগানিস্তান যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির মর্যাদাকে উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ইরাক ও লিবিয়ায় ‘গণবিধ্বংসী অস্ত্র’ (ডব্লিউএমডি) থাকার মিথ্যা অজুহাতে পরিচালিত আগ্রাসন যুক্তরাষ্ট্রকে এক যুদ্ধপ্রবণ রাষ্ট্র হিসেবে উপস্থাপন করেছে।
কিছু গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ৫০টি দেশ ও অঞ্চলে ১২০-১৩০টি বড় আকারের সামরিক ঘাঁটি পরিচালনা করে। আরও বিস্তৃত হিসাব অনুযায়ী—যেখানে ছোট স্থাপনা, লজিস্টিক হাব এবং সমন্বিত নিরাপত্তা কেন্দ্রগুলো অন্তর্ভুক্ত—মোট সামরিক স্থাপনার সংখ্যা প্রায় ৭৫০, যা প্রায় ৮০টি দেশ ও অঞ্চলে বিস্তৃত।
১৭৭৬ সালে জন্মলগ্নে যুক্তরাষ্ট্র গণতান্ত্রিক ও নৈতিক মূল্যবোধের প্রতিনিধিত্ব করেছিল। কিন্তু আজ তা ক্রমেই নিজের সামরিক শক্তি এবং অন্যান্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ, প্রভাব বিস্তার ও নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতার প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়ে উঠেছে। ১৯৪৫ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব নাটকীয়ভাবে বিস্তৃত হয়। বিশ্ব শিল্প উৎপাদনের প্রায় অর্ধেক তাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল, তাদের সামরিক শক্তি ছিল বিশ্বে সর্বশ্রেষ্ঠ এবং তাদের ‘ডলার’ হয়ে ওঠে বিশ্বের প্রধান মুদ্রা। জাতিসংঘ, আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক ও ন্যাটো প্রতিষ্ঠায় তারা নেতৃত্ব দেয়। পরবর্তী দশকে—১৯৯০ থেকে ২০০০—এই প্রাধান্য অব্যাহত থাকে। তবে ২০০১ সালের পর থেকে তুলনামূলকভাবে একধরনের পতন শুরু হয়েছে। আজও যুক্তরাষ্ট্র শক্তিশালী, কিন্তু প্রতিযোগিতামূলক অগ্রগামিতা ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে।
বিশ্বের অধিকাংশ দেশই দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলিদের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনকে মেনে নিয়েছিল। কিন্তু গাজায় বসবাসরত ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে গণহত্যা পরিচালনায় সহায়তা যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য নিয়ে মৌলিক প্রশ্ন তুলেছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরায়েলে হামলার জন্য হামাস অবশ্যই নিন্দার যোগ্য। কিন্তু এই অজুহাতে ৭৩ হাজারেরও বেশি মানুষকে হত্যা এবং ১ লাখ ৭০ হাজারেরও বেশি মানুষকে আহত করার বৈধতা কি দেওয়া যায়? গাজার মানুষকে খাদ্য, পানি, বিদ্যুৎ ও চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত করাও কি গ্রহণযোগ্য? প্রায় তিন বছর ধরে এই পরিস্থিতি চলছে, যেখানে গাজার বাসিন্দারা খুবই সামান্য সহায়তা পাচ্ছেন। এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সংঘটিত সবচেয়ে ভয়াবহ নৃশংসতার মধ্যে অন্যতম হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। এই গণহত্যায় অস্ত্র, গোলাবারুদ ও অর্থ সরবরাহের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা তার বৈশ্বিক নীতি ও নৈতিক অবস্থান নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উত্থাপন করেছে।
ইরানের ওপর সাম্প্রতিক হামলার প্রভাব ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে এবং এটি কতটা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থে কাজ করেছে—সে প্রশ্ন আমেরিকানদের নিজেদেরই করা উচিত।
শেষ করতে চাই আরেকটি প্রশ্ন তুলে: কে আমেরিকান?
একটি হিসাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যার প্রায় ৫৭ দশমিক ৫ শতাংশ শ্বেতাঙ্গ, ২০ শতাংশ হিস্পানিক, ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ আফ্রিকান-আমেরিকান, ৬ দশমিক ৭ শতাংশ এশীয় এবং ১ দশমিক ৪ শতাংশ নেটিভ আমেরিকান। বংশগত উৎসের বিচারে—জাতিগত পরিচয়ের বাইরে—এই জনসংখ্যা জার্মান, আইরিশ, ইংরেজ, মেক্সিকান, ইতালীয়, আফ্রিকান-আমেরিকান, পোলিশ, ফরাসি, ভারতীয়, চীনা, ফিলিপিনো, ভিয়েতনামি, পুয়ের্তো রিকানসহ অসংখ্য উৎস থেকে গঠিত। এটি এক অসাধারণ সম্পদ। এমন বৈচিত্র্যের কাছে পৃথিবীর আর কোনো দেশই পৌঁছাতে পারবে না।
তাই প্রশ্ন হচ্ছে—যুক্তরাষ্ট্র কি তার অভ্যন্তরীণ বন্ধন, যা সেই দেশটিকে আজকের অবস্থানে নিয়ে এসেছে, এটিকে আরও দৃঢ় করে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে? নাকি সেই কাঠামোতেই ফাটল ধরাবে?
আমাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তিতে এটাই সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন।
মাহফুজ আনাম: সম্পাদক ও প্রকাশক, দ্য ডেইলি স্টার