এইচএসসি পরীক্ষা: শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার সংকেত আমাদের কী বার্তা দিচ্ছে?
সারা দেশে চলছে উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষা। প্রতি বছরের মতো এবারও লাখো শিক্ষার্থী নতুন স্বপ্ন, প্রত্যাশা ও অনিশ্চয়তাকে সঙ্গে নিয়ে পরীক্ষার হলে বসেছে। এই পরীক্ষা শুধু একটি পাবলিক পরীক্ষা নয়, বরং একজন শিক্ষার্থীর বিশ্ববিদ্যালয়, কর্মজীবন ও ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সোপান।
কিন্তু এবারের পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগেই একটি বিষয় দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নিবন্ধিত শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়নি। গত ২ জুলাই প্রথম আলোতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একাদশ শ্রেণিতে নিবন্ধিত নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৬ শতাংশ এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে না। তারা ফরমই পূরণ করেনি। অর্থাৎ প্রায় সাড়ে ৫ লাখ শিক্ষার্থী এবারের এইচএসসি পরীক্ষার বাইরে রয়েছে।
এটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার বর্তমান বাস্তবতা নিয়ে নতুন করে ভাবার একটি উপলক্ষ।
এমনকি খোদ শিক্ষামন্ত্রীও এই সংখ্যাকে ‘খুব খারাপ ইন্ডিকেটর’ উল্লেখ করে বলেছেন, এবারের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ‘মাদ্রাসায় ৪৪ শতাংশ, কারিগরিতে ৫৪ শতাংশ ও সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের আওতায় ৩৩ শতাংশ ঝরে গেছে। এটা বড় সংখ্যা।’ (প্রথম আলো) সাধারণত এই হার ১০ থেকে ১৫ শতাংশের মধ্যে থাকে।
কেন একজন শিক্ষার্থী এতদূর এসে, দীর্ঘ শিক্ষাজীবন অতিক্রম করার পরও শেষ মুহূর্তে পরীক্ষার বাইরে থেকে যাচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের কেবল পরীক্ষার ফলাফল নয়, পুরো শিক্ষাব্যবস্থার দিকে তাকাতে হবে।
গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা একের পর এক বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। করোনা মহামারিতে দীর্ঘ সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। অনেক শিক্ষার্থীর শেখার ধারাবাহিকতা ভেঙে গেছে। অনলাইন শিক্ষা চালু হলেও দেশের সব শিক্ষার্থী সমানভাবে সেই সুযোগ পায়নি। শহর ও গ্রামের মধ্যে প্রযুক্তিগত বৈষম্য, আর্থিক সীমাবদ্ধতা ও মানসম্মত শিক্ষার অভাব বহু শিক্ষার্থীকে পিছিয়ে দিয়েছে।
পরবর্তীতে বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও পারিবারিক অর্থনৈতিক সংকটও অনেক শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। কেউ পরিবারকে সহায়তা করতে কাজে নেমেছে, কেউ পড়াশোনা থেকে ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, আবার কেউ মানসিকভাবে এতটাই ভেঙে পড়েছে যে পরীক্ষার মুখোমুখি হওয়ার সাহস হারিয়ে ফেলেছে।
আজকের শিক্ষার্থীরা এমন এক পৃথিবীতে বেড়ে উঠছে, যেখানে তথ্যের অভাব নেই, কিন্তু মনোযোগের অভাব প্রকট। একটি স্মার্টফোনের মাধ্যমে তারা কয়েক সেকেন্ডেই পুরো পৃথিবীর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। কিন্তু একইসঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, শর্ট ভিডিও, গেমিং ও অবিরাম ডিজিটাল বিনোদন তাদের মনোযোগকে ক্রমাগত খণ্ডিত করছে। এটি শুধু বাংলাদেশের নয়, বিশ্বব্যাপী শিক্ষাবিদদের মতে একটি বড় উদ্বেগের বিষয়।
এর অর্থ এই নয় যে বর্তমান প্রজন্ম অমনোযোগী বা অযোগ্য। বরং তারা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় প্রযুক্তিগতভাবে বেশি দক্ষ, দ্রুত শেখার সক্ষমতা রাখে এবং নতুন ধারণা গ্রহণে অনেক বেশি উন্মুক্ত। কিন্তু এই সম্ভাবনাকে সঠিক পথে পরিচালিত করার মতো শিক্ষা পরিবেশ, পারিবারিক সহায়তা এবং ইতিবাচক দিকনির্দেশনা সবসময় তারা পায় না।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় এখনো পরীক্ষার ফলাফলকে সাফল্যের একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একজন শিক্ষার্থীর সৃজনশীলতা, নেতৃত্বের গুণ, যোগাযোগ দক্ষতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা কিংবা মানসিক সুস্থতাকে তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে অনেক শিক্ষার্থী নিজেদের ব্যর্থ মনে করে। অথচ, তাদের মধ্যে অন্যক্ষেত্রে অসাধারণ সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকতে পারে।
অভিভাবকদেরও এই বাস্তবতা নতুনভাবে উপলব্ধি করতে হবে। সন্তানের প্রতি অতিরিক্ত প্রত্যাশা, অন্যের সঙ্গে তুলনা ও কেবল নম্বরকেন্দ্রিক চাপ অনেক সময় শিক্ষার্থীর আত্মবিশ্বাস নষ্ট করে দেয়। একজন শিক্ষার্থীর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন নিরাপদ, সহানুভূতিশীল ও উৎসাহব্যঞ্জক পারিবারিক পরিবেশ।
একইভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকেও শুধু পাঠদান নয়, শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য, ক্যারিয়ার পরিকল্পনা এবং জীবনদক্ষতা উন্নয়নের ওপর সমান গুরুত্ব দিতে হবে। আজকের পৃথিবীতে কেবল পাঠ্যবই মুখস্থ করলেই সফল হওয়া যায় না। প্রয়োজন সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, যোগাযোগের ক্ষমতা ও পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার মানসিকতা।
নীতিনির্ধারকদের জন্যও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। শুধু পরীক্ষার ফল প্রকাশ কিংবা পাসের হার নিয়ে আলোচনা করলেই হবে না। আমাদের জানতে হবে, কতজন শিক্ষার্থী মাঝপথে ঝরে যাচ্ছে, কেন ঝরে যাচ্ছে এবং তাদের ফিরিয়ে আনার জন্য কী ধরনের নীতি ও কার্যক্রম প্রয়োজন। কারণ, একজন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অনুপস্থিত থাকা মানে শুধু একটি খালি আসন নয়; এর পেছনে থাকতে পারে একটি পরিবারের ভেঙে যাওয়া স্বপ্ন, একটি সম্ভাবনাময় জীবনের থেমে যাওয়া পথচলা।
এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে আলোচনা যেন কেবল প্রশ্নপত্র, পাসের হার কিংবা জিপিএ-৫-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। আমাদের আলোচনার কেন্দ্রে আসুক শিক্ষার্থী, তার শেখার পরিবেশ, মানসিক সুস্থতা, দক্ষতা অর্জন ও ভবিষ্যতের প্রস্তুতি।
বাংলাদেশ আজ জনসংখ্যাগত সুবিধার এক গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই তরুণ জনগোষ্ঠীই দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি। কিন্তু তাদের একটি অংশ যদি শিক্ষা থেকে ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তাহলে সেটি শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, জাতীয় উন্নয়নের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
এইচএসসি পরীক্ষা তাই শুধু একটি বার্ষিক পরীক্ষা নয়; এটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার আয়না। সেই আয়নায় আমরা কী দেখছি, কী শিখছি এবং কী পরিবর্তন আনছি, তার ওপরই নির্ভর করবে আগামী বাংলাদেশের মানসম্মত মানবসম্পদ গড়ে তোলার সাফল্য।
যারা পরীক্ষার হলে বসেছে, তাদের জন্য শুভকামনা। আর যারা কোনো কারণে পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি, তাদের প্রতিও আমাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। কারণ, একটি জাতির প্রকৃত অগ্রগতি তখনই নিশ্চিত হয়, যখন সে তার প্রতিটি শিক্ষার্থীর সম্ভাবনাকে মূল্য দেয় এবং কাউকে পিছিয়ে পড়তে দেয় না।
মো. তরিকুল ইসলাম: লেখক, কলামিস্ট, শিক্ষা পরামর্শক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
mtislam.ca@gmail.com