কেন মানুষ গুজব ছড়ায়?

উসামা রাফিদ

গত ১৬ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের একজন অধ্যাপকের সোশ্যাল মিডিয়ায় করা পোস্টের স্ক্রিনশট ভাইরাল হয়ে পড়ে, যেখানে তিনি দুই বছর আগে হওয়া জুলাই আন্দোলনের অন্যতম আলোচিত ছবি, যেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরই একজন শিক্ষার্থীর রক্তমাখা মুখ দেখা যায়, সেটি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ফটোকার্ড দেখে ক্যাপশনে লেখেন শিক্ষার্থীটি বড় ভাইয়ের কথা শুনে মুখে টমেটো সস মেখে এসেছিলেন। ক্যাপশনের শেষে তিনি জুড়ে দেন, ‘এও কি সত্যি?’ প্রশ্ন।

এখানে সরাসরি গুজব না ছড়ালেও তিনি খানিকটা সন্দেহ প্রকাশ করেছেন, যাতে গুজব ছড়ানোর সম্পূর্ণ দায়টা নিজের ঘাড়ের ওপর না পড়ে। প্রোপাগান্ডা বা গুজব ছড়িয়ে দেওয়ার ক্লাসিক উপায় হিসেবে বহুদিন ধরেই ব্যবহার হয়ে এসেছে এটি।

পোস্টটির নিচে অনেকেই মন্তব্য করেছেন, কীভাবে একজন শিক্ষিত মানুষ, বিশেষ করে যে বিভাগের কাজই হলো তথ্য যাচাই করা, ফ্যাক্ট-চেক করার মতো প্রশিক্ষিত ব্যক্তিদের তৈরি করা, সে বিভাগেরই একজন শিক্ষক কীভাবে এ ধরনের কাজ করতে পারেন, যখন তিনি খুব সহজেই তথ্যটির সত্য-মিথ্যা যাচাই করতে পারতেন। অনেকেই মনে করেন, তথ্য যাচাই করার দক্ষতাই মানুষকে গুজব থেকে বাঁচাতে পারে। কিন্তু আসলেই কি তা-ই? তথ্য যাচাই করার দক্ষতা থাকলে কি মানুষ গুজব ছড়ায় না? মনস্তত্ত্ব নিয়ে গবেষণা বলছে ভিন্ন কথা।

এই প্রবণতাকে সবচেয়ে সহজে যে শব্দবন্ধ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় তা হলো: মোটিভেটেড রিজনিং। ১৯৯০ সালে জিভা কুন্দা তার বিখ্যাত ‘দ্য কেস ফর মোটিভেটেড রিজনিং’ নিবন্ধে তুলে ধরেন মানুষ মূলত দুইভাবে তথ্য গ্রহণ করতে পারে। প্রথমটি হলো অ্যাকুরেসি-মোটিভেটেড রিজনিং, যেখানে উদ্দেশ্য হলো সঠিক তথ্য কী সেটা খুঁজে বের করা। দ্বিতীয়টি হলো ডিরেকশনাল বা গোল-মোটিভেটেড রিজনিং, যেখানে ব্যক্তি তথ্যের সত্যতা নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামায় না। এখানে উদ্দেশ্য থাকে: তথ্যটি তার ইতোমধ্যেই গড়ে ওঠা মত-বিশ্বাস-ভাবাদর্শের সঙ্গে মেলানো এবং সে অনুযায়ী উপসংহারে পৌঁছানো।

ধরা যাক, কোনো তথ্য তার বিশ্বাসের সঙ্গে খুব সহজেই মিলে যাচ্ছে, তখন তিনি খুব সহজেই সেটিকে বিশ্বাস করেন, সেটাকে কোনো ধরনের যাচাই-বাছাই ছাড়াই। আবার, যখন কোনো তথ্য তার বিশ্বাস বা ভাবাদর্শের সঙ্গে না মেলে, তখন তিনি নানাভাবে এই তথ্যের খুঁত বের করার চেষ্টা করেন: কে এটি লিখেছে, তার উদ্দেশ্য কী, তিনি কোন রাজনৈতিক দল বা মতবাদে বিশ্বাসী, এই লেখার মূল সোর্স কী, ডেটাতে কোনো ভুল আছে কি না, কারা এই লেখা প্রকাশ করেছে—এমন নানা বিষয়।

যেমন: ওই পোস্টের কমেন্টেই অনেক মন্তব্যকারি প্রশ্ন করেছেন—কেন শিক্ষার্থীটির চশমা ভাঙলো না, কেন মুখে ক্ষত তৈরি হলো না, অথবা রক্ত গড়িয়ে কেন কাপড়ে লাগলো না। এরপর যখন শিক্ষার্থীটি তার সেলাই করা ক্ষতস্থানের ছবি শেয়ার করলো, তার নিচেই আবার অনেকে মন্তব্য করেছেন—কয়েকটি ছবিতে মুখের ডানপাশে আঘাত আবার কয়েকটি ছবিতে মুখের বামপাশে আঘাতের চিহ্ন কেন? অর্থাৎ, যতই আপনার সামনে প্রমাণ নিয়ে আসা হোক না কেন, আপনি ঠিক সেই তথ্যটিই গ্রহণ করবেন, যেটি আপনার ইতোমধ্যেই প্রতিষ্ঠিত মতামতের পক্ষে যায়, এর বিপক্ষের বিষয়টি নয়।

এর ১৬ বছর পর ইয়েল ল’ স্কুলের গবেষক ড্যান কাহান তার কালচারাল কগনিশন প্রজেক্টে এই মোটিভেটেড রিজনিংয়ের গবেষণাকে আরও এক ধাপ সামনে এগিয়ে নিয়ে যান। তিনি আইডেন্টিটি-প্রোটেক্টিভ কগনিশন বলে আরেকটু নতুন ধারণা সামনে নিয়ে আসেন। তিনি দেখতে পান, মানুষ সাধারণত এমন তথ্যই শেয়ার করে যা তার রাজনৈতিক মতাদর্শ বা বিভিন্ন ইস্যুতে নিজস্ব অবস্থানকে শক্ত করে। অর্থাৎ, এখানে তথ্যের সত্যতা মূল বিষয় নয়; তথ্য শেয়ার করে মূলত তিনি তার মতাদর্শকেই জানান দেন এবং নিজের আইডেন্টিটি বা পরিচয়কে সুরক্ষা দেন। যে তথ্য তার রাজনৈতিক বা আদর্শিক বিশ্বাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, তিনি কখনোই সেটি গ্রহণ করবেন না, সেটি যতই সত্যি হোক না কেন। কারণ এই তথ্য তার বিশ্বাস এবং সর্বোপরি তার পরিচয়ের ওপরই আঘাত হানে।

কাহান এটিও দেখতে পান যে, যাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা বেশি, অর্থাৎ যারা ‘স্মার্ট’, তাদের মধ্যে মোটিভেটেড রিজনিং করার সামর্থ্যও বেশি। তখন তারা বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত হাজির করে খুব দ্রুত এমন সিদ্ধান্তে উপনীত হন, যেটা সরাসরি তাদের রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে মিলে যায়। আবার তারা একইভাবে তাদের মতাদর্শের বিরুদ্ধে যায়, এমন তথ্যও খুব দ্রুত ছুঁড়ে ফেলে দেন। এর কারণ হলো: ভুল তথ্য বিশ্বাস করা বা ছড়িয়ে দেওয়ার ফলে ব্যক্তিগতভাবে তার খুব একটা ক্ষতি হয় না, কিন্তু তার পরিচয় বা বিশ্বাসের বিরুদ্ধে যায় এমন তথ্য মেনে নেওয়া তার পুরো অস্তিত্বকেই হুমকির মুখে ফেলে দেয়। ফলে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই তথ্যের সত্যতা খোঁজার চেয়ে নিজের পরিচয় আর বিশ্বাসকেই সুরক্ষা দেওয়ার দিকে ঝোঁকে এবং গুজব বা ভুল তথ্য ছড়ায়।

ফলে মিডিয়া লিটারেসি বাড়ালেই যে মানুষের মধ্যে তথ্য যাচাই-বাছাই করার প্রবণতা বাড়বে, এমন প্রচলিত ধারণা আসলে বাস্তবে কাজ করে না। মানুষ সেটাই গ্রহণ করে, যেটা তার মতের পক্ষে যায়। মিডিয়া লিটারেসি সম্পর্কিত প্রশিক্ষণগুলোতেও দেখা গেছে যে, প্রশিক্ষণের সময় মানুষ হয়তো ঠিকই তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে পারে এবং এর মাধ্যমে তথ্য যাচাই করার দক্ষতাও বাড়ে, কিন্তু স্বাভাবিক অবস্থায়, দৈনন্দিন জীবনে ব্যক্তি কখনোই এটি প্র্যাকটিস করে না। সে ফিরে যায় তার মতাদর্শ-বিশ্বাসনির্ভর তথ্য গ্রহণের দিকেই।

ভুল তথ্য মোকাবিলার আরেকটা খুব প্রচলিত উপায় হলো ফ্যাক্ট-চেকিং। গবেষণা বলছে, ফ্যাক্ট-চেকিং রিপোর্ট দেখার পর মানুষ সাময়িকভাবে ওই নির্দিষ্ট ভুল তথ্যটি বিশ্বাস করা বন্ধ করে ঠিকই। কিন্তু এর প্রভাব খুব একটা স্থায়ী হয় না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস পর মানুষ আবার সেই পুরোনো ভুল বিশ্বাসেই ফিরে যায়। বিশেষ করে রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর ইস্যুগুলোতে ফ্যাক্ট-চেকিং প্রায় কাজই করে না। কারণ মানুষ তখন তথ্যের চেয়ে তার দলীয় পরিচয়কে বেশি গুরুত্ব দেয়।

২০১০ সালে ওয়েপন্স অব ম্যাস ডেস্ট্রাকশনের ওপর ভিত্তি করে করা গবেষণায় ব্রেন্ডান নাইহান এবং জেসন রাইফলার এই প্রবণতার নাম দিয়েছেন ‘ব্যাকফায়ার ইফেক্ট’। এখানে মানুষ ফ্যাক্ট-চেকিং রিপোর্ট দেখার পর সেই ভুল বিশ্বাসকে আরও বেশি বিশ্বাস করে। কারণ এটা তার পরিচয়কে হুমকির মুখে ফেলে দেয় এবং নিজের পরিচয়কে আঁকড়ে ধরার জন্য এই কাজ করে। তবে পরবর্তীতে অন্যান্য গবেষণায় দেখা গেছে, এই ব্যাকফায়ার ইফেক্ট বাস্তবে খুব কমই দেখা যায়। অর্থাৎ, ফ্যাক্ট-চেকিংয়ের প্রভাব থাকলেও তা সীমিত পর্যায়ের।

তবে এর সমাধান কী হতে পারে? বর্তমানে যে বিষয়গুলো নিয়ে গবেষণা হচ্ছে, তার মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো প্রিবাঙ্কিং। কোনো ভুল তথ্য ছড়ানোর আগেই মানুষকে সে ধরনের মিথ্যা যুক্তির কৌশল সম্পর্কে সচেতন করে দেওয়া। মনোবিজ্ঞানী উইলিয়াম ম্যাকগুয়ারের ‘ইনওকুলেশন তত্ত্ব’ অনুযায়ী, মানুষকে যদি আগেভাগেই জানানো যায় যে অমুক ধরনের তথ্যের মাধ্যমে তাকে ম্যানিপুলেট করা হতে পারে, তবে তারা পরে সেই আসল ভুল তথ্যের মুখোমুখি হলে তা সহজে বিশ্বাস করে না। এর প্রভাব ফ্যাক্ট-চেকিংয়ের চেয়ে বেশি স্থায়ী হয়। এটি হয়তো সব সমস্যার সমাধান নয়, কিন্তু বর্তমানে যে পদ্ধতিগুলো আছে তার মধ্যে এটি অন্যতম কার্যকর।

আরেকটি উপায় হলো: বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষকে সরাসরি এক প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসা। এর ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ফলে ক্রমেই বাড়তে থাকা মেরুকরণের প্রভাব কিছুটা কমে আসে। বিপক্ষ মতাদর্শের ব্যক্তিদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার ফলে গ্রুপ-আইডেন্টিটি রক্ষা করার বদলে সঠিক তথ্য খুঁজে বের করা এবং আপস করাই তখন মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়।

উসামা রাফিদ: প্রভাষক, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস (ইউল্যাব)