রাজনৈতিক যোগাযোগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব

সাজ্জাদ সাব্বির
সাজ্জাদ সাব্বির

রাজনৈতিক যোগাযোগের ইতিহাসে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন মাত্রা যোগ করেছে প্রযুক্তি। পোস্টার ও মাইকিং থেকে শুরু করে রেডিও ঘরে পৌঁছে দিয়েছিল নেতার কণ্ঠকে। রাজনীতিকে দৃশ্যমান করেছিল টেলিভিশন এবং রাজনীতিকে দ্বিমুখী করেছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম।

রাজনৈতিক যোগাযোগের তত্ত্বে মার্শাল ম্যাকলুহানের বিখ্যাত ধারণা ছিল, মাধ্যম নিজেই বার্তার অংশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আসার পর রাজনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যম বদলেছিল, ফলে রাজনীতির ভাষা, গতি ও দর্শকও বদলেছিল। পোস্টার থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যন্ত রাজনৈতিক যোগাযোগের এই বিবর্তন নাগরিক অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়িয়েছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এসে সেই ধারায় আরেকটি মৌলিক পরিবর্তন এনেছে। এখন রাজনৈতিক বার্তা তৈরি, ব্যক্তিভেদে বদলে দেওয়া, ভোটারের মনোভাব বিশ্লেষণ, প্রচারণার উপকরণ বানানো এবং প্রতিপক্ষকে ঘিরে কৃত্রিম তথ্য ছড়ানো পর্যন্ত অনেক কাজ অটোমেশনের আওতায় আসছে।

রাজনৈতিক যোগাযোগের গবেষক ক্লাস দে ভ্রেসে এবং ফাবিও ভোটা দেখিয়েছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একইসঙ্গে প্রচারণা, রাজনৈতিক সাংবাদিকতা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সুপারিশ ব্যবস্থা ও নাগরিকের তথ্য গ্রহণের ধরন বদলে দিচ্ছে।

ক্লাসিক রাজনৈতিক যোগাযোগে প্রার্থীর ব্যক্তিত্ব, বিশ্বাসযোগ্যতা ও বক্তব্য ছিল প্রভাব বিস্তারের প্রধান উপাদান। কিন্তু এখন একটি বড় ভাষা মডেল কয়েক সেকেন্ডে একই নীতির পক্ষে শত শত যুক্তি তৈরি করতে পারে। একজন প্রার্থীর প্রচারক যেখানে দিনে কয়েকশ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন, একটি এআই ব্যবস্থা একই সময়ে অসংখ্য মানুষের জন্য আলাদা কথোপকথন তৈরি করতে পারে।

২০২৩ সালে মার্কিন কংগ্রেস প্রার্থী শামেইন ড্যানিয়েলসের প্রচারণায় ব্যবহৃত ‘অ্যাশলি’ ছিল এর একটি প্রাথমিক উদাহরণ। এটি ছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পরিচালিত রাজনৈতিক ফোনকর্মী, যা একই সময়ে অসংখ্য ভোটারের সঙ্গে ব্যক্তিগত কথোপকথন চালাতে পারত। ভোটারের পরিচিতি ও আগ্রহ বিশ্লেষণ করে কথোপকথনের বিষয়ও বদলাতে পারত। ২০টিরও বেশি ভাষায় কথা বলার সক্ষমতার বিষয়েও নির্মাতারা জানিয়েছিলেন।

রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রচলিত স্বয়ংক্রিয় ফোনবার্তার মতো আগে থেকে রেকর্ড করা বক্তব্য না শুনিয়ে ‘অ্যাশলি’ তাৎক্ষণিক কথোপকথন চালাতে পারত।

বাস্তবে রাজনৈতিক যোগাযোগে একটি মৌলিক পরিবর্তন ঘটছে। একজন প্রার্থী আগে একটি বক্তব্য তৈরি করে লাখো মানুষকে শোনাতেন। আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে একই প্রার্থী লাখো মানুষের জন্য লাখো সংস্করণের বক্তব্য তৈরি করতে পারবেন।

ইন্দোনেশিয়ায় ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন এ বিষয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। র. যোগি প্রাওয়িরা, আসিয়ারি এবং আখমাদ রোকি আলাওয়ির ২০২৬ সালের গবেষণায় তিন প্রার্থীর জোটের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের পার্থক্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এএমআইএন জোট সচেতনভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ছবি প্রত্যাখ্যান করে মানব শিল্পীদের ওপর নির্ভর করেছিল। গানজার মাহফুদ জোট লেখাভিত্তিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও চ্যাটবট ব্যবহার করলেও কৃত্রিম ছবি ব্যবহারে দূরত্ব রেখেছিল। প্রাবোয়ো গিবরান প্রচারণায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি দৃশ্যপট ব্যাপকভাবে ব্যবহার করে তরুণ ভোটারদের কাছে একটি নতুন, বন্ধুসুলভ ‘জেমোয়’ পরিচিতি নির্মাণ করে। গবেষণাটি দেখিয়েছে, প্রযুক্তি সেখানে শুধু প্রচারের উপকরণ ছিল না, প্রার্থীর রাজনৈতিক পরিচয় নির্মাণেরও অংশ হয়ে উঠেছিল।

রাজনৈতিক ব্র্যান্ডিংয়ের তত্ত্ব হচ্ছে, একজন প্রার্থী ভোটারের কাছে নিজের একটি নির্দিষ্ট পরিচিতি তৈরি করতে চান। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সেই পরিচিতি নির্মাণের কাজকে দ্রুত ও ব্যাপক করতে পারে। একই মুখকে তরুণ, জনপ্রিয়, দরিদ্রবান্ধব, ধর্মপ্রাণ, আধুনিক বা রাষ্ট্রনায়কসুলভ—নানা দৃশ্যে উপস্থাপন করা সম্ভব। ফলে রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে প্রার্থীর ডিজিটাল পরিচয়ের দূরত্ব বাড়তে পারে।

ইন্দোনেশিয়ায় এর বিপজ্জনক দিকও দেখা গেছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট সুহার্তোর মুখ ও কণ্ঠ ব্যবহার করে তৈরি একটি কৃত্রিম ভিডিও নির্বাচনের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওটি কয়েক মিলিয়ন বার দেখা হয়েছিল। মৃত একজন রাষ্ট্রনায়ককে নতুন করে রাজনৈতিক বক্তব্য দিতে দেখা যাওয়ার ঘটনা দেখিয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কীভাবে ইতিহাসকেও রাজনৈতিক প্রচারণার উপাদানে পরিণত করতে পারে।

তবে বিপদের জায়গাটি শুধু ভুয়া ভিডিও ঘিরে নয়। কিংস কলেজ লন্ডনের গবেষণা আলোচনায় বলা হয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হতে পারে স্বয়ংক্রিয় প্রভাব বিস্তারকারী যোগাযোগব্যবস্থার বিস্তার। ভাষাভিত্তিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তিনটি দেশের পরীক্ষায় ভোটারের মনোভাব ও ভোট দেওয়ার অভিপ্রায়ে অর্থবহ পরিবর্তন ঘটাতে পেরেছে।

গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো, এসব ব্যবস্থা সবসময় মনস্তাত্ত্বিক কৌশল প্রয়োগ করেই মানুষকে প্রভাবিত করে না। প্রাসঙ্গিক তথ্য ও যুক্তি উপস্থাপন করেও তারা রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে একইসঙ্গে এটি একটি গণতান্ত্রিক সুযোগও হতে পারে।

একটি ছোট দল হয়তো আগে পেশাদার গবেষক, লেখক, ভিডিও নির্মাতা কিংবা তথ্য বিশ্লেষকের বড় দল রাখতে পারত না। এখন সীমিত সম্পদে নীতিপত্রের খসড়া, বক্তব্যের বিভিন্ন সংস্করণ, নির্বাচনী এলাকার সমস্যার তথ্য বিশ্লেষণ কিংবা নাগরিক প্রশ্নের উত্তর তৈরির সক্ষমতা অর্জন করা সম্ভব। ফলে প্রযুক্তি রাজনৈতিক যোগাযোগের নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।

বাংলাদেশে এর সম্ভাবনা ইতোমধ্যে বাস্তব। ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে ডিসমিসল্যাবের অনুসন্ধানে শত শত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি রাজনৈতিক ভিডিও পাওয়া যায়। অনেক ভিডিওতে কৃত্রিমভাবে তৈরি হওয়ার তথ্য সংযুক্ত ছিল না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এসব ভিডিওর মধ্যে প্রার্থীর পক্ষে বক্তব্য, কৃত্রিম সংবাদ প্রতিবেদন, কণ্ঠ নকল এবং প্রতিদ্বন্দ্বীকে আক্রমণকারী উপাদান ছিল। (দ্য ডেইলি স্টার, ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)

এমনকি নির্বাচন কমিশনের নতুন স্থানীয় সরকার নির্বাচনী আচরণবিধিতেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে সরাসরি বিধান এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের সুযোগ রাখা হলেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে বিভ্রান্তি, চরিত্র হনন, ভুয়া তথ্য ও ঘৃণাত্মক বক্তব্য ছড়ানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে। (প্রথম আলো, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬)

তবে বাংলাদেশের বাস্তবতায় রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কেবল ভুয়া ভিডিও বানানোর মাধ্যম হয়ে উঠেছে। অথচ নির্বাচনী এলাকার সমস্যা বিশ্লেষণ, ভোটারের প্রশ্নের উত্তর, নীতিপত্র তৈরি, বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের কাছে একই নীতির ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা দেওয়া, তথ্য বিশ্লেষণ ও নাগরিক মতামত সংগ্রহেও এটি ব্যবহৃত হতে পারে।

হার্ভার্ডের অ্যাশ সেন্টারের আলোচনায়ও আইন প্রণয়ন ও জনসম্পৃক্ততার কাজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাবনা উঠে এসেছে।

তাই প্রশ্ন হচ্ছে, রাজনৈতিক দলগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের সহকারী হিসেবে ব্যবহার করবে, নাকি মানুষের মনকে অদৃশ্যভাবে পরিচালনার যন্ত্রে পরিণত করবে।

গণতন্ত্রের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি হবে যখন ভোটারের মনে এই নিয়ে বিভ্রান্তি থাকবে যে, সে আসলে মানুষ, দল, প্রচারকর্মী নাকি একটি অ্যালগরিদমের সঙ্গে কথা বলছে।

বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার নিয়ে বিধান তৈরি করেছে। কিন্তু আইন এখানে যথেষ্ট হবে না। রাজনৈতিক দলের নিজস্ব আচরণবিধি, কৃত্রিম উপাদানে স্পষ্ট পরিচিতি, রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনের অর্থদাতা প্রকাশ এবং নাগরিকদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শনাক্ত করার সক্ষমতা দরকার। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যেও এখন কৃত্রিম রাজনৈতিক উপাদান প্রকাশের বাধ্যবাধকতা এবং নির্বাচনী ভুয়া ভিডিও নিয়ন্ত্রণের আইন তৈরি হচ্ছে।

রাজনীতির ইতিহাসে নতুন প্রযুক্তি কখনো গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করেছে, কখনো ক্ষমতার নতুন অস্ত্র তৈরি করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও তার ব্যতিক্রম হবে না। আগামী দিনের নির্বাচনে হয়তো সবচেয়ে দক্ষ প্রচারক তিনিই হবেন না, যিনি সবচেয়ে ভালো বক্তা। তিনি হতে পারেন সেই রাজনৈতিক সংগঠক, যে সবচেয়ে ভালোভাবে তথ্য, প্রযুক্তি ও মানুষের মনস্তত্ত্বকে একত্রে বুঝতে পারে।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রের প্রশ্নটি হবে আস্থার। ভোটারের সঙ্গে কথা বলার জন্য যদি মেশিন ব্যবহার করি, তাহলে অন্তত ভোটারকে জানাতে হবে যে, ওপাশে মানুষ নেই।

 

সাজ্জাদ সাব্বির: এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ