‘ব্যাটিং পজিশন নির্দিষ্ট থাকলে হয়তো আরও আগেই সাফল্য পেতাম’

সামসুল আরেফীন খান
সামসুল আরেফীন খান

শুরুর দিকের সংগ্রাম আর সমালোচনা পেছনে ফেলে এগিয়ে চলেছেন সোবহানা মোস্তারি। সাম্প্রতিক সময়ে সাদা বলের দুই ফরম্যাটেই বাংলাদেশ নারী দলের অন্যতম ধারাবাহিক পারফর্মার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন তিনি। ২৪ বছর বয়সী এই ব্যাটার এখন আগামী জুন-জুলাইয়ে অনুষ্ঠেয় টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেও নিজের ছন্দ ধরে রাখতে মুখিয়ে আছেন।

দ্য ডেইলি স্টারের সামসুল আরেফীন খানের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে দলের প্রস্তুতি, নিজের পরিবর্তন ও বিশ্বকাপে বাংলাদেশের লক্ষ্য নিয়ে কথা বলেছেন তিনি। সেই সাক্ষাৎকারের চুম্বকাংশ নিচে তুলে ধরা হলো:

দ্য ডেইলি স্টার (স্টার): আপনারা এমন একটি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশ নিতে যাচ্ছেন, যেখানে প্রতিপক্ষ দলগুলোর প্রায় সবাই আপনাদের বেশ পরিচিত। আপনাদের সার্বিক প্রস্তুতি সম্পর্কে যদি একটু বলতেন?

সোবহানা মোস্তারি (সোবহানা): আমরা প্রথমবারের মতো ইংল্যান্ডে খেলতে যাচ্ছি। তাই আমাদের মধ্যে অন্যরকম এক রোমাঞ্চ কাজ করছে। আমরা জানি যে, সেখানকার আবহাওয়া ও উইকেট একটু ভিন্ন আচরণ করবে। গত দুটি প্রস্তুতি ম্যাচে আমরা ইংল্যান্ডের মতোই উইকেটে অনুশীলন করেছি। আমার মনে হয়, বিশ্বকাপের আগে স্কটল্যান্ডে হতে যাওয়া ত্রিদেশীয় সিরিজটি কন্ডিশনের সাথে মানিয়ে নিতে আমাদের জন্য দারুণ একটি সুযোগ হবে।

স্টার: গত ৫০ ওভারের বিশ্বকাপে বেশ কয়েকটি শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচে আমরা হেরে গিয়েছিলাম। তখন মনে হয়েছিল, আমাদের আরও প্রস্তুতির প্রয়োজন ছিল। আপনার কি মনে হয়, আগের ভুলগুলো শুধরে নেওয়ার জন্য এবারের প্রস্তুতি যথেষ্ট?

সোবহানা: সেবার আমাদের প্রস্তুতি ছিল, কিন্তু ম্যাচ পরিস্থিতিতে অনুশীলনের ঘাটতি ছিল। এবার আমরা শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে খেলেছি। ইংল্যান্ডের কাছাকাছি একটি দেশে ত্রিদেশীয় সিরিজ অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যা আমাদের খুব ভালো প্রস্তুতির সুযোগ করে দিচ্ছে। নেদারল্যান্ডস ও স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে তাদের নিজেদের কন্ডিশনে খেলাটা আমাদের জন্য অনেক বড় একটি সুযোগ।

স্টার: একজন ব্যাটার হিসেবে নিজের এই পরিবর্তন এবং দলের জন্য পারফর্ম করার চ্যালেঞ্জটাকে কীভাবে দেখছেন?

সোবহানা: দলের জন্য নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ ভাবাটা খুব জরুরি, আর এই উপলব্ধিটা আমার বেশ দেরিতে হয়েছে। আগে দলে যখন অনেক সিনিয়র খেলোয়াড় ছিলেন, তখন নিজের ওপর ওই পর্যায়ের কোনো চাহিদা অনুভব করতাম না। প্রায়ই এলোমেলো শট খেলে আউট হয়ে যেতাম। তাছাড়া, আমার অভিজ্ঞতারও অভাব ছিল এবং আমাকে ওপেনিং, মিডল অর্ডার বা তিন নম্বর— এমন বিভিন্ন পজিশনে খেলানো হতো। আমার মনে হয়, যদি আরও আগেই আমাকে একটা নির্দিষ্ট পজিশনে থিতু করা হতো, তাহলে হয়তো সাফল্যও আরও আগেই পেতাম।

স্টার: এমন কোনো নির্দিষ্ট টার্নিং পয়েন্ট কি ছিল, যার পর থেকে আপনি নিজেকে ভিন্নভাবে দেখতে শুরু করেছেন?

সোবহানা: (২০২৪ সালে) শ্রীলঙ্কায় হওয়া সবশেষ নারী টি-টোয়েন্টি এশিয়া কাপের দল থেকে বাদ পড়াটা আমার জন্য বড় একটা টার্নিং পয়েন্ট ছিল। ওই ঘটনা আমাকে বুঝতে সাহায্য করেছে যে, আমার কোথায় উন্নতি করা প্রয়োজন। আরেকটি টার্নিং পয়েন্ট ছিল একই বছর সংযুক্ত আরব আমিরাতে অনুষ্ঠিত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। ওই সফরের আগে আমাকে নিয়ে অনেক সমালোচনা হয়েছিল এবং মানসিকভাবেও আমি খুব একটা শক্ত অবস্থানে ছিলাম না। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে খেলা ৩৬ রানের ইনিংস আমার ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এরপর আমি ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৪৪ এবং দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ৩৮ রান করি, যা আমাকে আসরের শীর্ষ ১০ রান সংগ্রাহকের তালিকায় জায়গা করে দেয়।

স্টার: বাংলাদেশ দলের শক্তি ও দুর্বলতার জায়গাগুলো কী কী?

সোবহানা: আমাদের ব্যাটিং একইসঙ্গে চিন্তার বিষয় এবং সম্ভাব্য শক্তির জায়গাও। আমরা যদি স্কোরবোর্ডে রান তুলতে পারি, তাহলে আমাদের বোলাররা চাপমুক্ত হয়ে খেলতে পারবে। পেস বোলিংয়ের কথা বললে, আমরা রাতারাতি এটি পরিবর্তন করতে পারব না। আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ হলো, আমরা স্পিনারদের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। আর নির্দিষ্ট একটি দুর্বলতা হলো রান তাড়া করা। গত মাসে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সবশেষ সিরিজের তিনটি টি-টোয়েন্টিতেই রান তাড়া করতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। রান তাড়া করার পরিস্থিতিতে আমাদের ব্যাটাররা কতটা ভালো করতে পারে, তার ওপরই দলের সাফল্য নির্ভর করছে।

স্টার: রান তাড়া করতে গিয়ে কিংবা দ্রুত উইকেট হারিয়ে ব্যাটিং ধসের কারণে আমরা প্রায়ই ভুগে থাকি। এই চাপ সামলানোর জন্য কি দল কাজ করছে?

সোবহানা: ব্যাটিং ধস আমাদের জন্য বড় একটা চিন্তার কারণ। দলের দায়িত্ব যাদের কাঁধে, আমরা সব সময় আলোচনা করি কখন কার খেলা উচিত। আমরা কিছু নির্দিষ্ট পরিস্থিতি নিয়েও অনুশীলন করছি, যেমন— ১১ থেকে ১৭তম ওভারে কীভাবে খেলতে হবে। সাম্প্রতিক অনুশীলন সেশনগুলোতে এই বিষয়টিতেই জোর দেওয়া হয়েছে।

স্টার: এবারের বিশ্বকাপে দলগত ও ব্যক্তিগত লক্ষ্য কী?

সোবহানা: দলগতভাবে আমরা সবাই একমত যে, আমরা অন্তত তিনটি ম্যাচ জিততে চাই। আমরা এর আগে নেদারল্যান্ডস, পাকিস্তান ও এমনকি দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দলকেও হারিয়েছি। জেতার এই আকাঙ্ক্ষা ধরে রাখতে পারলে আমরা সফল হতে পারব। প্রতিপক্ষ র‍্যাঙ্কিংয়ে এগিয়ে থাকা দল ভেবে নিয়ে মানসিকভাবে আমাদের পিছিয়ে পড়া উচিত নয়।

স্টার: ঈদের সময় আপনারা স্কটল্যান্ডে থাকবেন। পরিবারের বদলে দলের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করার অনুভূতিটা কেমন?

সোবহানা: দলের সঙ্গে ঈদ উদযাপনের সময় আমরা একে অপরকে সঙ্গ দেওয়ার চেষ্টা করি। আমরা নিজেদের মতো করে মজা করি, অনুষ্ঠানের আয়োজন করি এবং নতুন জামাকাপড় কিনি। ঈদের দিন হয়তো আমাদের অনুশীলনও থাকতে পারে, তাই অনুশীলনের পর বিশেষ খাবার ও উপহার বিনিময়ের মাধ্যমে আমরা ঈদ উদযাপনের চেষ্টা করব।

স্টার: ঈদে আপনাকে কাছে না পাওয়া নিয়ে পরিবারের সদস্যরা কী বলছেন?

সোবহানা: আমার মায়ের প্রধান ভাবনা সব সময়ই থাকে— আমি ভালো খেলছি কি না এবং সুস্থ আছি কি না। যেহেতু আমি অনেকবারই বাড়ির বাইরে ঈদ করেছি, তাই তিনি এখন এতে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন।