অস্ট্রেলিয়াকে উড়িয়ে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক সিরিজ জয়
রাইলি মেরেডিথের বাউন্সার ফাইন লেগ দিয়ে ছক্কায় উড়িয়ে কাজ সারলেন অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ। এর আগে বাউন্সারে হেলমেটে আঘাত লেগে পড়ে যাওয়া বাংলাদেশ অধিনায়ক ম্যাচ শেষ করলেন দারুণভাবে।
বৃহস্পতিবার মিরপুর শেরেবাংলা ক্রিকেট স্টেডিয়ামে দ্বিতীয় ওয়ানডে বাংলাদেশ জিতল ৫ উইকেটে। এই জয়ে সিরিজ নিশ্চিত হলো মেহেদী হাসান মিরাজের দলের। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এটাই প্রথম ওয়ানডে সিরিজ জয়। টেস্ট খেলুড়ে দলগুলোর মধ্যে ওয়ানডে সিরিজ জেতা বাকি কেবল ইংল্যান্ডের সঙ্গে। এই নিয়ে টানা চারটি ওয়ানডে সিরিজ জিতল বাংলাদেশ।
জেতার কাজ অবশ্য করে রেখেছিলেন বোলাররাই। তাসকিন আহমেদ, মোস্তাফিজুর রহমানদের তোপে দিশাহারা অস্ট্রেলিয়া পেল না লড়াইয়ের পুঁজি। মামুলি লক্ষ্যে শুরুর ধাক্কা সামলে একাদশে ফেরা সৌম্য সরকার আর নাজমুল হোসেন শান্ত টানলেন দলকে। পরে নিরাপদে তরি ভেড়ালেন তাওহিদ হৃদয়।
৩৬ বল আগে ম্যাচ শেষ করে হৃদয় অপরাজিত থাকলেন ৫৫ বলে ৪০ রানে। মিরাজ করলেন ২২ বলে ২২। এর আগে শুরুর চাপ সামলে সৌম্য করেন ৪৭ বলে ৪২, শান্তর ব্যাট থেকে আসে ৫৩ বলে ৪২।
ওয়ানডে ইতিহাসে কোন দল শূন্য রানে ৩ উইকেট হারানোর পর ম্যাচ জেতেনি, টস জিতে ব্যাট করা অস্ট্রেলিয়া এমন বিপর্যয়ে পড়ার পরই মূলত ম্যাচ অনেকটা মুঠোয় চলে এসেছিল বাংলাদেশের। পরে একটা শতরানের জুটিতে প্রতিরোধ আর বোলিংয়ে শুরুর দুই-তিন ওভার তাদের জন্য কিছুটা লড়াইয়ের ছবি। বাকি ম্যাচ বাংলাদেশ জিতল দাপট দেখিয়ে।
'ডিএলএস মেথডে' ১৯২ রান তাড়ায় প্রথম বলেই জোরালো আবেদনে বেঁচে যাওয়া তানজিদ হাসান তামিম কুপোকাত পরের বলে। বার্টলেটের বল রিটার্ন ক্যাচ দিয়ে ফেরত যান খালি হাতে।
পরের কয়েক বলে বারবার তৈরি হলো উইকেট পতনের পরিস্থিতি। তিনে নামা শান্ত ক্যাচ দিয়েছিলেন রান করার আগেই। তানজিদের ক্যাচ নিলেও বার্টলেট ফেলে দেন শান্তরটা।
সাইফ হাসানের ব্যর্থতায় একাদশে ফেরা সৌম্যর উপরও চাপ ছিল প্রবল। সেই চাপ তিনি উড়ান দারুণ দুই শটে। শুরুর চাপ আলগা হয়ে যাওয়ার পর হাত খোলেন শান্তও। দুজনে মিলে দ্রুতই পরিস্থিতি করে ফেলেন সাবলীল। পুলে ছক্কায় উড়িয়ে সৌম্য দেখান পুরনো দিনের ছবি।
দ্বিতীয় উইকেটে দুজনে মিলে যোগ করেন ৯৩ বলে ৮৬। থিতু থাকা সৌম্য এগোচ্ছিলেন ফিফটির দিকে। রিভার্স সুইপের চেষ্টায় স্লিপে ধরা দেন ম্যাট রেনশর বলে। ৪৭ বলে ৫ চার, ২ ছক্কায় থামেন ৪২ করে।
খানিক পর ৪২ রানে থামেন শান্তও। মেরেডিথের বলে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দিয়ে ফিরে যান তিনি।
দ্রুত দুই উইকেট হারানোর পর চতুর্থ উইকেটে লিটন দাস-হৃদয় মিলে যোগ করেন ২৪। দারুণ ছন্দে খেলতে থাকা লিটন ক্যামেরন গ্রিনের আচমকা লাফানো বল গ্লাভসে ছুঁইয়ে ধরা দেন কিপারের হাতে।
আগের ম্যাচের হিরো মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত দ্রুত রান বাড়ানোর তালে ছিলেন। এবার থিতু হয়ে এগোতে পারেননি। ১৪ বলে ১৫ রান করে ক্যাচ দেন জাম্পার বলে। তাতে অবশ্য বিপদের কিছু হয়নি। অধিনায়ক মিরাজকে পাশে নিয়ে বাকি রান তুলে নেন হৃদয়। প্রথমে একটু ধীরলয়ে খেলে পরিস্থিতি শান্ত করেন, পরে অনায়াসে রান বাড়িয়ে খেলা শেষ করেন দুজন।
সকালে কিছু বুঝে ওঠার আগেই অস্ট্রেলিয়ার ইনিংস হয়ে যায় তাসের ঘর। কোনো রান করার আগেই তারা হারিয়ে ফেলে ৩ উইকেট। ওয়ানডে ইতিহাসে এমন ঘটনা ঘটল মাত্র চতুর্থবার, অজিদের জন্য এমন পরিস্থিতিতে পড়া প্রথম।
তাদের এই তিক্ত অভিজ্ঞতা দেন তাসকিন ও মোস্তাফিজুর রহমান। প্রথম ওভারে তাসকিনের ভেতরে ঢোকা বল ছেড়ে দেন শর্ট। সেটা ছোবল মেরে উড়িয়ে দেয় তার স্টাম্প। পরের ওভারে মোস্তাফিজুর রহমান যেন আরও ভয়ঙ্কর। কনলি তার মুখোমুখি প্রথম বলেই ধরা দেন লিটন দাসের গ্লাভসে।
ওই ওভারের শেষ বলটা অফ স্টাম্পের বাইরে করেন মোস্তাফিজ। রেনশর ব্যাট স্পর্শ করে সেটা আশ্রয় নেয় লিটনের গ্লাভসে। আম্পায়ার অনেকটা সময় নিয়ে তোলেন আঙুল। ০ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে ফেলে অস্ট্রেলিয়া।
এরপর ২৫ রানের জুটি। অ্যালেক্স কেয়ারি একটু প্রতিরোধের আভাস দিয়েও জ্বলে উঠতে পারেননি। মোস্তাফিজুর রহমানের বাইরের বল তাড়া করে ক্যাচ দেন পয়েন্টে। অধিনায়ক জশ ইংলিশ চূড়ান্ত বিপর্যস্ত অবস্থায় ধরছিলেন হাল। ক্যামেরন গ্রিনকে নিয়ে ৪৩ রান যোগ করেন তিনি।
থিতু হওয়া ইংলিশ থামেন বাজে শটে। বাঁহাতি স্পিনার তানভির ইসলামকে মারতে গিয়ে ক্যাচ দিয়ে বিদায় নেওয়া ডানহাতি ব্যাটার করেন ৩৮ বলে ৩৪ রান।
আগের ম্যাচে ফিফটি করা গ্রিনও করেন একই ভুল। থিতু হয়ে (২৫) তানভিরের বলে রিটার্ন ক্যাচ দিয়ে হাঁটা ধরেন। ৮১ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে বিধ্বস্ত অজিদের তখন তিন অঙ্ক স্পর্শ করা নিয়েও যেন সংশয়।
সপ্তম উইকেট জুটিতে হাল ধরেন লাবুশানে আর বার্টলেট। প্রতি-আক্রমণে দলকে লড়াইয়ে রাখার প্রয়াস চালান তারা। গত কয়েক ম্যাচে ছন্দ হারিয়ে দিকহারা লাবুশানে যেন নিজেকে ফিরে পান। বার্টলেটকে নিয়ে গড়েন ১০৩ রানের জুটি।
তাসকিন নতুন স্পেলে পরপর দুই বলে উইকেট নিয়ে এই জুটি ভাঙার পর নামে বৃষ্টি। প্রায় তিন ঘণ্টা খেলা বন্ধ থাকার পর ডিএলএস মেথডে ১৯২ রানের লক্ষ্য দাঁড়ায় বাংলাদেশের। সেটা তুলে নিতে তেমন কোনো বেগ পেতে হয়নি।