জার্মানিকে নকআউটে ওঠানোর নায়ক উন্দাভ টাকার প্রয়োজনে কাজ করতেন কারখানায়

স্পোর্টস ডেস্ক

ভোর চারটায় অ্যালার্মের শব্দে ঘুম ভাঙত তার। এরপর কারখানায় লেজার মেশিন চালানোর আট ঘণ্টার টানা শিফট। কাজ শেষে ক্লান্ত শরীর নিয়েই ছুটতে হতো অনুশীলনে। শুধু ফুটবল খেলে পেট চলত না বলে জার্মানির চতুর্থ স্তরের লিগে খেলার পাশাপাশি এই হাড়ভাঙা খাটুনি ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী। সেই দেনিজ উন্দাভই এখন যেন রূপকথার নায়ক! ২০১৪ সালের পর প্রথমবারের মতো জার্মানিকে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে তোলার মূল কারিগর তিনি।

শনিবার রাতে আইভরিকোস্টের বিপক্ষে ২-১ গোলের রোমাঞ্চকর জয়ের ম্যাচে জোড়া গোল করে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন উন্দাভ। এবারের আসরে বদলি হিসেবে নেমে দুই ম্যাচে এরই মধ্যে তিন গোল ও দুই অ্যাসিস্ট করেছেন এই স্ট্রাইকার। ১৯৬৬ সালের পর থেকে বিশ্বকাপে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে সর্বোচ্চ সংখ্যক গোলে অবদান রাখার যৌথ রেকর্ড এটি। তিনি ভাগ বসিয়েছেন ১৯৯০ সালের আসরে ক্যামেরুনের কিংবদন্তি রজার মিলার গড়া কীর্তিতে।

বহু প্রতিকূলতা জয় করে আসা এক ফুটবলারের স্বপ্নের মতো যাত্রার সাম্প্রতিক অধ্যায় এটি। কুরাসাওয়ের পর আইভরিকোস্টের  জাল কাঁপিয়ে মিরোস্লাভ ক্লোসার (২০০২ আসর) পর প্রথম জার্মান হিসেবে বিশ্বকাপে নিজের প্রথম দুই ম্যাচেই গোল করার কীর্তিও গড়েছেন উন্দাভ। সব মিলিয়ে এমন দারুণ সময় কাটাচ্ছেন তিনি, যা একসময় তার কাছে ছিল ভীষণ দূরের কোনো স্বপ্ন।

১৪ বছর বয়সে উচ্চতায় ছোট হওয়ার অজুহাতে তাকে বাতিলের খাতায় ফেলে দিয়েছিল জার্মান ক্লাব ভের্দার ব্রেমেন। কিন্তু উন্দাভ দমে যাননি। ১৭ বছর বয়সে ঘর ছেড়ে জার্মানির চতুর্থ স্তরের দল হাভেলের সঙ্গে চুক্তি করেন তিনি। সপ্তাহে তখন তার আয় ছিল মাত্র ১২০ পাউন্ড।

বেলজিয়ামের সংবাদমাধ্যম সেভেনসারসেভেনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সেই কঠিন দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করে উন্দাভ বলেছিলেন, ‘১৪ বছর বয়সে ব্রেমেন যখন আমাকে বলেছিল যে— উচ্চতায় ছোট হওয়ার কারণে তাদের ক্লাবে আমার কোনো ভবিষ্যৎ নেই, তখন আমার হৃদয় ভেঙে গিয়েছিল। কিন্তু আমি আশা ছাড়িনি।... বেঁচে থাকার জন্য টাকার প্রয়োজনে আমাকে ওই কারখানায় কাজটা করতে হতো। কারণ, শুধু ফুটবল থেকে পাওয়া টাকা দিয়ে আমার পক্ষে টিকে থাকা সম্ভব ছিল না।’

২০২০ সালে বেলজিয়ামের দ্বিতীয় স্তরের দল ইউনিয়ন এসজিতে যোগ দেন উন্দাভ। পরের বছর দলটিকে প্রথম স্তরে তুলতে সাহায্য করেন এবং বেলজিয়ান শীর্ষ লিগে ২৫ গোল করে ব্রাইটনে পাড়ি জমান। কিন্তু ২০২২-২৩ মৌসুমে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে ২২ ম্যাচে মাত্র ৫ গোল করার পর তাকে ধারে স্টুটগার্টে পাঠানো হয়। ২০২৪ সালে স্বদেশি ক্লাবটি তাকে স্থায়ীভাবে কিনে নেয়। এরপর সাফল্যের সিঁড়ি বেয়ে কেবলই ওপরে ওঠা। সবশেষ ২০২৫-২৬ মৌসুমে জার্মান বুন্দেসলিগায় ১৯ গোল করে হ্যারি কেইনের পর আসরের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা হন উন্দাভ। আর এই দুর্দান্ত পারফরম্যান্সই তাকে এনে দেয় বিশ্বকাপের টিকিট।

অথচ গত মার্চে ঘানার বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচের শেষ মুহূর্তের জয়সূচক গোল করার পর কোচ ইউলিয়ান নাগেলসমানের সঙ্গে বাদানুবাদের জেরে বিশ্বকাপ স্কোয়াডে তার জায়গা পাওয়া নিয়েই সংশয় তৈরি হয়েছিল। জাতীয় দলের শুরুর একাদশে সুযোগ পাওয়ার আকাঙ্ক্ষার কথা সেসময় প্রকাশ্যে বলেছিলেন ২৯ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড। জবাবে নাগেলসমান সতর্ক করে বলেছিলেন, এমন মন্তব্য করে উন্দাভ নিজের ওপর অযথাই চাপ বাড়াচ্ছেন। তবে আন্তর্জাতিক ফুটবলে ১১ ম্যাচে ৯ গোল করার পর চলমান বিশ্বকাপে জার্মানির শুরুর একাদশে জায়গা পাওয়ার শক্ত দাবিদার তিনি।

আগামী বৃহস্পতিবার রাতে ইকুয়েডরের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে উন্দাভকে শুরু থেকে খেলানো হবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে নাগেলসমান বলেছেন, ‘হ্যাঁ, অবশ্যই। তবে আমি কেন তার ছন্দে ব্যাঘাত ঘটাব? সে দুবার বদলি হিসেবে নেমেছে এবং দুবারই গোল পেয়েছে।... খেলা যখন উন্মুক্ত হয়ে যায়, তখন সে দারুণভাবে জায়গা করে নিতে পারে।... বদলি হিসেবে নেমে সে গত ম্যাচে আমাদের অনেক কিছু দিয়েছে। আর দেনিজকে প্রস্তুত করার কিছু নেই, সে নেমেই মানিয়ে নিতে পারে।’

আইভরিকোস্টের বিপক্ষে ম্যাচসেরার পুরস্কার জেতার পর উচ্ছ্বসিত উন্দাভ বলেছেন, ‘এটি দারুণ এক অনুভূতি। গত ম্যাচেই আমি এটি চেয়েছিলাম, কিন্তু কাজ হয়নি।... তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আমরা ম্যাচটি জিতেছি এবং পরের রাউন্ডে গেছি। দেখা যাক, সামনে কী ঘটে।’