শিষ্যের সামনে এখন বাঁচা-মরার লড়াইয়ে বিয়েলসা

স্পোর্টস ডেস্ক

বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে শনিবার মুখোমুখি হচ্ছে স্পেন ও উরুগুয়ে। ম্যাচটি শুধু দুই দলের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়, এটি এক অর্থে দুই প্রজন্মের দুই কোচেরও লড়াই। একদিকে স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে, অন্যদিকে তার অন্যতম অনুপ্রেরণা ও গুরুতুল্য মার্সেলো বিয়েলসা।

আজ থেকে ১৫ বছর আগে, যখন বিয়েলসা অ্যাথলেটিক বিলবাওয়ের দায়িত্ব নিতে স্পেনে এসেছিলেন, তখনই ক্লাবটি ছেড়ে দিয়েছিলেন দে লা ফুয়েন্তে। পরে নিজের প্রথম সিনিয়র কোচিং চাকরিতে ব্যর্থ হয়ে দীর্ঘ ১৮ মাস বেকার ছিলেন তিনি। সেই কঠিন সময়েই প্রায় ছয় মাস ধরে প্রতিদিন বিয়েলসার অনুশীলন সেশন পর্যবেক্ষণ করেছিলেন।

বিশ্বকাপের ম্যাচপূর্ব সংবাদ সম্মেলনে সেই স্মৃতি তুলে ধরে স্পেন কোচ বলেন, 'আমি মার্সেলো বিয়েলসার একজন বড় ভক্ত। তিনি অ্যাথলেটিককে অসাধারণ ফুটবল খেলিয়েছিলেন। বেকার থাকাকালে আমি মাসের পর মাস তার অনুশীলন দেখেছি। তার কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছি। তিনি ছিলেন অত্যন্ত উদ্ভাবনী একজন কোচ। তার সঙ্গে আলোচনা করার সুযোগ পাওয়া ছিল আমার জন্য সৌভাগ্যের বিষয়। এবার প্রথমবারের মতো তার বিপক্ষে কোচ হিসেবে দাঁড়ানো আমার জন্য সম্মানের।'

দে লা ফুয়েন্তের প্রশংসা ফিরিয়ে দিয়েছেন বিয়েলসাও। নিজের স্বভাবসুলভ বিনয়ী ভঙ্গিতে উরুগুয়ে কোচ বলেন, 'আমার কিছু ধারণা হয়তো তার কাছে পৌঁছেছিল। কিন্তু স্পেনের সঙ্গে তিনি যা অর্জন করেছেন, তা সত্যিই অসাধারণ। তাদের ফুটবল আমার দর্শনের প্রতিফলন নয়। বরং সত্যি বলতে, তারা আমার দলের চেয়ে অনেক বেশি সুন্দর ফুটবল খেলছে।'

তবে মাঠের বাস্তবতা দুই কোচের জন্য একেবারেই ভিন্ন। ইউরো চ্যাম্পিয়ন স্পেন টানা ৩৩ ম্যাচ অপরাজিত থেকে ইতোমধ্যে শেষ বত্রিশ নিশ্চিত করেছে। অন্যদিকে উরুগুয়ে এখনও জয়হীন। কেপ ভার্দের সঙ্গে ২-২ ড্র এবং সৌদি আরবের বিপক্ষে পয়েন্ট হারানোর পর এখন বিদায়ের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে দক্ষিণ আমেরিকার দলটি।

উরুগুয়ের মিডফিল্ডার আগুস্তিন কানোব্বিও অবশ্য আশা ছাড়ছেন না। তার ভাষায়, 'আমরা কাউকে ভয় পাই না। উরুগুয়ে সবসময়ই শক্তিশালী যখন নিজেদের ওপর বিশ্বাস রাখে। সেখান থেকেই আমাদের শুরু করতে হবে।'

কিন্তু বাস্তবতা হলো, উরুগুয়ের সংকট কেবল মাঠের ফলাফলে সীমাবদ্ধ নয়। দলটির ভেতরে দীর্ঘদিন ধরেই অস্থিরতা চলছে। ২০২৪ কোপা আমেরিকার পর জাতীয় দল থেকে বিদায় নেওয়া লুইস সুয়ারেজ প্রকাশ্যে অভিযোগ করেছিলেন, বিয়েলসার অধীনে জাতীয় দলের পরিবেশ ছিল অত্যন্ত শীতল ও অস্বস্তিকর। এমনকি খেলোয়াড়রা কোচের কাছে অন্তত একটি 'শুভ সকাল' শুনতেও আকাঙ্ক্ষা করতেন বলে জানান তিনি।

সুয়ারেজ বলেছিলেন, 'জাতীয় দলের বর্তমান অবস্থা আমাকে কষ্ট দেয়।'

অবাক করার বিষয়, বিয়েলসা নিজেও পরে নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করেছিলেন। গত নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ৫-১ গোলে হারের পর তিনি বলেছিলেন, 'আমি নিজেই বিষাক্ত একজন মানুষ। যারা আমার সঙ্গে সম্পর্ক রাখে, তারা প্রায়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমি সবসময় ভুল খুঁজি, সন্তুষ্ট হই না। এর পেছনে আসলে ভয় কাজ করে। জয়ের আনন্দ উপভোগ করি না, বরং হারের ভয় অনেক বেশি তাড়া করে।'

সেই সংকট এখনও পুরোপুরি কাটেনি। উরুগুয়ে দীর্ঘদিন জয়হীন। অথচ দেশটির ফুটবল ইতিহাস, দুই বিশ্বকাপ শিরোপা, অলিম্পিক সোনা এবং ২০১০ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের স্মৃতি এখনও প্রত্যাশার চাপ তৈরি করে।

এমন পরিস্থিতিতে স্পেনের বিপক্ষে ম্যাচটি উরুগুয়ের জন্য শুধুই একটি গ্রুপ ম্যাচ নয়, বরং অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। হার বা ড্র তাদের বিদায়ের পথে ঠেলে দিতে পারে। অন্যদিকে স্পেনের জন্য এটি মূলত নকআউটের আগে নিজেদের প্রস্তুতি যাচাইয়ের সুযোগ।

কানোব্বিও তাই সতীর্থদের মনে করিয়ে দিয়েছেন উরুগুয়ের ঐতিহ্যের কথা। তিনি বলেন, 'স্পেনের বিপক্ষে শুধু ভালো খেললেই হবে না। উরুগুয়ের মানসিকতা নিয়ে প্রতিটি বলের জন্য লড়তে হবে। দাঁড়িয়ে থেকে খেলা দেখা যাবে না। এই দলে গর্ব আছে, ক্ষুধা আছে, বিশ্বাস আছে। উরুগুয়ের জার্সি গায়ে চাপালে কোনো অজুহাত চলে না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, উরুগুয়েকে আবার উরুগুয়ের মতো হতে হবে।'