দক্ষিণ আফ্রিকার হৃদয় ভেঙে নতুন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ভারত
বড় মঞ্চে ব্যাট হাতে জ্বলে ওঠা শেফালি বর্মা ও দীপ্তি শর্মা পরে বোলিংয়েও দেখালেন ভেলকি। তাদের অলরাউন্ড নৈপুণ্যের বিপরীতে বিফলে গেল একপ্রান্ত আগলে দুর্দান্ত সেঞ্চুরি হাঁকানো লরা উলভার্টের প্রচেষ্টা। দক্ষিণ আফ্রিকার হৃদয় ভেঙে আইসিসি নারী বিশ্বকাপে নতুন চ্যাম্পিয়ন হলো ভারত।
রোববার নাবি মুম্বাইতে বৃষ্টির কারণে দুই ঘণ্টা দেরিতে শুরু হওয়া ফাইনালে ৫২ রানে জিতেছে ভারতীয়রা। টস হেরে আগে ব্যাট করে পুরো ওভার খেলে ৭ উইকেটে ২৯৮ রান তোলে তারা। জবাবে ২৭ বল বাকি থাকতে ২৪৬ রানে অলআউট হয় প্রোটিয়ারা।
নারী ওয়ানডে বিশ্বকাপে তিনবারের চেষ্টায় শিরোপার পরম আকাঙ্ক্ষিত স্বাদ নিতে পারল ভারত। নিজেদের মাটিতে কানায় কানায় পূর্ণ স্টেডিয়ামে শেষ হলো তাদের দীর্ঘ অপেক্ষার পালা, শুরু হলো উৎসব। এর আগে ২০০৫ ও ২০১৭ সালের আসরের ফাইনালে হেরেছিল তারা। অন্যদিকে, প্রথমবার শিরোপা নির্ধারণী লড়াইয়ে পৌঁছে তীব্র হতাশা নিয়ে মাঠ ছাড়তে হলো দক্ষিণ আফ্রিকাকে।
নারী বিশ্বকাপের ১৩তম আসরে এসে দেখা মিলল চতুর্থ চ্যাম্পিয়ন দলের। রেকর্ড সাতবার জিতেছে অস্ট্রেলিয়া। চারবার জিতে তাদের ঠিক পরেই ইংল্যান্ডের অবস্থান। বাকিটি গেছে নিউজিল্যান্ডের ঝুলিতে।
ফাইনালের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার জিতেছেন শেফালি। ওপেনিংয়ে নেমে ক্যারিয়ারসেরা ব্যাটিংয়ে তিনি খেলেন ৮৭ রানের আক্রমণাত্মক ইনিংস। ৭৮ বল মোকবিলায় তার ব্যাট থেকে আসে সাতটি চার ও দুটি ছক্কা। অনিয়মিত স্পিনার হলেও এরপর ক্যারিয়ারসেরা বোলিংয়ে ৭ ওভারে ৩৬ রান খরচায় তিনি নেন ২ উইকেট।
অথচ প্রতীকা রাওয়াল চোট না পেলে এবারের বিশ্বকাপে খেলাই হতো না শেফালির। কারণ, মূল স্কোয়াড তো বটেই, ছিলেন না রিজার্ভ তালিকাতেও। সেমিফাইনালের আগে ডাক পেয়ে সেই তিনিই সম্ভাব্য সেরা উপায়ে স্মরণীয় করে রাখলেন সুযোগকে।
আসরের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার গেছে দীপ্তির ঝুলিতে। ব্যাট হাতে তিনটি চার ও একটি ছক্কায় ৫৮ বলে ৫৮ রান করার পর অফ স্পিনে ৯.৩ ওভারে ৩৯ রানে তার শিকার ৫ উইকেট। নারী-পুরুষ মিলিয়ে কোনো ওয়ানডে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ফিফটি হাঁকানো ও ৫ উইকেট নেওয়া প্রথম খেলোয়াড় তিনি।
অনন্য কীর্তি গড়া দীপ্তির বলে দক্ষিণ আফ্রিকার নাডিন ডি ক্লার্ক এক্সট্রা কভারে ভারতের অধিনায়ক হারমানপ্রিত কৌরকে ক্যাচ দিলে ইতি ঘটে ফাইনালের। নয় ম্যাচে মোট ২১৫ রানের সঙ্গে তিনি সব মিলিয়ে পেয়েছেন এবারের বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ ২২ উইকেট।
বড় লক্ষ্য তাড়ায় দক্ষিণ আফ্রিকার শুরুটা হয় ভালো। ৫৭ বলে ৫১ রানের জুটি ভাঙে টাজমিন ব্রিটস (৩৫ বলে ২৩ রান) আমানজোত কৌরের সরাসরি থ্রোতে রানআউট হলে। দ্রুত আরেকটি সাফল্য আদায় করে ভারত। আন্নেকে বশ খুলতে পারেননি রানের খাতা।
প্রতিরোধ গড়ে সুনে লুসকে নিয়ে এগোতে থাকেন উলভার্ট। তবে হারমানপ্রিত ২১তম ওভারে শেফালিকে আক্রমণে আনলে কাজে লেগে যায় বাজি। দ্বিতীয় বলেই ফিরতি ক্যাচে লুসকে (৩১ বলে ২৫ রান) আউট করেন তিনি। থামে ৫১ বলে ৫২ রানের জুটি। ওয়ানডে ক্যারিয়ারে এর আগে স্রেফ একটি উইকেট পাওয়া শেফালির পরের ওভারে কাটা পড়েন মারিজান ক্যাপ (৫ বলে ৪ রান)।
এরপর সিনালো জাফটাকে (২৯ বলে ১৬ রান) ফিরিয়ে দীপ্তি উইকেট শিকারে যোগ দিলে বিপাকে পড়ে দক্ষিণ আফ্রিকা। ১৪৮ রানে তারা হারায় পঞ্চম উইকেট। উজ্জ্বল হয়ে ওঠে ভারতের জয়ের সম্ভাবনা।
এবারের বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক (নয় ম্যাচে ৫৭১) উলভার্ট অবশ্য হাল ছেড়ে দেননি। আনেরি ডের্কসেনকে নিয়ে ম্যাচে রোমাঞ্চ ফিরিয়ে আনেন তিনি। তাদের জুটিতে ৩৯তম ওভারে দুইশ পেরিয়ে যায় দক্ষিণ আফ্রিকা।
এরপর আবার মঞ্চের কেন্দ্রে আবির্ভূত হন দীপ্তি। ডের্কসেনকে (৩৭ বলে ৩৫ রান) দারুণ ইয়র্কারে বোল্ড করে ভাঙেন ৬১ বলে ৬১ রানের জুটি। ওই ওভারেই সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন উলভার্ট, ৯৬ বলে। নারী-পুরুষ মিলিয়ে কোনো বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল ও ফাইনালে সেঞ্চুরি করা দ্বিতীয় ক্রিকেটার তিনি। ২০২২ সালের সবশেষ আসরে অস্ট্রেলিয়ার অ্যালিসা হিলি প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে এই কীর্তি গড়েছিলেন।
নিজের পরের ওভারে জোড়া শিকার ধরেন দীপ্তি। ভারতের পথে সবচেয়ে বড় কাঁটা হয়ে থাকা উলভার্ট আউট হন ৯৮ বলে ১০১ রানে। ডিপ মিডউইকেটে তিনবারের চেষ্টায় ঝাঁপিয়ে পড়ে তার ক্যাচ হাতে জমান আমানজোত। তার ইনিংসে চার ১১টি ও ছক্কা একটি। ক্লোয়ি ট্রাইয়ন (৮ বলে ৯ রান) পড়েন এলবিডব্লিউয়ের ফাঁদে।
এরপর আয়াবোঙ্গা খাকা (৭ বলে ১ রান) রানআউট ও ডি ক্লার্ক (১৯ বলে ১৮ রান) দীপ্তির পঞ্চম শিকার হলে অলআউট হয়ে যায় দক্ষিণ আফ্রিকা। ফলে বেশ বড় ব্যবধানে জিতে শিরোপা উঁচিয়ে ধরার স্বাদ মিলল ভারতের।
ভারতের ব্যাটিংয়ের প্রতিবেদন পড়ুন এখানে:
