সেকেন্ডে শরীর ভেদ করে যায় ১০০ ট্রিলিয়ন কণা, ‘গোস্ট পার্টিকেল’ নিউট্রিনো গবেষণায় এবারের নোবেল
মহাকাশ থেকে আসা অতি ক্ষীণ ও রহস্যময় কণা নিউট্রিনো শনাক্তের জন্য বিশাল পর্যবেক্ষণাগার তৈরির পথ দেখিয়ে পদার্থবিজ্ঞানে এ বছর নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন বেলজিয়ামের পদার্থবিদ অধ্যাপক ফ্রান্সিস হ্যালজেন।
অ্যান্টার্কটিকার দক্ষিণ মেরুতে এক ঘনকিলোমিটার বরফের মধ্যে হাজার হাজার আলোকসংবেদী সেন্সর বসিয়ে ‘আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি’ গড়ে তোলার নেতৃত্ব দেন তিনি। রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস বলেছে, আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরির ক্ষেত্রে তার বৈজ্ঞানিক দূরদৃষ্টি ও নেতৃত্ব ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিবিসির প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
১৯৮৮ সালে দক্ষিণ মেরুতে নিউট্রিনো শনাক্তের এই পর্যবেক্ষণাগার তৈরির ধারণা প্রথম উপস্থাপন করেছিলেন হ্যালজেন। পরে তার নেতৃত্বে অ্যান্টার্কটিকার প্রায় এক কিলোমিটার ঘন বরফের মধ্যে দীর্ঘ তারের সঙ্গে হাজার হাজার সেন্সর স্থাপন করা হয়।
নিউট্রিনোকে বলা হয় ‘গোস্ট পার্টিকেল বা ভুতুড়ে কণা’। কারণ এগুলো এতটাই দুর্বলভাবে অন্য পদার্থের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে যে শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন। সূর্য থেকে প্রতি সেকেন্ডে বিপুলসংখ্যক নিউট্রিনো পৃথিবীতে আসে। এমনকি মানুষের শরীরের মধ্য দিয়েও প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১০০ ট্রিলিয়ন নিউট্রিনো চলে যায়, অথচ প্রায় কোনো নিউট্রিনোই শরীরের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে না।
তবে আইসকিউবের লক্ষ্য সাধারণ নিউট্রিনো নয়। দূরবর্তী ছায়াপথে সুপারনোভা বিস্ফোরণের মতো ভয়াবহ ও উচ্চশক্তির মহাজাগতিক প্রক্রিয়ায় তৈরি নিউট্রিনো শনাক্ত করাই এর অন্যতম উদ্দেশ্য। বিজ্ঞানীদের কাছে এসব নিউট্রিনো যেন মহাবিশ্বের দূরবর্তী ও চরম ঘটনাগুলোর বার্তাবাহক।
কীভাবে ধরা পড়ে নিউট্রিনো?
নিউট্রিনো সাধারণত বরফের মধ্য দিয়ে সরাসরি চলে যায়। তবে খুবই বিরল ক্ষেত্রে কোনো নিউট্রিনো বরফের পরমাণুর নিউক্লিয়াসের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়। তখন দ্রুতগতির চার্জযুক্ত কণা তৈরি হয়, যা বরফের মধ্যে নীল আলোর ক্ষীণ ঝলক সৃষ্টি করে। আইসকিউবের সংবেদনশীল সেন্সর সেই আলো শনাক্ত করে। আলোটি কখন এবং কোন দিকে তৈরি হয়েছে, তা বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা নিউট্রিনোটি কোথা থেকে এসেছে তা অনুমান করতে পারেন।
নোবেল পদার্থবিজ্ঞান পুরস্কার কমিটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মার্ক পিয়ার্স বলেছেন, হ্যালজেনের অধ্যবসায় ও বৈজ্ঞানিক দূরদৃষ্টি নতুন ধরনের জ্যোতির্বিজ্ঞানের পথ তৈরি করেছে।
নিউট্রিনো নিয়ে এত আগ্রহ কেন?
নিউট্রিনো শুধু মহাকাশের দূরবর্তী ঘটনাগুলো পর্যবেক্ষণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই কণা মহাবিশ্বের কয়েকটি বড় রহস্য সমাধানের সূত্রও দিতে পারে।
নিউট্রিনোর অস্তিত্বের তাত্ত্বিক ধারণা প্রথম দেন পদার্থবিদ উলফগ্যাং পাওলি। ১৯৩০ সালে তেজস্ক্রিয় ক্ষয়ের একটি অমীমাংসিত বিষয় ব্যাখ্যা করতে তিনি এই কণার অস্তিত্বের প্রস্তাব দেন। পরে ১৯৫০-এর দশকে পরীক্ষার মাধ্যমে নিউট্রিনোর অস্তিত্ব নিশ্চিত করা হয়।
নিউট্রিনোর তিনটি পরিচিত ধরন বা ‘ফ্লেভার’ রয়েছে, যেমন—ইলেকট্রন নিউট্রিনো, মিউন নিউট্রিনো ও টাও নিউট্রিনো। বিজ্ঞানীরা পরে দেখতে পান, মহাকাশে চলার সময় নিউট্রিনো এক ধরনের ফ্লেভার থেকে অন্য ধরনের ফ্লেভারে পরিবর্তিত হতে পারে।
এই আবিষ্কার পদার্থবিজ্ঞানে বড় একটি সমস্যার জন্ম দেয়। কারণ নিউট্রিনোর ফ্লেভার পরিবর্তন বা ‘অসিলেশন’ সম্ভব হতে হলে নিউট্রিনোর ভর থাকতে হবে। অথচ কণাপদার্থবিজ্ঞানের স্ট্যান্ডার্ড মডেল অনুযায়ী নিউট্রিনোর ভর থাকার কথা নয়। পরে গবেষণায় দেখা যায়, নিউট্রিনোর ভর অত্যন্ত ক্ষুদ্র হলেও তা শূন্য নয়।
মহাবিশ্বে পদার্থের অস্তিত্বের রহস্য
নিউট্রিনো নিয়ে গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, মহাবিশ্বে পদার্থ এত বেশি এবং প্রতিপদার্থ বা অ্যান্টিম্যাটার এত কম কেন।
বিগ ব্যাংয়ের পর সমপরিমাণ পদার্থ ও প্রতিপদার্থ তৈরি হওয়ার কথা ছিল। তারা পরস্পর ধ্বংস হয়ে গেলে মহাবিশ্বে শুধু শক্তি থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে মহাবিশ্বে বিপুল পরিমাণ পদার্থ রয়েছে, আর প্রতিপদার্থ তুলনামূলকভাবে বিরল। এই বৈষম্যকে পদার্থ-প্রতিপদার্থের অসমতা বলা হয়।
বিজ্ঞানীদের একটি ধারণা হলো, নিউট্রিনোর আচরণে এমন কোনো পার্থক্য থাকতে পারে, যা এই অসমতার ব্যাখ্যা দিতে সাহায্য করবে। কিছু পরীক্ষায় নিউট্রিনো ও অ্যান্টিনিউট্রিনোর ফ্লেভার পরিবর্তনের সম্ভাবনায় পার্থক্যের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এটি নিশ্চিত হলে তা ‘সিপি ভায়োলেশন’-এর প্রমাণ হতে পারে, যা মহাবিশ্বে পদার্থের আধিক্যের কারণ বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
ডার্ক ম্যাটারের সঙ্গে সম্পর্ক কী?
নিউট্রিনোকে ঘিরে আরেকটি বড় প্রশ্ন ডার্ক ম্যাটার। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা জানেন, মহাবিশ্বের বিপুল অংশ এমন এক অদৃশ্য পদার্থ দিয়ে গঠিত, যার উপস্থিতি সরাসরি দেখা যায় না। এর মহাকর্ষীয় প্রভাবের মাধ্যমে ডার্ক ম্যাটারের অস্তিত্বের ধারণা পাওয়া যায়।
সাধারণ নিউট্রিনোর কিছু বৈশিষ্ট্য ডার্ক ম্যাটারের সঙ্গে মিলে গেলেও তাদের ভর খুব কম এবং তারা প্রায় আলোর গতির কাছাকাছি চলে। ফলে মহাবিশ্বের ছায়াপথ ও অন্যান্য মহাজাগতিক কাঠামো গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ধীরগতির ‘ঠান্ডা’ ডার্ক ম্যাটার হিসেবে সাধারণ নিউট্রিনোকে উপযুক্ত মনে করা হয় না।
তবে বিজ্ঞানীরা ‘স্টেরাইল নিউট্রিনো’ নামে ভারী এক ধরনের সম্ভাব্য নিউট্রিনোর কথা বিবেচনা করেছেন। তাত্ত্বিকভাবে এগুলো ডার্ক ম্যাটারের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু এখন পর্যন্ত এসব কণার অস্তিত্বের পক্ষে নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
নিউট্রিনো নিজেরই প্রতিকণা কি না, সেটিও বিজ্ঞানীদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এ বিষয়ে ‘নিউট্রিনোলেস ডাবল বিটা ডিকে’ নামে একটি বিরল প্রক্রিয়া খোঁজা হচ্ছে। এর প্রমাণ পাওয়া গেলে মহাবিশ্বে পদার্থ কেন প্রতিপদার্থের চেয়ে বেশি—সেই প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার পথ আরও পরিষ্কার হতে পারে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, এখনো পুরোপুরি বোঝা না গেলেও নিউট্রিনো আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম রহস্যময় কণা। মহাবিশ্বের উচ্চশক্তির ঘটনাগুলো পর্যবেক্ষণ থেকে শুরু করে পদার্থের অস্তিত্ব ও ডার্ক ম্যাটারের প্রকৃতি বোঝা—বিভিন্ন ক্ষেত্রেই এই ‘ভুতুড়ে কণা’ গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দিতে পারে।
