এআই দিয়ে ভাইরাস বানালেন বিজ্ঞানীরা, নিরাপত্তা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে প্রথমবারের মতো নতুন ভাইরাস তৈরি করেছেন বিজ্ঞানীরা। চিকিৎসাবিজ্ঞানের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক, তবে প্রযুক্তিটি ভবিষ্যতে কতটা নিরাপদ থাকবে তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, এখানে যে ভাইরাস তৈরি করা হয়েছে, তা ব্যাকটেরিওফাজ বা সংক্ষেপে ফাজ নামে পরিচিত। এ ধরনের ভাইরাস কেবল ব্যাকটেরিয়াকে সংক্রমিত করে, মানুষ বা অন্য প্রাণীকে নয়। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অ্যান্টিবায়োটিকে কাজ না করা দীর্ঘস্থায়ী ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের চিকিৎসায় ফাজ থেরাপি ব্যবহার করা হচ্ছে।
গবেষণাগারে দেখা গেছে, এআই-নকশা করা কয়েকটি ফাজের সমন্বয়ে তৈরি একটি ককটেল এমন ই. কোলাই ব্যাকটেরিয়াকেও ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে, যেগুলো প্রাকৃতিক ফাজের প্রতিরোধী হয়ে উঠেছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রাসায়নিক প্রকৌশলী ড. ব্রায়ান হাই ও তার সহকর্মীরা এই গবেষণার নেতৃত্ব দেন। তারা জিনোম ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল নামে পরিচিত এক ধরনের এআই ব্যবহার করেন, যা মূলত মানুষের ব্যবহৃত বড় ভাষা মডেলের সংস্করণ। এই প্রযুক্তির সাহায্যে তারা নতুন ফাজের জিনোম বা জিনগত নকশা তৈরি করেন।
এরপর সেই নকশা ব্যবহার করে পরীক্ষাগারে সত্যিকারের ফাজ তৈরি করা হয় এবং ব্যাকটেরিয়ার ওপর পরীক্ষা চালানো হয়।
গবেষকদের বিশ্বাস, ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তির সাহায্যে খুব দ্রুত নির্দিষ্ট ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে নতুন ফাজ তৈরি করা যাবে। ফলে এমন অনেক সংক্রমণের চিকিৎসা করা সম্ভব হবে, যেগুলো এখন সহজে সারানো যায় না। এই গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্স-এ।
তবে বিজ্ঞানীরা শুরু থেকেই সতর্ক থাকার কথা বলেছেন। তাদের মতে, এমন প্রযুক্তি ব্যবহার করার সময় নিরাপত্তাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। তাই এ ধরনের গবেষণায় নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদেরও যুক্ত থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
একই বিষয়ে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই গবেষক, টম ইংলেসবি ও মরিটজ হ্যাঙ্কে। তাদের মতে, এখন এআই দিয়ে ভাইরাসের জিনোম তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু এই প্রযুক্তিকে নিরাপদভাবে নিয়ন্ত্রণ করার মতো নিয়মকানুন এখনও পুরোপুরি তৈরি হয়নি।
গবেষণায় ইভিও১ এবং ইভিও২ নামে দুটি এআই মডেল ব্যবহার করা হয়েছে। এগুলোকে প্রায় ২০ লাখ ব্যাকটেরিওফাজের জিনগত তথ্য দিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তবে মানুষ, প্রাণী বা গাছে রোগ ছড়াতে পারে এমন কোনো ভাইরাসের তথ্য ইচ্ছা করেই এতে দেওয়া হয়নি। এতে বিপজ্জনক ভাইরাস তৈরির ঝুঁকি কমে।
এআই কয়েক হাজার সম্ভাব্য জিনোম তৈরি করেছিল। সেখান থেকে বিজ্ঞানীরা প্রায় ৩০০টি বেছে নিয়ে পরীক্ষাগারে তৈরি করেন। কিন্তু এর মধ্যে মাত্র ১৬টি সত্যিই কাজ করেছে। যদিও সংখ্যায় কম, এই ১৬টি ফাজ একসঙ্গে ব্যবহার করে ই. কোলাইয়ের দুটি কঠিন ধরনের ব্যাকটেরিয়াকে সফলভাবে ধ্বংস করা গেছে।
বিজ্ঞানীদের মতে, এখানে থেকে দেখা গেছে এআই সত্যিই কাজ করতে পারে। তবে এর মানে এই নয় যে, এখনই এআই দিয়ে যেকোনো ভাইরাস সহজে তৈরি করা সম্ভব। কারণ, ব্যাকটেরিওফাজের জিনোম খুব ছোট ও তুলনামূলক সহজ। মানুষ বা প্রাণীতে রোগ ছড়ানো ভাইরাসের জিনোম অনেক বেশি জটিল।
যুক্তরাজ্যের ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক টম এলিস বলেন, এআইকে যদি বিপজ্জনক রোগজীবাণুর তথ্য দিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যতে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তবে জিনগত তথ্যের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা এবং বিপজ্জনক জিনোম তৈরির ওপর নজরদারি রাখলে সেই ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
কিংস কলেজ লন্ডনের গবেষক ড. ফিলিপা লেনজোস মনে করেন, শুধু এআইকে নিয়ন্ত্রণ করলেই হবে না। যখন পরীক্ষাগারে ডিএনএ তৈরি করা হয়, তখনও কঠোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি গবেষণা, প্রযুক্তির ব্যবহার ও পরীক্ষাগারের নিরাপত্তা সব ক্ষেত্রেই সতর্ক থাকতে হবে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, এআই ভবিষ্যতে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন দরজা খুলে দিতে পারে। তবে সেই দরজা যেন মানুষের জন্য আশীর্বাদ হয়ে ওঠে, বিপদ নয়—সেটি নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।