লিঙ্গ-ধর্ম নির্বিশেষে নির্বিঘ্ন ভোটাধিকার চায় সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে লিঙ্গ, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র ও সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে সব নাগরিক যেন নির্বিঘ্নে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, সে জন্য নির্বাচন কমিশনকে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিতের আহ্বান জানিয়েছে সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি।
আজ মঙ্গলবার সকাল ১১টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানায় নারী, মানবাধিকার ও উন্নয়নমূলক ৭১টি সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত এ প্ল্যাটফর্মটি।
এ সময় প্রধান নির্বাচন কমিশনার বরাবর একটি স্মারকলিপি পাঠ করে শোনানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে স্বাগত বক্তব্যে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার মধ্য দিয়ে দেশে গণতান্ত্রিক চর্চা পুনরুদ্ধারের প্রশ্নটি আবারও সামনে এসেছে।
তিনি বলেন, সংসদে নারীদের অর্থবহ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে নারী সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছে। এর মধ্যে সংরক্ষিত নারী আসনের সংখ্যা বাড়ানো, এসব আসনে ভোটের পদ্ধতি সংস্কার এবং রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে বেশি সংখ্যক নারী প্রার্থী মনোনয়নের দাবি রয়েছে। তবে এসব বিষয়ে অগ্রগতি এখনো হতাশাজনক।
মনোনয়নসংক্রান্ত তথ্য তুলে ধরে ফওজিয়া মোসলেম বলেন, আসন্ন নির্বাচনে নারী প্রার্থীর হার মাত্র প্রায় চার দশমিক দুই শতাংশ, যা নারী আন্দোলনের দৃষ্টিকোণ থেকে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি জানান, এর আগে নারী সংগঠনের প্রতিনিধিরা নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে প্রার্থী মনোনয়ন, নির্বাচনে অর্থ ও পেশিশক্তির প্রভাব এবং জেন্ডার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে প্রয়োজনীয় সংস্কারসংক্রান্ত একগুচ্ছ প্রস্তাব জমা দিয়েছিলেন। কমিশন পরবর্তীতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ভোটাধিকার নিয়ে কিছু উদ্যোগ নিলেও নারী সংগঠনগুলোর অন্যান্য দাবির বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি বলে তিনি অভিযোগ করেন।
ফওজিয়া মোসলেম বলেন, সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি নির্বাচন ঘনিয়ে আসার পর আবারও নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠকের অনুরোধ জানালেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
তিনি বলেন, নির্বাচন যখন খুব কাছে, তখন গণমাধ্যমের মাধ্যমে আমাদের উদ্বেগ ও প্রস্তাব নির্বাচন কমিশনের সামনে তুলে ধরছি। নারী প্রার্থী, সাম্প্রদায়িকতা এবং নারীর প্রতি সহিংসতা, এই বিষয়গুলোকে তিনি বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিশেষ উদ্বেগের জায়গা হিসেবে উল্লেখ করেন।
স্মারকলিপিটি পাঠ করেন অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের উইমেনস রাইটস অ্যান্ড জেন্ডার ইকুইটি টিমের ব্যবস্থাপক মরিয়ম নেছা।
স্মারকলিপিতে বলা হয়, জাতীয় সংসদ নির্বাচন গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। দেশে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নারীরা ঐতিহাসিকভাবে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছেন। অথচ নির্বাচনের সময় এবং শাসনব্যবস্থায় নারীদের পাশাপাশি ধর্মীয় সংখ্যালঘু, আদিবাসী ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে পূর্ণ নাগরিক হিসেবে নয়, কেবল ভোটার হিসেবে দেখা হয়।
বর্তমান নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে স্মারকলিপিতে বলা হয়, নির্বাচনের আগে নারীদের, সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সহিংসতা ও ভয়ভীতির বিভিন্ন ঘটনার খবর পাওয়া যাচ্ছে।
এ অবস্থায় নারীসহ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সদস্যরা যেন নিরাপদ ও স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারেন, সে জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ধর্মীয় সংখ্যালঘু, আদিবাসী, প্রতিবন্ধী ও অন্যান্য সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়।
১০ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে—ভোটের আগে, ভোটের দিন ও পরবর্তী সময়ে সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা; ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নারীদের বিরুদ্ধে হয়রানি ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ঠেকাতে কঠোর নজরদারি; নির্বাচনী ব্যয়ের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ ও তা কঠোরভাবে প্রয়োগ; নারী প্রার্থীদের জন্য বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা; এবং নির্বাচনী প্রচারে ধর্ম ব্যবহারের ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু, ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক শাশ্বতী বিপ্লবসহ বিভিন্ন নারী ও মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিনিধিরা।