প্রথম চাকরিটি কি স্বপ্নের চাকরিই হতে হবে?

আব্দুল্লাহ সেরু
আব্দুল্লাহ সেরু

সকাল ৯টা। ঢাকার মিরপুরের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের তৃতীয়তলায় আজ রাকিবের প্রথম কর্মদিবস। অফিসে ঢোকার আগে লিফটের আয়নায় শেষবারের মতো নিজের চেহারাটা দেখলেন তিনি। নীল শার্টটা আগের রাতেই ইস্ত্রি করে রেখেছিলেন। কালো জুতা জোড়া নতুন না হলেও ভালো করে পালিশ করা। চুলটাও একটু বেশি পরিপাটি করার চেষ্টা করেছেন।

সকালে বের হওয়ার সময় মা দরজায় দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, ‘সময়মতো খেয়ে নিস। আর মন দিয়ে কাজ করিস।’ রাকিব শুধু মাথা নেড়ে বলেছিল, ‘দোয়া করো।’

বাবা হয়তো এরই মধ্যে আত্মীয়দের ফোন করে জানিয়ে দিয়েছেন, ছেলে চাকরি পেয়েছে। কিন্তু রাকিবের ভেতরে তখন অন্যরকম একটা অনুভূতি—‘চার বছর বাংলা পড়ে শেষ পর্যন্ত ডাটা এন্ট্রির চাকরি!’

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সময় তার স্বপ্নটা এমন ছিল না। রাকিব বাংলা নিয়ে পড়েছে; শেষ দিকে গল্প লিখত, কবিতা পড়ত, বিতর্ক করত, ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যুক্ত থাকত। বন্ধুদের আড্ডায় অনেকবার বলেছে, ‘আমি একদিন লেখালেখি করব। সাংবাদিকতা বা মিডিয়ায় কাজ করব। এমন কিছু করব, যেখানে মানুষের গল্প নিয়ে কাজ করা যায়।’

কিন্তু চার বছর পর বাস্তবতা তাকে অন্য জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে। সে যে চাকরিটা পেয়েছে, সেটি একটি প্রতিষ্ঠানের অ্যাডমিন ও ডাটা এন্ট্রি এক্সিকিউটিভের পদ। কম্পিউটারে তথ্য আপডেট করা, ফাইল গোছানো, অফিসের কাগজপত্র দেখা, প্রয়োজন হলে বিভিন্ন দপ্তরে যোগাযোগ করা—এই তার মূল কাজ। এটা তার স্বপ্নের চাকরি নয়।

চাকরিটা পাওয়ার খবরে মা-বাবা খুশি হলেও রাকিব নিজে খুব একটা উচ্ছ্বসিত হয়নি। কিন্তু সে চাকরিটা নিয়েছে। কারণ, তার কাছে তখন ‘স্বপ্নের চাকরি’র চেয়েও জরুরি ছিল ‘একটি চাকরি’।

রাকিবের গল্পটি হয়তো বাংলাদেশের হাজারো তরুণের গল্প। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি হাতে আসার পর অনেকেই আবিষ্কার করেন, চাকরির বাজার তার অপেক্ষায় বসে নেই।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা ছেলে-মেয়েদের মধ্যে বেকারত্বের হার ১৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ, যা সব শিক্ষাগত স্তরের মধ্যে সর্বোচ্চ। প্রায় ৮ লাখ ৮৫ হাজার স্নাতক তখন বেকার ছিলেন। অর্থাৎ, ডিগ্রি অর্জন করলেই চাকরির নিশ্চয়তা মিলছে না। অনেক তরুণকে মাসের পর মাস, কখনো বছরের পর বছর চাকরি খুঁজতে হচ্ছে। আবেদন, লিখিত পরীক্ষা, ভাইভা, আবার অপেক্ষা। কেউ একটি চাকরির জন্য শত শত আবেদন করছেন। কেউ ‘ফ্রেশার’ হয়েও ইন্টারভিউতে প্রশ্ন শুনছেন, ‘অভিজ্ঞতা আছে?’

এই অভিজ্ঞতাটা হবে কীভাবে, যদি প্রথম সুযোগটাই না দেওয়া হয়? এই বাস্তবতায় একজন তরুণ যখন প্রথম চাকরির সুযোগ পান, সেটি পছন্দের না হলেও গ্রহণ করা অনেক সময় বাস্তব জীবনের প্রয়োজন হয়ে দাঁড়ায়। রাকিবও তাই করেছে।

কিন্তু এখানেই গল্পের আসল জায়গাটা। কারণ, প্রথমটা তার স্বপ্নের চাকরি না হলেও সেটি তার জীবনের অপ্রয়োজনীয় একটি বছর হতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। বরং সেই চাকরিটিই হয়তো তাকে এমন কিছু শেখাবে, যা চার বছরের বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেখাতে পারেনি।

প্রথম কয়েক মাসেই রাকিব বুঝবেন, অফিসে কাজ করার নিয়ম আলাদা। শুধু নিজের কাজ জানলেই হয় না, অন্যের সঙ্গে কাজ করতে হয়, সময়মতো কাজ শেষ করতে হয়, একটি ভুল কখনো কখনো অন্য একজনের কাজ আটকে দিতে পারে।

তিনি শিখবেন, সিনিয়রকে কীভাবে প্রশ্ন করতে হয়, কোনো কাজ বুঝতে না পারলে কখন সাহায্য চাইতে হয়, সহকর্মীর সঙ্গে মতের অমিল হলে কীভাবে তা সামলাতে হয়। শিখবেন, একটি অফিসিয়াল ই-মেইল কীভাবে লিখতে হয়, মিটিংয়ে কীভাবে কথা বলতে হয়, নিজের দায়িত্বের বাইরে গিয়ে কখন একটু এগিয়ে আসতে হয়।

এসব ছোট ছোট বিষয়ই ধীরে ধীরে একজন নতুন স্নাতককে পেশাজীবী করে তোলে। আর হয়তো একদিন তার বস তাকে একটি ছোট প্রতিবেদন তৈরি করতে বলবেন। সেটা লিখতে গিয়ে রাকিবের পুরোনো লেখালেখির অভ্যাস কাজে লাগবে। হয়তো কোনো একদিন তাকে প্রতিষ্ঠানের একটি অনুষ্ঠান নিয়ে ছোট্ট লেখা লিখতে দেওয়া হবে। সেখান থেকেই তার ভেতরের পুরোনো আগ্রহটা আবার মাথা তুলবে। হয়তো তিনি বুঝবেন, তার বাংলা পড়াটা একেবারে বৃথা যায়নি। হয়তো কয়েক বছর পর তিনি অ্যাডমিনের চাকরি ছেড়ে কোনো প্রতিষ্ঠানের যোগাযোগ বিভাগে কাজ করবেন। হয়তো সাংবাদিকতায় যাবেন। হয়তো যাবেন না।

কিন্তু তার প্রথম চাকরিটি তাকে অন্তত একটি অমূল্য জিনিস দেবে—অভিজ্ঞতা। আর অভিজ্ঞতার মূল্য অনেক সময় আমরা বুঝি তখনই, যখন পরের চাকরির ইন্টারভিউতে কেউ জিজ্ঞেস করে, ‘আপনার কী অভিজ্ঞতা আছে?’ তখন রাকিব আর বলতে পারবেন না, ‘কিছুই নেই।’ তিনি বলতে পারবেন, ‘হ্যাঁ, আমি কাজ করেছি।’ এখানেই প্রথম চাকরির গুরুত্ব।

প্রথম চাকরি আসলে কী শেখায়?

আমরা অনেক সময় ক্যারিয়ারকে একটি সোজা সিঁড়ি মনে করি—বিশ্ববিদ্যালয় শেষ, ভালো চাকরি, পদোন্নতি, আরও ভালো চাকরি, বড় পদ। বাস্তবে মানুষের ক্যারিয়ার খুব কম ক্ষেত্রেই এত সুন্দরভাবে সাজানো থাকে। কেউ নিজের পড়াশোনার বিষয়েই চাকরি পান, কেউ সম্পূর্ণ ভিন্ন কাজে ঢোকেন। কেউ ছোট একটি প্রতিষ্ঠানে শুরু করেন, কেউ প্রথম চাকরিতেই বুঝে যান এই পেশা তার জন্য নয়। কেউ আবার একটি চাকরিতে ঢুকে এমন একটি দক্ষতা আবিষ্কার করেন, যা শেষ পর্যন্ত তার পুরো ক্যারিয়ারের দিক বদলে দেয়।

কারণ, ক্যারিয়ার শুধু কী কাজ করছি তার গল্প নয়। এটি একইসঙ্গে কী শিখছি এবং কী হয়ে উঠছি তার গল্প।

প্রথম চাকরি আপনাকে অফিসের বাস্তবতা বুঝতে শেখাতে পারে। শেখাতে পারে দায়িত্ব নেওয়া, ডেডলাইন মেনে চলা, ব্যর্থতা সামলানো, কঠিন সহকর্মীর সঙ্গে কাজ করা এবং নিজের ভুল স্বীকার করা। সবচেয়ে বড় কথা, এটি আপনাকে নিজের সম্পর্কে কিছু সত্যি কথা জানাতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ে হয়তো আপনি ভেবেছিলেন, আপনি মানুষের সঙ্গে কাজ করতে পছন্দ করেন। চাকরিতে গিয়ে বুঝলেন, গবেষণামূলক কাজই আপনার বেশি ভালো লাগে। অথবা ভেবেছিলেন ডেস্কে বসে কাজ করবেন, কিন্তু বুঝলেন মাঠে মানুষের সঙ্গে কাজ করতেই আপনার বেশি ভালো লাগে। কিংবা যে পেশাটিকে এতদিন স্বপ্নের মনে হয়েছে, সেটি করতে গিয়ে বুঝলেন, ‘না, এটা আমার জন্য নয়।’

সেটিও ব্যর্থতা নয়। সেটিও শিক্ষা।

তাহলে প্রথম চাকরির ক্ষেত্রে কী খুঁজব?

অবশ্যই বেতন গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারের দায়িত্ব থাকলে বেতনকে ছোট করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। ভালো প্রতিষ্ঠান, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং সম্মানজনক কাজও গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্রথম চাকরির ক্ষেত্রে আরও কয়েকটি প্রশ্ন করা যায়—

  • আমি এখানে কী শিখব?

  • কোন দক্ষতাগুলো তৈরি হবে?

  • কাদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পাব?

  • এক বছর পর আমি কি আজকের চেয়ে বেশি দক্ষ হব?

  • এই অভিজ্ঞতা কি আমাকে পরের সুযোগের জন্য প্রস্তুত করবে?

যদি উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়, তাহলে চাকরিটি হয়তো স্বপ্নের না হলেও মূল্যবান। কারণ, এখানে প্রথম চাকরির সবচেয়ে বড় বেতন কখনো কখনো মাস শেষে পাওয়া টাকাটি নয়। অভিজ্ঞতাটিও একটি বেতন।

তবে এর অর্থ এই নয় যে তরুণদের অন্যায্য বেতন, অনিরাপদ কর্মপরিবেশ, অসম্মানজনক আচরণ বা শোষণ মেনে নিতে হবে। শেখার সুযোগ আর শোষণ এক জিনিস নয়। একটি চাকরি আপনাকে শিখতে সাহায্য করবে, বড় হতে সাহায্য করবে—এটাই প্রত্যাশা। নিজের অধিকার ও মর্যাদার সঙ্গে আপস করে শুধু ‘অভিজ্ঞতা’ অর্জন করার প্রয়োজন নেই।

তাহলে স্বপ্নটা কী হবে?

স্বপ্ন ছেড়ে দিতে হবে না। রাকিব যদি সত্যিই লেখালেখি করতে চান, তাকে লিখতে হবে। অফিস শেষে লিখতে পারেন, ছুটির দিনে লিখতে পারেন, অনলাইন পোর্টালে লেখা পাঠাতে পারেন, নিজের পোর্টফোলিও তৈরি করতে পারেন, নতুন দক্ষতা শিখতে পারেন। প্রথম চাকরিকে তাই স্বপ্নের বিকল্প হিসেবে দেখার দরকার নেই। বরং এটিকে স্বপ্নের দিকে যাওয়ার একটি প্রস্তুতি হিসেবে দেখা যায়।

বাংলাদেশের তরুণদের জন্য এই কথাটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, চাকরির বাজার যখন কঠিন, তখন প্রথম সুযোগটি নিখুঁত না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। সেই সুযোগটিকে শুধু ‘এটা তো আমার কাজ নয়’ বলে প্রত্যাখ্যান করার আগে ভাবা দরকার, এই কাজটি আমাকে কোথায় নিয়ে যেতে পারে? হয়তো আজ আপনি যে কাজটি করছেন, সেটি আপনার ভালো লাগে না। কিন্তু সেই কাজ থেকে শেখা যোগাযোগ দক্ষতা, কম্পিউটার দক্ষতা, সময় ব্যবস্থাপনা, পেশাগত শৃঙ্খলা, মানুষের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা—সবকিছুই আগামী দিনের চাকরিতে আপনার কাজে লাগতে পারে।

ক্যারিয়ার কোনো সরল রেখা নয়। এটি অনেকটা রাস্তার মতো। কখনো সোজা, কখনো বাঁক আছে। কখনো ভুল পথে চলে যেতে হয়। কখনো ফিরে আসতে হয়। আবার কোনো কোনো অপ্রত্যাশিত রাস্তা শেষ পর্যন্ত আপনাকে এমন জায়গায় নিয়ে যায়, যেখানে যাওয়ার কথা আপনি কখনো ভাবেনই-নি। অথবা এটি অনেকটা নদীর মতো। কখনো সোজা যায়, কখনো বাঁক নেয়, কখনো নিজের পথ বদলায়। নদীর প্রতিটি বাঁক যেমন ভুল পথ নয়, ক্যারিয়ারের প্রতিটি পরিবর্তনও তেমন ব্যর্থতা নয়।

কয়েক বছর পর হয়তো কোনো এক সকালে রাকিব আবার লিফটের আয়নায় নিজের মুখ দেখবেন। এবার হয়তো তার গায়ে অন্য রঙের শার্ট। হাতে অন্য অফিসের আইডি কার্ড। সামনে অন্য কোনো দায়িত্ব। তখন হয়তো তার মনে পড়বে সেই নীল শার্টের সকালটির কথা। যে চাকরিটিকে তিনি একসময় নিজের স্বপ্নের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে পারেননি, সেটিই হয়তো তাকে পরের দরজাটা খুলতে শিখিয়েছিল।


আব্দুল্লাহ সেরু: একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার যোগাযোগ ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত।