শিক্ষকদের ভাগ্যে সামান্য বেতন, জোটে না পদোন্নতিও
জাতি গড়ার কারিগর হওয়া সত্ত্বেও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা কম বেতন পান। অনেক শিক্ষকেরই অভিমত, এই আর্থিক বৈষম্যই সমাজে তাদের মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করছে।
আজ বিশ্ব শিক্ষক দিবস। এই দিবসের আগে শিক্ষকরা জানিয়েছেন, গাড়িচালক, করণিক (ক্লার্ক) বা স্টেনোগ্রাফারের মতো পদের মতোই শিক্ষকদের বেতন গ্রেড (গ্রেড-১৩) নির্ধারণ করা হয়েছে। অথচ, এই পেশায় যোগ দেওয়ার জন্য শিক্ষকদের উচ্চতর শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রয়োজন হয়। শিক্ষকদের মতে, এটি তাদের পেশাকে দীর্ঘকাল ধরে অবমূল্যায়ন করার একটি প্রমাণ।
উদাহরণস্বরূপ, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন টেকনিশিয়ান-১ পদের জন্য একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে, যেখানে গ্রেড-১৩ দেওয়া হয়েছে। অথচ এই পদের জন্য কেবল এইচএসসি বা বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি পাসসহ ছয় মাসের অভিজ্ঞতার প্রয়োজন।
এর বিপরীতে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের অবশ্যই স্নাতক ডিগ্রিধারী হতে হয়। ২০১৯ সাল থেকে নারী ও পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই এই শিক্ষাগত যোগ্যতা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
সরকার স্বীকার করেছে যে শিক্ষকদের বেতন গ্রেড পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন এবং তারা নতুন একটি ক্যারিয়ার কাঠামোর প্রস্তাব পর্যালোচনা করছে, তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
বেতন গ্রেড নিচের দিকে হওয়ার কারণে শিক্ষকদের যে পরিমাণ বেতন দেওয়া হয়, তা দিয়ে সংসার চালানো অনেকের জন্যই কঠিন হয়ে পড়ে।
একজন উপসচিবের মাসিক গাড়ি ভাতার দিকে তাকালেই এই বৈষম্যের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাদের ৫০ হাজার টাকার গাড়ি ভাতাই একজন প্রাথমিক শিক্ষকের শুরুর মোট বেতনের প্রায় দ্বিগুণ।
নতুন বেতন স্কেল অনুযায়ী, সরকারি কর্মচারীদের ১০ থেকে ২০ গ্রেডের কর্মীদের মূল বেতন প্রথম ধাপে ৫০ শতাংশ বাড়ানো হবে। এর ফলে একজন প্রাথমিক শিক্ষকের মূল বেতন ১১ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১৭ হাজার ৫০০ টাকা হবে।
শিক্ষকরা জানিয়েছেন, বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা মিলিয়ে তাদের মাসিক মোট বেতন দাঁড়াবে মাত্র ২৫ হাজার ২৩০ টাকায়।
২০২৭ সালের জুলাই মাসে যখন বেতন কাঠামো পুরোপুরি কার্যকর হবে, তখন গ্রেড-১৩ অনুযায়ী একজন শিক্ষকের মূল বেতন হবে ২৪ হাজার টাকা।
শিক্ষাবিদদের মতে, বেতন ও সামাজিক মর্যাদা কম হওয়ার কারণে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী শিক্ষকতা পেশায় আসতে আগ্রহী হয় না।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমেদ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘যদি শিক্ষকতায় দক্ষ ও মেধাবী মানুষদের ধরে রাখতে হয়, তবে তাদের তুলনা কোনোভাবেই সরকারি চাকরির নিম্নস্তরের পদের সঙ্গে করা উচিত নয়।’
শিক্ষক ও শিক্ষাবিদরা বলছেন, সমস্যাটি শুধু বেতন বৈষম্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পদোন্নতির সীমিত সুযোগ, সুনির্দিষ্ট ক্যারিয়ার কাঠামোর অভাব এবং উচ্চতর শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও প্রাথমিক শিক্ষকদের তুলনামূলক কম সামাজিক মর্যাদা।
১৯৯৯ সালের ১৪ জানুয়ারি সহকারী শিক্ষক হিসেবে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগ দেন শাহিনুর আল আমিন। ২৭ বছরেরও বেশি সময় পার হয়ে গেলেও তিনি এখনো সেই একই পদে কর্মরত আছেন।
তিনি বলেন, ‘আমাদের মতো পেশাজীবীদের জন্য পদোন্নতি না থাকাটা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। কিন্তু আমাদের সব দুঃখ মনে চেপে রেখেই পাঠদান চালিয়ে যেতে হয়।’
তিনি আরও যোগ করেন, একটি সুনির্দিষ্ট ক্যারিয়ার পরিকল্পনা থাকলে এতদিনে তার অন্তত দুই বা তিনটি পদোন্নতি পাওয়া সম্ভব ছিল।
শাহিনুর জানান, ঢাকায় স্ত্রী, তিন সন্তান এবং মাকে নিয়ে চলতে তার মাসে প্রায় ৮০ হাজার টাকা খরচ হয়। এই খরচের যোগান দিতে তাকে আয়ের অন্য উৎসের ওপর নির্ভর করতে হয়।
তিনি বলেন, ‘আমাদের অনেকেই ছোটখাটো ব্যবসা করেন অথবা প্রাইভেট পড়ান। আমি গানবাজনার সঙ্গে যুক্ত; বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান গাই। রেডিও ও টেলিভিশনেও গান করি। এভাবেই আমাদের সংসার চালাতে হয়।’
বিভিন্ন দাবিদাওয়া নিয়ে নানা সময়ে শিক্ষকেরা রাজপথে নেমে আসেন। ২০২৫ সালের মে মাসে সহকারী শিক্ষকরা কর্মবিরতি পালন করেন। তাদের দাবি ছিল—নিয়োগের সময় ১১তম গ্রেড প্রদান এবং চাকরির ১০ ও ১৬ বছর পূর্তিতে উচ্চতর গ্রেড নিশ্চিত করা।
নভেম্বর নাগাদ তাদের এই দাবি ১০ম গ্রেডে উন্নীত হয়। শিক্ষকেরা যখন শাহবাগের দিকে মিছিল নিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন পুলিশ তাদের ওপর লাঠিপেটা করে, সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়ে এবং জলকামান ব্যবহার করে। এতে শতাধিক শিক্ষক আহত হন।
অর্থ বিভাগের সঙ্গে আলোচনার পর আন্দোলন সাময়িকভাবে স্থগিত করা হলেও পরে তা আবার শুরু হয়। অর্থ বিভাগ জানিয়েছে, শিক্ষকদের বেতন সংক্রান্ত প্রস্তাবটি জাতীয় বেতন কমিশনের কাছে পাঠানো হয়েছে।
দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে আলাপকালে বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক এবং আন্দোলনের অন্যতম নেত্রী খায়রুন নাহার লিপি বলেন, ১০ম গ্রেডের দাবিটি কেবল বেতনের বিষয় নয়, এটি শিক্ষকদের মর্যাদা ও ক্যারিয়ারের ভবিষ্যতের সঙ্গেও জড়িত।
তিনি বলেন, ‘এটি শুধু উচ্চ বেতনের দাবি নয়, বরং এটি শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদা, তাদের দায়িত্বের গুরুত্ব এবং একটি সুনির্দিষ্ট ক্যারিয়ার কাঠামোর দাবি।’
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিষয়ক পরামর্শক কমিটি ‘সহকারী শিক্ষক’ পদটি বিলুপ্ত করে ১২তম গ্রেডে নতুন শিক্ষক নিয়োগের প্রস্তাব করেছিল।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিষয়ক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পরামর্শক কমিটি ‘সহকারী শিক্ষক’ পদটি তুলে দিয়ে ১২তম গ্রেডে নতুন শিক্ষক নিয়োগের প্রস্তাব করেছিল।
তাদের পরিকল্পনা ছিল, দুই বছর পর শিক্ষকদের চাকরি স্থায়ী হবে এবং আরও দুই বছর পর তারা ১১তম গ্রেডে ‘সিনিয়র শিক্ষক’ হিসেবে পদোন্নতি পাবেন। পাশাপাশি প্রধান শিক্ষকদের ১০ম গ্রেডে দেওয়ার প্রস্তাবও ছিল।
এসব প্রস্তাবের একটিও এখন পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি।
পরামর্শক কমিটির প্রধান অধ্যাপক মনজুর আহমেদ বলেন, বিশ্ব শিক্ষক দিবসে ফাঁকা আওয়াজ না দিয়ে সরকারি ও বেসরকারি সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের পেশাগত মান, প্রস্তুতি, সুযোগ-সুবিধা, মর্যাদা এবং কাজের মূল্যায়নের বিষয়টি নতুন করে ঢেলে সাজানো জরুরি।
প্রাথমিক শিক্ষকদের এই দাবিগুলো থেকেই বোঝা যায়, সরকারি বেতন কাঠামোয় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের অবস্থান কতটা নিচে নেমেছে।
দ্য ডেইলি স্টারের পর্যালোচনা করা তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৩ সালের বেতন স্কেলে একজন প্রশিক্ষিত সহকারী শিক্ষক অষ্টম (৮ম) গ্রেডে ছিলেন, যেখানে তাদের মূল বেতন ছিল ২২০ টাকা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উন্নতির বদলে তারা এখন তালিকার একেবারে নিচের দিকে চলে এসেছেন।
অধ্যাপক মনজুর আহমেদ আরও বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতন অনেক কম।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, বর্তমানে সহকারী শিক্ষকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও দায়িত্ব অনেক বেড়েছে, তাই ১৩তম গ্রেড বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তিনি জানান, মন্ত্রণালয় শিক্ষকদের জন্য ১২তম গ্রেড দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে। সেই সঙ্গে পদোন্নতি দিয়ে তাদের ১১তম গ্রেডে 'সিনিয়র শিক্ষক' করার পরিকল্পনাও আছে।
তবে প্রতিমন্ত্রী এও বলেন, এই পরিবর্তন আনার আগে প্রশাসনিক কাঠামো, মোট পদের সংখ্যা এবং এতে সরকারের ওপর কী পরিমাণ আর্থিক প্রভাব পড়বে, তা আগে ভালোভাবে খতিয়ে দেখতে হবে।
ববি হাজ্জাজ আরও জানান, মন্ত্রণালয় শিক্ষকদের যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, প্রশিক্ষণ এবং কাজের পারফরম্যান্সের ওপর ভিত্তি করে একটি সুনির্দিষ্ট ক্যারিয়ার গাইডলাইন বা পদোন্নতির কাঠামো তৈরির জন্যও কাজ করছে।