রংপুর ও লালমনিরহাটে কালবৈশাখীর তাণ্ডব, ঘরবাড়ি-ফসলের ক্ষতি

নিজস্ব সংবাদদাতা, দিনাজপুর ও লালমনিরহাট

রংপুর ও লালমনিরহাটে বেশ কয়েকটি উপজেলায় তাণ্ডব চালিয়েছে কালবৈশাখী ঝড়। এতে আম, ভুট্টা, গম, ধানসহ উঠতি ফসলের ক্ষতি হয়েছে। ধংস হয়েছে কয়েকশ ঘরবাড়ি।

গতকাল মঙ্গলবার রাত নয়টর পর থেকে থেমে থেমে কালবৈশাখী ঝড় ও শিলা বৃষ্টি আঘাত হানে। রংপুর আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গেছে, বৃষ্টির পরিমাণ কম হলেও ঘুর্ণিঝড়ে বাতাসের বেগ বেশি ছিল। কোথাও কোথাও ভারি বজ্রপাতও হয়েছে। কোথাও কোথাও শিলা বৃষ্টির আঘাতে ঘরবাড়ির ক্ষতির পাশাপাশি ঝড়ে উড়ে গেছে স্থাপনা। শিলার তোপে মাটিতে নুয়ে পড়েছে কৃষকের সবুজ খেত।

জেলার পীরগঞ্জের বড় আলমপুর ইউনিয়নে মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে শ্যামদাসের পাড়া, ষোলঘড়িয়া ও আলমপুর গ্রামে ঝড়ে গাছপালা উপড়ে পড়ে, মাটির বাড়িঘর ভেঙে যায়। কারো কারো ঘরের চাল উড়ে গেছে। ধসে পড়েছে বাড়ির দেয়ালও। ক্ষতি হয়েছে ধান, ভুট্টা আম ও কলাগাছের।

স্থানীয় আজমল হোসেন জানান, ঝড়ে বড় আলমপুর ইউনিয়নের অনেক ঘরবাড়ি, গাছগাছালি ও উঠতি ফসলের ক্ষতি হয়েছে। কিছু কিছু জায়গায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

শ্যামদাসের পাড়া গ্রামের সোলেমান মিয়া বলেন, সারাদিন আকাশে মেঘ ছিল না। হঠাৎ রাতে যখন ঘুমানোর প্রস্তুতি চলছিল, তখন ঝড়বৃষ্টি শুরু হয়। ঘুর্ণিঝড়ে বাতাসের খুব বেগ ছিল। তার নিজের ঘরবাড়িসহ আশপাশের অনেকের বাড়ি ভেঙে তছনছ হয়েছে।

বড় আলমপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হাফিজুর রহমান সেলিম বলেন, রাতে ঘুর্ণিঝড় থেমে যাওয়ার পর বিভিন্ন ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা ঘুরে দেখেছি। প্রায় অর্ধশত বাড়ি ঘর ভেঙে গেছে। এই দুর্ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জানা যায়নি। তবে তালিকা করে যতটুকু সম্ভব সহযোগিতা করা হবে।

এদিকে পীরগঞ্জ ছাড়া কাউনিয়া, বদরগঞ্জ, গঙ্গাচড়া উপজেলার বেশ কয়েকটি গ্রামে তাণ্ডব চালিয়েছে কালবৈশাখী ঝড়। ঝড়ে কাউনিয়ার বিভিন্ন স্থানে বড় বড় গাছ ভেঙে পড়েছে, তছনছ হয়েছে অনেকের ঘরবাড়ি। ঝড়ে রেললাইনের ওপর গাছ ভেঙে পড়ায় সকালে মীরবাগে কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস চলাচলে বিঘ্ন ঘটে।

বিভিন্ন এলাকার কয়েকজন কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঘুর্ণিঝড় ও শিলা বৃষ্টিতে আমগাছে আসা গুঁটি ঝরে গেছে। বিভিন্ন এলাকায় আধপাকা ও পাকা গম, ধান আর ভুট্টা মাটিতে শুয়ে পড়েছে। হাড়িভাঙ্গা আমের জন্য বিখ্যাত মিঠাপুকুরের খোড়াগাছ, পদাগঞ্জ ও বদরগঞ্জের শ্যামপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় আম বাগানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

রংপুর আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা একেএম কামরুল হাসান জানান, মঙ্গলবার রাত ৯টা ৫ মিনিট থেকে রাত ৯টা ৫৫ মিনিট পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন স্থানসহ প্রত্যন্ত এলাকাতে ঘুর্ণিঝড় ও শিলা বৃষ্টি হয়েছে। ঝড়ের স্থায়ীত্ব ছিল ৫০ মিনিট। এসময় ৭ দশমিক শূন্য মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। ঝড়ের সঙ্গে বজ্রপাতের পাশাপাশি বাতাসের বেগ বেশি ছিল। আগামী দু-একদিন রংপুর অঞ্চলে ঝড়-বৃষ্টি হতে পারে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

lalmonirhat_tornado-01.jpg
লালমনিরহাট সদর উপজেলার ৬টি গ্রামের উপর দিয়ে কালবৈশাখী ঝড় বয়ে গেছে। এতে দুই শতাধিক ঘর-বাড়ি ধ্বংস হয়েছে। ছবি: এস দিলীপ রায়/স্টার

এদিকে, লালমনিরহাট সদর উপজেলার ৬টি গ্রামের উপর দিয়ে মঙ্গলবার রাত ১১টার দিকে কালবৈশাখী ঝড় বয়ে গেছে। এতে দুই শতাধিক কাঁচা ঘর-বাড়ি বিধ্বস হয়েছে। বাতাসে উড়ে গেছে অনেক ঘরের চাল ও বেড়া। উপড়ে গেছে গাছপালা আর জমির ভুট্টা গাছ। অনেকের বাড়ির হাঁস-মুরগির বাচ্চা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কালবৈশাখী ঝড়ে ঘর-বাড়ি হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে রয়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত মানুষজন।

এছাড়া পাটগ্রাম উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে শিলা বৃষ্টি হওয়ায় ধান, ভুট্টাসহ ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। উপজেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো পরিদর্শন করছে।

লালমনিরহাট সদর উপজেলার দিনমজুর রফিকুল ইসলামের স্ত্রী লাইলী বেগম (৪২) দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'আমাদের দুটি টিনের ঘরই কালবৈশাখী ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।'

৪ সন্তানকে নিয়ে এখন খোলা আকাশের নিচে থাকছেন তিনি। ঘর মেরামতের জন্য তাদের কোনো আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় অসহায় হয়ে পড়েছেন বলে জানান তিনি।

একই গ্রামের কদবানু বেওয়া (৬২) জানান, তার একটি টিনের ঘর রয়েছে কিন্তু কালবৈশাখি ঝড়ে তার ঘরের চাল ও বেড়া উড়ে গেছে। ঘর মেরামতের জন্য তার আর্থিক সঙ্গতি নেই বলে তিনি জানান।

ওই গ্রামের আমজাদ হোসেন (৬০) ডেইলি স্টারকে বলেন তার ৩টি টিনের ঘর ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। তার বাড়িতে ছোট খামারে এক হাজারটি মুরগির ছানা মারা গেছে।

লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক শামীম আশরাফ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'পাটগ্রাম উপজেলার কিছু স্থানে শিলা বৃষ্টিতে ফসলের ক্ষতি হয়েছে। শিলাবৃষ্টি ও কালবৈশাখী ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত ফসলের পরিমাণ নির্ধারণ করতে কৃষি বিভাগ মাঠে কাজ করছে।'

লালমনিরহাট সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মাহমুদা মাসুম ডেইলি স্টারকে বলেন, 'কালবৈশাখী ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত ঘর-বাড়ির পরিমাণ নির্ধারণ করে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সরকারিভাবে সহায়তা করা হবে।'