ঢাকায় ‘একদিনের কসাই’
‘মাংস বানাই, হাড় সাইজ করি…..কসাই লাগবে কসাই?’—কোরবানির ঈদের দিন ঢাকার অলিগলিতে এমন ডাক হরহামেশাই শোনা যায়। এদের কারো মূল পেশা অটোরিকশা চালানো, কারোর দিনমজুরি। কিন্তু বছরের এই বিশেষ দিনটির জন্য তারাই হয়ে ওঠেন ‘একদিনের কসাই’। কোরবানির দিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত রাজধানীর বড় একটি অংশ কার্যত তাদের দখলেই থাকে।
সকাল ৮টা। মিরপুর ১৪ নম্বরের পুলপাড় এলাকায় বাড়ি বাড়ি ঘুরে গরু-ছাগলের মাংস কাটার কাজ নিচ্ছিলেন কামাল হোসেন (৩০) ও নুরুন্নবী (৩৫)।
এই দুই অটোচালকের সঙ্গে আছে আরও ৫ জন। ৭ জনের এই গ্রুপটি বছরে শুধুমাত্র এই এক দিনের জন্য কসাই হয়ে যান।
রাস্তার মধ্যে বসেই মাংস সাইজ করা শুরু করেন তারা। দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, তিনটি গরুর মাংস কাটার কাজ পেয়েছেন। দুটির কাজ প্রায় শেষের পথে, একটা বাকি আছে।
গরুর দামের ১২ শতাংশ কমিশনে কাজ নিয়েছেন তারা।
অটো ছেড়ে আজ কেন এই কসাইয়ের কাজ?—এমন প্রশ্নের জবাবে নুরন্নবি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘ঈদের দিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত অটো চালালে সর্বোচ্চ আয় দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকা। আর তিনটা গরুর মাংস কেটে পাচ্ছি ৫ হাজার টাকা।’
এর মধ্যে মাংস কাটার ছুরি, চাকু, চাপাতিসহ আনুসাঙ্গিক যন্ত্রপাতি যার, তিনি গরু প্রতি অতিরিক্ত আরও দুই হাজার টাকা করে নিয়েছেন।
মিরপুরের কাফরুল এলাকায় এমন আরেকটি গ্রুপের দেখা মেলে।
১০ জনের এই গ্রুপটির ৯ জনই কোরবানির আগের রাতে ঢাকায় এসেছেন। এদের সবার বাড়ি ফরিদপুরের শালথা উপজেলায়। সেখানে কৃষি কাজ করেন তারা।
এদের একজন পিপুল মোল্লা (৪০)। তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘গতরাতে ইব্রাহিমপুরে ভাইয়ের বাসায় এসেছি। দুই দিন থাকবো। হাড়-মাংস কাটবো, ৫ হাজার টাকা দেবে।’
পিপুল মোল্লা আরও বলেন, ‘১০ জনের দল আমাদের। আজ সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ৬টা গরু কাটার অর্ডার নিয়েছি। কাল আরও ৩টা গরু কাটার অর্ডার আছে।’
এবার তাদের টিম লিডারদের আয় ভালো হবে বলে জানান তিনি। সবগুলোই বড় সাইজের গরু কোরবানির অর্ডার পেয়েছেন। গরুর দামের ১০ শতাংশ কমিশনে কাজ করেন তারা।
কথা বলে জানা যায়, ১০ জনের এই দলে কেবলমাত্র ২ জন কসাইয়ের কাজ জানেন। বাকিরা সাহায্যকারী হিসেবে আছেন।
প্রতি বছর কোরবানি ঈদে ঢাকা শহরে কয়েক লাখ গরু-ছাগল কোরবানি দেওয়া হয়। কিন্তু সেই তুলনায় পেশাদার কসাইয়ের সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত।
এই চাহিদাকে পুঁজি করে এই সময়ে ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলা থেকে হাজারো মানুষ আসেন যারা ‘একদিনের কসাই’ বা ‘ভ্রাম্যমাণ কসাই’ হিসেবে পরিচিত । ঢাকার ভেতরে নিম্নআয়ের মানুষের একটা বড় অংশও এই কাজ করেন।
এই মৌসুমি কসাইরা মূলত সারা বছর অন্য পেশায় নিয়োজিত থাকেন। কেউ রিকশাচালক, কেউ রাজমিস্ত্রি, আবার কেউ দিন মজুর বা কৃষি কাজ করেন।
এদের একটি বড় অংশ কোরবানি ঈদের দুই থেকে তিন দিন আগে ঢাকায় আসেন। আত্মীয়-স্বজনের বাসায় থাকেন। ফরিদপুর, মুন্সিগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, ময়মনসিংহ, বগুড়া ও সিরাজগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলা থেকে আসেন তারা।
আরেকটা অংশ ঢাকাতেই অবস্থানরত শ্রমজীবী মানুষ। কোরবানির সময় পেশা বদলে কসাই হয়ে যান।
একদিনের কসাইরা সাধারণত দলবদ্ধভাবে কাজ করেন। একটি দলে ৪ থেকে ১০ জন পর্যন্ত সদস্য থাকতে পারে।
কথা বলে জানা গেছে, পুরো দলের সবাই কসাইয়ের কাজ জানেন না। ১০ জনের একটি দলে হয়তো মাত্র ১ বা ২ জন অভিজ্ঞ থাকেন, বাকিরা থাকেন সাহায্যকারী বা হেল্পার হিসেবে।
কাজের প্রক্রিয়াও গ্রুপ ভেদে কিছুটা আলাদা।
একটি গ্রুপের প্রধান বা লিডার সাধারণত আগে থেকেই বিভিন্ন বাড়ির মালিকদের সাথে যোগাযোগ করে গরুর সংখ্যা ও মজুরি নির্ধারণ করে রাখেন।
কোরবানির দিন তারা খুব ভোর থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করেন। যেমন- ১০ জনের একটি দল দুই ভাগে ভাগ হয়ে একদিনে ৬টি পর্যন্ত গরুর মাংস কাটার কাজ করেন।
তবে পেশাদার কসাইদের মতো তারা দ্রুত কাজ করতে পারেন না। পেশাদাররা যেখানে ২-৩ ঘণ্টায় একটি বড় গরু (৪ থেকে ৫ মণ) কাটতে পারেন, সেখানে এই মৌসুমি কসাইদের তুলনামূলক বেশি সময় লাগে।
তাদের কাজও নিখুঁত নয়। অনেক ক্ষেত্রেই গরু জবাই করতে গিয়ে ঠিকমত ধরতে না পারার কারণে আহত হন কেউ কেউ। হাড়-মাংস কাটাও ঠিকঠাক হয় না।
সাধারণত গরুর দামের ওপর ভিত্তি করে মজুরি নির্ধারিত হয়। একদিনের কসাইরা সাধারণত গরুর দামের ১০ শতাংশ থেকে ১২ শতাংশ হারে মজুরি নেন। তবে পেশাদার বা ‘জাত কসাইদের’ ক্ষেত্রে এই হার ২০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।
সেই হিসাবে, একজন মৌসুমি কসাই বা তার সাহায্যকারী কোরবানির দিন চার হাজার থেকে দশ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারেন।
তবে যার নিজের ছুরি-চাপাতি থাকে বা যে দক্ষ কসাই হিসেবে নেতৃত্ব দেয়, সে অন্যদের তুলনায় বেশি টাকা পায়। যেমন, একটি দলের প্রধান বিশ হাজার টাকা পেলে সেখানে সাধারণ একজন সদস্য পান পাঁচ থেকে সাত হাজার টাকা।
অনেক সময় চুক্তিভিত্তিকও লোক আনা হয়। যেমন, অল্প-স্বপ্ল কসাইয়ের কাজ জানে ঢাকার বাইরে থেকে এমন একজনকে পাঁচ হাজার টাকা মজুরি ও থাকা-খাওয়ার বিনিময়ে দুই দিনের জন্য আনা হয়েছে।
অনভিজ্ঞ হওয়ায় কাজ করতে গিয়ে অনেকেই দুর্ঘটনার শিকার হন। গরুর লাথি খাওয়া, চাপাতির আঘাতে হাত কেটে যাওয়া বা হাড় ছিটকে আহত হওয়ার মতো ঘটনা ঘটে।
অল্প সময়ে তুলনামূলক বেশি আয়ের সুযোগ থাকায় প্রতি বছর কোরবানির ঈদে ঢাকায় ভিড় জমান এসব ‘একদিনের কসাই’। দক্ষতার ঘাটতি থাকলেও পেশাদার কসাইয়ের স্বল্পতার কারণে রাজধানীবাসী বাস্তবতার প্রয়োজনে তাদের ওপরই নির্ভর করতে বাধ্য হন।