ভুঁড়ি পরিষ্কার করার সহজ উপায়
কেউবা বলেন গরুর ভুঁড়ি, কেউবা বলেন বট! বাঙালির গরম ভাতের পাতে গরুর ভুঁড়ি যেন এক বিশেষ আকর্ষণীয় ও সুস্বাদু খাবার। ভুঁড়ি যেহেতু গরুর শরীরের অভ্যন্তরীণ অংশ, তাই রান্নার আগে এটি ভালোভাবে ধোয়া, গরম পানিতে ফোটানো এবং সঠিকভাবে কাটা জরুরি।
ভুঁড়ির কোন কোন অংশ খাওয়া যায়
খাবার হজমের জন্য গরু, ছাগল বা ভেড়ার পাকস্থলীতে সাধারণত চারটি প্রকোষ্ঠ থাকে।
রুমেন বা ব্ল্যাংকেট ট্রাইপ: এটি পাকস্থলীর প্রথম এবং সবচেয়ে বড় প্রকোষ্ঠ। এখানে খাবার প্রথমে জমা হয় এবং বিভিন্ন ক্ষুদ্র অণুজীবের মাধ্যমে হজম প্রক্রিয়া শুরু হয়।
রেটিকুলাম বা হানিকম্ব ট্রাইপ: রুমেন থেকে খাবার এখানে আসে। এখানে হজম প্রক্রিয়া চলমান থাকে এবং কিছু অংশ পুনরায় জাবর কাটার জন্য মুখে ফিরে যায়।
ওমাসাম বা বুক ট্রাইপ: জাবর কাটার পর খাবার এই প্রকোষ্ঠে আসে। এই অংশে বইয়ের পাতার মতো অনেক ভাঁজ থাকে। এখানে মূলত খাবার থেকে পানি শোষিত হয়।
অ্যাবোমাসাম: এটি চতুর্থ প্রকোষ্ঠ এবং এর কাজ অনেকটা মানুষের পাকস্থলীর মতো। এখানে অ্যাসিড ও বিভিন্ন এনজাইম নিঃসৃত হয়, যা অন্ত্রে খাবার পৌঁছানোর আগে হজম প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে।
ভুঁড়ি হিসেবে সাধারণত রুমেন, রেটিকুলাম ও ওমাসাম খাওয়া হয়। অ্যাবোমাসাম সাধারণত ভুঁড়ি হিসেবে খাওয়া হয় না।
ভুঁড়ি পরিষ্কারের সঠিক পদ্ধতি
• প্রথমে স্বাভাবিক তাপমাত্রার পর্যাপ্ত পানি দিয়ে ভুঁড়ি ভালোভাবে ধুয়ে নিতে হবে, যাতে কোনো ময়লা অবশিষ্ট না থাকে।
• এরপর ভুঁড়ির মসৃণ দিকটি ভালোভাবে পরীক্ষা করতে হবে। হালকা রঙের চর্বি (অনেকটা রাবারের মতো) থাকলে তা ছুরি দিয়ে কেটে ফেলে দিতে হবে।
• পরবর্তী ধাপে মাংসের অবশিষ্টাংশ বা অন্য কোনো ময়লা থাকলে তা পরিষ্কার করতে হবে এবং ভুঁড়ির পাশগুলো ক্ষতি না করে মসৃণ করে নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে ভিনেগার ব্যবহার করলে এর অ্যাসিডিক ধর্ম ভুঁড়ি গভীরভাবে পরিষ্কার করতে সাহায্য করে।
• ভিনেগার ব্যবহারের পর রক সল্ট (বিট লবণ বা সামুদ্রিক লবণ) দিয়ে ভালোভাবে ঘষে পরিষ্কার করতে হবে। ভুঁড়ি সম্পূর্ণ পরিষ্কার ও মসৃণ না হওয়া পর্যন্ত এই প্রক্রিয়া পুনরাবৃত্তি করতে হবে।
• এ পর্যায়ে ছুরির উল্টো পাশ দিয়ে ভুঁড়ির পৃষ্ঠ ভালোভাবে ঘষে নিতে হবে, যাতে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত অংশ অবশিষ্ট না থাকে। তবে হানিকম্ব ট্রাইপের পৃষ্ঠ সমতল না হওয়ায় পরিষ্কারের ক্ষেত্রে একটি টুথব্রাশ ব্যবহার করা যেতে পারে।
• এরপর পরিষ্কার পানিতে কয়েক মিনিট ধরে ভুঁড়িগুলো ভালোভাবে ধুয়ে নিতে হবে, যাতে কোনো ময়লা বা অপ্রয়োজনীয় কিছু অবশিষ্ট না থাকে। যদিও আগের ধাপগুলো অনুসরণ করলে সাধারণত আর ময়লা থাকার কথা নয়, তবুও ভালোভাবে ধুয়ে নিলে দুর্গন্ধ পুরোপুরি দূর হয়ে যায়।
গরম পানিতে ভুঁড়ি সেদ্ধ করার ধাপ
• একটি পাত্রে পানি নিয়ে ভুঁড়িগুলো প্রায় ১ ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখতে হবে।
• এরপর আরেকটি বড় পাত্রে পর্যাপ্ত পানি নিয়ে তাতে ভুঁড়িগুলো দিয়ে প্রায় ৩০–৪৫ মিনিট চুলায় জ্বাল দিতে হবে। প্রতি লিটার পানির জন্য ১ টেবিল চামচ করে লবণ দিতে হবে। ভুঁড়ি ভালোভাবে সেদ্ধ করলে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস হয়, ভুঁড়ি কাটা সহজ হয় এবং পরে রান্নাও দ্রুত করা যায়।
• সেদ্ধ শেষে পানি ফেলে দিয়ে ভুঁড়ি ভালোভাবে ধুয়ে নিতে হবে। কয়েকবার পরিষ্কার পানি দিয়ে ধুয়ে নিলে ভুঁড়ি সম্পূর্ণ পরিষ্কার হয়ে যায়।
• এরপর পাত্রে আবার পানি নিয়ে চুলায় হালকা জ্বাল দিতে হবে। ভুঁড়িগুলো পাত্রে দিয়ে অল্প আঁচে ২–৩ ঘণ্টা রান্না করতে হবে। এ সময় পাত্রের পানি কমে গেলে বারবার পানি যোগ করতে হবে, যাতে ভুঁড়িগুলো সব সময় পানির মধ্যে ডুবে থাকে।
ভুঁড়ি কাটার নিয়ম
• কাটার সময় ভুঁড়ির মসৃণ দিকটি নিচের দিকে রাখতে হবে এবং যতটা সম্ভব টেনে ধরে টুকরো করতে হবে। সেদ্ধ করার পর ভুঁড়ি কাটা অনেকটাই সহজ হয়ে যায়।
• তবে ভুঁড়ি কাটার সময় আরেকবার ভালোভাবে দেখে নিতে হবে, কোনো অযাচিত চর্বি বা ময়লা রয়ে গেছে কি না। যদি থেকে যায়, তাহলে সেই অংশগুলো কেটে ফেলে দিতে হবে।
• ধারালো ছুরি বা বঁটি দিয়ে ভুঁড়িগুলো একে একে কেটে নিতে হবে। সেদ্ধ করার আগে ভুঁড়ি নরম থাকে, কিন্তু সেদ্ধ করার পর কিছুটা শক্ত হয়ে যায়, ফলে কাটতেও সুবিধা হয়।
