এক্সপ্লেইনার

অভ্যুত্থান যেভাবে মিয়ানমারকে ঠেলে দিলো ‘সবচেয়ে প্রাণঘাতী’ সংঘাতে, বিশ্ব কেন মুখ ফিরিয়ে আছে

মোজাক্কির রিফাত
মোজাক্কির রিফাত

২০২১ সালে মিয়ানমারে সেনা অভ্যুত্থান হয়। সেই থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধ এখন এশিয়ার সবচেয়ে প্রাণঘাতী সংঘাত। সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটা প্রজেক্ট (এসিএলইডি) জানায়, সামরিক বাহিনী গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করার পর থেকে দেশটিতে ১ লাখের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।

সংস্থাটির মতে, মিয়ানমারের এই সংঘাত বিশ্বের সবচেয়ে খণ্ডবিখণ্ড। এখানে সশস্ত্র গোষ্ঠীর সংখ্যা ১ হাজার ২০০-এরও বেশি। এসিএলইডির বিবেচনায়, মিয়ানমার এখন পৃথিবীর সবচেয়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলোর একটি।

পরিস্থিতি সব সময় এমন ছিল না

তবে পরিস্থিতি সব সময় এমন ছিল না। কয়েক দশক ধরে মিয়ানমারে ছিল স্বৈরাচারী সামরিক শাসন। দেশটিকে তখন মনে হতো সময়ের আবর্তে আটকে থাকা এক জায়গা। কিন্তু এরপর দেশটিতে পরিবর্তন আসতে শুরু করে।

২০১১ সালে মিয়ানমারে রাজনৈতিক ব্যবস্থা উন্মুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। বিশ্ব ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এর পরের এক দশকে অর্থনীতি বছরে গড়ে প্রায় ৬ শতাংশ হারে বেড়েছে। দারিদ্র্যের হারও দ্রুত কমেছে—২০০৫ সালে ছিল ৪৮ দশমিক ২ শতাংশ, ২০১৭ সালে তা নেমে আসে ২৪ দশমিক ৮ শতাংশে। ক্ষুধাও কমছিল। অধিকাংশ সূচক অনুযায়ী, গুরুতর খাদ্যসংকটে থাকা মানুষের অনুপাত দুই দশক ধরে কমছিল।

স্বাভাবিক সময়ে মিয়ানমারের কাচিন রাজ্যের রাজধানী মিতকিনার বাইরে মালি ও এনমাই নদীর মিলনস্থল মিতসোনে ঘুরতে এসেছেন কাচিন সম্প্রদায়ের মানুষ। ৩০ মার্চ, ২০১৭। ফাইল ছবি: রয়টার্স

এসব অগ্রগতি মিয়ানমারকে ধনী দেশে পরিণত করেনি। তবু অর্ধশতাব্দী ধরে এশিয়ার দরিদ্রতম দেশগুলোর একটি হিসেবে থাকা মিয়ানমারের অবস্থার তখন দৃশ্যমান উন্নতি হচ্ছিল। দেশটি অসম্পূর্ণভাবে হলেও গণতন্ত্রের পথে এগোচ্ছিল। অং সান সু চির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি ২০১৫ সালের অবাধ নির্বাচনে জয়লাভ করে। ২০২০ সালের নির্বাচনেও তারা আবার বিপুল ব্যবধানে জয়ী হয়।

বিনিয়োগকারীরাও এই পরিবর্তন লক্ষ্য করেছিলেন। আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১২ সালে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ ছিল মাত্র ১৪০ কোটি ডলার। ২০১৫ সালে তা বেড়ে সর্বোচ্চ প্রায় ৯৫০ কোটি ডলারে পৌঁছায়। অভ্যুত্থানের আগে শেষ পূর্ণ অর্থবছর, অর্থাৎ ২০১৯–২০২০ সালে, এই বিনিয়োগ ছিল প্রায় ৪৯০ কোটি ডলার।

সে সময় টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক ও নতুন ধারার রেস্তোরাঁর ব্যাপক প্রসার ঘটে। তারপর ২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি জেনারেলরা বেসামরিক নেতৃত্বকে গ্রেপ্তার করেন। এতে বহুমুখী গৃহযুদ্ধ শুরু হয়, আর দেশটি কার্যত একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হয়। গাজার পাশাপাশি এটি এখন পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক স্থানগুলোর একটি।

ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসির নেতা অং সান সু চি। ২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি জেনারেলরা তাকে গ্রেপ্তার করেন। ফাইল ছবি: রয়টার্স

অগ্রগতির এক দশক যেভাবে মুছে গেল

এই বিপরীতমুখী পরিবর্তন বিস্ময়কর। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সালে জিডিপি প্রায় ১৮ শতাংশ সংকুচিত হয়। এরপর থেকে তা খুব সামান্যই ঘুরে দাঁড়িয়েছে।

সংবাদমাধ্যম সিএনএনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের মধ্যে দারিদ্র্যের হার প্রায় দ্বিগুণ হয়ে দাঁড়ায় ৪৯ দশমিক ৭ শতাংশে।

এর ফলে এক দশকের বেশি সময় ধরে অর্জিত অগ্রগতি মুছে যায়। ধারণা করা হচ্ছে, আজও এই হার প্রায় একই পর্যায়ে রয়েছে।

ইউএনডিপি আরও দেখেছে, দেশটির মধ্যবিত্ত শ্রেণির আকার অর্ধেকে নেমে এসেছে। প্রতি চারজনের মধ্যে তিনজনই এখন জীবনধারণের ন্যূনতম পর্যায়ে বা তার কাছাকাছি অবস্থায় বাস করছেন। গত বছরের মধ্যে মূল্যস্ফীতি ৩০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। এক ঝুড়ি মৌলিক খাদ্যপণ্যের দামও বেড়ে হয়েছে প্রায় তিন গুণ।

থাইল্যান্ডভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর ট্রেড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইটিডি) সমীক্ষা অনুযায়ী, লাখো দক্ষ কর্মী দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। অভ্যুত্থানের আগের তুলনায় বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে প্রায় চার ভাগের তিন ভাগ। একসময় কমতে থাকা ক্ষুধাও এখন ভয়াবহভাবে বেড়েছে।

বিদ্রোহীদের সীমিত সামর্থ্যের হাসপাতাল। ছবি: সংগৃহীত

ভেঙে পড়েছে স্বাস্থ্যব্যবস্থা

জাতিসংঘের হিসাবে, বর্তমানে ১ কোটি ৫২ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার মুখে আছেন। এই সংখ্যা দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় তিনভাগের একভাগ। পশ্চিম মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য এখন দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে। প্রায় ৩৫ লাখ মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন।

স্বাস্থ্যব্যবস্থাও প্রায় পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয় কার্যালয় (ওসিএইচএ) জানায়, অভ্যুত্থানের পর থেকে চিকিৎসা স্থাপনাগুলো ৩৩০ বারের বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

মিয়ানমারের কায়াহ রাজ্যের লোইকাও শহরের বাইরে একটি আফিমখেতে আফিম সংগ্রহ করছেন এক ব্যক্তি। ৩০ নভেম্বর, ২০১৬। ফাইল ছবি: রয়টার্স

বিশ্বের শীর্ষ আফিম উৎপাদনকারী

সংঘাতের মধ্যে দেশজুড়ে অপরাধ ছড়িয়ে পড়েছে, গড়ে উঠেছে বিশাল এক অপরাধভিত্তিক অর্থনীতি।

সিএনএনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে মিয়ানমার আফগানিস্তানকে ছাড়িয়ে বিশ্বের বৃহত্তম আফিম উৎপাদনকারী দেশে পরিণত হয়। দেশটিতে সে বছর আনুমানিক ১ হাজার ৮০ মেট্রিক টন আফিম উৎপাদিত হয়, যার মূল্য সর্বোচ্চ ২৪০ কোটি ডলার।

মিয়ানমার এখন বিশ্বের মেথামফেটামিন উৎপাদনেরও কেন্দ্র। শুধু থাইল্যান্ডই ২০২৪ সালে রেকর্ড ১০০ কোটি মেথামফেটামিন ট্যাবলেট জব্দ করে, যার প্রায় সবই এসেছে মিয়ানমার থেকে।

জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনারের কার্যালয় (ওএইচসিএইচআর) জানায়, মিয়ানমারের ভেতরের সাইবার প্রতারণা কেন্দ্রগুলোও বছরে শত শত কোটি ডলার আয় করে। এসব কেন্দ্রে পাচারের শিকার কর্মীদের প্রায়ই দাসত্বের কাছাকাছি পরিবেশে আটকে রেখে কাজ করানো হয়। একটি বৈশ্বিক সূচকে এখন মিয়ানমারকে পৃথিবীর সবচেয়ে অপরাধপ্রবণ দেশ হিসেবে দেখানো হয়েছে।

বিক্ষোভকারী থেকে গেরিলা যোদ্ধায় পরিণত হওয়া পিপলস ডিফেন্স ফোর্সের (পিডিএফ) সদস্যরা মিয়ানমারের কওকারেইকে সম্মুখসারিতে অবস্থান করছেন। ৩১ ডিসেম্বর ২০২১। ছবি: রয়টার্স

বিমান হামলা

এরপর আসে হত্যাকাণ্ডের হিসাব। এসিএলইডির তথ্য অনুযায়ী, বেসামরিক মানুষের মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশের জন্য দায়ী জান্তা। বেসামরিক মানুষের ওপর বিমান হামলা এখন সামরিক বাহিনীর প্রধান অস্ত্র। সামরিক জেট ও ড্রোন দিয়ে হামলা চালানো হয়েছে বাজার, মঠ, বাস্তুচ্যুত মানুষের শিবির, হাসপাতাল ও বিদ্যালয়ে।

মানবাধিকার সংস্থা ফর্টিফাই রাইটেসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মে মাসে সাগাইংয়ের দেপাইন টাউনশিপের একটি বিদ্যালয়ে বিমান হামলা হয়। এতে ২২ শিশু ও ২ শিক্ষক নিহত হন। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ম্রাউক-ইউর একটি হাসপাতালে বিমান হামলায় নিহত হন অন্তত ৩৩ রোগী, সেবাদানকারী ও কর্মী।

মিয়ানমারের ছায়া সরকারের (ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট) হিসাবে, জান্তার বিমান হামলা মাত্র এক বছরে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ২০২৪ সালে হামলা হয়েছিল ২ হাজার ৪৭১টি। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪ হাজার ৮৮১টিতে।

এসব সংখ্যার আড়ালে আছে এমন সব ঘটনা, যাকে মানবাধিকার তদন্তকারীরা মানবতাবিরোধী অপরাধ বলে মনে করেন।

জান্তার বিমান হামলায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া হাসপাতাল। ছবি: রয়টার্স

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) জানায়, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) কৌঁসুলি জান্তা নেতা মিন অং হ্লাইংয়ের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আবেদনও করেছেন।

দেশটির সংবাদমাধ্যম মিজ্জিমার তথ্য অনুযায়ী, বেঁচে ফেরা মানুষেরা শুধু নির্বিচার বিমান হামলার কথাই বলেননি। তারা সেনাদের গ্রামে আগুন দেওয়া, আটক ব্যক্তিদের হত্যা করা এবং মাঠে মরদেহ ফেলে যাওয়ার কথাও বলেছেন। ক্ষমতা দখলের পর থেকে সামরিক বাহিনী পুড়িয়ে দিয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজারের বেশি বাড়িঘর।

হেরে যাওয়া জান্তা ঘুরে দাঁড়াল

জান্তার নিষ্ঠুরতা সত্ত্বেও একপর্যায়ে মনে হয়েছিল, জেনারেলরা হয়তো গৃহযুদ্ধে হেরে যেতে পারেন।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক গবেষণা সংস্থা ফরেন পলিসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে জাতিগত সশস্ত্র বাহিনী ও স্বেচ্ছাসেবী মিলিশিয়াদের একটি জোট সামরিক বাহিনীকে দেশের বড় অংশ থেকে হটিয়ে দেয়। তারা দখল করে নেয় উত্তরের লাশিও শহর। ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে মিয়ানমারের প্রায় অর্ধেক ভূখণ্ড। তারা পৌঁছে যায় দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মান্দালয়ের মাত্র ১৪ মাইলের মধ্যে।

তবে যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেয় জেনারেলদের স্বৈরাচারী মিত্ররা। এটি এক ধরনের কর্তৃত্ববাদী সহযোগিতার নেটওয়ার্কের অংশ, যেখানে স্বৈরশাসকেরা একে অপরকে সহায়তা করে।

চীনের বেইজিংয়ে গ্রেট হল অব দ্য পিপলে আয়োজিত এক স্বাগত অনুষ্ঠানে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও মিয়ানমারের জান্তা প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইং। ১৬ জুন, ২০২৬। ফাইল ছবি: রয়টার্স

জাস্টিস ফর মিয়ানমারের এক বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, বেলারুশ মিয়ানমারকে দিয়েছে ভি৩ডি রাডার প্রযুক্তি ও ভূমিভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাসহ উন্নত সামরিক সরঞ্জাম। ২০২৫ সালে মিয়ানমার হয়ে ওঠে রাশিয়ার নতুন অ্যাসল্ট ট্রান্সপোর্ট হেলিকপ্টারের প্রথম ক্রেতা দেশ। আকাশে আধিপত্য বাড়াতে জান্তা এসব হেলিকপ্টার ব্যবহার করছে।

রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানও গোপনে মিয়ানমার সরকারকে জেট জ্বালানি সরবরাহ করেছে। এই জ্বালানিতেই জান্তার বিমান আকাশে উড়ছে, আর সেই বিমান দিয়েই বেসামরিক মানুষের ওপর বোমা ফেলা হচ্ছে।

ফরেন পলিসির তথ্য অনুযায়ী, বেইজিংও প্রায় ৩০০ কোটি ডলারের সহায়তার প্রলোভন দেখিয়েছে। নতুন করে অস্ত্র ও রসদ পেয়ে সামরিক বাহিনী ২০২৫ ও ২০২৬ সালে আবার আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। তারা পুনর্দখল করে নেয় লাশিও শহর ও চীনমুখী গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক। এরপর তারা আয়োজন করে এক নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন, যার মাধ্যমে অভ্যুত্থানের নেতা মিন অং হ্লাইংকে বসানো হয় প্রেসিডেন্ট পদে।

ফিলিপাইনের সেবুতে ৪৮তম আসিয়ান শীর্ষ সম্মেলন ও সংশ্লিষ্ট বৈঠকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মিয়ানমার, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, পূর্ব তিমুর, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর, ব্রুনেই, ইন্দোনেশিয়া, কম্বোডিয়া ও লাওসের প্রতিনিধিরা দলীয় ছবি তোলার জন্য পোজ দিচ্ছেন। ৮ মে, ২০২৬। ফাইল ছবি: রয়টার্স

আসিয়ানের ব্যর্থতা

এত কিছুর পরও বিশ্ব মুখ ফিরিয়ে আছে। অভ্যুত্থানের কয়েক দিন পরই এই অঞ্চলের নিজস্ব জোট আসিয়ান একটি পাঁচ দফা ঐকমত্যে পৌঁছেছিল। এতে ছিল সহিংসতার অবসান, পক্ষগুলোর মধ্যে সংলাপ এবং মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর সুযোগ।

কিন্তু জান্তা দুই দিনের মধ্যেই তা প্রত্যাখ্যান করে। এরপর থেকে তারা ধারাবাহিকভাবে তা লঙ্ঘন করে আসছে।

সহায়তা কমছে, যুক্তরাষ্ট্রও সরে যাচ্ছে

মিয়ানমারের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তার পরিমাণও কমে যাচ্ছে। জাতিসংঘ জানায়, মিয়ানমারের জন্য ২০২৫ সালের মানবিক সহায়তা পরিকল্পনায় প্রায় ২ কোটি মানুষের কাছে পৌঁছাতে চাওয়া হয়েছিল ১১৪ কোটি ডলার। কিন্তু বছরের মাঝামাঝি পর্যন্ত এসেছে প্রয়োজনীয় অর্থের মাত্র ১২ শতাংশ। বছরের শেষ নাগাদও তা পূর্ণ অর্থায়নের ধারেকাছে পৌঁছায়নি।

বড় আঘাত এসেছে ওয়াশিংটনের খরচ কমানোর সিদ্ধান্ত থেকেও। ঐতিহাসিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র ছিল মিয়ানমারের গণতন্ত্রপন্থী শক্তি ও সহায়তা কর্মসূচিগুলোর বড় সমর্থক। ট্রাম্প প্রশাসন ইউএসএআইডি ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এর ফলে শুধু ২০২৫ সালেই মিয়ানমারের জন্য প্রায় ২৫ কোটি ৯০ লাখ ডলারের সহায়তা বাতিল হয়, আর ভবিষ্যতের সহায়তাও কমে যায়।

এনবিসি নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের বিপর্যয় থেকে পালিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় নেওয়া মিয়ানমারের অভিবাসীদেকে ওয়াশিংটন ছাড়তে বলা হয়েছে।

মিয়ানমারের শরণার্থীরা। ছবি: ইউএনএইচআর

২০২৫ সালের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ মিয়ানমারকে নিরাপদ ঘোষণা করে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা মিয়ানমারের প্রায় ৪ হাজার নাগরিকের টেম্পোরারি প্রোটেক্টেড স্ট্যাটাস বা অস্থায়ী সুরক্ষা মর্যাদা বাতিল হয়ে যায়।

কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের প্রতিবেদন অনুজায়ী, মিয়ানমার নিয়ে গবেষণা করেন—এমন প্রায় কেউই এই মূল্যায়নের সঙ্গে একমত নন।

খোদ যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রতিবেদনেই দেখা গেছে, দেশটির মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। এই মানুষদের ফেরত পাঠানো মানে তাদের একটি যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো।

যুদ্ধক্ষেত্রেই ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে শরণার্থীদের

মিয়ানমারের নাগরিকদের যুদ্ধের মধ্যে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র একা নয়। ইনফো মাইগ্রান্টসের তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাঁচ দেশ—জার্মানি, অস্ট্রিয়া, ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ডস ও গ্রিস প্রত্যাখ্যাত আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য বিদেশে ‘রিটার্ন হাব’ বা প্রত্যাবর্তনকেন্দ্র স্থাপনের কথা ভাবছে।

এইচআরডব্লিউয়ের তথ্য অনুযায়ী, মিয়ানমারের বাইরে দেশটির প্রায় ৪০ লাখের বেশি নাগরিক থাইল্যান্ডে থাকেন। তাদের প্রায় অর্ধেকের কোনো বৈধ কাগজপত্র নেই। থাই কর্তৃপক্ষ নিয়মিত অভিবাসনবিরোধী অভিযান ও গণহারে প্রত্যাবাসন চালায়।

বাংলাদেশের কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরের ড্রোনচিত্র। ১৭ এপ্রিল, ২০২৬। ফাইল ছবি: রয়টার্স

থাই সংবাদমাধ্যম রেডিও ফ্রি এশিয়া জানায়, ২০২৪ সালে মাত্র তিন মাসের একটি অভিযানে তারা মিয়ানমারের ১ লাখ ৪৪ হাজারের বেশি নাগরিককে আটক করে ফেরত পাঠায়।

ভারতও মিয়ানমারের শরণার্থীদের ফেরত পাঠাচ্ছে। বিশেষ করে যারা সংঘাতকবলিত ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ঢোকেন, তাদের ক্ষেত্রে এমনটা হচ্ছে বেশি।

জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর জরুরি ভিত্তিতে প্রত্যাবাসন বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। তবু মালয়েশিয়া বারবার মিয়ানমারের আশ্রয়প্রার্থীদের দেশে ফেরত পাঠিয়েছে।

বাংলাদেশও শরণার্থীদের সীমান্ত অতিক্রমের অনুমতি দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের নীরব সখ্যতা

আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়, যুক্তরাষ্ট্র নীরবে ঝুঁকছে এই সরকারের দিকে।

ফক্স নিউজের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি কোম্পানি ও ব্যক্তির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। এদের মধ্যে ছিলেন জান্তার জন্য অস্ত্র কেনাবেচায় মধ্যস্থতার অভিযোগ থাকা ব্যক্তিরাও। একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে বুঝতে পেরে জান্তা ওয়াশিংটনকে কাছে টানতে বিপুল অর্থ ব্যয় করেছে।

মিয়ানমারের বিদ্রোহীরা। ছবি: সংগৃহীত

সংবাদমাধ্যম মিয়ানমার নাও জানায়, ট্রাম্প-ঘনিষ্ঠ প্রতিষ্ঠান ডিসিআই গ্রুপকে ৩০ লাখ ডলারের চুক্তিতে নিয়োগ দিয়েছে জান্তা সরকার। দুই দেশের সম্পর্ক ‘পুনর্গঠনের’ জন্য প্রেসিডেন্টের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী রজার স্টোন এই কাজের জন্য মাসে পাচ্ছেন ৫০ হাজার ডলার।

একটি সরকার বিদ্যালয়ে বোমা হামলা চালায়, সেই সরকার নিজের নাগরিকদেরও অনাহারে রাখে। আর এখন সেই সরকারই মাসিক অর্থের বিনিময়ে কিনছে বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতা। এর মূল্য পরিশোধ হচ্ছে নিজ দেশের মানুষের রক্ত দিয়ে।

মৃতের সংখ্যা যত বাড়ছে, প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে একটাই—সহায়তা করার ক্ষমতা যাদের আছে, তাদের কেউ কি এখনো পরিস্থিতির দিকে তাকানোর মতো যথেষ্ট আগ্রহী?