করোনা চিকিৎসায় স্টেরয়েড, ভারতে ডায়াবেটিক রোগী বাড়ার শঙ্কা
গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে করোনায় আক্রান্ত হয়ে সংকটাপন্ন অবস্থায় ১১ দিন ভারতের মুম্বাইয়ের একটি হাসপাতালে ছিলেন বিপুল শাহ। করোনায় আক্রান্ত হওয়ার আগে পর্যন্ত তার ডায়াবেটিস ছিল না।
তার করোনার চিকিৎসায় স্টেরয়েড ব্যবহার করতে হয়েছিল। স্টেরয়েড ফুসফুসের প্রদাহ কমিয়ে আনে। এ ছাড়া, করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে দেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার যে ক্ষতি হয়, তা স্টেরয়েড কিছু পরিমাণে প্রতিহত করতে পারে।
একইসঙ্গে এর ব্যবহারে সার্বিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় এবং রক্তে শর্করার পরিমাণ বেড়ে যায়। যিনি ডায়াবেটিসে আক্রান্ত এবং ডায়াবেটিসে আক্রান্ত নন— উভয়ের ক্ষেত্রেই একই ঘটনা ঘটে। এক বছর আগে কোভিড থেকে সেরে উঠেছেন এ রকম অনেক রোগীকেও দেখা গেছে স্টেরয়েড চিকিৎসার পর ওষুধ খেয়ে রক্তে শর্করার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়েছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি জানিয়েছে, ভারতে প্রতি ছয় জনে একজন ব্যক্তি ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। বিশ্বের সর্বাধিক এক কোটি ১১ কোটি ৬০ লাখ ডায়াবেটিক রোগী আছে চীনে। এর পরেই সাত কোটি ৭০ লাখ রোগী নিয়ে ভারতের অবস্থান দ্বিতীয়তে।
চিকিৎসকদের ধারণা, আরও লাখো মানুষ বিভিন্ন পর্যায়ের ডায়াবেটিসে আক্রান্ত।
অগ্ন্যাশয় থেকে যখন যথেষ্ট পরিমাণে ইনসুলিন তৈরি না হয় অথবা তৈরি হওয়া ইনসুলিনকে যখন শরীর সঠিকভাবে ব্যবহার করতে না পারে, তখন ডায়াবেটিস দেখা দেয়। ফলে রক্তে গ্লুকোজ নামে এক ধরনের শর্করার পরিমাণ বেড়ে যায়, যেটি বিভিন্ন ধরনের মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি করে। যকৃত, চোখ ও হৃদপিণ্ডের ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
যে কয়েকটি রোগ থাকলে মানুষের মারাত্মক পর্যায়ের কোভিড-১৯ রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে, তার মাঝে ডায়াবেটিস অন্যতম। এ ছাড়া, অতিরিক্ত ওজন, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদপিণ্ড ও ফুসফুসজনিত রোগ থাকলেও করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে।
চিকিৎসকরা আশঙ্কা করছেন করোনাভাইরাস থেকে সেরে ওঠা অসংখ্য রোগী ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হতে পারেন। ভারতে মোট তিন কোটি ২০ লাখ মানুষ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। সংক্রমণের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পরে বিশ্বে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছে ভারত।
মুম্বাইয়ের ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ ডা. রাহুল বকশী বলেন, 'আমরা আশঙ্কা করছি ভারতে করোনাভাইরাস মহামারির প্রকোপ কমে যাওয়ার পর ডায়াবেটিস আমাদেরকে ঘূর্ণিঝড়ের মতো আঘাত করতে পারে।'
তিনি জানান, তার কাছে চিকিৎসার জন্য আসা করোনা রোগীদের মধ্যে আট থেকে ১০ শতাংশের অতীতে কখনো ডায়াবেটিস ছিল। তবে করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পরে তাদের রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ অনেক বেড়ে গেছে। সেরে ওঠার কয়েক মাস পরেও তাদের গ্লুকোজের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে ওষুধ খেতে হয়েছে।
করোনার কারণে মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হচ্ছেন কি না বিশ্বজুড়ে সেটাই এখন বিতর্কের বিষয়বস্তু। টাইপ টু ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষের ৫০ শতাংশই থাকেন চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রে।
যে কারণে করোনার চিকিৎসায় স্টেরয়েড ব্যবহার কারণে এসব দেশে ডায়াবেটিক রোগীর সংখ্যা আরও বেড়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন চিকিৎসকরা। করোনার সংক্রমণ হলে দেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা তাকে এর হাত থেকে সুরক্ষিত করার জন্য অতিরিক্ত কাজ করে, যেটিকে মেডিকেল পরিভাষায় 'ওভারড্রাইভ' বলা হয়। এই ওভারড্রাইভের কারণে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একইসঙ্গে, ভাইরাসটি নিজেও অগ্ন্যাশয়ের যেসব কোষ ইনসুলিন তৈরি করে সেগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
সম্প্রতি ভারতের চিকিৎসকরা 'মিউকরমাইকোসিস' রোগ থেকে সেরে উঠেছেন এ রকম রোগীদের নিয়ে একটি গবেষণা করেছেন, যেটি পিয়ার রিভিউ করা হয়েছে। গবেষণায় মিউকরমাইকোসিসের সঙ্গে ডায়াবেটিসের যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া গেছে।
ভারতে এ পর্যন্ত প্রায় ৪৫ হাজার মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। যেটি নাক, চোখ ও কোনো কোনো ক্ষেত্রে মস্তিষ্ককে আক্রান্ত করে। সাধারণত কোভিড-১৯ থেকে সেরে ওঠার ১২ থেকে ১৮ দিনের মাথায় মানুষ এ রোগে আক্রান্ত হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে মিউকরমাইকোসিসে আক্রান্ত রোগীদের ১০ শতাংশ (১২৭ জনের মধ্যে ১৩ জন) নতুন করে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়েছেন। তাদের গড় বয়স প্রায় ৩৬ বছর। তবে আক্রান্তদের সাত জনকে করোনার চিকিৎসাকালে কোন ধরনের স্টেরয়েড দেওয়া হয়নি।
দিল্লি ও চেন্নাইয়ের দুটি হাসপাতালের ৫৫৫ জন রোগীর ওপর আরেকটি গবেষণা চালিয়ে দেখা গেছে, যেসব রোগী করোনায় চিকিৎসা নেওয়ার পরে নতুন করে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়েছেন, তাদের দেহে তুলনামূলকভাবে আগে থেকে ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের চেয়ে গ্লুকোজের পরিমাণ বেশি।
গবেষণাটির অন্যতম প্রণেতা ডা. অনুপ মিশ্র বলেন, কোভিড-১৯ ও ডায়াবেটিসের মধ্যের সম্পর্কটি আমাদেরকে একটি জটিল চিত্র দেখাচ্ছে।
হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় করোনায় আক্রান্ত রোগীদের রক্তের নমুনা সংগ্রহ করে হিমোগ্লোবিন এ১সি লেভেল পরীক্ষা করা হয়েছে। এই পরীক্ষাটির মাধ্যমে রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণের তিন মাসের গড় নির্ণয় করা হয়, যেখান থেকে ডায়াবেটিস শনাক্ত করা যায়।
নতুন করে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীদের অনেকের সম্ভবত আগে থেকেই ডায়াবেটিস ছিল কিন্তু তারা কখনো পরীক্ষা করাননি। যে কারণে রোগ শনাক্ত হয়নি। আবার কারও কারও ক্ষেত্রে চিকিৎসার সময় স্টেরয়েড ব্যবহার করার কারণে তারা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়েছেন। কিছু মানুষ হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর তাদের রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ কমে স্বাভাবিক পর্যায়ে চলে এসেছে।
এই তিন ধরনের মানুষ ছাড়া আরও কিছু রোগী আছেন যাদের অগ্ন্যাশয় করোনাভাইরাসের আক্রমণে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যে কারণে তারা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়েছেন। এ ধরনের রোগীরা টাইপ ১ (দেহ যখন একেবারেই ইনসুলিন তৈরি করতে পারে না) এবং টাইপ ২ (দেহ যখন যথেষ্ট পরিমাণ ইনসুলিন তৈরি করতে পারে না) উভয় ধরনের ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়ে থাকতে পারেন।
লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের অধ্যাপক গাই রাট্টার বলেন, করোনাভাইরাসের অন্যতম লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে মানবদেহের অগ্ন্যাশয় এবং এর যে অংশটি ইনসুলিন তৈরি করে।
তবে এ ক্ষেত্রে কোভিড-১৯ সংক্রমণ থেকে সেরে ওঠা রোগীদের মধ্যে নতুন করে দেখা দেওয়া ডায়াবেটিস কি সাময়িক না চিরস্থায়ী— সে বিষয়টির এখনও নিষ্পত্তি হয়নি।
অধ্যাপক রাট্টার বিবিসিকে জানান, 'যেহেতু ভারতে অসংখ্য মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত, সেখানে করোনাভাইরাসের কারণে রোগীদের মৃত্যু ও দুঃখজনক পরিণতি ঘটার সম্ভাবনা অন্যান্য দেশের (যেখানে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা তুলনামুলকভাবে কম) চেয়ে অনেক বেশি।'
দীর্ঘদিন ধরে লকডাউন চলার কারণে অসংখ্য মানুষ ঘরে থেকে কাজ করেছেন, বাইরে থেকে অস্বাস্থ্যকর খাবার আনিয়ে খেয়েছেন এবং খুব একটা শরীর চর্চা করার সুযোগ পাননি। তাদের অনেকে উদ্বেগ ও বিষণ্ণতায় ভুগছেন।
ডা. মিশ্র বলেন, 'আমি এ ধরনের মানুষের মধ্যে অনেককেই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হতে দেখছি। বিষয়টি অন্য যেকোনো কিছুর চেয়ে আমাকে বেশি উদ্বিগ্ন করছে।'