রাশিয়ার কৌশল: সিএনএন’র বিশ্লেষণ
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য পশ্চিমা কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন যে রাশিয়া ক্রমবর্ধমানভাবে বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানবে এবং ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীকে 'ধীরে ধ্বংস' করতে চাইবে। কারণ যুদ্ধ ধ্বংসাত্মক দিকে যাচ্ছে।
কর্মকর্তারা বলেছেন, ইউক্রেনের সেনাবাহিনী এখন পর্যন্ত কিয়েভ ও অন্যান্য বড় শহরগুলোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে রাশিয়ার প্রাথমিক ধাক্কা ঠেকাতে সক্ষম হয়েছেন। কিন্তু তারা ব্যাপকভাবে ধ্বংসের মুখে পড়েছেন।
সিএনএন'র এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
রাশিয়া এখন আরও ভারী ও ধ্বংসাত্মক অস্ত্র নিয়ে আসছে। তারা প্রথমে সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার দিকে মনোযোগ দেবে। তারপর বেসামরিক ও অবকাঠামোয় আঘাত হানবে।
পশ্চিমের এক ঊর্ধ্বতন গোয়েন্দা কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেছেন, কৌশল পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বুঝা যাচ্ছে সম্ভবত কিয়েভের দ্রুত পতনে বিষয়ে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের প্রাথমিক পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছে। কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, কিয়েভে যে ধরনের প্রতিরোধের কথা চিন্তা করা হয়েছিল ইউক্রেনীয়রা তার চেয়ে অনেক বেশি প্রতিরোধ করেছেন।
তাছাড়া, রাশিয়ার কিছু ভুল উদ্যোগের কারণে তাদের কিয়েভ দখলের অগ্রগতি ধীর হয়ে গেছে।
এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেছেন, কিন্তু পশ্চিমের কর্মকর্তারা এখন ধারণা করছেন যে রাশিয়া ইউক্রেনের শহরগুলোতে ভারী অস্ত্র দিয়ে হামলা চালাবে এবং সম্ভাব্য 'হাজার হাজার' সেনা নিয়ে আসবে।
কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী সম্ভবত লড়াই চালিয়ে যেতে প্রয়োজনীয় রসদের অভাবে পড়বে।
মার্কিন কর্মকর্তা ও কংগ্রেস সূত্র জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র গত সোমবার ২০০টিরও বেশি এবং গত কয়েক দিনে ইউক্রেনে শতাধিক স্টিংগার ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করেছে। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে তারা ইউক্রেনকে রক্ষায় সেনা পাঠাবে না।
'সামরিক হিসাব'
ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী এবং বেসামরিক জনগণের মধ্যে আত্মসমর্পণের কোন লক্ষণ দেখা যায়নি। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হতে পারে এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে যেতে পারে। যার একটি ভয়াবহ পরিণত হবে বলে মনে হচ্ছে।
সামরিক ক্ষয়ক্ষতি কার কেমন হয়েছে সেই হিসাব এখনো পরিষ্কার নয়।
দুই মার্কিন কর্মকর্তার সাম্প্রতিক হিসেবে মতে, রাশিয়া ইউক্রেনের অভ্যন্তরে ৩ থেকে ৫ শতাংশ ট্যাঙ্ক, বিমান, কামান এবং অন্যান্য সামরিক সম্পদ হারিয়েছে। ইউক্রেনের এই ক্ষতি প্রায় ১০ শতাংশ।
গোয়েন্দা তথ্য মতে, ইউক্রেনের সামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করতে মস্কো এখন আরও আধুনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের দিকে ব্যাপকভাবে ঝুঁকেছে। অন্যদিকে ইউক্রেন তাদের কাঁধে চালিত জ্যাভলিন ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে প্রতিরোধ করছে।
পশ্চিমাদের দেওয়া নিরাপত্তা সহায়তা সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্ত পেরিয়ে ইউক্রেনে পৌঁছেছে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে অস্বীকার করেছেন প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।
তবে ইউক্রেনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন এটি যথেষ্ট নয়।
ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দিমিত্রো কুলেবা বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেনকে বলেছেন তাদেরকে 'এখন' অতিরিক্ত অস্ত্র সরবরাহ করা দরকার।
ইউক্রেনে সহযোগিতা করা সম্পর্কে এক ঊর্ধ্বতন গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেছেন, 'তাদের বুলেট, ব্যান্ডেজ, জ্বালানি দরকার। তাদের গোলাবারুদ প্রয়োজন, মানবিক সহায়তা ছাড়াও চিকিৎসা সহায়তা, যুদ্ধে আহত এবং বেসামরিক নাগরিকদের জন্য হাসপাতাল টিকিয়ে রাখা প্রয়োজন।'
তিনি বলেন, 'তাদের আরও গোলাবারুদ এবং অস্ত্র সরবরাহের প্রয়োজন হবে, কারণ রাশিয়ান বাহিনী সংখ্যাগত এবং গুণগতভাবে উন্নত।'
বেসামরিক লোক হতাহতের আশঙ্কা
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য পশ্চিমা কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন যে, ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীকে ধ্বংস করার পাশাপাশি অনেক বেসামরিক লোকজন হতাহতের শিকার হবে। কারণ রাশিয়া যেকোনো কৌশলে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ দখল করতে চায়।
প্রথম কয়েক রাতে রাশিয়ার অভিযানের লক্ষ্য ছিল সামরিক স্থাপনা। সবশেষ ৩ দিনে অনেক বেসামরিক এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র, কামান এবং রকেট হামলা হয়েছে। সেখানে প্রশাসনিক ভবন থাকতে পারে তবে সেগুলোর কোনো নিরাপত্তা নেই।
সিএনএন কিয়েভের নিকটবর্তী ইরপিনে, মারিউপোল, বোরোদজাঙ্কা, খারকিভ এবং খেরসনে হামলার বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছে।
জেনেভা কনভেনশনের অধীনে যেসব অস্ত্র নিষিদ্ধ তা ইউক্রেনে আনার অভিযোগ করেছেন জাতিসংঘে মার্কিন রাষ্ট্রদূত লিন্ডা থমাস-গ্রিনফিল্ড। গতকাল বুধবার রাশিয়ার বিরুদ্ধে তিনি এই অভিযোগ আনেন।
তিনি বলেন, 'আমরা রাশিয়ান বাহিনীকে ইউক্রেনে ধ্বংসাত্মক অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে যাওয়ার ভিডিও দেখেছি, যেগুলো যুদ্ধক্ষেত্রে নিষিদ্ধ। এর মধ্যে রয়েছে ক্লাস্টার যুদ্ধাস্ত্র এবং ভ্যাকুয়াম বোমা…যা জেনেভা কনভেনশনের অধীনে নিষিদ্ধ।'
শক্তিশালী বাহিনীর দিকে ঝুঁকছে রাশিয়া
কয়েকজন কর্মকর্তারা বলছেন, নিশ্চিতভাবে বলা যায় রুশ সামরিক বাহিনী আক্রমণের সময় অনেক সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে।
গতকাল এক ঊর্ধ্বতন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা বলেছেন, কিয়েভের উত্তরে অবস্থানরত ট্যাঙ্ক, সাঁজোয়া যান এবং টোয়েড আর্টিলারির একটি ৪০ মাইল দীর্ঘ কনভয় 'স্থির হয়ে আছে'।
এই কর্মকর্তা বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মনে করছে একাধিক কারণে কিয়েভ দখলে রাশিয়ার অগ্রগতি ধীর হয়ে পড়েছে। যার মধ্যে রয়েছে জ্বালানি ও খাদ্য সমস্যা। ইউক্রেনীয়রা একটি কার্যকর, 'কঠোর প্রতিরোধ' গড়ে তুলতে পেরেছে।
তবে কর্মকর্তা সতর্ক করেছেন, রুশরা তাদের ভুল থেকে শিখবে এবং মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করবে।
সেই ঊর্ধ্বতন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা বলেন, 'আমি মনে করি তারা এখন আরও ভারী অস্ত্র সজ্জিত শক্তিশালী সেনার দিকে ঝুঁকবে। আমাদের উদ্বেগের বিষয় হলো, তারা এখন আরও বেশি বর্ম, দূরপাল্লার আর্টিলারি, ভারী অস্ত্রসহ শক্তিশালী বাহিনী নিয়ে আসছে। যেগুলো কেবল আরও ধ্বংসাত্মক নয় বরং অনুমান করাও কঠিন।'
ইউক্রেন বুধবার বলেছে, ৬ হাজার রাশিয়ান সেনা নিহত বা আহত হয়েছেন। তবে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা বলছে এই সংখ্যাটি ২ বা ৩ হাজারের কাছাকাছি।