গাড়ি নিয়ে বিশ্ব রাজনীতিতে যত ‘অ্যাক্সিডেন্ট’
সম্প্রতি সংসদ সদস্যদের জন্য গাড়ি চেয়েছেন এনসিপির নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ। মাসে ৭০ হাজার টাকা যাতায়াত ভাতা পাওয়ার পরও কেন বাড়তি সরকারি গাড়ির প্রয়োজন—এই প্রশ্নে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বেশ গরম।
জবাবে সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ অবশ্য ব্যাখ্যা দিয়েছেন—তিনি শুল্কমুক্ত ব্যক্তিগত গাড়ি নয়, বরং ডিসি-ইউএনওদের মতো সরকারি প্রক্রিয়ায় ‘ডিউটি কার’ চেয়েছেন।
বাংলাদেশের সংসদে এই বিতর্ক গরম বা নরম—যেমনই হোক, বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে গাড়ি নিয়ে এমন ‘গাড়ি-ঘোড়া’ ছোটানোর গল্প কিন্তু বেশ পুরোনো। চলুন দেখে নিই, গাড়ির কারণে বিশ্বের কয়েকটি দেশের সংসদ সদস্য বা নেতারা কীভাবে ‘দুর্ঘটনায়’ পড়েছিলেন।
সুইডেনের 'টবলেরোন' কেলেঙ্কারি
বাংলাদেশের সংসদ সদস্যদের যাতায়াত ভাতা নিয়ে যখন কথা উঠছে, তখন সুইডেনের রাজনীতিবিদ মোনা সাহলিনের কথা মনে করা যেতে পারে। তিনি সুইডিশ সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রথম নারী নেত্রী (২০০৭-২০১১) এবং উপ-প্রধানমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
১৯৯৫ সালে তিনি স্রেফ নিজের ব্যক্তিগত প্রয়োজনে সরকারি ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে ৫৩ হাজার সুইডিশ ক্রোনা খরচ করেছিলেন। এর মধ্যে ছিল ব্যক্তিগত গাড়ি ভাড়া করা ও তেল ভরা, ডায়াপারসহ নিত্যপণ্য কেনা এবং টবলেরোন চকলেট কেনা। এ কারণে এই কেলেঙ্কারির নাম হয়েছিল ‘টবলেরোন অ্যাফেয়ার’।
এই কেলেঙ্কারির কারণে পরে মোনা সাহলিনকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল। যদিও তিনি পরে টাকা ফেরত দিয়েছিলেন, কিন্তু সুইডিশ জনগণ মনে করেছিল, জনগণের পয়সায় নিজের গাড়ির সুবিধা নেওয়া অনৈতিক।
ব্রিটিশ পার্লামেন্টের 'এক্সপেন্সেস' কেলেঙ্কারি
ব্রিটেনের এমপিরাও বাংলাদেশের সংসদ সদস্যদের মতো যাতায়াত ভাতাসহ নানা সুযোগ-সুবিধা পান। ২০০৯ সালে যুক্তরাজ্যের ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকা একটি বড় কেলেঙ্কারি ফাঁস করে।
প্রতিবেদনে উঠে আসে, অনেক ব্রিটিশ এমপি তাদের ব্যক্তিগত বাড়ি ছাড়াও বিলাসবহুল গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ ও যাতায়াতের জন্য ভুয়া খরচ দেখিয়েছেন। এই প্রতিবেদনের জেরে বেশ কয়েকজন এমপিকে পদত্যাগ, এমনকি জেলেও যেতে হয়। পার্লামেন্টের স্পিকারকে পর্যন্ত বিদায় নিতে হয়।
এই কেলেঙ্কারি জনগণের মধ্যে রাজনীতিবিদদের প্রতি ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি করে ও ২০১০ নির্বাচনে তার প্রভাব পড়ে।
ভারতে গাড়িতে ‘লাল বাতি’ বিতর্ক
প্রতিবেশী ভারতে একসময় রাজনৈতিক নেতাদের গাড়ির ওপর ‘লাল বাতি’ লাগানো ছিল আভিজাত্যের প্রতীক। জনগণের মধ্যে এটি ‘ভিভিআইপি কালচার’ হিসেবে পরিচিত ছিল। সাধারণ মানুষ রাস্তায় আটকে থাকত, আর নেতারা সাইরেন বাজিয়ে চলে যেতেন।
এই সংস্কৃতির ফলে সাধারণ নাগরিকদের সঙ্গে বৈষম্য তৈরি হচ্ছে বলে মনে করা হতো। ২০১৭ সালে জনগণের ব্যাপক সমালোচনার মুখে নরেন্দ্র মোদি সরকার সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের গাড়িতে ওই ফ্ল্যাশিং বাতি লাগানো নিষিদ্ধ করে। মোদি বললেন, ‘প্রত্যেক নাগরিকই ভিআইপি’।
ভারতের এই ইতিহাস এটাই মনে করিয়ে দেয়—জনগণ নেতাদের ‘ভিআইপি’ হিসেবে নয়, ‘সেবক’ হিসেবে দেখতে চায়।
নেপালের সংসদীয় গাড়ি বিতর্ক
২০১৫ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর নেপালে পুনর্গঠনের কাজ দীর্ঘদিন ধরে চলছিল। বিদেশি দাতা সংস্থা ও সরকারি তহবিল থেকে বিলিয়ন ডলারের সাহায্য আসে। কিন্তু গ্রামীণ এলাকায় ঘরবাড়ি, রাস্তা, স্কুল-হাসপাতাল নির্মাণের কাজ অনেক জায়গায় ধীরগতিতে চলছিল।
এই সময়ে সংসদ সদস্যদের জন্য নতুন বিলাসবহুল গাড়ি কেনার প্রস্তাব উঠলে জনগণের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়। অনেকে বললেন, দেশের অর্থনৈতিক সংকট ও পুনর্গঠনের প্রয়োজনের মধ্যে এমপিদের ‘আভিজাত্য’ বাড়ানো অযৌক্তিক।
রাজপথে প্রতিবাদ শুরু হয়। সংবাদমাধ্যমে একে ‘শেমলেসনেস’ (লজ্জাহীনতা) বলে সমালোচনা করা হয়। কিছু ক্ষেত্রে এমপিরা গাড়ি কিনতে চোরাকারবারি বা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগও ওঠে।
বিদেশের অনেক দেশে এমপিরা সাইকেলে চড়ে বা পাবলিক বাসে করে সংসদে যান—এমনটাও দেখা যায়। নেতার গাড়ি যত চকচকে হোক, জনগণের আস্থা যদি নড়বড়ে হয়, তাহলে সেই গাড়ি শেষ পর্যন্ত ‘রাজনৈতিক ব্রেক ফেল’ করতে পারে।