বিশ্লেষণ

রাষ্ট্রীয় ১২ পদে দলীয় নিয়োগ ৩১ দফার প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক

আবু সাদিক
আবু সাদিক

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে ‘রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের ৩১ দফা’য় যে রূপরেখা দেওয়া হয়েছিল, সম্প্রতি ১২টি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয় নেতাদের নিয়োগ এর সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। সরাসরি দলীয় নিয়োগ দেওয়ার পর সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

গত ২৩ জুলাই ১১টি বড় করপোরেশন, পরিচালনা পর্ষদের শীর্ষ পদ এবং নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিব পদে এক বছরের চুক্তিতে দেওয়া হয়। বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সমাজের মতে, এসব নিয়োগ বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণ, বিএনপির নির্বাচনের ইশতেহার এবং ৩১ দফার মূল চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

৩১ দফায় কী ছিল?

বিএনপির ৩১ দফার ৯ নম্বর দফায় উল্লেখ করা হয়, ‘সংকীর্ণ রাজনৈতিক দলীয়করণের ঊর্ধ্বে’ উঠে সব রাষ্ট্রীয়, সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা এবং বিশ্বাসযোগ্যতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হবে। এসব পদে নিয়োগ হবে সংসদীয় কমিটির শুনানি ও ভেটিং সাপেক্ষে। অর্থাৎ, একতরফা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে নিয়োগ হবে না।

রূপরেখার ১১ নম্বর দফায় বলা হয়েছিল, একটি ‘প্রশাসনিক সংস্কার কমিশন’ গঠন করে বেসামরিক ও সামরিক প্রশাসনে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে যোগ্যতাকে একমাত্র মানদণ্ড ধরা হবে। আর ২ নম্বর দফায় নির্বাচনকালীন দলনিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা প্রবর্তনের কথা বলা হয়েছে। একে নির্বাচন কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা রক্ষার নিশ্চয়তা হিসেবে দেখা যায়।

বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, মেধা ও পেশাদরত্বের বদলে দলীয় পরিচয় ও আনুগত্যকেই নিয়োগের মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।

১২ প্রতিষ্ঠানে দলীয় নিয়োগ

সম্প্রতি সরকার যেসব প্রতিষ্ঠানে দলীয় ব্যক্তিদের বসিয়েছে, তার মধ্যে কৃষি, শিল্প, বৈদেশিক কর্মসংস্থান, পরিবহন, জলবায়ু অর্থায়নের মতো প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

এর মধ্যে বাংলাদেশ পাট করপোরেশনের চেয়ারম্যান করা হয়েছে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মামুন হাসানকে। বাংলাদেশ স্টিল অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান হয়েছেন দলটির রংপুর বিভাগের সহকারী সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুল খালেক। বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশনের চেয়ারম্যান পদে এসেছেন নির্বাহী কমিটির সদস্য সামসুজ্জামান। বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের চেয়ারম্যান হিসেবে বিএনপির বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল এবং বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান হিসেবে সহকারী ধর্মবিষয়ক সম্পাদক আবদুল বারী নিয়োগ পেয়েছেন।

বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্টের (বিসিসিটি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক হয়েছেন কাজী রওনাকুল ইসলাম, বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের চেয়ারম্যান হয়েছেন সাবেক যুবদল নেতা জাকির হোসেন, বোয়েসেলের চেয়ারম্যান হয়েছেন মোহাম্মদ রাশেদুল হক, জাতীয় সমাজকল্যাণ পরিষদের নির্বাহী সচিব হয়েছেন মো. কামরুজ্জামান, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) চেয়ারম্যান হয়েছেন বেনজীর আহমেদ এবং বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক হয়েছেন সালাহউদ্দিন সরকার। তারা সবাই সরাসরি বিএনপির বিভিন্ন পদে ছিলেন।

ইসিতে বিতর্কিত নিয়োগ

সবচেয়ে বেশি আপত্তি উঠেছে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে অতিরিক্ত সচিব পদে সাবেক ইসি কর্মকর্তা শামসুল আলমের নিয়োগ নিয়ে। তিনি ২০২৫ সালে বিএনপির নির্বাচনী এলাকার সীমানানির্ধারণবিষয়ক একটি দলীয় কমিটির সদস্য হিসেবে কাজ করেছেন। ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর ইসি থেকে তথ্য ফাঁসের অভিযোগে তিনি গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন।

এই নিয়োগ নিয়ে আপত্তি তুলেছে জামায়াতে ইসলামী। দলটির ভাষ্য, নির্বাচন কমিশনের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানে সরাসরি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত কোনো ব্যক্তিকে বসালে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ইসির নিরপেক্ষতা নিয়ে জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ণ হবে। জামায়াতের অভিযোগ, বিএনপির কাছে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’-এর বদলে ‘বিএনপি ফার্স্ট’ অগ্রাধিকার পাচ্ছে।

এসব নিয়োগ নিয়ে বিরোধী দলের পাশাপাশি নাগরিক সমাজের দিক থেকেও উদ্বেগ রয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে এই নিয়োগগুলো মূলত পুরোনো ‘উইনার-টেকস-অল’ বা বিজয়ী দল সবকিছু একছত্র নিয়ন্ত্রণ করবে—এই সংস্কৃতিরই ধারাবাহিকতা। তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, এটি বিএনপির ঘোষিত ইশতেহার ও ৩১ দফার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে।

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব ফিরোজ মিয়া বলেন, প্রশাসনিক বা প্রযুক্তিগত দক্ষতা সম্পন্ন ব্যক্তিরা দ্রুত নতুন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেন। কিন্তু যাদের এ ধরনের কোনো প্রাসঙ্গিক অভিজ্ঞতা নেই, তাদের জন্য মানিয়ে নেওয়া অনেক কঠিন।

তিনি আরও বলেন, ‘সরকার যদি বিষয়টি বিবেচনায় না নেয়, তবে তা ঝুঁকির কারণ হতে পারে। যেখানে প্রয়োজন, সেখানে দক্ষ, যোগ্য ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিতে কোনো বাধা নেই। তবে এ ক্ষেত্রে অবশ্যই জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া নিশ্চিত করতে হবে।’

ইসিতে এই নিয়োগের রাজনৈতিক তাৎপর্য সম্পর্কে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) ট্রাস্টি ও প্রধান নির্বাহী বদিউল আলম মজুমদারের বক্তব্য গতকাল এক নিবন্ধে প্রকাশ করেছে প্রথম আলো। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে সংশয় বারবার নির্বাচন বর্জনের রাজনীতিকে উসকে দিয়েছে। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪, ২০২৪-এর নির্বাচনগুলো তার প্রমাণ। বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় বিএনপি দীর্ঘদিন নির্বাচন কমিশনে দলীয় নিয়োগকে নির্বাচন বর্জনের অন্যতম যুক্তি হিসেবে উপস্থাপন করেছে। কিন্তু নিজেরা ক্ষমতায় গিয়ে সেই পথই অনুসরণ করছে। এই সিদ্ধান্ত বিএনপির জন্য যেমন আত্মঘাতী, তেমনি বাংলাদেশর গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্যও অশনিসংকেত।’