এক্সপ্লেইনার

‘বর্গী এলো দেশে’—কারা এই বর্গী?

স্টার অনলাইন ডেস্ক

‘খোকা ঘুমালো, পাড়া জুড়ালো/ বর্গী এলো দেশে/ বুলবুলিতে ধান খেয়েছে/ খাজনা দেবো কিসে…’—এই ছড়াটি আজো অনেক বাড়িতে শিশুদের উৎসুক চোখে ঘুম আনতে সুর করে পড়া হয়। তবে বড় হওয়ার পর অনেকেই ভুলে যায় সেই ঘুম-পাড়ানী ছড়ার কথাগুলো।

কিন্তু, অবচেতন মনে থেকে যায় একটি শব্দ—‘বর্গী’।

এখন অনেককেই ‘বর্গী কারা?’—এমন প্রশ্ন করলে সঠিক জবাব পাওয়া যায় না।

তবে বর্গী বলতে যে ‘ভয় জাগানো’ কোনো গোষ্ঠীকে বোঝায় তা সবাই বুঝতে পারেন। তারা বুঝতে পারেন যে— শিশুদের ঘুম পাড়ানো ছড়ায় তুলে ধরা হয় এক ‘ঘুম ওড়ানো নৃশংসতার’ ইতিহাস।

আজকাল যে কোনো অজানা বিষয়ের জবাব পেতে প্রশ্ন ছুড়ে দেওয়া হয় এআইয়ের কাছে। এমন বাস্তবতায় ‘এআই মোড’ সূত্রে জানা গেল—‘বর্গী হলো অষ্টাদশ শতাব্দীতে বাংলায় আক্রমণ ও লুণ্ঠনকারী মারাঠা অশ্বারোহী সৈন্যদল।’

শব্দটির উৎপত্তি সম্পর্কে জানা যায়—ফারসি ‘বার’ (অর্থ: বোঝা বা ভার) ও ‘গীর’ (অর্থ: গ্রহণকারী বা বহনকারী) শব্দযুগল থেকে এসেছে ‘বারগীর’।

রসদ বহনকারী অশ্বারোহীদের বোঝাতে ‘বারগীর’ শব্দটি মোঘল সেনাবাহিনীতে ব্যবহার করা হতো।

শব্দটি মারাঠা বাহিনীতে ব্যবহৃত হতো ‘নিয়োগকর্তার দেওয়া ঘোড়ায় চড়ে যুদ্ধ করা সৈনিককে’ বোঝাতে।

ঐতিহাসিক সূত্রগুলো বলছে—মারাঠা বাহিনীর সাধারণ সেনাদের একটি অংশকে ‘বরগীর’ বলা হতো। শাসকরা তাদের অস্ত্র ও ঘোড়া দিত। যাদের নিজেদের ঘোড়া ও অস্ত্র থাকতো তারা ‘শিলেদার’ হিসেবে পরিচিত।

২০২৫ সালের ২ মার্চ ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী) বা সিপিআই (এম) এর পশ্চিমবঙ্গ কমিটির বাংলায় প্রকাশিত মুখপত্র ‘গণশক্তি’র-‘মারাঠা বর্গী হামলা থেকে বাঁচাতে খাল কাটা হয়েছিল কলকাতা ঘিরে’ প্রতিবেদনটি থেকে জানা যায়—মারাঠা সেনাবাহিনীতে শিলেদারদের পদগত অবস্থান ছিল বর্গীদের নিচে।

এ ছাড়া, শিলেদারদের সংখ্যা বর্গীদের তুলনায় কম ছিল বলেও প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়।

তবে অধিকাংশ গবেষকের মত—ফারসি ‘বারগীর’ শব্দটি পরবর্তীতে বাংলায় পরিবর্তিত হয়ে ‘বর্গী’ রূপ নিয়েছে।

কেউ কেউ এই শব্দটির সঙ্গে মারাঠি ভাষার যোগসূত্রের কথাও উল্লেখ করেন।

জানা যায়, ১৭৪২ সালে বাংলায় মারাঠা বা বর্গীদের সম্ভাব্য আক্রমণ থেকে কলকাতা শহরকে সুরক্ষিত রাখতে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পরিকল্পনা অনুসারে প্রায় ৩ মাইল দীর্ঘ একটি পরিখা বা খাল খনন করা হয়েছিল।

ইতিহাসে এটি ‘মারাঠা ডিচ’ নামে পরিচিত।

The Mahratta Ditch & The English Itch – How Bengalis Crossed it to Invite the Final Doom – Abhinav Pancholi
মারাঠা ডিচ-এর ম্যাপ। ছবি: সংগৃহীত

গবেষকরা বলছেন, শেষমেশ বর্গীরা কলকাতায় হামলা না করায় সেখানকার বাসিন্দাদের শ্রমে তৈরি সেই পরিখাটি আর পরিকল্পনা-মাফিক কাটা হয়নি। তা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। সেই পরিখার মাটির ঢিবির ওপর গড়ে উঠে সার্কুলার রোড।

পরে সেই পরিখা ভরাট করা হয়। আজকের কলকাতার ‘মারাঠা ডিচ লেন’ ও খালের খানিক অংশ এখনো বর্গী হামলাকারীদের ইতিহাস বহন করে চলেছে।

একজন মালিক আম্বর ও ভাস্কর পণ্ডিত

বর্গী ও বাংলায় বর্গী হামলার প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে ভারতের আজকের মহারাষ্ট্র রাজ্যের তৎকালীন আহমেদনগরের মোঘলবিরোধী সেনাপতি মালিক আম্বর ও বর্গী দস্যুদের প্রধান ভাস্কর পণ্ডিত সম্পর্কে একটু আলোচনা করা যেতে পারে।

সেই আহমেদনগরের নাম বদলিয়ে এখন ‘অহল্যানগর’ করা হয়েছে।

২০২০ সালের ২৪ জানুয়ারি প্রকাশিত তুরস্কের সরকারি সংবাদমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ডের এক প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল—‘মালিক আম্বর: ইথিওপীয় দাস যিনি ভারতে রাজা-তৈরির কুশীলব হয়ে উঠেছিলেন।’

আহমেদনগরের মোঘলবিরোধী সেনাপতি মালিক আম্বর। ছবি: সংগৃহীত
আহমেদনগরের মোঘলবিরোধী সেনাপতি মালিক আম্বর। ছবি: সংগৃহীত

এতে বলা হয়, ১৬ শতকের কোনো এক সময়ে দাস ব্যবসায়ীদের হাতে বন্দি ইথিওপিয়ার হাজারো মানুষের সঙ্গে বন্দি হোন আম্বর। পরে তাকে মধ্যপ্রাচ্যে বিক্রি করে দেওয়া হয়।

কয়েক দশক পর আম্বর নানা হাত বদলে ভারতে আসেন। নিজের প্রতিভা গুণে সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ পদে প্রতিষ্ঠিত হোন। তিনি এক সময় মোঘলদের ভয়ের কারণ হয়ে উঠেছিলেন।

প্রতিবেদন অনুসারে, ১৫৪৮ সালে পূর্ব ইথিওপিয়ার হারার প্রদেশে জন্ম নেয় চাপু। বার বার বিক্রির পর তিনি ইয়েমেন হয়ে বাগদাদে পৌঁছেন। কাজি হুসাইন নামের এক ব্যক্তির হাতে পড়ার পর চাপু ইসলাম গ্রহণ ও আম্বর নাম ধারণ করেন।

হুসাইন তার দাস আম্বরের প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে তাকে প্রশাসন ও হিসাবনিকাশে পারদর্শী করে তোলেন।

আম্বর ২২ বছর বয়সে আসেন দক্ষিণ ভারতের সুলতান নিজাম শাহীর আহমেদনগরে। ১৬০০ সালে আম্বর গুরুত্বপূর্ণ সেনানায়ক হয়ে উঠেন। তার দক্ষতায় ১৬০১ সালে দিল্লির মোঘল সম্রাট আকবরের বিশাল বাহিনী আহমেদনগর আক্রমণ করে ব্যর্থ হয়।

আম্বরের রণকৌশলের কারণে পরে আকবরের ছেলে জাহাঙ্গীরও আহমেদনগরে হামলা চালিয়ে পরাজিত হোন।

১৬২৬ সালে আম্বর মারা যান। মহারাষ্ট্রে আজো তাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়।

গত ২৯ মে ভারতের ‘টাইম অ্যান্ড টাইড’ পডকাস্টে ইতিহাস গবেষক দীপাঞ্জন ঘোষ জানান, মালিক আম্বর অল্প সংখ্যক সৈনিক নিয়ে ছোট ছোট বাহিনী করে বিশাল মোঘল বাহিনীকে আচমকা আক্রমণ করে দ্রুত পালিয়ে যেতেন। তার এমন গেরিলা হামলায় মোঘলরা বারবার পরাস্ত হয়।

ভারতের খুলদাবাদে মালিক আম্বরের সমাধি। ছবি: উইকিমিডিয়া কমনস
ভারতের মহারাষ্ট্রের খুলদাবাদে মালিক আম্বরের সমাধি। ছবি: উইকিমিডিয়া কমনস

সেই রণকৌশল পরবর্তীতে মারাঠা বাহিনী গ্রহণ করে। সেই সব ছোট ছোট বাহিনীর সৈনিকরা ‘বারগীর’ নামে পরিচিত ছিল। পরে সেই বাহিনী একই কৌশলে বাংলায় হামলা চালায়। তারা বাংলায় ‘বর্গী’ নামে পরিচিত হয়।

এখন আসা যাক বর্গী দস্যুদের নেতা ভাস্কর পণ্ডিত প্রসঙ্গে।

২০১৪ সালের ১ অক্টোবর ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকার এক প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল—‘ভাস্কর পণ্ডিতের পুজো সাক্ষ্য দিচ্ছে ভাঙা প্রাচীর’।

প্রতিবেদনটি থেকে জানা যায়, দাঁইহাট শহরের সমাজবাটি মহল্লায় মারাঠা দস্যু ভাস্কর পণ্ডিতের স্মৃতিবিজড়িত একটি দুর্গা মন্দির আছে। সেই মন্দিরটির ভাঙা পাঁচিল আজো বাংলায় বর্গী হামলার নিদর্শন বহন করে চলছে।

দাঁইহাট শহর পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব বর্ধমান জেলার কাটোয়ার কাছে ভাগীরথী নদীর তীরে একটি প্রাচীন জনপদ। কাঁসা-পিতল ও হস্তশিল্পের জন্য এই শহরের খ্যাতি আছে।

বর্গীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক হত্যা-লুটের অভিযোগের পাশাপাশি ধর্মপ্রতিষ্ঠান বিশেষ করে হিন্দু মন্দিরে হামলার অভিযোগ আছে। এমন প্রেক্ষাপটে দাঁইহাটে বর্গী দস্যুদের প্রধান ভাস্কর পণ্ডিতের দুর্গা পূজায় অংশগ্রহণের কথাও বলা হয়।

প্রতিবেদন অনুসারে, প্রায় ১২০ বর্গফুটের একটা ভাঙা পাঁচিল ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে। আড়াই শ বছরের পুরোনো সেই পাঁচিলের সঙ্গে দুর্গা পূজার ইতিহাসও জড়িয়ে আছে।

এতে আরও বলা হয়, ‘এলাকার প্রবীণদের দাবি, ভাঙা পাঁচিলটি বাংলায় বর্গী হামলার অন্যতম নিদর্শন। মারাঠা দস্যু ভাস্কর পণ্ডিতের হাতে শুরু হয়েছিল এই পুজো। তারপর থেকে দাঁইহাটের সমাজবাটি পাড়ার ওই দুর্গা পুজো ভাস্কর পণ্ডিতের পুজো বলে খ্যাত।’ দীর্ঘ বছর ধরে সমাজবাটি পাড়ার বাসিন্দারা ওই ভাঙা পাঁচিলকে ঘিরেই দুর্গাপূজা করে আসছেন।

ভাঙা পাঁচিলের গায়েই দুর্গামণ্ডপ। নিজস্ব চিত্র।
সেই ভাঙা প্রাচীর। ছবি: সংগৃহীত

স্থানীয় ইতিহাসবিদ ও দাঁইহাট উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক স্বপনকুমার ঠাকুর সংবাদমাধ্যমটিকে জানান, ১৭৪২ সালের এপ্রিলে চৌথ বা কর আদায়ের উদ্দেশে ২২ জন মারাঠা সরদার ও ২০ হাজার বর্গী সেনা সুবে বাংলার রাজধানী মুর্শিদাবাদের দিকে রওনা দেন। নবাব আলিবর্দী খান ওড়িশার বিদ্রোহ দমন করে বর্ধমানের রানিসায়রের কাছে তাঁবু খাটিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। সেই সময় গোপনে ভাস্কর পণ্ডিত হামলা চালান।

তিনি আরও জানান, নবাব আলিবর্দী ৩ দিন অবরুদ্ধ থাকার পর কাটোয়া হয়ে মুর্শিদাবাদে চলে যান। সেই সময় দাঁইহাটে ঘাঁটি গেড়ে রাঢ়বঙ্গে তথা বাংলার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ব্যাপক লুটপাট করে ভাস্কর পণ্ডিতের বর্গী সেনারা।

স্থানীয় ইতিহাসবিদের ভাষ্য—বর্ধমানের মহারাজা গঙ্গাস্নানের জন্য দাঁইহাটে গঙ্গার তীরে বাড়ি বানিয়েছিলেন। দস্যুপ্রধান ভাস্কর পণ্ডিত সেই বাড়ি দখল করে নিয়েছিলেন।

আনন্দবাজারের প্রতিবেদনটিতে বলা হয়—‘কথিত আছে, বর্গী হামলার ওই নায়ক ভেবেছিলেন দুর্গাপুজো ও দশেরা উৎসব একসঙ্গে হবে। সে জন্যই বর্ধমানের মহারাজাদের ওই বাড়িতে দুর্গোৎসব শুরু করেন তিনি। কিন্তু, নবমীর দিন আলিবর্দী খানের দলবল নদীয়ার প্রান্ত থেকে কামানের গোলা দাগাতে আরম্ভ করে। শাঁখাই ঘাট পেরিয়ে অতর্কিত আক্রমণ চালান নবাব। আর তাতেই দিশেহারা হয়ে পুজো ছেড়ে পালিয়ে যান ওই মারাঠি দস্যু।’

বাংলার নবাব নবাব আলিবর্দী খান। ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স
বাংলার নবাব নবাব আলিবর্দী খান। ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স

তবে পডকাস্টার দীপাঞ্জন ঘোষ বলেন, ভাস্কর পণ্ডিতকে ধরার জন্য আলিবর্দী খানের সেই হামলাটি হয়েছিল অষ্টমীতে।

তার মতে, মালিক আম্বরের রণকৌশল পরবর্তী শতকগুলোয় মারাঠা সেনারা মেনে চলেছে এবং তা আরও নিখুঁত করেছে। সেই রণকৌশল অনুসরণ করে মারাঠারা আরও দুর্ধর্ষ ও অপরাজেয় হয়ে উঠে। তারা মোঘল সেনাদের বিপর্যস্ত করার পাশাপাশি মোঘল রণকৌশল মেনে চলা বাংলার নবাবের বাহিনীকেও অস্থির করে তুলেছিল।

নবাব আলিবর্দী খান ও একদল বর্গী

ব্রিটিশ ও ব্রিটিশ-পরবর্তী বাংলা সাহিত্যে মারাঠাদের, বিশেষ করে মারাঠাশ্রেষ্ঠ ছত্রপতি শিবাজী মহারাজার বন্দনা করা হলেও বাংলাপিডিয়ার ‘মারাঠা হামলা’ অংশে বলা হয়—‘আঠারো শতকে বাংলায় মারাঠারা এক অভিশাপরূপে আবির্ভূত হয়। তারা সারাদেশে ধ্বংসযজ্ঞ চালায় এবং জনজীবনে নেমে আসে অবর্ণনীয় দুঃখ-দুর্দশা।’

বাংলায় মারাঠা হামলাকে মূলত মোঘলদের সঙ্গে মারাঠাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতারই ফল হিসেবেও এতে উল্লেখ করা হয়।

অর্থাৎ, দিল্লির মোঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব দাক্ষিণাত্য অভিযানে মারাঠাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে খুব একটা সফল হননি।

সম্রাট আওরঙ্গজেব। ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স
সম্রাট আওরঙ্গজেব। ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স

ইতিহাস বলছে, ১৭০৭ সালে আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর মারাঠারা আবার মোঘল শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে।

আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর তার উত্তরসূরিদের মধ্যে সংঘাত শুরু হয়। সেসময় দিল্লির শাসকদের দুর্বলতার সুযোগে বাংলার শাসকরাও নিজেদের স্বাধীন ভাবতে এবং দিল্লিতে করের টাকা না পাঠিয়ে স্বাধীনভাবে রাজ্য চালাতে শুরু করেন।

১৭১৬ সালে ঢাকার মোঘল কর্মকর্তা মুর্শিদকুলী খানকে বাংলার নাজিম বা প্রশাসক করা হয়। সেসময় দিল্লির সম্রাট ছিলেন আওরঙ্গজেবের নাতির ছেলে বা প্র-পৌত্র ফররুখ সিয়ার।

মুর্শিদকুলী খান । ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স
মুর্শিদকুলী খান । ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স

আজকের মুর্শিদাবাদ এই মুর্শিদকুলী খানের নামে নামকরণ করা হয়। সেই জায়গাটির আগের নাম ছিল মকসুদাবাদ।

১৭২৭ সালে নিঃসন্তান মুর্শিদকুলী খানের মৃত্যুর পর তার জামাতা ও কটক বা ওড়িশার শাসক সুজাউদ্দিন বাংলার মসনদ দখল করেন। এ কাজে বিহারের তৎকালীন প্রশাসনিক কর্মকর্তা আলিবর্দী খান তাকে সহায়তা করেছিলেন।

১৭৩৯ সালে সুজাউদ্দিন মারা গেলে তার ছেলে সরফরাজ বাংলার মসনদে বসেন। পরের বছর আলিবর্দী খান তার এক বন্ধুর সহায়তায় দিল্লির তৎকালীন সম্রাট মুহাম্মদ শাহের কাছ থেকে বাংলা-বিহার-ওড়িশার সুবাদারি বা শাসনের অনুমতি নেন।

তখন দিল্লির সম্রাট মোহাম্মদ শাহ ইরানের সম্রাট নাদির শাহের ভারত আক্রমণ ঠেকাতে ব্যতিব্যস্ত ছিলেন।

ইরানের সম্রাট নাদির শাহ
ইরানের সম্রাট নাদির শাহ।

এমন ‘ঘোলাটে’ পরিস্থিতিতে আলিবর্দী খান বর্তমানের মুর্শিদাবাদ জেলার গিরিয়ায় এক যুদ্ধে সরফরাজকে পরাজিত ও হত্যা করে বাংলার ক্ষমতা গ্রহণ করেন।

সবাই জানেন যে, বাংলার নবাব হয়ে আলিবর্দী খান অনেকটাই স্বাধীনভাবে রাজ্য পরিচালনা করেছিলেন।

তবে এই ‘ছলে-বলে-কৌশলে’ ক্ষমতা গ্রহণ তাকে শান্তিতে থাকতে দেয়নি।

সেসময় ওড়িশার প্রশাসক ও সরফরাজের শ্যালক রুস্তম জং নব্য-নবাব আলিবর্দীর বিরুদ্ধে অভিযোগ দেন প্রতিবেশী নাগপুরের মারাঠা রাজা রঘুজি ভোঁসলের কাছে।

ভারতের বর্তমান মানচিত্রের দিকে তাকালে দেখা যায়, পূবের ওড়িশা রাজ্য থেকে পশ্চিমের মহারাষ্ট্রের দূরত্ব খুব একটা বেশি নয়। এই দুই রাজ্যের মাঝখানে এক চিলতে ছত্তিশগড়।

ইনফোগ্রাফিক: এআই
ইনফোগ্রাফিক: এআই

এমনকি, আজকের এই মহারাষ্ট্র রাজ্যের নাগপুর নগরী থেকে ওড়িশার ঐতিহাসিক কটক নগরী বাংলার এক সময়ের রাজধানী মুর্শিদাবাদের তুলনায় অনেক কাছে।

যা হোক, নাগপুরের মারাঠা রাজা রঘুজি ভোঁসলে তার প্রধানমন্ত্রী ভাস্কর রাম কোহলতকারকে নবাব আলিবর্দীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব দেন। কোনো লেখায় ভাস্করকে রঘুজি ভোঁসলের সেনাপতি ও কোনো লেখায় তাকে রঘুজি ভোঁসলের বিশ্বস্তজন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে এই ব্যক্তি বাংলার ইতিহাসে ‘ভাস্কর পণ্ডিত’ হিসেবে সুপরিচিত।

নবাব আলিবর্দীর ‘অন্যায়ভাবে’ ক্ষমতাগ্রহণের বদলা নেওয়ার সঙ্গে যোগ হয় ‘চৌথ’ বা কর আদায়ের প্রসঙ্গটিও।

ইতিহাস বলছে—আওরঙ্গজেবের সঙ্গে বিদ্রোহী মারাঠাদের চুক্তি অনুসারে করের চারভাগের এক ভাগ মারাঠারা নেবে। কিন্তু, আলিবর্দী খান বাংলা-বিহার-ওড়িশার শাসক হওয়ার পর কর না দেওয়ায় মারাঠারা দিল্লিতে অভিযোগ জানায়। তখন সম্রাট মোহাম্মদ শাহ কর আদায়ের বিষয়টি মারাঠাদের নিজেদেরকেই বুঝে নিতে বলেন।

১৭৪২ সালের এপ্রিলের প্রথমদিকে বিবদমান বিষয়গুলোর সুরাহা করতে ভাস্কর পণ্ডিতের নেতৃত্বে একদল মারাঠা নাগপুর থেকে এসে প্রথমে ওড়িশা আক্রমণ ও দখল করে সেখানে ধ্বংসলীলা চালায়। পরে ওড়িশা ও বিহারের সীমান্তবর্তী বাংলার জেলাগুলো যেমন—পুরুলিয়া, মেদিনীপুর ও বর্ধমানে হামলা ও লুটতরাজ শুরু করে।

মারাঠা বাহিনীর সদস্যরা ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে আচমকা হামলা চালাতো এবং লুটতরাজ ও হত্যাযজ্ঞ শেষে দ্রুত পালিয়ে আশপাশের ঘন জঙ্গলে লুকিয়ে থাকতো। নবাবের বিশাল বাহিনী তাদেরকে ধরতে পারতো না।

মারাঠা সেনাদের মধ্যে যারা ‘বরগীর’ পদধারী তারা আচমকা লোকালয়ে হামলা চালিয়ে বাজার ও ফসলের খেত পুরিয়ে দিত। মানুষজনের টাকাপয়সা কেড়ে নিত। তাদেরকে হত্যা করতো।

ইতিহাসে তারাই ‘বর্গী’ ও তাদের আক্রমণগুলো ‘বর্গী হামলা’ হিসেবে কুখ্যাত হয়ে আছে।

বাংলাপিডিয়ার ‘মারাঠা হামলা’ অংশে আরও বলা হয়েছে—‘১৭৪২ থেকে ১৭৫১ সাল পর্যন্ত বাংলায় বার বার বর্গীদের আক্রমণ হয় এবং ১৭৫১ সালে বাংলার নবাব আলিবর্দী খান মারাঠাদের কাছে ওড়িশা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন।’

প্রতীকী ছবি: সংগৃহীত
প্রতীকী ছবি: সংগৃহীত

নবাব আলিবর্দী যখন বছরের পর বছর ধরে বর্গীদের হামলা প্রতিরোধে এক জেলা থেকে আরেক জেলায় ছুটে চলছিলেন, তখন সেই সুযোগে বর্গীদের একটি দল রাজধানী মুর্শিদাবাদে হামলা চালিয়ে ব্যাপক লুটতরাজ চালায়।

ঐতিহাসিকদের অনেকে বলছেন, মারাঠা বাহিনী প্রথমে নবাবকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণের কর দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিল। কিন্তু, নবাব ভেবেছিলেন যে তাদেরকে একবার কর দিলে তারা বারবার আসবে এবং প্রতিবছর করের টাকা বাড়িয়ে দেবে।

তাই তিনি বর্গীদের কর না দিয়ে বরং তাদের নির্মূলের সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু, বাস্তবতা হচ্ছে তার সেই সিদ্ধান্তের দরুন ওড়িশার সঙ্গে বাংলার পশ্চিমাংশের জেলাগুলো বর্গীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। সেখানকার অধিবাসীরা ব্যাপক লুটতরাজের পাশাপাশি হত্যাযজ্ঞের শিকার হয়।

আলিবর্দী খান বাংলার নবাব ছিলেন ১৭৪১ থেকে ১৭৫৬ সাল পর্যন্ত। অর্থাৎ, ১৫ বছর। এর মধ্যে প্রায় ৯ বছর তিনি বর্গী হামলা মোকাবিলায় শশব্যস্ত ছিলেন।

আলিবর্দী যখন বর্গী হামলা মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছিলেন তখন তিনি তাদের পুরোপুরি ধ্বংস করতে কূট-কৌশল হাতে নেন। পরিকল্পনা-মাফিক তিনি বর্গী দলপতি ভাস্কর পণ্ডিতকে তার নেতৃস্থানীয় সরদারদের নিয়ে সমঝোতার জন্য পূর্ব বর্ধমান জেলার কাটোয়ার কাছে মানকাড়ায় আসতে বলেন।

বাংলাপিডিয়ার তথ্য আরও বলছে—১৭৪৪ সালের ৩১ মার্চ ভাস্কর পণ্ডিত তার ২১ সহযোগীসহ আলিবর্দীর তাঁবুতে আসেন। তখন তাঁবুর আড়ালে লুকিয়ে থাকা ঘাতকরা বর্গী নেতাদের হত্যা করে।

এরপর কয়েক মাস বর্গী হামলা কম হলেও তা পুরোপুরি শেষ হয় ১৭৫১ সালে।

বর্গী নৃশংসতার প্রভাব

আলিবর্দী খানের নবাব হওয়ার বিরোধিতা ও কর আদায়ে চাপ দেওয়ার জন্য ওড়িশা ও বাংলায় এসেছিল বর্গীরা। দীর্ঘ ৯ বছর তারা এসব অঞ্চলে নৃশংসতা চালায়।

বর্গী নৃশংসতার প্রভাব সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. শহিদুল হাসান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘কে এন চৌধুরীর “দ্য ট্রেডিং ওয়ার্ল্ড অব এশিয়া অ্যান্ড দ্য ইংলিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, ১৬৬০-১৭৬০” গ্রন্থে ১৭৫৫ সালের বাংলার ডাচ কোম্পানির এক কর্মকর্তার প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে লিখেন, বাংলা ও বিহারে ৪০ হাজার লোক বর্গীদের হাতে প্রাণ হারিয়েছিলেন; এর মধ্যে ৩৫ হাজার বাংলায়।’
তার ভাষ্য—‘জন আর ম্যাকলেন তার “ল্যান্ড অ্যান্ড লোকাল কিংশিপ ইন এইটিন্থ-সেঞ্চুরি বেঙ্গল” বইয়ে এই তথ্যটিকে ভিত্তি করে প্রস্তাবনা করেন যে যদি অনুমান করা হয় তখন বাংলার লোকসংখ্যা ছিল ২ কোটি ৪০ লাখ; তাহলে প্রতি হাজারে প্রায় ৪০ জন বাঙালি মারাঠিদের হাতে নিহত হয়েছিলেন।’

Thumb
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. শহিদুল হাসান। ছবি: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট

‘চালের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছিল বলেও মত প্রকাশ করেন জন আর ম্যাকলেন।’

ড. শহিদুল হাসান জানান, ‘বইটিতে আরও বলা হয়—মারাঠাদের বেপরোয়া লুণ্ঠন ও নবাবের আর্থিক প্রয়োজনীয়তা এবং বিদেশি বণিকের রপ্তানিনীতি বাংলার অর্থ ব্যবস্থাকে তলানিতে পৌঁছে দিয়েছিল।’

শুধু বিদেশি নয়, দেশি লেখকদের লেখাতেও বর্গী নৃশংসতার কথা উঠে এসেছে। ১৭৫১ সালে লিখিত গঙ্গারামের ‘মহারাষ্ট্রা পুরাণ’ বইয়ে বর্গীদের নির্যাতন ও নৃশংসতার কথা বলা হয়েছে। তাদের হামলায় শিশু-নারী-বৃদ্ধ কেউই রেহাই পায়নি।

বর্গীরা ফসলের মাঠ পুরিয়ে দিয়ে বাংলায় খাদ্য সংকট সৃষ্টি করেছিল। তারা বাংলার গুরুত্বপূর্ণ রেশম শিল্প ধ্বংস করে দিয়েছিল।

পডকাস্টার দীপাঞ্জন ঘোষ জানান, ধনী-গরিব সবার সবকিছু ছিনিয়ে নেওয়ার পর তাদের হত্যা করতে দ্বিধা করেনি বর্গী দস্যুরা। বর্গীদের হামলায় ওড়িশায় দুর্ভিক্ষ হয়েছিল।

তিনি আরও জানান, বাংলার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সমৃদ্ধ জেলাগুলোয় তারা যে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিল তার পরিপ্রেক্ষিতে সেসব জেলার অর্থনীতি ধসে পড়েছিল।

উপসংহার

‘বর্গী হামলায় বাংলার পূর্বাঞ্চলীয় জেলাগুলোয় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বা আর্থ-সামাজিক প্রভাব কতটা পড়েছিল’—তা জানতে আবারও খোঁজ চালানো হয় অনলাইনে।

‘এআই মোড’ জানায়—বাংলার পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলাগুলো বর্গী হামলার শিকার হওয়ায় সেখানকার মানুষজন প্রাণ বাঁচাতে পূর্বাঞ্চলীয় জেলাগুলোয় আসতে শুরু করে। এতে উদ্বাস্তু সমস্যা সৃষ্টি হয়।

তবে পশ্চিমাঞ্চলের কারিগর ও শিল্পীরা পূর্বাঞ্চলে চলে আসায় তৎকালীন পূর্ববঙ্গ বা আজকের বাংলাদেশে হস্ত ও বস্ত্রশিল্পের বিকাশ ঘটে। শরণার্থীদের খাবারের সংকট দূর করতে কৃষির বিস্তার হয়।

বর্গী। এআই প্রতীকী ছবি

এমন পরিস্থিতিতে পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলোয় কর বেড়ে যায়।

আরও জানা যায়—পশ্চিমের জেলাগুলোয় বর্গীদের নৃশংসতা পূর্বাঞ্চলের মানুষদের মনে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিল। সেকারণে ‘বর্গী এলো দেশে’ ছড়াটি পূর্ববঙ্গের লোকসংস্কৃতিরও অংশ হয়ে উঠে।

২০২৫ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এই সময়-এর এক প্রতিবেদনের শিরোনামে বলা হয়—‘বাংলায় বর্গী কিন্তু, শিবাজী প্রতিষ্ঠিত মারাঠা রাষ্ট্র সংঘের মডেল।’

এতে বলা হয়, মারাঠা বাহিনী বাংলার মানুষের কাছে স্রেফ দস্যু বর্গী হলেও শিবাজীর তৈরি করা মারাঠা রাষ্ট্র সংঘের (আরএসএস) তাত্ত্বিক নেতৃত্বের কাছে ‘আদর্শ’ রাষ্ট্রের প্রতিরূপ।

আরও বলা হয়, ‘বর্গী হামলায় যেখানে খোদ আলিবর্দী নাকানিচোবানি খেয়েছিলেন সেখানে দক্ষিণবঙ্গের বিস্তীর্ণ জনপদগুলির মানুষের কী অবস্থা হয়েছিল, কী অত্যাচারের মুখে পড়তে হয়েছিল তার প্রমাণ হিসেবে রয়ে গিয়েছে এই প্রবাদ। যেখানে আরও কয়েকটি লাইন হলো, ‘… ধানের গোলা, চালের ঝুড়ি, সব শুধু খালি, ছিন্ন কাপড় জড়িয়ে গায়ে, শত শত তালি…।’

বাংলায় বর্গী হামলা শেষ হওয়ার ঠিক ২৭৫ বছর পরও এই প্রসঙ্গ জাজ্বল্যমান। চলতি বছরের শুরুতে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের সময় অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক সেই রাজ্যে মহারাষ্ট্রের নাগপুর-ভিত্তিক উগ্র হিন্দু সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ বা আরএসএস-এর সমর্থনপুষ্ট বিজেপিকে ঠেকাতে বাংলায় ‘বর্গী’ হামলার প্রসঙ্গ টেনেছিলেন।

অনেকের ভাষ্য—রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে বাঙালি মানসে ‘বর্গী’রা আজও ভীতিকর।

তাই এই দীর্ঘ সময় পরও জানা প্রয়োজন হয়—কারা এই ‘বর্গী’।