যুদ্ধের প্রভাবে দেশের বাজারে ভোজ্যতেল ও চিনির দাম বেড়েছে
গত কয়েক সপ্তাহে বাংলাদেশের প্রধান পাইকারি বাজারগুলোতে ভোজ্যতেল, চিনি ও মসলার দাম বেড়েছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম বৃদ্ধি, পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে সরবরাহ বিঘ্ন—এসব কারণে পাইকারি বাজারে পণ্যের দাম বেড়েছে।
তাদের মতে, এগুলোর কারণে আমদানি ব্যয় বেড়েছে। যার প্রভাব পড়েছে দেশের বাজারে।
চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ দেশের অন্যতম বড় পাইকারি বাজার। সেখানকার ব্যবসায়ীরা জানান, পর্যাপ্ত মজুত থাকার কারণে রমজানে বাজার মোটামুটি স্থিতিশীল ছিল। তবে ঈদের পর সরবরাহ কমায় পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে।
খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ী আব্দুর রাজ্জাক বলেন, বড় আকারের ঘাটতি না থাকলেও দামের বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে।
তার ভাষ্য, ‘কিছু পণ্যের দাম হঠাৎ বেড়ে গেছে, কারণ আমদানিতে সমস্যা হচ্ছে এবং আমদানি ব্যয় বেড়েছে।’
ভোজ্যতেল
ভোজ্যতেলের মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বেশি দাম বেড়েছে সয়াবিন তেলের।
আব্দুর রাজ্জাক জানান, খাতুনগঞ্জে এক মণ সয়াবিন তেলের দাম এখন ৭ হাজার ৪০০ টাকা, যা এক সপ্তাহ আগে ছিল ৬ হাজার ৬০০ টাকা। পাম অয়েল বেড়ে হয়েছে ৬ হাজার ৪৫০ টাকা, যা আগে ছিল ৬ হাজার টাকা।
ঢাকার কারওয়ানবাজারের ব্যবসায়ী আবু বকর সিদ্দিক জানান, কারওয়ানবাজারে বোতলজাত তেলের দাম তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি, বলা যায় অপরিবর্তিতই আছে। তবে ঈদের পর খোলা সয়াবিন তেলের দাম প্রতি মণে প্রায় ১ হাজার ২০০ টাকা বেড়ে ৬ হাজার ৬০০ থেকে ৬ হাজার ৭০০ টাকায় পৌঁছেছে।
তিনি আরও বলেন, সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে লিটারপ্রতি ৭ থেকে ৮ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে খোলা সয়াবিন তেল।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ প্রধানত মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে থেকেই ভোজ্যতেল আমদানি করে।
এনবিআর ও ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সয়াবিন তেল ও কাঁচা তেলবীজ আসে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে। দেশে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত পাম অয়েল মূলত আসে ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া থেকে।
এ বিষয়ে বড় একটি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, এসব পণ্যের কোনো চালানই হরমুজ প্রণালী দিয়ে আসে না। তবে ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম বাড়ছে, যার প্রভাব এখানেও দেখা যাচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ ‘পিংক শিট’ অনুযায়ী, মার্চে পাম অয়েলের গড় দাম ছিল প্রতি টনে ১ হাজার ১০৩ ডলার, যা ফেব্রুয়ারিতে ছিল ১ হাজার ০৩৯ ডলার এবং জানুয়ারিতে ১ হাজার ০০৫ ডলার।
সয়াবিন তেলের দাম আরও বেশি বেড়েছে। সয়াবিন তেলের দাম ফেব্রুয়ারির ১ হাজার ২৮২ ডলার থেকে বেড়ে মার্চে ১ হাজার ৪৮২ ডলারে পৌঁছেছে, অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে দাম বেড়েছে প্রায় ১৬ শতাংশ।
সয়াবিন মিলের দামও বেড়ে মার্চে হয়েছে ৪৭৩ ডলার, যা ফেব্রুয়ারিতে ছিল ৪২৫ ডলার।
ডেল্টা অ্যাগ্রোফুড ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিরুল হক বলেন, বৈশ্বিকাভাবে আমদানি খচর বাড়ায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
তিনি জানান, দেড় মাসের মধ্যে তেলবীজের দাম ৪৩৫ থেকে ৪৫০ ডলার বেড়ে প্রায় ৫০০ ডলারে পৌঁছেছে, এবং এটি আরও বেড়ে ৫৫০ ডলার পর্যন্ত হতে পারে।
আন্তর্জাতিক বাজারের প্রবণতা দেখে তিনি আশঙ্কা করেন, সয়াবিন তেলের দাম টনপ্রতি ১ হাজার ৩০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
সিটি গ্রুপের বিজনেস ডেভলেপমেন্ট পরিচালক লুৎফুল কবির শাহীন বলেন, যুদ্ধের পর পরিবহন খরচ ২ থেকে আড়াই গুণ বেড়ে গেছে, এটাই মূল কারণ।
তবে এ বিষয়ে মেঘনা গ্রুপের কর্মকর্তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
বাংলাদেশ পাইকারি ভোজ্যতেল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি গোলাম মাওলা বলেন, এটি হঠাৎ কোনো সংকট নয়, বরং বাজারে চলমান চাপের প্রতিফলন।
তিনি বলেন, ‘পণ্য আছে, কিন্তু দ্রুত বিক্রি হয়ে যাচ্ছে—তাই সরবরাহ কম বলে মনে হচ্ছে।’
কারওয়ান বাজারের খুচরা ব্যবসায়ী আবু বকর সিদ্দিক বলেন, আতঙ্কে মানুষ প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কিনছে। এতে বাজারে চাপ বেড়েছে।
তিনি অভিযোগ করনে, ‘বাজারে সরকারের নিয়ন্ত্রণ কম, আর খাতুনগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের পাইকাররা নিজেদের মতো দাম নির্ধারণ করছেন।’
মসলা ও চিনি
খাতুনগঞ্জে সবচেয়ে বেশি দাম বেড়েছে মসলা ও শুকনা ফলের। যেগুলোর বেশিরভাগ মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়া থেকে আসে, সে কারণে দাম দ্রুত বাড়ছে।
পেস্তাবাদামের দাম ৩০ শতাংশের বেশি বেড়ে কেজিতে ৪ হাজার ১০০ টাকায় পৌঁছেছে। শুকনা আলুবোখারার দাম ১৬০ শতাংশের বেশি বেড়ে ১ হাজার ৩২০ টাকা হয়েছে। এই দুই পণ্য মূলত ইরান ও আফগানিস্তান থেকে আসে।
কিশমিশ, জিরা, জায়ফল ও জয়ত্রী—এসবের দামও বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, যেহেতু এসব পণ্যের বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে, তাই সেখানে সরবরাহে সমস্যা হলে বাংলাদেশের বাজারে দ্রুত প্রভাব পড়ে।
কিশমিশ আসে ইরান, আফগানিস্তান, তুরস্ক ও উজবেকিস্তান থেকে। জিরা আসে ভারত, সিরিয়া ও তুরস্ক থেকে। জায়ফল ও জয়ত্রী আসে প্রধানত ইন্দোনেশিয়া থেকে।
চিনির দাম কিছুটা বেড়েছে প্রতি মণ ৩ হাজার ৫৫০ টাকা হয়েছে, যা এক সপ্তাহ আগে ছিল ৩ হাজার ৪২০ টাকা। বাংলাদেশ প্রধানত ব্রাজিল, ভারত ও থাইল্যান্ড থেকে চিনি আমদানি করে।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মার্চে বিশ্ববাজারে চিনির দাম কেজিতে ০.৩৩ ডলার হয়েছে, যা ফেব্রুয়ারিতে ছিল ০.৩১ ডলার।
২০২৩ সালে ০.৫২ ডলারে ওঠার পর থেকে চিনির দাম নিম্নমুখী ছিল। ২০২৪ সালে ছিল ০.৪৫ ডলার, ২০২৫ সালে ০.৩৭ ডলার।
পরিহন খরচই মূল কারণ
বাংলাদেশের প্রধান আমদানি পণ্য হরমুজ প্রণালী দিয়ে না এলেও, বৈশ্বিক শিপিং ব্যবস্থার বিঘ্নের কারণে পরিবহন খরচ অনেক বেড়েছে।
শীর্ষ একটি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, আগে প্রতি টনে পরিবহন খরচ ছিল ৩৫ ডলার, যা এখন বেড়ে ৫৫ ডলার হয়েছে—অর্থাৎ ৫৭ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানি মার্চের শুরু থেকেই অতিরিক্ত চার্জ আরোপ করেছে।
মার্স্ক ৩ মার্চ গালফ অঞ্চলের (সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, সৌদি আরব, বাহরাইন, কুয়েত, ইরাক, ওমান) জন্য জরুরি পরিবহন চার্জ ঘোষণা করে—২০ ফুট কনটেইনারে ১ হাজার ৮০০ ডলার, ৪০ ফুটে ৩ হাজার ডলার, এবং রেফ্রিজারেটেড ইউনিটে ৩ হাজার ৮০০ ডলার।
সিএমএ সিজিএম ২ মার্চ একই ধরনের জরুরি চার্জ ঘোষণা করে যথাক্রমে ২ হাজার, ৩ হাজার ও ৪ হাজার ডলার।
এছাড়া ১৬ মার্চ থেকে তারা ৭৫ থেকে ১৮০ ডলার পর্যন্ত অতিরিক্ত জ্বালানি চার্জ আরোপ করে।
এমএসসি ৫ মার্চ ভারতীয় উপমহাদেশ (বাংলাদেশসহ) থেকে পূর্ব আফ্রিকা ও ভারত মহাসাগরগামী পণ্যের ওপর ৫০০ থেকে ১ হাজার ডলার যুদ্ধকালীন অতিরিক্ত চার্জ আরোপ করে।
৭ মার্চ তারা ভূমধ্যসাগর ও কৃষ্ণসাগর থেকে ভারতীয় উপমহাদেশ ও লোহিত সাগরমুখী পণ্যের ওপর সর্বোচ্চ ২০০ ডলার অতিরিক্ত জ্বালানি চার্জ আরোপ করে।