নাকুগাঁও স্থলবন্দর দিয়ে ১০ বছরে শুধু পাথর আমদানি হয়েছে
শেরপুরের নালিতাবাড়ীতে অবস্থিত নাকুগাঁও স্থলবন্দরটি ২০১৫ সালে যাত্রা শুরু করলেও এখনো পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম চালু হয়নি। বাংলাদেশ ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর মধ্যে বাণিজ্য সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে সম্ভাবনাময় এই স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি হচ্ছে শুধু পাথর।
বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের অধীনে পরিচালিত এই বন্দরটি ১৩ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত। এটি ভারতের মেঘালয়ের বারাঙ্গাপাড়ায় অবস্থিত ডালু কাস্টমস স্টেশনের সঙ্গে যুক্ত।
২০১০ সালে নাকুগাঁওকে স্থলবন্দর ঘোষণা করা হয় এবং ২০১৫ সালের জুনে এর কার্যক্রম শুরু হয়। এখানে ইমিগ্রেশন কার্যক্রমও চালু রয়েছে। এই সীমান্ত দিয়ে যাত্রীরাও চলাচল করতে পারেন।
বন্দরের অতিরিক্ত পরিচালক (ট্রাফিক) মো. জাহিদুল ইসলাম জানান, এই বন্দর দিয়ে পাথর ও বোল্ডার, কয়লা, চুনাপাথর, চায়না ক্লে, কাঠ, রাসায়নিক সার, পেঁয়াজ, মরিচ, রসুন, আদা, তাজা ফল, গাছপালা, বীজ, গম, কোয়ার্টজ, ফ্লাই অ্যাশসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানির অনুমতি রয়েছে। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া ভুটানের পণ্যও এখান দিয়ে আমদানি করা যায়। পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে রপ্তানিযোগ্য সব পণ্য নাকুগাঁও দিয়ে পাঠানো সম্ভব।
স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, ভারত থেকে পাথর আমদানির পরিমাণ ২০১৯-২০ অর্থবছরের ৮৫ হাজার ৩৫ মেট্রিক টন থেকে বেড়ে ২০২১-২২ অর্থবছরে ২ লাখ ৭৬ হাজার ৪৮৩ মেট্রিক টনে দাঁড়ায়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা সর্বোচ্চ ৩ লাখ ৯১ হাজার ১৩৭ মেট্রিক টনে পৌঁছায়। তবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আমদানির পরিমাণ কমে ১ লাখ ৯৫ হাজার ৬৫৫ মেট্রিক টনে নেমে আসে।
ব্যবসায়ীরা জানান, বন্দরটির আমদানি-রপ্তানিকারক সমিতির ২৫০ জন সদস্য থাকলেও বর্তমানে মাত্র ৩৫ জন স্থানীয় ব্যবসায়ী পাথরের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।
সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মিজানুর রহমান অভিযোগ করেন, ভারতের সীমান্ত এলাকায় বিভিন্ন গোষ্ঠীর চাঁদাবাজির কারণে পাথরের দাম বেড়ে যাচ্ছে। এ জন্য দুই দেশের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীরা এই ব্যবসায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন।
তিনি জানান, ব্যবসায়ীদের মাল্টিপল পারপাস ভিসা দেওয়ার বিষয়ে সম্প্রতি ভারতের হাইকমিশনারের সঙ্গে আলোচনা করেছেন শেরপুর-২ (নকলা-নালিতাবাড়ী) আসনের সংসদ সদস্য প্রকৌশলী ফাহিম হোসেন চৌধুরী।
মিজানুর রহমান বলেন, ‘ব্যবসায়ীদের জন্য এরকম ভিসার ব্যবস্থা থাকলে প্রয়োজন অনুযায়ী আমরা ভারতে যাতায়াত করতে পারব। এতে দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়বে এবং অন্যান্য পণ্যের বাণিজ্যও সম্প্রসারিত হবে।’
তিনি আরও বলেন, বাণিজ্যের পাশাপাশি যাত্রীসেবা ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন করা হলে বাংলাদেশ ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মধ্যে মানুষের যাতায়াত, পর্যটন ও ব্যবসায়িক ভ্রমণের সুযোগ বাড়বে।
সমিতির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমান মুকুল বলেন, মেঘালয়ের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ থাকায় ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় বাজারে প্রবেশের সুযোগ রয়েছে বাংলাদেশের। পাশাপাশি প্রতিবেশী রাজ্যগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণেরও সুযোগ রয়েছে। তবে পাথর আমদানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা বন্দরটির জন্য দুর্বলতা।
শেরপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মো. আরিফ হোসেন জানান, বন্দরে ৪০০ মেট্রিক টন ধারণক্ষমতার গুদাম, ট্রান্সশিপমেন্ট ইয়ার্ড, পার্কিং ইয়ার্ড, ওয়েব্রিজ স্কেল, অফিস, ডরমিটরি, ব্যারাক ও পর্যবেক্ষণ টাওয়ার রয়েছে। এ ছাড়া পণ্য ওঠানো-নামানোরও ব্যবস্থা রয়েছে।
তিনি বলেন, বন্দরটিকে পূর্ণাঙ্গভাবে সচল করতে হলে বাণিজ্যবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। দ্রুত শুল্কায়ন ও পণ্য খালাস, উন্নত সড়ক যোগাযোগ, কম পরিবহন ব্যয় এবং দুই পাশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে যোগাযোগ নিশ্চিত করাও জরুরি।
বন্দর সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নাকুগাঁওয়ে রাজস্ব আয় বেড়েছে। পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যক্রম চললে তা আরও বাড়বে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বন্দরটি থেকে প্রায় ৮ কোটি ৯০ লাখ টাকা এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১০ কোটি টাকার বেশি আয় হয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে রাজস্ব আয় হয়েছে ৩৭ লাখ টাকার বেশি।
ময়মনসিংহ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সহসভাপতি শঙ্কর সাহা বলেন, স্থলবন্দরটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা গেলে এবং ইমিগ্রেশন সেবা কার্যকর হলে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়বে। শত শত মানুষের কর্মসংস্থান হবে। এই অঞ্চলের অর্থনীতির জন্য নাকুগাঁও স্থলবন্দর বিপুল সম্ভাবনাময়।