হাওরের বন্যায় ১০৪৭ কোটি টাকার ফসলের ক্ষতি

সুকান্ত হালদার
সুকান্ত হালদার

টানা বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও বন্যায় গত ২৬ এপ্রিল থেকে ৪ মে পর্যন্ত দেশের সাতটি হাওর জেলায় প্রায় ১ হাজার ৪৭ কোটি টাকার ফসলের ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়।

মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ তথ্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাকির হোসেন আজ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘হাওর অঞ্চলের মোট কৃষিজমির ১০ দশমিক ৭৮ শতাংশ, অর্থাৎ ৪৯ হাজার ৭৩ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘এতে বোরো ধানের ক্ষতি হয়েছে প্রায় ২ লাখ ১৩ হাজার টন। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় ২ লাখ ৩৬ হাজার কৃষক।’

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্য অনুযায়ী, সাতটি হাওর জেলায় এবার ৪ লাখ ৫৫ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়েছিল। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত প্রায় ৮০ শতাংশ ধান কাটা শেষ হয়েছে।

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে মোট ৫০ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৩ দশমিক ২৯ শতাংশ বেশি।

ডিএইর তথ্যে দেখা যায়, বোরো ধানের উৎপাদন ২০২১-২২ অর্থবছরের ২ কোটি ১ লাখ টন থেকে বেড়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২ কোটি ১৩ লাখ টনে পৌঁছেছে। চলতি মৌসুমে ২ কোটি ২৪ লাখ টন বোরো উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার।

বোরো হলো শুষ্ক মৌসুমের সেচনির্ভর ধান, যা ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির শুরু পর্যন্ত রোপণ করা হয় এবং এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে কাটা হয়। দেশের মোট বার্ষিক চাল উৎপাদনের প্রায় ৫৫ শতাংশ আসে এই ফসল থেকে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সম্প্রসারণ উইংয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. সেলিম খান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘প্রাথমিক হিসাবে হাওর অঞ্চলের প্রায় ১১ শতাংশ ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘হাওর অঞ্চলের প্রায় ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ এলাকা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত। তবে প্রায় ৮০ শতাংশ ধান ইতোমধ্যে কেটে ফেলা হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘সাধারণত মৌসুমের মধ্যেই হাওর অঞ্চলের ধান কাটা শেষ হয়। কিন্তু এবার বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় এবং এপ্রিলের ভারী বৃষ্টিপাতে ফসলের ক্ষতি হয়েছে।’

সরকার ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরির কাজ চলছে এবং দু-একদিনের মধ্যেই শেষ হবে।’

তার ভাষ্য, আগামী দু-তিনদিনের মধ্যে সহায়তা কার্যক্রম শুরু হবে এবং তিন মাস পর্যন্ত চলবে। এতে করে কৃষক ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।

এদিকে, কিশোরগঞ্জের মিঠামইনের গোপদিঘী ইউনিয়নের বজরপুর হাওরের কৃষক ফয়জুল ইসলাম পাঁচ একর জমিতে ধান আবাদ করেছিলেন। এর মধ্যে দুই একরের ধান পানিতে তলিয়ে যায়। বাকি তিন একরের ধান কাটলেও মাড়াইয়ের মাঠে রাখা ধানে অঙ্কুর গজিয়ে তা-ও নষ্ট হয়ে যায়।

সব মিলিয়ে প্রায় ৩০০ মণ ধানের ক্ষতি হয়েছে বলে জানান ফয়জুল।

স্থানীয় মহাজনের কাছ থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নেওয়ার কথা উল্লেখ করে ফয়জুল ইসলাম জানান, এখন কীভাবে সেই টাকা শোধ করবেন তা নিয়ে তিনি দুশ্চিন্তায় আছেন।

তিনি বলেন, ‘এই টাকা এখন কীভাবে শোধ করব? শেষ পর্যন্ত হয়তো জমি বিক্রি করা ছাড়া আর উপায় থাকবে না।’

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান হাওর অঞ্চলে ভারী বর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তায় দ্রুত ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন।

আজ বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় স্বচ্ছতার সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা প্রস্তুতের নির্দেশনাও দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের চিহ্নিত করে নির্ভুল ও স্বচ্ছ তালিকা প্রস্তুত করতে হবে। এই তালিকার ভিত্তিতেই আগামী তিন মাস কৃষকদের আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে।

সভায় সিদ্ধান্ত হয়, যতো দ্রুত সম্ভব ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের হাতে আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হবে। পাশাপাশি বৃষ্টির কারণে কৃষক যেন ক্ষতির মুখে না পড়েন, সে জন্য ধান রোপণ ও সংগ্রহের মৌসুম কিছুটা এগিয়ে আনার বিষয়েও আলোচনা হয়।