৩০ বছরে আইয়ুব বাচ্চুর ‘কষ্ট’

মাহমুদ নেওয়াজ জয়
মাহমুদ নেওয়াজ জয়
31 December 2025, 11:53 AM
UPDATED 1 January 2026, 17:45 PM

'তারপর একদিন: ভরা জ্যোৎস্নায় আমিও চলে যাবো একমাত্র নিশ্চয়তাকে সঙ্গী করে চির নবান্নের দেশে। জেনে যাবো—"সবকিছুই বড় দেরিতে আসে, বড় দেরিতে ধরা দেয়; হারিয়ে যায় সেও হঠাৎ করেই"।'

১৯৯৫ সালে প্রকাশিত হয়েছিল আইয়ুব বাচ্চুর তুমুল জনপ্রিয় একক অ্যালবাম 'কষ্ট'। সেই অ্যালবামের কভারে লেখা ছিলো এই কথাগুলো। লিখেছিলেন নিয়াজ আহমেদ অংশু।

এর আগে আশির দশকে আইয়ুব বাচ্চুর দুটি একক অ্যালবাম প্রকাশিত হলেও এলআরবি গঠনের পর এটিই ছিল তার প্রথম একক অ্যালবাম৷ এই অ্যালবামই বাচ্চুকে বাংলা ব্যান্ড বা রকগানের সিংহাসনে বসিয়ে দেয়।

কিন্তু কেন এত জনপ্রিয় হলো 'কষ্ট'? এখানে আইয়ুব বাচ্চুর চমৎকার গায়কী ও গানগুলোর কথার যেমন ভূমিকা ছিল, তেমনিভাবে ভূমিকা ছিল আইয়ুব বাচ্চুর জাদুকরি সুরের। যদিও নিজ নাম ব্যবহার না করে তিনি সুর ও সংগীতের ক্ষেত্রে ব্যবহার করেছিলেন ডাকনাম 'রবিন'।

অ্যালবামটির সব গানের কম্পোজিশন অত্যন্ত চমৎকার। 'কষ্ট' নিয়ে গান ছিল তিনটি, সবগুলোই অসাধারণ। 'কষ্ট পেতে ভালোবাসি'-তে মেলোডি ও রকের এক অনবদ্য সমন্বয় ঘটান বাচ্চু। কি-বোর্ড ও গিটারের দুর্দান্ত মেলবন্ধন, মিনিমাল ড্রাম আর বেজে গানটির ভারসাম্য রক্ষা করেছেন দারুণভাবে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাচ্চুর ন্যাচারাল প্যাথোসে পূর্ণ কণ্ঠ।

'কষ্ট আমার এই বুকে' গানে হার্ড রকের সঙ্গে মেলোডির মেলবন্ধন পাওয়া যায়। এই গানটিতে বাচ্চুর গিটার বাদন আন্তর্জাতিক মানের। গানটি হার্ড রক ও মেলোডিক রকের মাঝামাঝি পথ ধরে চলেছে।

'কষ্ট কাকে বলে' একদম মেলো রক গান। এখানে শুরুতেই আমরা শুনতে পাই কি-বোর্ডের দুর্দান্ত একটি ইন্ট্রো। এই গানটির পুরোটাজুড়েই এই কি-বোর্ডটাই প্রধান। আর তার সঙ্গে যুক্ত হয় বাচ্চুর উদাত্ত কণ্ঠে প্রকাশিত হাহাকার, যা ছড়িয়ে পড়ে আমাদের মনোজগতের চরাচরে।

'অবাক হৃদয়' গানটিতে হালকা ব্লুজ নোটের প্রয়োগ আছে। এই গানে যে অনুভূতিশূন্যতা বা নাম্বনেস আমরা পাই, সেটিকে আরও মূর্ত করেছে এই ব্লুজ নোটের প্রয়োগ।

'১০০ টা স্বপ্ন' গানটিতে স্বপ্ন পূরণ না হওয়ার হাহাকারের প্রকাশ আবার অনেক জোরালো ও তীব্র। এ কারণে এই গানের কম্পোজিশনে বাচ্চু প্রয়োগ করেছেন হার্ড রক।

এর বিপরীতে 'জেগে আছি একা' গানটি আবার একদমই সফট। একে ঠিক রক বা মেলো রকও বলা যায় না। একদম নরম মেলোডির ব্যথাতুর এক গান৷ এই কম্পোজিশনটি শ্রোতাদের আইয়ুব বাচ্চুর 'সোলস' ব্যান্ডের জন্য করা সফট কম্পোজিশনগুলোর কথা মনে করিয়ে দিতে পারে।

এই অ্যালবামের 'হয়ত কোথাও' গানটি কনসেপ্টের দিক থেকে ব্যতিক্রমধর্মী। এই গানে প্রেমিক ইতোমধ্যেই মারা গেছে। পরপার থেকে সে ভালোবাসার মানুষের উদ্দেশ্যে কিছু কথা বলছে।

'আমিও মানুষ' গানটি আবার একেবারেই আধুনিক বাংলা গানের মতো। চমৎকার মেলোডিয়াস এই গানটিতে বেশ সিনেমাটিক একটা স্বাদ ও অনুভূতি আছে।

'হৃদয়ের পুনর্বাসন' গানটি আশি-নব্বই দশকের অডিও ক্যাসেটের মেলোডিয়াস আধুনিক বাংলা গানের মতো। তপন চৌধুরীর জন্য আইয়ুব বাচ্চুর সুর করা গানগুলোর কথা মনে পড়ে যাবে চমৎকার এই গানটি শুনলে।

'আমার জীবন' গানটি চমৎকার এক ব্লুজ কম্পোজিশনের উদাহরণ। সে সময়ের বাংলা গানে ব্লুজের এমন প্রয়োগ বলতে গেলে ছিল না। এই গানে জীবনের অন্তর্নিহিত যে হতাশার যে সুর ও রূপ ফুটে ওঠে, ব্লুজ স্টাইল কম্পোজিশন তাকে মূর্ত করে তুলেছে।

'ভীষণ ব্যথা' গানটিতে র‍্যেগে ও ব্লুজের সমন্বয়ে অনন্যসাধারণ এক কম্পোজিশন দাঁড় করিয়েছেন আইয়ুব বাচ্চু। গানটির কম্পোজিশন খুবই ব্যতিক্রমী ও সে সময়ের হিসেবে একেবারেই অনন্য। বাংলায় র‍্যেগে ও ব্লুজের এরকম মেলবন্ধন ঘটানো গান খুব বেশি নেই৷

'বহুদূর যেতে হবে' গানটি সমস্ত কষ্ট পেরিয়ে জীবনে এগিয়ে যাওয়ার গান। গানটির শুরু হয় বেশ লম্বা একটি চমৎকার গিটার সলো দিয়ে৷ এই সলোটি যেমন দুর্দান্ত সুন্দর, তেমনি গানটিরও পুরোটা জুড়েই আছে আশাবাদ। এই গানটির সুরে মেলোডিক রকের সঙ্গে হালকা একরকম ব্লুজ ফ্লেভার এনেছেন বাচ্চু৷ এতে বাধা ও দুঃখকে অতিক্রম করে শান্তি ও আনন্দকে খুঁজে নেওয়ার বার্তা আরও সজীবতা পেয়েছে৷

'কষ্ট' অ্যালবামটি সে সময়ের তরুণদের মনের কথাগুলো বলে দিয়েছে গানে গানে। রক গানকে নির্ধারিত গণ্ডি পেরিয়ে নিয়ে গেছে ঘরে ঘরে। অ্যালবামটি সে সময়ে রেকর্ড পরিমাণ বিক্রি হয়ে অডিও জগতে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। আইয়ুব বাচ্চুর গায়কী সার্বিকভাবে সবচেয়ে মেলোডিয়াস এই অ্যালবামে। তার অসাধারণ সংগীত প্রতিভা এবং বৈচিত্র্যময় ও শক্তিমান সুরকারসত্ত্বার চমকপ্রদ প্রকাশ ঘটেছে এই অ্যালবামে। প্রকাশের ৩০ বছর পরও তাই শ্রোতাদের হৃদয়ে 'কষ্ট' জীবন্ত হয়ে রয়ে গেছে, রয়ে যাবে সবসময়।