সাগর সেন: রবীন্দ্র সংগীতকে সোনার খাঁচা থেকে মুক্ত করেছিলেন যিনি

মাহমুদ নেওয়াজ জয়
মাহমুদ নেওয়াজ জয়
4 January 2026, 14:44 PM
UPDATED 4 January 2026, 20:54 PM

১৯৫৮ সাল। অল ইন্ডিয়া রেডিওতে শ্রোতারা প্রথম শুনলেন এক নতুন কণ্ঠ। মোলায়েম অথচ শক্তিশালী গলা, সূক্ষ্ম সংগীতবোধ আর গভীর আবেগ—সব মিলিয়ে কণ্ঠটি আলাদা করে নজর কাড়ে। 

এই তরুণ শিল্পীই পরবর্তীতে হয়ে ওঠেন সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রবীন্দ্র সংগীতশিল্পী—সাগর সেন।

সাগর সেনের জন্ম ১৯৩২ সালের ১৫ মে, ফরিদপুরে। দেশভাগের পর তার পরিবার চলে যায় কলকাতায় এবং বরানগরে বসবাস শুরু করে। সেখানেই তার প্রাতিষ্ঠানিক সংগীত শিক্ষার সূচনা। সেই সময় কলকাতার সংগীতাঙ্গন ছিল সমৃদ্ধ ও প্রাণবন্ত। 

পঙ্কজ কুমার মল্লিক, দেবব্রত বিশ্বাস, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, চিন্ময় চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথের সরাসরি শিক্ষার্থী কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, সুচিত্রা মিত্র—এমন সব শিল্পীর গান শুনতে শুনতেই সাগর সেনের মনে রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্রতি গভীর আকর্ষণ তৈরি হয়। 

অবশেষে ১৯৫৮ সালেই অল ইন্ডিয়া রেডিওতে প্রথমবারের মতো রবীন্দ্র সংগীত পরিবেশন করেন সাগর সেন।

1000147346.png
ছবি: সাগর সেন

ষাটের দশক থেকে সন্তোষ গুপ্তের নির্দেশনায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিভিন্ন গীতিনাট্যে নিয়মিত অংশ নিতে থাকেন সাগর সেন। ১৯৬৬ সালে 'শাপমোচন' এবং ১৯৬৭ সালে 'বাল্মীকি প্রতিভা'য় তার অংশগ্রহণ প্রশংসিত হয়।  

তবে তার ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরে যায় ১৯৬৮ সালে। অল ইন্ডিয়া রেডিওতে তার কণ্ঠে প্রচারিত রবীন্দ্র সংগীত—'আমি জেনেশুনে বিষ করেছি পান' বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করে। এই গানের মাধ্যমেই সাগর সেন রবীন্দ্রসংগীতে দেবব্রত বিশ্বাস, হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ও চিন্ময় চট্টোপাধ্যায়দের সমকক্ষ শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।

১৯৭৪ সালে গ্রামোফোন কোম্পানি অব ইন্ডিয়ার ব্যানারে প্রকাশিত হয় তার প্রথম লং প্লে রেকর্ড 'পূজা ও প্রেম'। রেকর্ডটির দুই পিঠে মোট চৌদ্দটি গান ছিল—একপিঠে পূজা পর্বের, অন্যপিঠে প্রেম পর্বের গান। 

'আমি জেনে শুনে বিষ করেছি পান', 'কতবারো ভেবেছিনু আপনা ভুলিয়া', 'অলি বারবার ফিরে যায়', 'এরা সুখের লাগি চাহে প্রেম'—এই গানগুলো ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। 

এরপর থেকে নিয়মিতভাবে লং প্লে রেকর্ড প্রকাশ করতে থাকেন তিনি। তার কণ্ঠে রবীন্দ্র সংগীত পৌঁছে যায় ঘরে ঘরে। বাণিজ্যিক সফলতার দিক থেকেও তিনি হয়ে ওঠেন শীর্ষস্থানীয় রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী। 

তার সাফল্যে অবশ্য গুণী সংগীতজ্ঞ ভি. বালসারার অবদানও উল্লেখ না করলেই নয়। সাগর সেনের গানগুলোর সংগীত পরিচালনা তিনিই করতেন। প্রথাগত ভাবগাম্ভীর্যের বাইরে এসে সংগীতায়োজনে ভি.বালসারা নিয়ে আসেন সহজ লাবণ্য। সেইসঙ্গে সাগর সেনের ব্যারিটোনাল কণ্ঠ রবীন্দ্র সংগীতকে পৌঁছে দেয় ঘরে ঘরে। 

১৯৭৪ সালেই আধুনিক বাংলা গানেও তার অভিষেক ঘটে। 'যে যেখানে দাঁড়িয়ে' ছবিতে প্লেব্যাক করেন তিনি। 

১৯৭৯ সালে 'পরিচয়' চলচ্চিত্রে তার কণ্ঠে রবীন্দ্র সংগীত 'আজ জোছনা রাতে সবাই গেছে বনে' গানটির জন্য বেঙ্গল ফিল্ম জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে সেরা গায়কের পুরস্কার পান। 

সাগর সেনের জীবনে আরেকটি স্মরণীয় সম্মান আসে ১৯৭৫ সালের আগস্টে। কলকাতা দূরদর্শনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রথম সংগীত পরিবেশনার সুযোগ পান তিনি। তার সঙ্গে ছিলেন আরেক প্রখ্যাত রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী সুমিত্রা সেন। সেদিন সাগর সেন পরিবেশন করেন 'আকাশ ভরা সূর্য তারা, 'বিশ্বভরা প্রাণ'।

১৯৮০ সালে 'আবির্ভাব' চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন তিনি। 

1000147347.png
সলিল চৌধুরীর সঙ্গে রেকর্ডিংয়ে সাগর সেন। ছবি: সংগৃহীত

পাশাপাশি সলিল চৌধুরীর সংগীত পরিচালনায় রেকর্ড করেন বেশ কিছু আধুনিক বাংলা গান। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—'এ জীবন এমনি করে আর তো সয়না', 'কী হলো চাঁদ কেনো মেঘে ঢেকে গেলো' এবং সবিতা চৌধুরীর সঙ্গে গাওয়া ডুয়েট গান 'তৃষিত নয়নে এসো'। 'তৃষিত নয়নে এসো' গানটি ছিলো 'দেবিকা' সিনেমায়। এই গানগুলো প্রমাণ করে, ধ্রুপদী সঙ্গীতেও সাগর সেন দক্ষ ছিলেন। 

শুধু শিল্পী হিসেবেই নয়, সংগীত শিক্ষক হিসেবেও সাগর সেন বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। তিনি 'রবি রাশ্মি' নামে একটি সংগীত বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। 

শ্রাবণ সন্ধ্যা, শাপমোচন, ঋতুরঙ্গ, গানের ঝরণাতলায়, বিশ্বজন মোহিছে, স্বদেশে নেয়ে বিদেশে খেয়ে—এর মতো বহু গুরুত্বপূর্ণ কনসার্টে অংশ নেন তিনি। রবীন্দ্র সদন, শিশির মঞ্চ, কলা মন্দিরসহ নানা প্রখ্যাত মঞ্চে তার পরিবেশনা আজও স্মরণীয়।

ক্যারিয়ারের শীর্ষ সময়েই নেমে আসে দুঃসংবাদ। ১৯৮১ সালে ধরা পড়ে তার গলায় মরণঘাতী ক্যান্সার। চিকিৎসা শুরু হলেও খুব বেশি সাফল্য আসেনি। তবুও অসুস্থ শরীর নিয়েও গান গাওয়া ও শেখানো তিনি বন্ধ করেননি। 

১৯৮২ সালের শেষ দিকে তার শারীরিক অবস্থা দ্রুত অবনতি ঘটে। অবশেষে ১৯৮৩ সালের ৪ জানুয়ারি, মাত্র ৫০ বছর বয়সে পরলোকে পাড়ি জমান এই কণ্ঠশিল্পী। তিনি তার জীবদ্দশায় ১১০ টির মতো রবীন্দ্রগান রেকর্ড করেছিলেন। 

মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী ও তিন সন্তান—প্রমিত সেন, প্রীতম সেন ও প্রিয়ম সেনকে রেখে যান। তার পুত্ররাও ভালো রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী। বিশেষত, প্রমিত সেন পরবর্তীতে রবীন্দ্রগানে খ্যাতি অর্জন করেছেন। 

সাগর সেন রবীন্দ্র সংগীকে একটি নির্দিষ্ট গণ্ডি অতিক্রম করে পৌঁছে দিয়েছিলেন সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে। রবীন্দ্রনাথের গানকে সোনার খাঁচা থেকে মুক্ত করে উড়িয়ে দিয়েছিলেন খোলা হাওয়ায়, খোলা আকাশে। 

তাই সাগর সেন শ্রোতাদের হৃদয়ে রয়ে গিয়েছেন চিরস্থায়ী এক নাম হিসেবে। রয়ে গিয়েছেন এমন এক কণ্ঠ হয়ে, যে কণ্ঠ মানুষকে কাঁদায়, হাসায়, ভাবালুতায় ও ভালোবাসায় ভাসায়।